ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে তাঁর সন্ধিচুক্তির প্রতীক হিসাবে রামধনু ব্যবহার করেন

আদিপুস্তক ৯.১১-১৩ আমি এক সন্ধি চুক্তি স্থাপন করব, তার শর্ত হবে এই যে, আর কখনো জলপ্লাবনে সমস্ত প্রাণী বিনষ্ট হবে না এবং আর কখনো পৃথিবীবিধ্বংসী প্লাবন হবে না। ঈশ্বর আরও বললেন, তোমাদের ও তোমাদের সঙ্গে যত প্রাণী আছে তাদের সঙ্গে পুরুষানুক্রমে স্থায়ী যে সন্ধি চুক্তি আমি স্থাপন করলাম, তার নিদর্শন হবে এইঃ আকাশের গায়ে আমি আমার ধনু স্থাপন করব, আর তা-ই হব পৃথিবীর সঙ্গে স্থাপিত আমার সন্ধি চুক্তির প্রতীক।

রামধনু কী তা অধিকাংশ মানুষই জানে, এবং রামধনু সংক্রান্ত কিছু আখ্যান তারা শুনেছে। বাইবেলে রামধনু বিষয়ক যে আখ্যায়িকা রয়েছে, সেই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, কিছু মানুষ তা বিশ্বাস করে, আবার অন্যরা তা আদ্যন্ত অবিশ্বাস করে। যা-ই হোক না কেন, রামধনু সংক্রান্ত যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল, তা সকলই ছিল ঈশ্বরের কর্ম, এবং ঈশ্বর যে প্রক্রিয়ায় মানুষকে পরিচালনা করেছেন সেই অনুসারেই তা সংঘটিত হয়েছিল। সেই ঘটনাবলী বাইবেলে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। সেই সময়ে ঈশ্বর কী মেজাজে ছিলেন, বা ঈশ্বর কথিত বাক্যগুলির নেপথ্যে কী অভিপ্রায় ছিল, তা এই নথিগুলি বলে না। উপরন্তু, ঈশ্বর যখন সেগুলি উচ্চারণ করেছিলেন, তখন তিনি কী অনুভব করেছিলেন তা-ও কেউ-ই অনুধাবন করতে পারে না। তবে, ভাষ্যের ছত্রগুলিতে, এই পুরো ঘটনা প্রসঙ্গে ঈশ্বরের মনের অবস্থা উদ্‌ঘাটিত হয়ে। মনে হয় বুঝি তাঁর সেই সময়কার চিন্তাধারা ঈশ্বরের বাক্যের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমে জীবন্ত ও প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে।

ঈশ্বরের চিন্তাধারা নিয়েই মানুষের ভাবনাচিন্তা করা উচিত, এবং সেটাই তাদের সবচেয়ে বেশি জানার চেষ্টা করা উচিত। এর কারণ হল যে, ঈশ্বরের চিন্তাধারা মানুষের ঈশ্বরোপলব্ধির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, এবং মানুষের ঈশ্বরোপলব্ধি মানুষের কাছে জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য যোগসূত্র। তাহলে, সেই ঘটনাবলী যখন ঘটেছিল, তখন ঈশ্বর কী চিন্তাভাবনা করছিলেন?

প্রথমে, ঈশ্বর সেই মানবজাতি সৃষ্টি করেছিলেন যারা তাঁর চোখে অত্যন্ত ভালো এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিল, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার পর তাদের বন্যার দ্বারা ধ্বংস করা হয়। এই ধরনের মানবজাতিকে মুহূর্তের মধ্যে এভাবে ধ্বংস করার জন্য ঈশ্বর কি আহত হয়েছিলেন? অবশ্যই তিনি আহত হয়েছিলেন! তাঁর সেই যন্ত্রণার প্রকাশ কী ছিল? বাইবেলে কীভাবে তা লিপিবদ্ধ রয়েছে? বাইবেলে তা এই বাক্যগুলির দ্বারা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে: “আমি এক সন্ধি চুক্তি স্থাপন করব। তার শর্ত হবে এই যে, আর কখনো জলপ্লাবনে সমস্ত প্রাণী বিনষ্ট হবে না এবং আর কখনো পৃথিবীবিধ্বংসী প্লাবন হবে না”। এই সরল বাক্যটি ঈশ্বরের ভাবনা প্রকাশ করে। এই পৃথিবীর ধ্বংস তাঁকে খুবই যন্ত্রণা দিয়েছিল। মানুষের বচনে, তিনি খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। আমরা অনুমান করতে পারি: যে পৃথিবী আগে প্রাণময় ছিল, তা বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে তা কেমন দেখতে লাগছিল? যে পৃথিবী আগে মানুষের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল, তাকে সেই সময় কেমন দেখতে লাগছিল? মানুষের কোনো বসতি নেই, কোনো জীবিত প্রাণী নেই, চারদিকে জলরাশি, এবং জলরাশির উপর চরম ধ্বংসলীলা। ঈশ্বর যখন এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তাঁর মূল অভিপ্রায় কি এমনতর ছিল? অবশ্যই নয়! ঈশ্বরের মূল অভিপ্রায় ছিল যে, তিনি পৃথিবীকে প্রাণময় দেখবেন, তিনি দেখতে চেয়েছিলেন যে, তাঁর সৃষ্ট মানুষজন তাঁর উপাসনা করছে, তিনি এমনটা চাননি যে, একমাত্র নোহই তাঁর উপাসনা করুক, বা নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য একমাত্র নোহই তাঁর ডাকে সাড়া দিক। যখন মানবজাতি অদৃশ্য হয়ে গেল, এটা তাঁর মূল অভিপ্রায় ছিলনা, বরং সেটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর হৃদয় কীভাবে যন্ত্রণাবিদ্ধ না হয়ে থাকতে পারে? তাই যখন তিনি তাঁর স্বভাবকে প্রকাশ ও তাঁর আবেগসমূহ ব্যক্ত করছিলেন, তখনই ঈশ্বর একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কী ধরনের সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন? মানুষের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি হিসাবে আকাশের গায়ে একটা ধনুক (যে রামধনু আমরা দেখি) স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, যা এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেবে, যে, ঈশ্বর আর কখনো মানবজাতিকে বন্যার দ্বারা ধ্বংস করবেন না। সেইসঙ্গে, তার মাধ্যমে মানুষকে এ-ও বলা হয়েছে, যে, ঈশ্বর বন্যার মাধ্যমে পৃথিবীকে ধ্বংস করেছিলেন যাতে মানুষ চিরকাল মনে রাখে যে ঈশ্বর কেন এহেন কাজ করেন।

ঈশ্বর কি সেইসময় পৃথিবীর ধ্বংসই চেয়েছিলেন? অবশ্যই সেটা ঈশ্বর চাননি। বিশ্বচরাচর ধ্বংস হওয়ার পর পৃথিবীর সেই করুণ দৃশ্যের একটা ক্ষুদ্র অংশ আমরা হয়তো কল্পনা করতে সক্ষম হব, কিন্তু ঈশ্বরের চোখে সেই সময়ের চিত্রটা কী ছিল তার সুদূরতম কল্পনাও আমরা করতে পারব না। আমরা এটা বলতে পারি যে, একালের মানুষই হোক বা সেকালের, বন্যার দ্বারা পৃথিবী ধ্বংসের পর যখন ঈশ্বর পৃথিবীর সেই দৃশ্য, সেই রূপ দেখেছিলেন, তখন তিনি কী অনুভব করেছিলেন, তা কেউই কল্পনা বা উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। মানুষের অবাধ্যতার কারণেই ঈশ্বর তা করতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু বন্যার দ্বারা পৃথিবীর এই ধ্বংসের ফলে ঈশ্বরের অন্তর যে যন্ত্রণা ভোগ করেছিল তা হল এমন এক বাস্তব যার মর্মোদ্ধার অথবা অনুধাবন কোনো মানুষ করতে পারে না। এই কারণেই, ঈশ্বর মানবজাতির সঙ্গে একটি সন্ধিচুক্তি করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি মানুষকে বলতে চেয়েছিলেন, তারা যেন মনে রাখে, যে, ঈশ্বর একবার এহেন ঘটনা ঘটিয়েছেন, এবং তাদের কাছে এ-ও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যে, ঈশ্বর আর কখনোই এভাবে পৃথিবীকে ধ্বংস করবেন না। এই সন্ধিচুক্তিতে আমরা ঈশ্বরের হৃদয় প্রত্যক্ষ করি—আমরা দেখি যে, যখন তিনি এই মানবজাতিকে ধ্বংস করেছিলেন, তখন তাঁর হৃদয় যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়েছিল। মানুষের ভাষায় বলতে গেলে, ঈশ্বর যখন মানবজাতিকে ধ্বংস করলেন, যখন তিনি দেখলেন যে মানবজাতি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁর মন কেঁদেছিল, তাঁর হৃদয় থেকে যেন রক্তক্ষরণ ঘটেছিল। এটাই কি তা বর্ণনা করার সবচেয়ে ভালো পন্থা নয়? মানবিক আবেগগুলিকে বোঝানোর জন্য মানুষের দ্বারা এই কথাগুলি ব্যবহৃত হয়, কিন্তু যেহেতু মানুষের ভাষায় অনেক ঘাটতি রয়েছে, সেহেতু ঈশ্বরের অনুভূতিও আবেগকে বর্ণনার জন্য এই ভাষার ব্যবহার আমার খুব একটা মন্দ লাগে না, আবার তা খুব একটা আতিশয়োক্তি বলেও মনে হয় না। সেই সময় ঈশ্বরের মেজাজ কেমন ছিল, সেবিষয়ে এটা তোমাদের খুবই বাঙ্ময়, অত্যন্ত যথাযথ এক ধারণা দেয়। এখন, যখন তোমরা একটা রামধনু দেখো তখন, তোমরা কী ভাববে? তোমরা অন্ততপক্ষে এটা স্মরণ করবে যে, বন্যার দ্বারা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য ঈশ্বর একসময় কীভাবে দুঃখভোগ করেছিলেন। তুমি এ-ও স্মরণ করবে যে, যদিও ঈশ্বর এই পৃথিবীকে ঘৃণা করতেন ও এই মানবজাতিকে অপছন্দ করতেন, তবুও আপন হাতে সৃষ্ট এই মানুষদের যখন তিনি ধ্বংস করেছিলেন, তখন তাঁর হৃদয় যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়েছিল, তাদের পরিহার করতে তিনি অস্বস্তি ও অনিচ্ছা বোধ করছিলেন, এবং তা তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। নোহর আট-সদস্যভুক্ত পরিবারই ছিল তাঁর একমাত্র সান্ত্বনা। সকল কিছু সৃষ্টি করার জন্য তাঁর শ্রমসাধ্য প্রয়াস যাতে বৃথা না যায়, তা নোহর সহযোহিতার ফলেই সুনিশ্চিত হয়েছিল। যে সময় ঈশ্বর যন্ত্রণাভোগ করছিলেন, সেই সময় একমাত্র এই বিষয়টিই তাঁর বেদনা প্রশমন করতে পেরেছিল। সেই সময় থেকে, মানবজাতির প্রতি তাঁর সমস্ত প্রত্যাশা ঈশ্বর নোহর পরিবারের উপর ন্যস্ত করেন, এই আশায় যে, তারা বাস করবে তাঁর আশীর্বাদের অধীনে, অভিশাপের নয়, এই আশায় যে, তারা আর কখনো দেখবে না, যে, ঈশ্বর বন্যার দ্বারা পৃথিবীকে ধ্বংস করছেন, এই আশায় যে, তারা আর ধ্বংস হয়ে যাবে না।

এর থেকে আমরা ঈশ্বরের স্বভাবের কোন অংশটির বিষয়ে শিক্ষা নিতে পারি? ঈশ্বর মানুষকে অপছন্দ করতেন কারণ মানুষ তাঁর প্রতি ছিল বিরূপ, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে মানবজাতির জন্য তাঁর যত্ন, উদ্বেগ ও করুণা অপরিবর্তিতই ছিল। এমনকি যখন তিনি মানবজাতিকে ধ্বংস করেছিলেন, তখনও তাঁর হৃদয় অপরিবর্তিত ছিল। মানবজাতি যখন দুর্নীতিতে পূর্ণ ছিল এবং ভয়াবহ মাত্রায় ঈশ্বরের প্রতি অবাধ্য ছিল, তখন, তাঁর স্বভাব ও সারসত্যের কারণে, এবং তাঁর নীতিসমূহের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে, ঈশ্বরকে এই মানবজাতি ধ্বংস করতেই হত। কিন্তু, ঈশ্বরের সারসত্যের কারণে, তিনি তখনো মানবজাতিকে করুণা করতেন, এবং এমনকি মানবজাতিকে উদ্ধার করতেও তিনি বিভিন্ন পন্থা প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা বেঁচে থাকতে পারে। তবে মানুষ ঈশ্বরের বিরোধিতা করেছিল, ঈশ্বরকে অমান্য করেই গিয়েছিল, এবং ঈশ্বরের পরিত্রাণ গ্রহণে অস্বীকার করেছিল; অর্থাৎ, তাঁর শুভ অভিপ্রায় গ্রহণে অস্বীকার করেছিল। ঈশ্বর যেভাবেই তাদের আহ্বান করুন না কেন, তাদের স্মরণ করিয়ে দিন না কেন, তাদের সরবরাহ করুন না কেন, তাদের সাহায্য করুন না কেন, বা তাদের প্রতি সহনশীল হোন না কেন, মানুষ তা অনুধাবন ও উপলব্ধি করেনি, তারা তাতে কোনো মনোযোগও দেয়নি। নিজের যন্ত্রণাতেও, ঈশ্বর তখনো মানুষকে তাঁর সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতা প্রদান করতে ভোলেননি, তিনি অপেক্ষা করে গিয়েছিলেন যে, মানুষ তার ভুল শুধরে নেবে। তিনি তাঁর সীমায় পৌঁছনোর পর, সকল দ্বিধা ত্যাগ করে তিনি তাঁর যা করণীয় কার্য সম্পাদন করেন। প্রকারান্তরে বললে, যে মুহূর্তে ঈশ্বর মানবজাতিকে ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই মুহুর্তকাল থেকে তাঁর মানবজাতিকে ধ্বংস করার কাজ শুরু হওয়ার মধ্যে, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং প্রক্রিয়া ছিল। মানুষকে তার ভুল সংশোধনে সমর্থ করার জন্যই ছিল এই প্রক্রিয়া, এবং সেটিই ছিল ঈশ্বর মানুষকে দেওয়া শেষ সুযোগ। মানবজাতিকে ধ্বংস করার সেই প্রাক্কালে ঈশ্বর কী করেছিলেন? তিনি উল্লেযোগ্যভাবে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, উপদেশ প্রচার করেছিলেন। তাঁর হৃদয়ে যতই দুঃখ–যন্ত্রণা থাকুক না কেন, তিনি মানুষকে তাঁর যত্ন, উদ্বেগ, এবং প্রভূত করুণা বিতরণ করে গিয়েছিলেন। তা থেকে আমরা কী প্রত্যক্ষ করি? সন্দেহাতীতভাবেই, আমরা দেখি, যে, মানবজাতির প্রতি ঈশ্বরের ভালোবাসা সততই খাঁটি, তা নিছকই কোনো মুখের কথা নয়। তা সত্য, বোধগম্য ও অনুধাবনীয়, তা কপট, অবিশুদ্ধ, চাতুরিপূর্ণ বা ভণ্ডামি নয়। তিনি যে প্রেমার্হ তা মানুষকে দেখানোর জন্য ঈশ্বর কখনোই কোনো ছলনার আশ্রয় নেন না, বা নিজের কোনো মিথ্যা প্রতিমূর্তিও তৈরি করেন না। মানুষের কাছে তাঁর মাধুর্য দেখনোর জন্য, বা তাঁর মাধুর্য ও পবিত্রতা জাহির করার উদ্দেশ্যে, তিনি কখনোই মিথ্যা সাক্ষ্য ব্যবহার করেন না। ঈশ্বরের স্বভাবের এই দিকগুলি কি মানুষের ভালোবাসার যোগ্য নয়? সেগুলি কি উপাসনার যোগ্য নয়? সেগুলি কি লালন করার যোগ্য নয়? এইখানে এসে আমি তোমাদের প্রশ্ন করতে চাই: এই বাক্যগুলি শোনার পর তোমাদের কি মনে হয়, যে, ঈশ্বরের মহত্ত্ব নিছকই কাগজে লেখা কিছু শূন্যগর্ভ বাক্য? ঈশ্বরের মাধুর্য কি শুধু শূন্যগর্ভ বাক্যসমূহ? না! অবশ্যই তা নয়! তাঁর কাজের প্রতিটি সময়ে ব্যবহারিক অভিব্যক্তি ধারণ করে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব, পবিত্রতা, সহনশীলতা, ভালোবাসা, এবং ইত্যবিধ—ঈশ্বরের স্বভাব ও সারসত্যের বিভিন্ন দিকের মধ্যে প্রত্যেকটির প্রতিটি খুঁটিনাটি—এবং মানুষের প্রতি তাঁর ইচ্ছার মধ্যে সেগুলি মূর্ত হয়ে ওঠে, এবং সেগুলি প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে পরিপূর্ণ ও প্রতিফলিতও হয়। পূর্বে তুমি এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছ কি না তা নির্বিশেষে, সম্ভাব্য সকল উপায়ের প্রয়োগ ঘটিয়ে ঈশ্বর প্রত্যেক ব্যক্তির বিষয়ে যত্নশীল হন, প্রত্যেক ব্যক্তির হৃদয়কে উষ্ণ করতে, এবং প্রত্যেক ব্যক্তির চেতনাকে জাগ্রত করতে, তাঁর একনিষ্ঠ হৃদয়, প্রজ্ঞা ও বিভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহার করেন। এ হল এক অবিসংবাদিত সত্য। এখানে যতজন মানুষই বসে থাকুক না কেন, ঈশ্বরের সহনশীলতা, ধৈর্য ও মাধুর্য সম্পর্কে প্রত্যেক ব্যক্তিরই ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং পৃথক পৃথক অনুভূতি রয়েছে। ঈশ্বর সম্পর্কে এই সকল অভিজ্ঞতা ও তাঁর সম্বন্ধে ধারণা—সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই সব ইতিবাচক বিষয়—এসেছে ঈশ্বরেরই কাছ থেকে। তাহলে, ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে, এবং সেগুলিকে আজকে আমরা বাইবেলের এই যে অনুচ্ছেদগুলি পাঠ করলাম, তার সঙ্গে সংযুক্ত করে, তোমরা কি এখন ঈশ্বর সম্বন্ধে আরো বাস্তব ও যথাযথ উপলব্ধি লাভ করলে?

এই উপাখ্যান পাঠের পর, এবং এই ঘটনার মাধ্যমে ঈশ্বরের যে স্বভাব প্রকাশিত হয়েছে তা কিছুটা উপলব্ধি লাভ করে, ঈশ্বর সম্বন্ধে তোমরা নতুন কী ধরনের জ্ঞানের অধিকারী হলে? তা কি ঈশ্বর ও তাঁর হৃদয় সম্পর্কে তোমাদের গভীরতর উপলব্ধি দান করেছে? নতুন করে নোহর আখ্যান পড়ার পর এখন কি তোমাদের ভিন্ন অনুভূতি হচ্ছে? তোমাদের মতে বাইবেলের স্তবকগুলির নিয়ে আলোচনা কি অপ্রয়োজনীয়? আমাদের সেগুলি নিয়ে আলোচনা করার পর, তোমরা কি এখনো মনে করো, যে, তা অপ্রয়োজনীয়? অবশ্যই তা প্রয়োজনীয়! আমরা যা পাঠ করি তা যদিও এক কাহিনীমাত্র, কিন্তু তা ছিল ঈশ্বরকৃত কার্যের এক প্রকৃত নথি। তোমাদের এই কাহিনীগুলির বা এই চরিত্রের বিশদ বিবরণ অনুধাবনে সক্ষম করে তোলা আমার লক্ষ্য নয়, বা তোমরা যাতে এই চরিত্রটি নিয়ে পাঠ করো, বা তোমরা যাতে ফিরে গিয়ে আবার বাইবেল পাঠ করো, তা-ও অবশ্যই আমার উদ্দেশ্য নয়। তোমরা কি তা উপলব্ধি করো? এই আখ্যানমালা কি ঈশ্বরের সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনে তোমাদের সহায় হয়েছে? তোমাদের ঈশ্বর উপলব্ধিতে এই কাহিনীগুলি কী যোগ করেছে? হংকং থেকে থেকে আগত ভ্রাতা ও ভগিনীরা, তোমরা এটা বলো। (আমরা দেখেছি যে ঈশ্বরপ্রেম হল এমন এক বিষয়, আমাদের মতো কোনো ভ্রষ্ট মানুষই যার অধিকারী নয়।) দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আগত ভ্রাতা ও ভগিনীরা, তোমরা কিছু বলো। (ঈশ্বরের মানবপ্রেম নিখাদ। ঈশ্বরের মানবপ্রেম তাঁর মহত্ত্ব, পবিত্রতা, শ্রেষ্ঠত্ব, এবং তাঁর সহনশীলতাকে বহন করে। আমরা যদি গভীরতরভাবে সেবিষয়য়ে উপলব্ধি অর্জনের চেষ্টা করি, তবে তা বিফলে যাবে না।) (ঠিক একটু আগেই যে আলোচনাটা হল, তার মাধ্যমে আমি একাধারে ঈশ্বরের ধার্মিক ও পবিত্র স্বভাব দেখতে পাই এবং মানবজাতির প্রতি ঈশ্বরের উদ্বেগ, মানবজাতির প্রতি ঈশ্বরের করুণাও আমি প্রত্যক্ষ করি, এবং এ-ও দেখতে পাই, যে, ঈশ্বর যা কিছু করেন তা দ্বারা, এবং তাঁর প্রতিটি চিন্তা ও ধারণায়, তিনি মানবজাতির প্রতি তাঁর প্রেম ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।) (পূর্বে, আমার এই উপলব্ধি ছিল যে, মানুষ সাঙ্ঘাতিক রকমের দুষ্ট হয়ে পড়েছিল বলে এক বন্যার মাধ্যমে ঈশ্বর পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, এবং ঈশ্বর এই মানবজাতিকে অপছন্দ করতেন বলেই বুঝি তিনি তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আজ, যখন ঈশ্বর নোহর উপাখ্যান শোনালেন, এবং বললেন যে ঈশ্বরের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল, তখন আমি উপলব্ধি করি যে এই মানবজাতিকে ধ্বংস করতে ঈশ্বর আদতে অনিচ্ছুকই ছিলেন। মানুষ যেহেতু খুবই অবাধ্য ছিল, সেহেতু তাদের ধ্বংস করা ছাড়া ঈশ্বরের আর কোনো উপায় ছিল না। বস্তুত, সেই সময়ে ঈশ্বরের হৃদয় অত্যন্ত বিষন্ন ছিল। এর থেকে, ঈশ্বরের স্বভাবের মধ্যে মানবজাতির জন্য তাঁর যত্ন ও তাঁর উদ্বেগ দেখতে পাই। এই বিষয়টি আমার আগে জানা ছিল না।) খুব ভালো! তোমরা এবার পরের উত্তরে যেতে পারো (শোনার পরে আমি খুবই প্রভাবিত হয়েছি। আমি পূর্বেও বাইবেল পাঠ করেছি, কিন্তু আজকের মতো অভিজ্ঞতা আমার কখনোই হয়নি, যেখানে ঈশ্বর সরাসরি এই বিষয়গুলি বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন যাতে আমরা তাঁকে জানতে পারি। বাইবেলকে প্রত্যক্ষ করায় ঈশ্বর আমাদের এইভাবে পরিচালনা করার ফলে, আমি জানতে সক্ষম হয়েছি যে মানুষের অনাচারের সামনে ঈশ্বরের স্বভাব আসলে মানবজাতির প্রতি প্রেমময় ও যত্নশীল। মানুষ যে সময় থেকে ভ্রষ্ট হয়েছিল তখন থেকে শুরু করে বর্তমানের এই অন্তিম সময় পর্যন্ত, যদিও ঈশ্বরের একটি ধার্মিক স্বভাব রয়েছে, তবুও, তাঁর ভালোবাসা ও যত্ন অপরিবর্তিত রয়েছে। এটা দেখায় যে, সৃষ্টিলগ্ন থেকে অদ্যাবধি, মানুষ ভ্রষ্ট হয়েছে কি না তা নির্বিশেষে ঈশ্বরের প্রেমময় সারসত্য কখনোই পরিবর্তিত হয়নি।) (আজ আমি দেখলাম যে, তাঁর কার্যের কাল বা স্থানের পরিবর্তনের দরুন ঈশ্বরে সারসত্যের পরিবর্তন হবে না। আমি এ-ও দেখলাম, যে, ঈশ্বর এই পৃথিবী সৃষ্টিই করুন বা মানুষ ভ্রষ্ট হওয়ার পর তা ধ্বংসই করুন, তিনি যাকিছু করেন তার প্রত্যেকটির একটা অর্থ আছে এবং সেগুলি তাঁর স্বভাবকে ধারণ করে। অতঃপর আমি দেখলাম যে, ঈশ্বরের ভালোবাসা অসীম ও অপরিমেয়, এবং, যেমনটা অন্য ভ্রাতা, ভগিনীরাও উল্লেখ করেছেন, ঈশ্বর যখন এই পৃথিবীকে ধ্বংস করেছিলেন, তখন তাঁর মানবজাতির প্রতি যত্ন ও করুণাও আমি প্রত্যক্ষ করলাম।) (এগুলি এমন বিষয় যা সত্যিই আমি আগে জানতাম না। আজ, শোনার পর, আমি অনুভব করছি যে, ঈশ্বর বস্তুতই বিশ্বাসযোগ্য, বিশ্বাসভাজন, এবং তাঁর উপর বিশ্বাস রাখলে তা কখনো বৃথা যায় না, এবং তিনি যথার্থই বিরাজমান। আমি অন্তর থেকে প্রকৃতপক্ষেই উপলব্ধি করতে পারছি, যে, ঈশ্বরের স্বভাব ও প্রেম সত্যিই মূর্ত। আজ শোনার পর আমার এই অনুভূতিই হয়েছে।) চমৎকার! মনে হচ্ছে যে, তোমরা যা শ্রবণ করেছ, তা তোমরা অন্তর থেকে গ্রহণ করেছ।

বাইবেলের যে আখ্যানসমূহ নিয়ে আমরা আজ আলোচনা করলাম, সেগুলি সহ বাইবেলের সমস্ত স্তবকে তোমরা কি কিছু একটা লক্ষ্য করেছ? ঈশ্বর তাঁর নিজস্ব ভাবনা প্রকাশের জন্য, বা মানবজাতির জন্য তাঁর ভালোবাসা ও যত্নকে ব্যাখ্যা করার জন্য, কখনো কি তাঁর নিজের ভাষা ব্যবহার করেছেন? মানবজাতির প্রতি তাঁর উদ্বেগ, বা প্রেমের বিবরণকালে তিনি এহেন সহজসরল ভাষা ব্যবহার করছেন, এমন অপর কোনো নথি রয়েছে কি? নেই। এমনটা কি সঠিক নয়? তোমাদের মধ্যে অনেকেই বাইবেল পাঠ করেছ বা বাইবেল ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করেছ। তোমাদের মধ্যে কেউ কি এমন বাক্য দেখেছ? উত্তরটা হল যে, অবশ্যই দেখো নি! অর্থাৎ, ঈশ্বরের বাক্য সহ বাইবেলের কোনো নথিতে বা তাঁর কার্য লিপিবদ্ধ করা রয়েছে এমন কোথাও, কোনো যুগে বা কোনো সময়কালে তাঁর নিজস্ব অনুভূতির বর্ণনা দিতে গিয়ে, বা মানবজাতির জন্য তাঁর ভালোবাসা ও যত্নের প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে, ঈশ্বর কখনোই তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করেননি, বা তাঁর অনুভূতি ও আবেগ ব্যক্ত করার উদ্দেশ্যে ঈশ্বর কখনোই কোনো ভাষণ বা ক্রিয়াকর্ম ব্যবহার করেননি—এটাই কি ঘটনা নয়? কেন আমি তা বলি? কেন আমাকে এমনটা উল্লেখ করতে হল? কারণ। এ-ও ঈশ্বরের মাধুর্য ও তাঁর স্বভাবকে মূর্ত করে।

ঈশ্বর মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন; তারা কলুষিত হয়েছে কি না বা তারা তাঁকে অনুসরণ করে কি না তা নির্বিশেষে, ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে লালিত প্রিয়জন হিসাবেই আচরণ করেন—অথবা, যেমনটা মানুষ বলবে, তাঁর প্রিয়তম মানুষ হিসাবে—তাঁর ক্রীড়ার সামগ্রী হিসাবে নয়। যদিও ঈশ্বর বলেছেন যে তিনিই সৃষ্টিকর্তা এবং মানুষ তাঁরই সৃষ্টি, এতে পদমর্যাদায় সামান্য পার্থক্য আছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সত্য হ’ল মানবজাতির জন্য ঈশ্বর যা কিছু করেছেন তা এই প্রকৃতির এক সম্পর্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছে। ঈশ্বর মানবজাতিকে ভালবাসেন, মানবজাতির যত্ন নেন, এবং মানবজাতির জন্য উদ্বিগ্ন হন, সেইসঙ্গে নিরন্তর এবং অবিরামভাবে, মানবজাতির জন্য প্রদান করেন। তিনি অন্তরে কখনই এমনটা অনুভব করেন না, যে, এ কোনো অতিরিক্ত কাজ বা এমন কিছু যা প্রচুর কৃতিত্বের যোগ্য। কিংবা তিনি অনুভব করেন না যে, মানবতাকে উদ্ধার করা, তাদের জন্য সরবরাহ করা, এবং তাদের সবকিছু প্রদান করা মানবজাতির জন্য বিরাট বড় কোনো অবদান রাখছে। তিনি শুধুই মানবজাতির জন্য প্রদান করেন, প্রশান্তভাবে ও নীরবে, তাঁর নিজস্ব উপায়ে, এবং তাঁর নিজস্ব সারসত্যের মাধ্যমে, এবং তাঁর যা আছে ও তিনি স্বয়ং যা, তার মাধ্যমে। মানবজাতি তাঁর কাছ থেকে যত বেশি সংস্থান এবং যত বেশি সাহায্যই গ্রহণ করুক না কেন, ঈশ্বর কখনই তা নিয়ে চিন্তা করেন না বা কৃতিত্ব গ্রহণের চেষ্টা করেন না। তা ঈশ্বরের সারসত্য দ্বারা নির্ধারিত হয়, এবং তা ঈশ্বরের স্বভাবের এক সঠিক অভিব্যক্তিও বটে। এই কারণে, বাইবেলই হোক বা অন্য কোনো গ্রন্থে, কোথাও-ই আমরা দেখি না, যে, ঈশ্বর তাঁর নিজস্ব চিন্তা ব্যক্ত করছেন, কোথাও-ই আমরা খুঁজে পাই না, যে, মানবজাতিকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ তোলা, বা মানবজাতিকে দিয়ে তাঁর স্তুতি করানোর লক্ষ্য নিয়ে ঈশ্বর মানুষের কাছে বর্ণনা করছেন, অথবা ঘোষণা করছেন, যে, কেন তিনি এই কাজগুলি করেন, বা কেন তিনি মানবজাতির জন্য এতটা চিন্তা করেন। এমনকি, যখন তিনি আহত হন, যখন তাঁর হৃদয় তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়, তখনো মানবজাতির প্রতি তাঁর দায়িত্ব, বা মানবজাতির প্রতি তাঁর উদ্বেগের বিষয়ে তিনি কখনোই বিস্মৃত হন না; এই সমস্ত সময়জুড়ে তিনি একাকী, নীরবেএই আঘাত ও যন্ত্রণা সহ্য করেন। ঠিক তার বিপরীতে, মানবজাতির জন্য ঈশ্বর রসদ যুগিয়ে যান, যেমন তিনি সর্বদা করে এসেছেন। যদিও মানবজাতি প্রায়শই ঈশ্বরের স্তুতি করে এবং তাঁর হয়ে সাক্ষ্য দেয়, এই ধরনের কোনো আচরণই ঈশ্বর দাবি করেননি। কারণ, ঈশ্বর কখনোই চান না যে, মানুষের জন্য যে ভালো কাজগুলি তিনি করেন, তার বিনিময় ঘটুক কৃতজ্ঞতা দিয়ে, তা পরিশোধ করা হোক। প্রকারান্তরে, যারা ঈশ্বরে ভীত হতে এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করতে পারে, যারা ঈশ্বরকে প্রকৃতই অনুসরণ করতে পারে, যারা তাঁর নির্দেশ শোনে, এবং যারা তাঁর প্রতি অনুগত, এবং যারা তাঁকে মান্য করতে পারে—এহেন মনুষ্যগণ প্রায়শই ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করবে, এবং ঈশ্বর নির্দ্বিধায় রেখে সেই আশীর্বাদ বর্ষণ করবেন। উপরন্তু, মানুষ ঈশ্বরের কাছ থেকে যে আশীর্বাদ লাভ করে, তা প্রায়শই হয় তাদের কল্পনাতীত, যে কাজ তারা করেছে বা যে মূল্য তারা দিয়েছে, তার মাধ্যমে মানুষ যা কিছুর ন্যায্যতা প্রতিপাদন করতে পারে এ তারও ঊর্ধ্বে। মানুষ যখন ঈশ্বরের আশীর্বাদ উপভোগ করে, তখন ঈশ্বর কী করছেন সেবিষয়ে কি কেউ মাথা ঘামায়? ঈশ্বর কী অনুভব করছেন তা নিয়ে কি কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করে? কেউ কি ঈশ্বরের যন্ত্রণা উপলব্ধির চেষ্টা করে? উত্তর নিঃসন্দেহেই, না! ঈশ্বর সেইসময় যে যন্ত্রণা অনুভব করছিলেন, নোহ সহ কোনো মানুষই কি তা উপলব্ধি করতে পেরেছিল? কোনো মানুষই কি তা অনুধাবন করতে পেরেছিল যে ঈশ্বর কেন এহেন এক সন্ধিচুক্তি স্থাপন করবেন? তারা পারেনি। মানবজাতি ঈশ্বরের যন্ত্রণা স্বীকার যে করে না, তার কারণ এই নয় যে, তারা ঈশ্বরের যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করে না, তার কারণ এ-ও নয়, যে, ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। বা তাদের মর্যাদার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; বরং, কারণটা হল এই, যে, মানবজাতি ঈশ্বরের অনুভূতির বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত নয়। মানবজাতি মনে করে যে ঈশ্বর স্বাধীন—তাঁর এমন প্রয়োজন নেই, যে মানুষ তাঁর বিষয়ে যত্নশীল হোক, তাঁকে উপলব্ধি করুক, এবং তাঁর প্রতি বিবেচনাশীল হোক। ঈশ্বর হলেন ঈশ্বর, তিনি বেদনা-বিরহিত, আবেগশূন্য; তিনি বিষন্ন হন না, দুঃখবোধ করেন না, তিনি এমনকি কাঁদেনও না। ঈশ্বর হলেন ঈশ্বর, তাই তাঁর আবেগের বহিঃপ্রকাশের কোনো প্রয়োজন নেই, এবং আবেগগত সান্ত্বনারও তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই। যদি কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর এই বিষয়গুলির প্রয়োজন ঘটে, তাহলে তিনি নিজেই তা সামলে নিতে পারবেন, এবং মানবজাতির কাছ থেকে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন তাঁর পড়বে না। এর বিপরীতে দুর্বল, অপরিণত মানবজাতিরই প্রয়োজন রয়েছে ঈশ্বরের সান্ত্বনার, রসদের, উৎসাহের, এবং এমনকি প্রয়োজন রয়েছে সর্বদা ও সর্বদার তাদের আবেগকে সান্ত্বনার সান্তওনা প্রদানেরও: এই ধরনের বিষয়গুলি মানবজাতির হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে: মানুষ দুর্বল; তাদের সবরকমভাবে দেখভাল করারর জন্য ঈশ্বরকে প্রয়োজন হয়, ঈশ্বরের কাছ থেকে যে যত্ন তারা লাভ করে তা তাদের প্রাপ্য, যা কিছু তাদের পাওয়া উচিত বলে তাদের ধারণা, তা তারা ঈশ্বরের কাছ থেকে দাবি করতেই পারে। ঈশ্বর শক্তিমান; তাঁর সবকিছু আছে, তাঁর উচিত মানবজাতির অভিভাবক এবং আশীর্বাদ বর্ষণকারী হওয়া। যেহেতু তিনি ইতিমধ্যেই ঈশ্বর, সেহেতু তিনি সর্বশক্তিমান এবং মানবজাতির কাছ থেকে তাঁর কখনোই কিছু চাহিদা নেই।

মানুষ যেহেতু ঈশ্বরের কোনো উদ্‌ঘাটনের প্রতিই মনোযোগ দেয় না, সেহেতু সে কখনোই ঈশ্বরের দুঃখ, যন্ত্রণা বা আনন্দ অনুভব করে না। বরং, প্রকারান্তরে, ঈশ্বর মানুষের সব অনুভূতিকে নিজের হাতের তালুর মতো জানেন। ঈশ্বর সবসময় এবং সব স্থানে প্রত্যেকের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করেন, প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবর্তনশীল চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণ করেন, এবং এইভাবেই, তাদের সান্ত্বনা ও উপদেশ দেন, এবং তাদের পথনির্দেশ দেন তথা প্রদীপ্ত করেন। ঈশ্বর মানবজাতির উপর যা করেছেন, এবং মানুষের নিমিত্ত যে মূল্য তিনি দিয়েছেন, সেই সকল বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে, মানুষ কি বাইবেল অথবা ঈশ্বর এখনও পর্যন্ত যা বলেছেন তা থেকে এমন একটা অনুচ্ছেদ খুঁজে বের করতে পারে, যা স্পষ্টভাবে এমনটা বলে থাকে, যে, ঈশ্বর মানুষের কাছ থেকে কিছু একটা দাবি করবেন? না! বিষয়টা ঠিক তার উলটো, ঈশ্বরের ভাবনাকে মানুষ যতই উপেক্ষা করুক না কেন, তিনি এখনো বারংবার মানবজাতিকে নেতৃত্ব দেন, বারংবার মানবজাতির জন্য রসদের যোগান দেন এবং তাদের সাহায্য করেন, যাতে তারা ঈশ্বরের পথ অনুসরণে সক্ষম হয়, যাতে তারা সেই গন্তব্য অর্জন করতে পারে যা ঈশ্বর তাদের জন্য প্রস্তুত করেখেছেন। ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তাঁর যা আছে এবং তিনি যা, তাঁর অনুগ্রহ, তাঁর করুণা, এবং তাঁর সমস্ত পুরস্কার তাদেরই উপর নির্দ্বিধায় বর্ষিত হয় যারা তাঁকে ভালোবাসে এবং তাঁর অনুসরণ করে। কিন্তু তিনি যে যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, বা তাঁর মনের অবস্থা, কখনোই কোনো ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করেন না, এবং কোনো ব্যক্তি সম্বন্ধে তিনি এই মর্মে অভিযোগ করেন না, যে, সে তাঁর প্রতি বিবেচনাশীল নয় না, বা, যে, সে তাঁর ইচ্ছা সম্বন্ধে অবগত নয়। তিনি এই সবকিছুই নীরবে সহ্য করেন, এবং শুধু সেই দিবসের অপেক্ষা করে যান, যেদিন মানবজাতি এবিষয়ে উপলব্ধিলাভে সক্ষম হবে।

কেন আমি এই প্রসঙ্গগুলির অবতারণা করছি? যে বিষয়গুলি আমি বলেছি, তা থেকে তোমরা কী দেখছ? ঈশ্বরের সারসত্য ও স্বভাবে এমন একটা কিছু রয়েছে, যা খুব সহজে চোখে না-ও পড়তে পারে, এমন একটা কিছু, যার অধিকারী একমাত্র ঈশ্বর এবং কোনো মানুষ নয়, নয় এমনকি তারাও, যাদের অন্যরা মহৎ ব্যক্তি, ভালো মানুষ বলে মনে করে বা যাদের তারা ঈশ্বর বলে কল্পনা করে। সেই বিষয়টি কী? তা হল ঈশ্বরের নিঃস্বার্থতা। নিঃস্বার্থতার প্রসঙ্গে তুমি হয়তো ভাবতে পারো যে, তুমিও খুব নিঃস্বার্থ, কারণ তুমি কখনোই তোমার সন্তানদের সঙ্গে দরাকষাকষি বা তর্কাতর্কি করো না, বা তুমি মনে করো যে তোমার পিতামাতার বিষয়ে তুমি বুঝি খুবই নিঃস্বার্থ। তুমি যা-ই ভাবো না কেন, অন্ততপক্ষে তোমার “নিঃস্বার্থ” শব্দটির একটি ধারণা রয়েছে, এবং তা এক ইতিবাচক শব্দ হিসাবে গণ্য করো, এবং মনে করো যে, নিঃস্বার্থ ব্যক্তি হয়ে ওঠাটা হল একটা মহত্ত্ব। যখন তুমি নিঃস্বার্থ, তখন নিজেকে খুবই উচ্চাসনে বসাও। কিন্তু এমন কোনো মানুষ নেই যে সমস্ত কিছুর মধ্যে, মানুষ, ঘটনাবলি ও বস্তুসমূহের মধ্যে, এবং তাঁর কর্মে, ঈশ্বরের নিঃস্বার্থতা দেখতে পায়। কেন এমন হয়? কারণ মানুষ অত্যন্ত স্বার্থপর! কেন আমি এমনটা বলি? মানবজাতি এক বস্তুগত জগতের মধ্যে বাস করে। তুমি ঈশ্বরকে অনুসরণ করতে পারো, কিন্তু ঈশ্বর কীভাবে তোমার জন্য রসদের যোগান দেন, তোমাকে ভালোবাসেন, এবং তোমার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তা তুমি কখনোই দেখো না বা উপলব্ধি করো না। তাহলে, তুমি কী দেখো? তুমি সেই আত্মীয়পরিজনদের দেখো, যাদের সঙ্গে তোমার রক্তের সম্পর্ক রয়েছে, যারা তোমাকে ভালোবাসে বা ভীষণ স্নেহ করে। তুমি সেই বিষয়গুলিকেই দেখো, যা তোমার দেহের পক্ষে উপকারী, তুমি সেইসকল মানুষ ও বস্তুগুলি নিয়েই ভাবিত যেগুলিকে বা যাদের তুমি ভালোবাসো। এ-ই হল মানুষের তথাকথিত নিঃস্বার্থতা। তবে, এইরূপ “নিঃস্বার্থ” মানুষেরা কখনো সেই ঈশ্বরকে নিয়ে ভাবিত নয়, যিনি তাদের জীবনদান করেছেন। ঈশ্বরের নিঃস্বার্থতার বিপরীতে, মানুষের তথাকথিত নিঃস্বার্থতা আদতে স্বার্থসর্বস্বতা ও ঘৃণ্যতার দ্যোতক। নিঃস্বার্থ মানুষ যাতে বিশ্বাসী, তা শূন্যগর্ভ এবং অবাস্তব, কলুষিত, তা ঈশ্বরের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ, এবং ঈশ্বরের সঙ্গে সকল প্রকার সম্পর্ক বিরহিত। মানুষের নিঃস্বার্থতা শুধু তার নিজের জন্য, অন্যদিকে ঈশ্বরের নিঃস্বার্থতা হল তাঁর সারসত্যের প্রকৃত উদ্‌ঘাটন। নিঃস্বার্থতার কারণেই ঈশ্বর মানুষের উদ্দেশ্যে নিরন্তর রসদ যুগিয়ে চলেন। যে বিষয়টি নিয়ে আমি আজ আলোচনা করছি, তা নিয়ে তোমরা হয়তো গভীরভাবে প্রভাবিত না-ও হতে পারো, এবং হয়তো নিছকই সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়িয়ে চলেছ, কিন্তু যখন তুমি তোমার অন্তঃকরণে ঈশ্বরের অন্তরকে উপলব্ধির চেষ্টা করবে, তখন তুমি অনিচ্ছাকৃতভাবেই আবিষ্কার করবে: যে, এই পৃথিবীর সকল মানুষ, ঘটনাবলী ও বস্তুসমূহের মধ্যে, একমাত্র ঈশ্বরের ভালোবাসাই বাস্তব ও মূর্ত, কারণ তোমার জন্য কেবলমাত্র ঈশ্বরের ভালোবাসাই নিঃশর্ত এবং নিষ্কলঙ্ক। ঈশ্বর ব্যতীত বাকি সকলের তথাকথিত নিঃস্বার্থতা ছদ্ম, অগভীর, মেকি; সেখানে একটা ভারসাম্যের প্রশ্ন জড়িত, এবং তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। তোমরা এমনকি এমনও বলতে পারো, যে, তা কলুষিত এবং ঘৃণার্হ। তোমরা কি এই বাক্যগুলির সঙ্গে সহমত?

আমি জানি যে তোমরা এই বিষয়গুলির সঙ্গে খুবই অপরিচিত, এবং এই বিষয়গুলির গভীরে প্রবেশ করার জন্য তোমাদের একটু সময়ের প্রয়োজন রয়েছে, এবং তারপরই তোমাদের প্রকৃত উপলব্ধি জন্মাবে। এই সমস্ত প্রশ্ন ও বিষয়গুলির সঙ্গে তোমরা যত বেশি অপরিচিত থাকবে, তত বেশি করে এটা প্রমাণিত হবে যে তোমাদের অন্তরে এই বিষয়গুলির অস্তিত্ব নেই। আমি যদি এই বিষয়গুলি কখনোই না উল্লেখ করতাম, তাহলে কি তোমাদের মধ্যে কেউ এগুলি সম্বন্ধে কিছু জানতে? আমি বিশ্বাস করি তোমরা এগুলি সম্বন্ধে কখনোই কিছু জানতে পারতে না। এমনটা নিশ্চিত। তোমরা যতই অনুধাবন বা উপলব্ধি করতে পারো না কেন, যে বিষয়গুলির আলোচনা আমি করলাম, সংক্ষেপে বলতে গেলে, মানুষের মধ্যে সেগুলির ঘাটতি সর্বাধিক, এবং এগুলি সম্বন্ধেই তাদের সবচেয়ে বেশি করে জানা উচিত। এই বিষয়গুলি প্রত্যেকের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সেগুলি মূল্যবান এবং সেগুলি জীবন, এবং যে বিষয়গুলি সম্মুখের পথের পাথেয় হিসাবে তোমাদের সঞ্চয় করতেই হবে। পথনির্দেশিকা হিসাবে এই বাক্যগুলি ব্যতীত, ঈশ্বরের স্বভাব ও সারসত্য সম্বন্ধে তোমাদের উপলব্ধি ব্যতীত, ঈশ্বরের বিষয়ে তোমাদের মধ্যে একটা প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাবে। তুমি যদি ঈশ্বরকে উপলব্ধিই না করো, তাহলে তুমি কীভাবে তাঁকে যথাযথভাবে বিশ্বাস করবে? ঈশ্বরের আবেগ, তাঁর ইচ্ছা, তাঁর মনের অবস্থা, তিনি কী ভাবছেন, কী তাঁকে দুঃখ দেয়, কী-ই বা তাঁকে আনন্দ দেয়, তার কিছুই তুমি জানো না, সুতরাং, তুমি কীভাবে ঈশ্বরের হৃদয়ের প্রতি বিবেচনাশীল হবে?

ঈশ্বর যখন বিষণ্ণ থাকেন, তখন তিনি এমন এক মানবজাতির সম্মুখীন হন, যারা তাঁর প্রতি বিন্দুমাত্র মনোযোগী নয়, এমন এক মানবজাতি, যারা দাবি করে যে তারা তাঁকে অনুসরণ করে এবং ভালোবাসে, কিন্তু তবুও তাঁর অনুভূতিগুলিকে পূর্ণত উপেক্ষা করে। কীভাবে তাঁর হৃদয় আহত না হয়ে থাকতে পারে? ঈশ্বরের পরিচালনামূলক কার্যের ক্ষেত্রে, তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর কর্ম সম্পাদন করেন, এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে বাক্য বিনিময় করেন, এবং কোনোরকম দ্বিধা ও গোপনীয়তা ছাড়াই তিনি তাদের মুখোমুখী হন; কিন্তু, এর বিপরীতে, যারা তাঁকা অনুসরণ করে তাদের প্রত্যেকেই তাঁর প্রতি থেকে নিজেকে নিরুদ্ধ রেখেছে, কেউই সক্রিয়ভাবে তাঁর নিকটে আসতে, তাঁর হৃদয়ের প্রতি বিবেচনাশীল হতে, বা তাঁকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতে, ইচ্ছুক নয়। ঈশ্বর যখন আনন্দময় ও সুখী থাকেন, তখনও কেউই তাঁর আনন্দ বা সুখের অংশীদার হয় না। মানুষ যখন ঈশ্বরকে ভুল বোঝে, তখনও তাঁর আহত হৃদয়ের শুশ্রুষার জন্য কেউ থাকে না। যখন তাঁর হৃদয় যন্ত্রণাকাতর হয়, তখনও তিনি এমন একজনকেও পান না যে তাঁকে তার উপর ভরসা করতে দিতে ইচ্ছুক। ঈশ্বরের পরিচালনামূলক কার্যের এই সহস্রাধিক বৎসরকালে, একজনও কেউ আসে নি, যে ঈশ্বরের আবেগগুলিকে উপলব্ধি করেছে, যে সেগুলিকে অনুধাবন বা স্বীকার করেছে, আর ঈশ্বরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর সুখ, দুঃখ ভাগ করে করে নিতে পারবে, এমন কোনো ব্যক্তির বিদ্যমান হওয়া তো দূরস্থান। ঈশ্বর নিঃসঙ্গ। ঈশ্বর একাকী! দুর্নীতিগ্রস্ত মানবজাতি তাঁর বিরোধিতা করে বলেই যে ঈশ্বর নিঃসঙ্গ, শুধু তেমনটাই কিন্তু নয়, তিনি এই কারণে আরো বেশি নিঃসঙ্গ, যে, যারা আধ্যাত্মিক হতে যায়, যারা ঈশ্বরকে জানতে ও উপলব্ধি করতে চায়, এবং, এমনকি, যারা তাঁর জন্য নিজেদের সমগ্র জীবন ব্যয় করতে ইচ্ছুক, তারাও তাঁর ভাবনাচিন্তাগুলি জানে না, বা তাঁর স্বভাব ও তাঁর আবেগগুলিকে উপলব্ধি করে না।

নোহর কাহিনির শেষভাগে, আমরা দেখি, যে, নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের জন্য ঈশ্বর এক অচিরাচরিত পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এ হল এক সবিশেষ পদ্ধতি: মানুষের সঙ্গে এক সন্ধিচুক্তি স্থাপন, যা ঈশ্বরের দ্বারা বন্যার মধ্যমে পৃথিবীর ধ্বংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। উপরিগতভাবে, এই সন্ধিচুক্তি স্থাপনকে খুব সাধারণ একটা বিষয় বলে মনে হতে পারে। এ হল নিছকই বাক্যের মাধ্যমে দুটি পক্ষকে একত্রে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা, যাতে এই চুক্তির লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা যায়, যাতে উভয়পক্ষেরই স্বার্থরক্ষা ঘটে। আকারের দিক থেকে এ খুবই সাধারণ এক বিষয়, কিন্তু, এই কাজের নেপথ্যে ঈশ্বরের যে অভিপ্রায় এবং প্রেরণা রয়েছে, সেই নিরিখে এ হল ঈশ্বরের স্বভাব ও তাঁর মানসিক অবস্থার প্রকৃত উদ্‌ঘাটন। যদি তুমি এই বাক্যগুলিকে অবহেলা এবং উপেক্ষা করো, যদি আমি তোমাদের বিষয়গুলির সত্য সম্বন্ধে কখনোই না বলি, তাহলে মানবজাতি কখনোই ঈশ্বরের ভাবনাগুলিকে জানতে পারবে না। ঈশ্বর যখন এই সন্ধিচুক্তি করেছিলেন, তোমাদের কল্পনায় তিনি হয়তো তখন হাসছিলেন, বা হয়তো তিনি গুরুগম্ভীর ছিলেন, কিন্তু, যে সাধারণতম অনুভূতিগুলিরই ঈশ্বরের হয়েছে বলে মানুষ কল্পনা করুক না কেন, কেউই সক্ষম হয়নি দেখতে তাঁর অন্তর বা তাঁর যন্ত্রণা, তাঁর একাকিত্ব তো দূরস্থান। কেউই ঈশ্বরকে দিয়ে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করাতে বা তাঁর আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারেনি, বা এমন কেউ হয়ে উঠতে পারেনি যার কাছ ঈশ্বর ভরসা করে তাঁর চিন্তাভাবনা বা যন্ত্রণা প্রকাশ করতে পারেন। এই কারণেই, এই কাজটি করা ছাড়া ঈশ্বরের কোনো গতান্তর ছিল না। উপরিগতভাবে, মানবজাতি তখন যেমন ছিল, সেভাবে তাকে বিদায় জানিয়ে, অতীতের বিষয়গুলির মীমাংসা করে, এবং বন্যার দ্বারা পৃথিবীকে ধ্বংসের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে, ঈশ্বর খুব সহজ একটা কাজ করেছেন। তবে, সেই মুহূর্ত থেকে, ঈশ্বর নিজের হৃদয়ের গভীরে সেই যন্ত্রণা অবদমিত রেখেছেন। যে সময়ে ঈশ্বরের পাশে ভরসা করার মতো কেউ ছিল না, তখন তিনি মানবজাতির সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিলেন, তাদের বলেছিলেন, যে, তিনি আর বন্যার দ্বারা এই পৃথিবীকে ধ্বংস করবেন না। যখন কোনো রামধনুর উদয় ঘটে, তখন তা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল, এবং তা তাদের পাপাচার থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্কও করে দেয়। এমনকি সেই যন্ত্রণাদগ্ধ অবস্থাতেও ঈশ্বর মানবজাতির কথা ভোলেননি এবং তখনো তাদের জন্য এতখানি উদ্বেগ দেখিয়েছিলন। তা কি ঈশ্বরের ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থতা নয়? কিন্তু মানুষ যখন যন্ত্রণাভোগ করে, তখন তারা কী ভাবে? সেই সময়েই কি ঈশ্বরকে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় না? তেমন সময়গুলিতেই, মানুষ সবসময় ঈশ্বরকে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য টেনে আনে। যে সময়েই হোক না কেন, ঈশ্বর কখনোই মানুষকে নিরাশ করেন না, তিনি সততই তাদের সক্ষম করে তুলবেন যাতে তারা দুর্দশামুক্ত হয়ে আলোয় বসবাস করতে পারে। যদিও ঈশ্বর মানবজাতির উদ্দেশ্যে রসদের যোগান দেন, মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বরের ভূমিকা আরামদায়ক বটিকা ও স্বাচ্ছন্দ্যপ্রদায়ক পাঁচনের বেশি কিছু নয়। ঈশ্বর যখন যন্ত্রণাভোগ করেন, তাঁর হৃদয় যখন আহত হয়, তখন নিজের পাশে একজন সৃষ্ট সত্তা বা ব্যক্তিকে চাওয়াটা ঈশ্বরের পক্ষে যেন নিঃসন্দেহেই অতিরিক্ত কিছু চাওয়া হয়ে যায়। মানুষ কখনোই ঈশ্বরের অনুভূতির প্রতি মনোযোগ দেয় না, তাই ঈশ্বরও কারো সান্ত্বনা দাবি করেন না প্রত্যাশাও করেন না। তিনি শুধু নিজের মনের ভাব প্রকাশের জন্য নিজস্ব পদ্ধতিসমূহ ব্যবহার করেন। মানুষ মনে করে না, যে, যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাওয়াটা ঈশ্বরের পক্ষেও কঠিন, কিন্তু যখন তুমি ঈশ্বরকে প্রকৃতপক্ষেই উপলব্ধি করার চেষ্টা করো, তখন তুমি ঈশ্বর যা কিছু করেন তার মধ্যে ঈশ্বরের আন্তরিক অভিপ্রায়কে যথার্থরূপেই উপলব্ধি করতে পারো, ঈশ্বরের মহত্ত্ব ও তাঁর নিঃস্বার্থতা অনুভব করো। যদিও ঈশ্বর রামধনু ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে একটা সন্ধিচুক্তি করেছেন, কেন তিনি কখনোই কাউকে বলেননি যে কেন তিনি তা করেছেন সেটা—কেন তিনি এই সন্ধিচুক্তি স্থাপন করেছিলেন—অর্থাৎ, তিনি কখনোই তাঁর প্রকৃত চিন্তাভাবনাগুলি কাউকেই ব্যক্ত করেননি। তার কারণ হল, স্বহস্তে সৃষ্ট মানবজাতির প্রতি ঈশ্বরের প্রেমের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারবে, এমন কেউ-ই নেই, এবং, এমন-ও কেউ নেই, যে, মানবজাতির ধ্বংসসাধনকালীন তাঁর হৃদয় যে যন্ত্রণাভোগ করেছিল, তা উপলব্ধি করতে পারে। তাই, তিনি যা অনুভব করেছিলেন, তা যদি তিনি মানুষকে বলতেনও, তবুও তারা তা বিশ্বাস তথা গ্রহণে সক্ষম হত না। যন্ত্রণায় থাকা সত্ত্বেও, তবু তিনি তাঁর কাজের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জারি রাখেন। ঈশ্বর সর্বদাই মানবজাতিকে তাঁর শ্রেষ্ঠ দিক ও শ্রেষ্ঠ বিষয়সকলই প্রদান করেম, কিন্তু সমস্ত যন্ত্রণা তিনি একাকী, নীরবে সহন করেন। ঈশ্বর কখনোই তাঁর সেই যন্ত্রণাসমূহের বিষয়ে প্রকাশ্যে উন্মোচন করেন না। পরিবর্তে, তিনি সেগুলি সহ্য করেন, এবং নীরবে অপেক্ষা করেন। ঈশ্বরের সহনশীলতা শীতল, অসাড় বা অসহায় নয়, বা, তা দুর্বলতার লক্ষণও নয়। বরং, ঈশ্বরের ভালোবাসা ও সারসত্য সর্বদাই নিঃস্বার্থ থেকেছে। এ হল তাঁর সারসত্য ও স্বভাবের প্রাকৃতিক উদ্ঘাটন, এবং প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা হিসাবে ঈশ্বরের পরিচিতির এক যথার্থ মূর্তরূপ।

তবে, কেউ কেউ হয়তো আমার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করবে। “মানুষ যাতে ঈশ্বরের প্রতি দুঃখবোধ করে, সেই উদ্দেশ্যেই কি ঈশ্বরের অনুভূতি এত চাঞ্চল্যকর ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা?” এখানে কি অভিপ্রায় এমনটাই? (তা নয়।) আমার এই বিষয়গুলি বলার একমাত্র উদ্দেশ্য হল তোমরা যাতে ঈশ্বরকে আরো ভালোভাবে জানো, তাঁর অসংখ্য দিকগুলি উপলব্ধি করো, তাঁর আবেগগুলি উপলব্ধি করো, এবং এমনটা অনুধাবন করো, যে, ঈশ্বরের সারসত্য এবং স্বভাব সুনির্দিষ্টভাবে এবং ক্রমাগত তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা বর্ণিত হয়নি মানুষের শূন্যগর্ভ কথা, তাদের আক্ষরিক অর্থ ও মতবাদসমূহের মাধ্যমে। অর্থাৎ, ঈশ্বর এবং ঈশ্বরের সারসত্য বস্তুতই বিদ্যমান—সেগুলি চিত্র নয়, কল্পনা নয়, মানুষের দ্বারা নির্মিত নয়, এবং কোনোমতেই মানুষের দ্বারা উদ্ভাবিত নয়। তোমরা কি এখন তা স্বীকার করো? তোমরা যদি তা স্বীকার করো, তাহলে আমার আজকের আলোচনাটি তার লক্ষ্য অর্জন করেছে।

—বাক্য, খণ্ড ২, ঈশ্বরকে জানার প্রসঙ্গে, ঈশ্বরের কর্ম, ঈশ্বরের স্বভাব এবং স্বয়ং ঈশ্বর ১

পূর্ববর্তী: বন্যার পরে নোহকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ

পরবর্তী: ঈশ্বর অব্রাহামকে একটি পুত্রসন্তান প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।

সম্পর্কিত তথ্য

প্রথম দিবসে, ঈশ্বরের কর্তৃত্বের বদান্যতায় মানবজাতির দিন এবং রাতের সূচনা হয় এবং অবিচল থাকে

প্রথম অনুচ্ছেদটির প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাকঃ: “ঈশ্বর বললেন, দীপ্তি হোক! দীপ্তির হল আবির্ভাব। ঈশ্বর দেখলেন, চমৎকার এই দীপ্তি। অন্ধকার থেকে...

তৃতীয় দিবসে, ঈশ্বরের বাক্যসমূহ জন্ম দেয় পৃথিবী এবং সমুদ্রের এবং ঈশ্বরের কর্তৃত্ব বিশ্বে প্রাণসঞ্চার করে

এরপর, পাঠ করা যাক আদিপুস্তক ১:৯-১১-এর প্রথম বাক্যটি: “ঈশ্বর বললেন, আকাশের নীচে সমস্ত জলরাশি এক স্থানে সংহত হোক, প্রকাশিত হোক শুষ্ক ভূমি!”...

আদমের প্রতি ঈশ্বরের আদেশ

আদিপুস্তক ২:১৫-১৭ প্রভু পরমেশ্বর মানুষকে এদন উদ্যানে কৃষিকর্ম ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত করলেন। প্রভু পরমেশ্বর মানুষকে নির্দেশ দিলেন,...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন