পরীক্ষা-পরবর্তী সময়ে ইয়োব

ইয়োবে ৪২:৭-৯ ইয়োবকে এই কথাগুলো বলার পর যিহোবা তেমানের অধিবাসী এলিফসকে বললেন, আমি তোমার উপরে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ, এবং তোমার দুই বন্ধুর উপরেও: কারণ তোমরা আমার সম্পর্কে যা সঠিক তা বলোনি, যেমন আমার সেবক ইয়োব বলেছে। সুতরাং তোমরা এখন সাতটা বৃষ আর সাতটা মেষ নিয়ে আমার সেবক ইয়োবের কাছে যাও, আর নিজেদের জন্য অগ্নিদগ্ধ বলি উৎসর্গ করো; আমার সেবক ইয়োব তখন তোমাদের জন্য প্রার্থনা করবে: তার জন্য আমি সেই প্রার্থনা স্বীকার করবো: নাহলে তোমরা যে আমার সেবক ইয়োবের মতো আমার সম্পর্কে যা সঠিক তা বলোনি, সেজন্য আমি তোমাদের মূর্খতার জন্য তোমাদের সাথে বোঝাপড়া করবো। তখন তেমানবাসী এলিফস, শুহার অধিবাসী বিলদদ্‌ এবং নামাথ নিবাসী সোফর সেই স্থান ত্যাগ করলো, এবং যিহোবার আদেশ অনুসারে সব কাজ করলো: যিহোবাও তখন ইয়োবের প্রার্থনা স্বীকার করলেন।

ইয়োবে ৪২:১০ ইয়োব যখন তার বন্ধুদের জন্য প্রার্থনা করলেন, তখন যিহোবা ইয়োবের দুর্দশার অবসান ঘটালেন: সেইসাথে আগে ইয়োবের যা ছিল তার দ্বিগুণ যিহোবা তাকে দানও করলেন।

ইয়োবে ৪২:১২ অর্থাৎ ইয়োবের প্রথম জীবনের চেয়ে পরবর্তীকালে যিহোবা তাকে আরও বেশি আশীর্বাদ করেছিলেন: কারণ ইয়োব পেয়েছিলেন চোদ্দ হাজার মেষ, ছয় হাজার উট, দু’হাজার বৃষ, আর এক হাজার গর্দভী।

ইয়োবে ৪২:১৭ অবশেষে ইয়োব পূর্ণপরিণত বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন

যারা ঈশ্বরে ভীত এবং মন্দকে পরিত্যাগ করে ঈশ্বর তাদের স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেন, এবং যারা নির্বোধ তাদের হীন নজরে দেখেন

ইয়োব ৪২:৭-৯-এ ঈশ্বর বলেন ইয়োব তাঁর সেবক। ইয়োবের বিষয়ে তাঁর এই “সেবক” শব্দের ব্যবহারই ঈশ্বরের হৃদয়ে ইয়োবের গুরুত্ব প্রদর্শন করছে; যদিও ঈশ্বর ইয়োবকে এর চেয়ে বেশি সম্মানের কোনো নামে ডাকেননি, কিন্তু এই আখ্যার সাথে ঈশ্বরের হৃদয়ে ইয়োবের গুরুত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে “সেবক” হল ইয়োবের জন্য ঈশ্বরের দেওয়া ডাকনাম। ঈশ্বরের এই বারংবার “আমার সেবক ইয়োব” উল্লেখ করার মাধ্যমেই বোঝা যায় তিনি ইয়োবের প্রতি কতটা সন্তুষ্ট ছিলেন। ঈশ্বর যদিও “সেবক” শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থের বিষয়ে কিছু বলেননি, কিন্তু ঈশ্বরের কাছে “সেবক” শব্দের সংজ্ঞা কী তা শাস্ত্রের এই অনুচ্ছেদে দেখা যায়। ঈশ্বর প্রথমে তেমান নিবাসী এলিফসকে বললেন: “আমি তোমার উপরে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ, এবং তোমার দুই বন্ধুর উপরেও: কারণ তোমরা আমার সম্পর্কে যা সঠিক তা বলোনি, যেমন আমার সেবক ইয়োব বলেছে।” এই বাক্যগুলোর মাধ্যমেই ঈশ্বর প্রথমবার প্রকাশ্যে মানুষকে বললেন যে ইয়োব ঈশ্বরের পরীক্ষার পরে যা বলেছে ও করেছে সেই সমস্তকিছু তিনি গ্রহণ করেছেন, এবং ইয়োব যা বলেছে ও করেছে তা যে সঠিক ও নির্ভুল, এই প্রথমবার ঈশ্বর প্রকাশ্যে তার স্বীকৃতি দিলেন। ঈশ্বর এলিফস ও অন্যদের প্রতি জন্য ক্রুদ্ধ ছিলেন তাদের ভ্রান্ত ও অযৌক্তিক কথাবার্তার জন্য, কারণ, ইয়োবের মতো তারাও ঈশ্বরের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেনি বা তাদের জীবনে ঈশ্বরের বাক্য শুনতে পায়নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইয়োবের ঈশ্বর সম্বন্ধে এরকম নির্ভুল জ্ঞান ছিল, অথচ তারা শুধু ঈশ্বরের সম্পর্কে অন্ধভাবে অনুমানই করতে পেরেছিল, তাদের সমস্ত কাজেই তারা ঈশ্বরের ইচ্ছা লঙ্ঘন করত এবং ঈশ্বরের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিত। ফলতঃ, ইয়োব যা বলেছিল ও করেছিল সেই সমস্তকিছু গ্রহণ করার সাথেসাথে অন্যদের প্রতি ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তাদের মধ্যে তিনি যে শুধু ঈশ্বর-ভীতির বাস্তবতা দেখতে পাননি তা-ই নয়, তারা যা বলেছিল তার মধ্যেও ঈশ্বর-ভীতির চিহ্নমাত্র দেখতে পাননি। আর তাই এরপর ঈশ্বর তাদের কাছে দাবী করেন: “সুতরাং তোমরা এখন সাতটা বৃষ আর সাতটা মেষ নিয়ে আমার সেবক ইয়োবের কাছে যাও, আর নিজেদের জন্য অগ্নিদগ্ধ বলি উৎসর্গ করো; আমার সেবক ইয়োব তখন তোমাদের জন্য প্রার্থনা করবে: তার জন্য আমি সেই প্রার্থনা স্বীকার করবো: নাহলে তোমরা যে আমার সেবক ইয়োবের মতো আমার সম্পর্কে যা সঠিক তা বলোনি, সেজন্য আমি তোমাদের মূর্খতার জন্য তোমাদের সাথে বোঝাপড়া করবো।” এই অনুচ্ছেদে ঈশ্বর এলিফস ও অন্যদের এমন কিছু করতে বলছেন যা তাদের পাপমুক্ত করবে, কারণ তাদের মূর্খতা ছিল যিহোবা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ, এবং সেই কারণে এই ভুল সংশোধন করার জন্য তাদের অগ্নিদগ্ধ বলি উৎসর্গ করতে হয়েছিল। অগ্নিদগ্ধ বলি সাধারণত ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়, কিন্তু এইক্ষেত্রে যা কিছুটা অস্বাভাবিক তা হচ্ছে এই অগ্নিদগ্ধ বলি ইয়োবের প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছিল। ঈশ্বর ইয়োবকে গ্রহণ করেছিলেন কারণ ইয়োব পরীক্ষা চলাকালীন ঈশ্বরের সাক্ষ্য বহন করেছিল। এদিকে, ইয়োবের এই বন্ধুরা ইয়োবের পরীক্ষার সময়েই অনাবৃত হয়েছিল; তাদের মূর্খতার কারণে তারা ঈশ্বরের দ্বারা তিরস্কৃত হয়েছিল, এবং তারা ঈশ্বরের ক্রোধ জাগিয়ে তুলেছিল, তাই তাদের ঈশ্বরের থেকে শাস্তি পেতে হতো—ইয়োবের উদ্দেশ্যে অগ্নিদগ্ধ বলি উৎসর্গ করার শাস্তি—যার পরে ইয়োব তাদের প্রতি ঈশ্বরের ক্রোধ ও শাস্তি নিরসন করার জন্য তাদের হয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল। ঈশ্বরের অভিপ্রায় ছিল তাদেরকে লজ্জিত করা, কারণ তারা এমন লোক ছিল না যারা ঈশ্বরে ভীত এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করেছে, এবং তারা ইয়োবের সততাকে নিন্দা করেছিল। এক দিক থেকে, ঈশ্বর তাদের বলছিলেন যে তিনি তাদের কাজকে গ্রহণ করেননি, কিন্তু সানন্দে ও সমাদরে ইয়োবকে গ্রহণ করেছিলেন; অন্য দিক থেকে, ঈশ্বর তাদের বলছিলেন যে ঈশ্বরের দ্বারা গৃহীত হলে মানুষ ঈশ্বরের সম্মুখে উন্নীত হয়, মানুষ তার মূর্খতার কারণে ঈশ্বরের কাছে ঘৃণিত, এই কারণেই সে ঈশ্বরকে ক্ষুব্ধ করে, এবং এই কারণেই সে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে নীচ ও অধম। এগুলোই হল দুই ধরনের মানুষের ঈশ্বর প্রদত্ত সংজ্ঞা, এগুলোই এই দুই ধরনের মানুষের প্রতি ঈশ্বরের মনোভাব, এবং এগুলোই এই দুই ধরনের মানুষের মূল্য ও অবস্থান সম্পর্কে ঈশ্বরের স্পষ্টভাষণ। যদিও ঈশ্বর ইয়োবকে সেবক বলে অভিহিত করেছিলেন, কিন্তু ঈশ্বরের চোখে এই সেবক ছিল প্রিয়, এবং ঈশ্বর তাকে অন্যদের হয়ে প্রার্থনা করার ও তাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এই সেবক ঈশ্বরের সাথে সরাসরি কথা বলতে ও সরাসরি ঈশ্বরের সম্মুখে আসতে সক্ষম ছিল, এবং তার মর্যাদা ছিল অন্যদের থেকে উচ্চতর ও সম্মানীয়। এটাই ঈশ্বরের উচ্চারিত “সেবক” শব্দের আসল অর্থ। ইয়োবকে এই বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়েছিল তার ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগের কারণে, এবং ঈশ্বর অন্যদের সেবক নামে অভিহিত করেননি কারণ তারা ঈশ্বরে ভীত ছিল না এবং তারা মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করেনি। ঈশ্বরের এই দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাব হল দুই প্রকারের মানুষের প্রতি তাঁর মনোভাবের প্রকাশ: যারা ঈশ্বরে ভীত ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করেছে তারা ঈশ্বরের দ্বারা গৃহীত ও তাঁর চোখে মূল্যবান, অপরদিকে যারা নির্বোধ তারা ঈশ্বরে ভীত নয়, তারা মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করতে পারে না, এবং তারা ঈশ্বরের আনুকূল্য পেতে অসমর্থ; তারা সাধারণত ঈশ্বরের কাছে ঘৃণিত ও নিন্দিত, এবং ঈশ্বরের চোখে নীচ।

ঈশ্বরের ইয়োবকে কর্তৃত্ব প্রদান

ইয়োব তার বন্ধুদের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল, এবং তারপর, ইয়োবের এই প্রার্থনার জন্য ঈশ্বর তাদের মূর্খতার উপযুক্ত মোকাবিলা থেকে বিরত থেকেছিলেন—তিনি তাদের দণ্ড দেননি বা তাদের উপর প্রতিশোধ নেননি। তা কেন? কারণ তাদের জন্য ঈশ্বরের সেবক ইয়োব যে প্রার্থনা করেছিল তা ঈশ্বরের কানে পৌঁছেছিল; ঈশ্বর তাদের ক্ষমা করেছিলেন কারণ তিনি ইয়োবের প্রার্থনা গ্রহণ করেছিলেন। তাহলে এর মধ্যে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? যখন ঈশ্বর কাউকে আশীর্বাদ করেন তখন তিনি তাকে অনেক পুরষ্কার দেন, এবং তা শুধু জাগতিক পুরষ্কারই নয়: ঈশ্বর তাদের কর্তৃত্বও প্রদান করেন, অন্যদের হয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি দেন, এবং সেই অন্যদের সীমালঙ্ঘনকে ঈশ্বর উপেক্ষা করেন ও ভুলে যান, কারণ এদের প্রার্থনা তিনি শোনেন। ঠিক এই কর্তৃত্বই ঈশ্বর ইয়োবকে দিয়েছিলেন। ইয়োবের প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের তিরস্কৃত হওয়ার অবসান ঘটিয়ে ঈশ্বর সেই নির্বোধ মানুষদের লজ্জিত করেছিলেন—যেটা নিশ্চিতভাবেই এলিফস ও অন্যদের প্রতি ঈশ্বরের বিশেষ দণ্ড।

ইয়োব আরও একবার ঈশ্বরের কাছ থেকে আশীর্বাদ লাভ করে, এবং আর কখনোই শয়তানের দ্বারা অভিযুক্ত হয় না

যিহোবা ঈশ্বরের উচ্চারণের মধ্যে এই বাক্যগুলো রয়েছে যে “তোমরা আমার সম্পর্কে যা সঠিক তা বলোনি, যেমন আমার সেবক ইয়োব বলেছে।” ইয়োব আসলে ঠিক কী বলেছিল? তা আমরা আগে আলোচনা করেছি, এবং ইয়োবের গ্রন্থের অনেক পৃষ্ঠায় ইয়োবের এই কথাগুলো লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই এত এত পৃষ্ঠার এত শব্দের মধ্যে, ইয়োব কখনও একবারও ঈশ্বরের সম্পর্কে অভিযোগ করেনি বা সন্দেহপ্রকাশ করেনি। সে শুধু পরিণামের অপেক্ষা করেছে। তার এই অপেক্ষা, যা তার আনুগত্যের আচরণ, তার ফল হিসাবে, এবং ঈশ্বরকে সে যে কথাগুলো বলেছিল তার ফল হিসাবে, ঈশ্বর তাকে গ্রহণ করেছিলেন। যখন সে এই পরীক্ষাগুলো সহ্য করছিল, কষ্ট ভোগ করছিল, তখন ঈশ্বর তার পাশে ছিলেন, এবং যদিও তার এই কষ্ট ঈশ্বরের উপস্থিতির ফলে কমে যায়নি, তবুও ঈশ্বর যা দেখতে চেয়েছিলেন এবং যা শুনতে চেয়েছিলেন তা দেখেছিলেন ও শুনেছিলেন। ইয়োবের প্রতিটা কাজ ও প্রতিটা কথা ঈশ্বরের দৃষ্টি ও কর্ণগোচর হয়েছিল; ঈশ্বর শুনেছিলেন এবং দেখেছিলেন—এটাই সত্য। সেই সময়ে, সেই সময়কাল ধরে, ঈশ্বর সম্পর্কে যে জ্ঞান ছিল ও তার হৃদয়ে ঈশ্বর সম্পর্কে যে চিন্তাভাবনা ছিল, তা বর্তমানের মানুষের মতো এত সুনির্দিষ্ট ছিল না, কিন্তু সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, সে যা কিছু বলেছিল ঈশ্বর তা চিনতে পেরেছিলেন, কারণ তার আচরণ ও তার হৃদয়ের চিন্তাভাবনা, ও সেইসাথে সে যা প্রকাশ ও অভিব্যক্ত করেছিল, তা ঈশ্বরের চাহিদার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। ইয়োব যখন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, সেই সময়ে তার হৃদয়ে সে যা চিন্তাভাবনা করেছিল ও যা করার সংকল্প নিয়েছিল, তা ঈশ্বরকে এমন এক পরিণাম প্রদর্শন করেছিল যা ছিল তাঁর কাছে সন্তোষজনক, এবং এরপরে ঈশ্বর ইয়োবের পরীক্ষার সমাপ্তি ঘটান, ইয়োব তার সমস্যা থেকে মুক্তি পায়, এবং তার পরীক্ষা দূরীভূত হয় এবং আর কখনো তাকে সেসবের সম্মুখীন হতে হয়নি। যেহেতু ইয়োবকে ইতিমধ্যেই পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়েছে, এবং সে পরীক্ষায় অবিচল থাকতে পেরেছে ও শয়তানকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেছে, তাই ঈশ্বর তাকে তার ন্যায্য প্রাপ্য আশীর্বাদ প্রদান করেছিলেন। ইয়োব ৪২:১০,১২ অনুযায়ী, ইয়োব আরও একবার আশীর্বাদ লাভ করেছিল, এবং তার পরিমাণ ছিল প্রথমবারের থেকেও বেশী। এই সময়ে শয়তান নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, এবং আর কিছু বলেনি বা করেনি, এবং এরপর থেকে শয়তান আর কখনো ইয়োবের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি বা তাকে আক্রমণ করেনি, এবং ইয়োবের প্রতি ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে আর কোনো অভিযোগ করেনি।

ইয়োব তার জীবনের পরবর্তী অর্ধেক অংশ ঈশ্বরের আশীর্বাদের মধ্যে যাপন করে

যদিও সেই সময়ে ঈশ্বরের আশীর্বাদ শুধু ভেড়া, গবাদি পশু, উট ও অন্যান্য জাগতিক সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ঈশ্বর তাঁর হৃদয় থেকে ইয়োবকে যে আশীর্বাদ প্রদান করতে চেয়েছিলেন তা এর থেকে অনেকাংশে বেশী ছিল। এইসময়ে ঈশ্বর ইয়োবকে কী ধরনের চিরন্তন প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে চেয়েছিলেন, তা কী কোথাও লিপিবদ্ধ ছিল? ইয়োবের প্রতি ঈশ্বরের আশীর্বাদে ঈশ্বর ইয়োবের সমাপ্তির বিষয়ে উল্লেখ করেননি বা সে বিষয় স্পর্শ করেননি, এবং ঈশ্বরের হৃদয়ে ইয়োব যে স্থানই অধিকার করে থাকুক না কেন, সংক্ষেপে বলা যায় যে ঈশ্বর আশীর্বাদ প্রদানে অত্যন্ত পরিমিত ছিলেন। ঈশ্বর ইয়োবের সমাপ্তির বিষয়ে কোনো ঘোষণা করেননি। এর অর্থ কী? সেই সময়ে, যখন ঈশ্বরের পরিকল্পনা মানুষের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করার মতো পর্যায়ে পৌঁছয়নি, সেই পরিকল্পনা তখনও ঈশ্বরের কাজের সর্বশেষ স্তরে পৌঁছনো বাকি, তখন ঈশ্বর সমাপ্তির কোনো উল্লেখ করেননি, তিনি শুধু মানুষকে জাগতিক আশীর্বাদ প্রদান করতেন। এর অর্থ হল, ইয়োবের জীবনের শেষার্ধ ঈশ্বরের আশীর্বাদের মধ্যেই কেটেছিল, যার ফলে সে অন্যদের থেকে পৃথক হয়ে উঠেছিল—কিন্তু অন্যদের মতো তারও বয়স বেড়েছিল, এবং যে কোনো সাধারণ মানুষের মতোই এমন একটা দিন এসেছিল যেদিন সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিল। তাই এ কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে “অবশেষে ইয়োব পূর্ণপরিণত বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন” (ইয়োবে ৪২:১৭)। এখানে “পূর্ণপরিণত বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন”—এর অর্থ কী? ঈশ্বর মানুষের সমাপ্তি ঘোষণা করার পূর্ববর্তী যুগে, ঈশ্বর ইয়োবের জন্য একটা জীবনকাল নির্ধারণ করেছিলেন, এবং সেই সময় উপনীত হলে ঈশ্বর তাকে পৃথিবী থেকে স্বাভাবিকভাবে বিদায় নেওয়ার অনুমতি দেন। ইয়োবের দ্বিতীয় আশীর্বাদ থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত ঈশ্বর তার জীবনে আর কোনো দুর্দশা যোগ করেননি। ঈশ্বরের কাছে ইয়োবের মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক, এবং সেইসাথে প্রয়োজনীয়ও; এটা ছিল একটা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তাকোনো বিচারের রায় বা দণ্ড ছিল না। ইয়োব যখন জীবিত ছিল, সে ঈশ্বরের উপাসনা করত এবং ঈশ্বরে ভীত ছিল; মৃত্যুর পরে তার পরিসমাপ্তি কেমন হয়েছিল তা ঈশ্বর কিছু বলেননি, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্যও করেননি। ঈশ্বর কী করেন ও বলেন সে সম্বন্ধে উপযুক্ততার উপযুক্ততার বোধ আছে, এবং তাঁর কাজ ও তাঁর বাক্যের বিষয় ও নীতি তাঁর কাজের স্তর ও যুগের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ঈশ্বরের হৃদয়ে ইয়োবের মতো একজন মানুষের জন্য কী ধরনের সমাপ্তি নিহিত ছিল? ঈশ্বর কী তাঁর হৃদয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন? অবশ্যই হয়েছিলেন! বিষয়টা শুধু এই যে তা মানুষের অজানা; ঈশ্বর মানুষকে তা বলতে চাননি, বা মানুষকে তা বলার কোনো অভিপ্রায়ও তাঁর ছিল না। সুতরাং বাহ্যিকভাবে বলতে গেলে, ইয়োব তার পূর্ণ পরিণত বয়সে ইহলোক ত্যাগ করে, এবং এমনই ছিল ইয়োবের জীবন।

সমগ্র আয়ুষ্কাল ধরে ইয়োব যে জীবন যাপন করেছিল তার মূল্য

ইয়োব কি মূল্যবান জীবন যাপন করেছিল? সেই মূল্য কোথায় নিহিত ছিল? কেন বলা হয় যে সে একটা মূল্যবান জীবন যাপন করেছিল? মানুষের কাছে তার মূল্য কী ছিল? মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, শয়তানের ও সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে ঈশ্বরের সাক্ষ্য বহন করার দিক থেকে সে সেই মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করেছিল যাদের ঈশ্বর উদ্ধার করতে চান। ঈশ্বরের জীবের যে কর্তব্য পালন করা উচিত তা সে পূরণ করেছিল, সে একটা নজির সৃষ্টি করেছিল, এবং ঈশ্বর যাদের রক্ষা করতে চান তাদের আদর্শ হিসাবে কাজ করেছিল, মানুষকে দেখিয়েছিল যে ঈশ্বরের উপর ভরসা রেখে শয়তানের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। ঈশ্বরের কাছে তার মূল্য কী ছিল? ঈশ্বরের কাছে ইয়োবের জীবনের মূল্য নিহিত ছিল তার ঈশ্বরে ভীতি, ঈশ্বরের আরাধনা, ঈশ্বরের কর্মের সাক্ষ্য বহন করা, ঈশ্বরের কাজের বন্দনা করা, এবং ঈশ্বরকে স্বস্তি ও আনন্দ এনে দেওয়ার মধ্যে; ঈশ্বরের কাছে, ইয়োবের জীবনের মূল্য এর মধ্যেও নিহিত ছিল যে মৃত্যুর আগে, ইয়োব কীভাবে পরীক্ষার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল ও শয়তানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিল, শয়তানের ও সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে কীভাবে সে ঈশ্বরের সাক্ষ্য বহন করেছিল, যার ফলে ঈশ্বর মানবজাতির কাছে মহিমা অর্জন করতে পেরেছিলেন, ঈশ্বরের হৃদয় স্বস্তি পেয়েছিল এবং তাঁর উৎসুক হৃদয় একটা পরিণাম প্রত্যক্ষ করেছিল ও আশা দেখতে পেয়েছিল। ঈশ্বরের সাক্ষ্যপ্রদানে কোনো একজনের অবিচল থাকার সামর্থ্যের জন্য এবং ঈশ্বরের হয়ে শয়তানকে লজ্জিত করতে সক্ষম হওয়ার জন্য ইয়োবের সাক্ষ্য ঈশ্বরের মানবজাতিকে পরিচালনার কাজে একটা নজির সৃষ্টি করেছিল। এটাই কি ইয়োবের জীবনের মূল্য নয়? ইয়োব ঈশ্বরের হৃদয়কে স্বস্তি দিয়েছিল, তাঁকে গৌরব অর্জনের আনন্দ আস্বাদন করিয়েছিল, এবং ঈশ্বরের পরিচালনামূলক পরিকল্পনাকে এক বিস্ময়কর সূচনা প্রদান করেছিল। এই সময়ের পর থেকে, ইয়োবের নাম হয়ে উঠেছিল ঈশ্বরের মহিমা অর্জনের প্রতীক, এবং শয়তানের বিরুদ্ধে মানবজাতির জয়ের প্রতীক। ইয়োব নিজের আয়ুষ্কালে যে জীবন যাপন করেছিল, ও সেইসাথে শয়তানের বিরুদ্ধে তার উল্লেখযোগ্য জয়লাভ, ঈশ্বরের দ্বারা সর্বদা সযত্নে লালিত হবে, এবং তার ত্রুটিহীনতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ঈশ্বরে ভীতি আগামী প্রজন্ম গভীর শ্রদ্ধা করবে ও অনুকরণ করবে। সে ঈশ্বরের কাছে সর্বদা এক নিখুঁত প্রোজ্জ্বল মুক্তার মতো সযত্নলালিত হবে, এবং একইভাবে সে মানবজাতির কাছেও মূল্যবান হিসাবে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।

—বাক্য, খণ্ড ২, ঈশ্বরকে জানার প্রসঙ্গে, ঈশ্বরের কর্ম, ঈশ্বরের স্বভাব এবং স্বয়ং ঈশ্বর ২

পূর্ববর্তী: ইয়োব নিজের কানে ঈশ্বরকে শ্রবণ করেছিল (পর্ব ২)

পরবর্তী: মনুষ্যপুত্র হলেন বিশ্রামবারের প্রভু (পর্ব ১)

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন