ষষ্ঠ সন্ধিক্ষণ: মৃত্যু

এত ব্যস্ততা, এত হতাশা ও পরাজয় পেরিয়ে, বহু আনন্দ-বেদনা এবং উত্থান-পতনের পরে, এতগুলি অবিস্মরণীয় বছর পার করে, ঋতুচক্রের বারংবার পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করার পরে, মানুষ তার অজান্তেই অতিক্রম করেছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পথচিহ্নগুলিকে, এবং হঠাৎ এক ঝলকের মধ্যে, সে নিজেকে খুঁজে পায় জীবনের গোধূলিবেলায়। তার সারা শরীরে সময়ের চিহ্নঃ ঋজু হয়ে আর দাঁড়াতে পারে না, কালো চুল বদলে গেছে সাদায়, এককালের উজ্জ্বল ও ঝকঝকে চোখ এখন স্তিমিত ও ধুসর, পেলব ত্বকে বলিরেখা এবং ভাঁজ। কারও শ্রবণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, শিথিল হয়ে পড়ে গেছে কারও দাঁত, কারও প্রতিক্রিয়া হয়েছে মন্থর, ধীর হয়ে এসেছে কারও নড়াচড়া…। এই সময়ে, মানুষ তার যৌবনের আবেগঘন বছরগুলিকে চূড়ান্ত বিদায় জানিয়েছে এবং প্রবেশ করেছে জীবনের গোধূলিতে: বার্ধক্য। এর পরে, সে মুখোমুখি হবে মৃত্যুর, যা মানব জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণ।

১. মানুষের জীবন ও মৃত্যুর ক্ষমতা ধারণ করেন শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা

পূর্বজন্মের দ্বারা যদি কারোর জন্ম নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে তার মৃত্যু সেই ভাগ্যের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। যদি মানুষের জন্ম তার জীবনের অভীষ্ট পূরণের সূচনা হয়, তবে তার মৃত্যু সেই অভীষ্টের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। কোনো ব্যক্তির জন্মের জন্য যেহেতু স্রষ্টা একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নির্ধারণ করেছেন, তাই এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে তার মৃত্যুর জন্যও তিনি এক নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ব্যবস্থা করেছেন। অন্য কথায়, কেউই আকস্মিকভাবে জন্ম নেয় না, কারও মৃত্যু হঠাৎ করে আসে না এবং জন্ম ও মৃত্যু উভয়ই একজনের পূর্ব ও বর্তমান জীবনের সাথে অপরিহার্যভাবে জড়িত। মানুষের জন্ম এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি উভয়ই স্রষ্টার দ্বারা পূর্বনির্ধারিত; এটি সেই ব্যক্তির অদৃষ্ট, তার ভাগ্য। কোনো ব্যক্তির জন্মের যেহেতু অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে, তাই এটিও সত্য যে তার মৃত্যুও স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে তার নিজস্ব, বিশেষ কিছু পরিস্থিতির সমাহারে। এই কারণেই মানুষের জীবনকাল বিভিন্ন এবং তাদের মৃত্যুর পদ্ধতি ও সময় ভিন্ন ভিন্ন। কিছু মানুষ শক্তিশালী এবং সুস্থ, তবুও মারা যায় অল্প বয়সে; আবার অনেকে দুর্বল এবং অসুস্থ থাকলেও বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে, এবং মারা যায় শান্তিতে। অপ্রাকৃতিক কারণে মারা যায় কিছু মানুষ, অন্যদের মৃত্যু হয় স্বাভাবিকভাবে। কেউ কেউ জীবন শেষ করে বাড়ি থেকে বহু দূরে, কেউ কেউ তাদের প্রিয়জনদের পাশে শেষবারের জন্য চোখ বন্ধ করে। মাঝ আকাশে মারা যায় কিছু মানুষ, অন্যরা মাটির নিচে। কেউ মারা যায় জলে ডুবে, কেউ আবার হারিয়ে যায় দুর্যোগে। কেউ সকালে মারা যায়, কেউ বা রাতে। … প্রত্যেকেই একটি বর্ণাঢ্য জন্ম, একটি উজ্জ্বল জীবন এবং একটি গৌরবময় মৃত্যু চায়, কিন্তু কেউ তার নিজের ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারে না, সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব থেকে কেউই নিস্তার পায় না। এটাই মানুষের অদৃষ্ট। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষ অনেক আগাম পরিকল্পনা করতে পারে, কিন্তু তাদের জন্ম ও পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পদ্ধতি ও সময় কেউ পরিকল্পনা করতে পারে না। মৃত্যুর আগমন এড়াতে এবং প্রতিরোধে যদিও মানুষ যথাসাধ্য চেষ্টা করে, তবুও, তাদের অজ্ঞাতে, নীরবে নিকটবর্তী হয় মৃত্যু। কেউ জানে না তার কখন মৃত্যু হবে বা কীভাবে, কোথায় হবে সে তো অনেক দূরের কথা। স্পষ্টতই, জীবন ও মৃত্যুর ক্ষমতা মানুষ ধারণ করে না, প্রাকৃতিক জগতের কোনো সত্তাও নয়, বরং সৃষ্টিকর্তা-যাঁর কর্তৃত্ব অনন্য, তিনি সে ক্ষমতা ধারণ করেন। মানবজাতির জীবন ও মৃত্যু প্রাকৃতিক জগতের কোনো নিয়মের ফসল নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার কর্তৃত্বের সার্বভৌমত্বের ফল।

২. সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বের জ্ঞান যার নেই, মৃত্যুভয় তাকে তাড়া করবে

যখন কেউ বার্ধক্যে প্রবেশ করে, তখন যে প্রশ্নের মুখোমুখি হয় তা নিজের পরিবারের প্রতিপালন বা তার জীবনে উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাফল্য প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সেগুলো হচ্ছে, কীভাবে জীবনকে বিদায় জানাতে হবে, কীভাবে জীবনের অন্তিম ক্ষণের সাথে তার দেখা হবে, জীবন-বাক্যে পূর্ণচ্ছেদ কীভাবে টানতে হবে। যদিও আপাতভাবে মনে হয়, যে মৃত্যুর বিষয়ে মানুষ খুব কমই মনযোগ দেয়, কিন্তু এই বিষয়টির অনুসন্ধান কেউই এড়াতে পারে না, কারণ কেউই জানে না যে মৃত্যুর অপর প্রান্তে অন্য এক ভুবন আছে কি না, যে ভুবন মানুষের উপলব্ধি বা বোধের অগম্য, এ বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এ কারণেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে মানুষ ভীত হয়, যথোচিতভাবে মৃত্যুর সামনাসামনি হতে তারা ভয় পায়; সর্বতোভাবে পরিহার করতে চায় বিষয়টি। এবং তাই এই অজ্ঞানতা প্রতিটি ব্যক্তিকে মৃত্যুভয়ে পূর্ণ করে, এবং জীবনের এই অনিবার্য সত্যে রহস্যের আবরণ যোগ করে, অবিরাম ছায়া ফেলে প্রতিটি ব্যক্তির হৃদয়ে।

যখন কেউ অনুভব করে যে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, যখন কেউ উপলন্ধি করে যে মৃত্যু আসন্ন, তখন সে এক অস্পষ্ট ভয় অনুভব করে, এক অবর্ণনীয় ভয়। মৃত্যুভয়ে মানুষ নিঃসঙ্গ এবং আরও অসহায় বোধ করে এবং সেই মুহূর্তে, সে নিজেকে প্রশ্ন করে: মানুষ কোথা থেকে এসেছে? কোথায় চলেছে মানুষ? মানুষ কি এভাবেই মারা যায়, জীবন তাকে অতিক্রম করে চলে যাবে তারই পাশ দিয়ে? এটাই কি সেই সময়কাল যা মানুষের জীবনের সমাপ্তি চিহ্নিত করে? শেষ পর্যন্ত জীবনের অর্থ কী? সর্বোপরি, জীবনের মূল্যই বা কী? তা কি শুধুই খ্যাতি এবং সৌভাগ্য? না কি নেহাতই পরিবার প্রতিপালন? … এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলি নিয়ে কেউ চিন্তা করুক বা না করুক, মৃত্যুকে মানুষ যত গভীরভাবেই ভয় পাক, প্রত্যেক ব্যক্তির হৃদয়ের গভীরে সবসময়েই থাকে রহস্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা, জীবন সম্পর্কে বোধগম্যতার অনুপলব্ধি এবং তার সাথে মিশ্রিত থাকে জীবন সম্পর্কে আবেগ, অথবা পৃথিবী ছেড়ে যেতে তার অনীহা। সম্ভবত কেউই স্পষ্টভাবে বলতে পারে না যে মানুষ কীসের ভয়ে ভীত, কী খুঁজছে মানুষ, কী ব্যাপারে সে আবেগপ্রবণ এবং কী ছেড়ে যেতে সে অনিচ্ছুক …

মৃত্যুকে ভয় পায় বলেই মানুষের দুশ্চিন্তা অনেক; মৃত্যুভয়ের কারণেই মানুষের কাছে এত কিছু আছে যা সে পরিত্যাগ করতে পারে না। কিছু লোক মৃত্যুকালেও নানা কারণে অস্থির থাকে; তাদের সন্তান, প্রিয়জন, তাদের সম্পদ সম্পর্কে চিন্তা করে, যেন উদ্বিগ্ন হলেই মৃত্যু যে কষ্ট এবং ভয় নিয়ে আসে তা তারা মুছে ফেলতে পারবে, যেন জীবিতদের সাথে এক ধরণের ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখলেই মৃত্যুর সঙ্গী হয়ে আসা অসহায়ত্ব এবং একাকীত্ব থেকে তারা বাঁচতে পারবে। মানুষের হৃদয়ের গভীরে একটি অস্পষ্ট ভয় বিদ্যমান, প্রিয়জনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়, নীল আকাশের দিকে আর কখনও চোখ না রাখার, আর কখনও পার্থিব জগত দেখতে না পাওয়ার ভয়। এক একাকী আত্মা, প্রিয়জনদের সাহচর্যে অভ্যস্ত, তার আশ্রয় ছেড়ে সম্পূর্ণ একা প্রস্থান করতে অনিচ্ছুক, অজানা এবং অপরিচিত এক জগতের উদ্দেশ্যে।

৩. খ্যাতি এবং সৌভাগ্যের সন্ধানে ব্যয় করা জীবন মৃত্যুর মুখে হতভম্ব হয়ে পড়ে

স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব এবং পূর্বনির্ধারণের ফলে, একাকী এক আত্মা পরিচয়হীন অবস্থা থেকে খুঁজে পায় পিতামাতা এবং একটি পরিবার, সুযোগ পায় মানবজাতির সদস্য হওয়ার, সুবিধা পায় মানব জীবন অনুভবের, এবং বিশ্বকে দেখার। এই আত্মা সুযোগ লাভ করে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব অনুভবের, তাঁর সৃষ্টির চমৎকারিত্ব জানার, এবং অধিকন্তু, স্রষ্টার কর্তৃত্বে অবগত এবং অধীন হওয়ার। তবুও বেশিরভাগ মানুষ এই বিরল এবং ক্ষণস্থায়ী সুযোগটি সত্যই গ্রহণ করে না। ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মানুষ সারাজীবনের শক্তি নিঃশেষ করে, ব্যস্ত থাকে সমস্ত সময়, নিজের পরিবার প্রতিপালনের চেষ্টা চেলায় এবং সম্পদ ও মর্যাদার অন্বষণে ঘুরপাক খায়। মানুষের যেগুলিকে মূল্য দেয় তা হল পরিবার, অর্থ ও খ্যাতি এবং তারা এগুলিকেই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হিসাবে দেখে। সব মানুষই তাদের ভাগ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, কিন্তু তারা হৃদয়ের অন্তরালে এমন বিষয়গুলি ঠেলে দেয় যেগুলি পরীক্ষা করা এবং বোঝা সবচেয়ে প্রয়োজনীয়: মানুষ কেন বেঁচে আছে, তার কীভাবে জীবনযাপন করা উচিত, জীবনের মূল্য ও অর্থ কী। তারা তাদের সমগ্র জীবন অতিবাহিত করে, তা যতই দীর্ঘস্থায়ী হোক, কেবল খ্যাতি ও ভাগ্যের সন্ধানে ছুটে, যতক্ষণ না তাদের যৌবন অপসৃয়মান হয়, এবং তারা ধূসর ও বলিরেখা-সম্পন্ন হয়। তারা এইভাবে বেঁচে থাকে যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারে যে, খ্যাতি এবং সৌভাগ্য বার্ধক্যের দিকে তাদের এগিয়ে চলাকে রোধ করতে পারে না, অর্থ হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না, জন্ম, বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং মৃত্যুর নিয়ম থেকে কেউ রেহাই পায় না, ভাগ্য তার জন্য যা সঞ্চয় করে রেখেছে, তা কেউই এড়াতে পারে না। শুধুমাত্র যখন তারা জীবনের চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয় তখনই তারা প্রকৃতপক্ষে উপলব্ধি করে যে কেউ যদি বিশাল সম্পদ এবং বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়, এমনকি যদি কেউ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এবং উচ্চ পদের অধিকারী হয়, তবুও মৃত্যু থেকে সে বাঁচতে পারে না এবং তাকে অবশ্যই তাদের প্রকৃত অবস্থানে ফিরে যেতে হবে: নাম-গোত্রহীন একাকী এক আত্মা। যখন মানুষের পিতা-মাতা জীবিত থাকে, তখন তারা বিশ্বাস করে যে তাদের পিতা-মাতাই সবকিছু; যখন মানুষের কাছে সম্পত্তি থাকে, তখন তারা মনে করে যে অর্থই একজনের প্রধান ভিত্তি, এটিই তার জীবনযাপনের উপায়; যখন মানুষের মর্যাদা থাকে, তখন তারা এটিকে এত নিবিড়ভাবে অবলম্বন করে যে তার জন্য তাদের জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নেয়। একমাত্র যখন এই পৃথিবী ছেড়ে মানুষকে চলে যেতে হয় তখনই তারা বুঝতে পারে যে তারা যেগুলির পিছনে তাদের জীবন কাটিয়েছে তা জীবনের আকাশে ক্ষণস্থায়ী মেঘ ছাড়া আর কিছুই নয়, এগুলির কোনটিকেই তারা ধরে রাখতে পারবে না, সাথে নিয়ে যেতে পারবে না কোনোটিকেই, এগুলির কোনটিই মৃত্যু থেকে তাদের রেহাই দিতে পারে না, একাকী আত্মাকে তার ফেরার যাত্রায় সঙ্গ বা সান্ত্বনা দিতে পারে না; অন্ততপক্ষে, এইগুলির কোনটিই তাকে বাঁচাতে পারে না এবং মৃত্যুকে অতিক্রম করার ক্ষমতা প্রদান করে না। পার্থিব জগতের খ্যাতি এবং সৌভাগ্য মানুষকে সাময়িক তৃপ্তি দেয়, আনন্দ দেয়, আরামের মিথ্যা অনুভূতি দেয়; কিন্তু এই প্রক্রিয়ায়, তারা মানুষকে পথভ্রান্ত করে। আর তাই মানুষ যখন মানবতার বিশাল সমুদ্রে অস্থিরভাবে ছুটে বেড়ায়, শান্তি, স্বস্তি এবং হৃদয়ের প্রশান্তি কামনা করে, তখন তারা ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে আচ্ছন্ন হয়। যখন মানুষ সন্ধান পায় না সেই সব প্রশ্নের যেগুলি বোঝা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তারা কোথা থেকে এসেছে, কেন তারা বেঁচে আছে, তারা কোথায় যাচ্ছে এবং আরও অনেক কিছু—তারা খ্যাতি এবং ভাগ্য দ্বারা প্রলুব্ধ হয়, তাদের দ্বারা পথভ্রষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত হয় এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে দিকভ্রান্ত হয়। সময় চলে যায়; চোখের পলকে পেরোয় বছর, এবং এটি উপলব্ধির আগেই, মানুষ তার জীবনের সেরা বছরগুলিকে বিদায় জানায়। যখন কোনো মানুষ শীঘ্রই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চলেছে, তখন সে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে যে জগতের সব কিছুই দূরে সরে যাচ্ছে, একদা অর্জিত অধিকার সে আর ধরে রাখতে পারবে না; কোনো মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে অনুভব করে যে সে এক ক্রন্দনরত শিশুর মতো যে পৃথিবীতে এইমাত্র আবির্ভূত হয়েছে, এবং তার নিজের বলে এখনও কিছুই নেই। এই সময়ে, মানুষ ভাবতে বাধ্য হয় জীবনে সে কী করেছে, জীবিত থাকার মূল্য কী, তার তাৎপর্য কী, কেনই বা সে পৃথিবীতে এসেছে। এবং এই মুহুর্তে মানুষ ক্রমাগতই অনুসন্ধিৎসু হয়ে ওঠে যে সত্যই পরবর্তী জীবন আছে কিনা, স্বর্গের অস্তিত্ব সত্যই আছে কিনা, কর্মের প্রতিফল সত্যই আছে কিনা…। মৃত্যু যত নিকটবর্তী হয়, মানুষ ততই বুঝতে চায় জীবন আসলে কী; মৃত্যু যত কাছে আসে, তার হৃদয় ততই শূন্য মনে হয়; মৃত্যু যত সন্নিকটে আসে, তত বেশি সে অসহায় বোধ করে; আর তাই তার মৃত্যুভয় প্রতিদিন বাড়ে। মৃত্যুর নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে এই ধরনের অনুভূতির উদ্ভাসের দুটি কারণ রয়েছে: প্রথমত, তারা সেই খ্যাতি এবং সম্পদ হারাতে চলেছে যার উপর তাদের জীবন নির্ভরশীল ছিল, তারা দৃশ্যমান বিশ্বের সব কিছু ছেড়ে যেতে চলেছে; এবং দ্বিতীয়ত, তারা মুখোমুখি হতে চলেছে, একেবারে একা, একটি অপরিচিত ভুবনের, একটি রহস্যময়, অজানা রাজ্যের, যেখানে তারা পা রাখতে ভয় পায়, যেখানে তাদের কোন প্রিয়জন নেই এবং সাহায্য পাওয়ারও কোন উপায় নেই। এই দুটি কারণে, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে মানুষ অস্বস্তি বোধ করে, আতঙ্কিত হয় এবং অসহায়তা বোধ করে যা তারা আগে কখনও অনুভব করে নি। কেবলমাত্র মানুষ যখন এই অবস্থায় আসে তখনই সে বুঝতে পারে যে এই পৃথিবীতে পা রাখার সময় তাদের প্রথমেই বুঝতে হবে যে মানুষ কোথা থেকে আসে, কেন মানুষ বেঁচে আছে, কে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে ও তাকে পালন করে, এবং মানুষের অস্তিত্বের উপর সার্বভৌমত্ব আসলে কার। এই জ্ঞানই মানুষের বেঁচে থাকার প্রকৃত সাধন, তার বেঁচে থাকার অপরিহার্য ভিত্তি—কীভাবে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ করতে হয় বা কীভাবে খ্যাতি এবং সম্পদ অর্জন করতে হয় তা শেখা নয়, জনতার মধ্যে বিশিষ্ট হওয়া বা আরও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের পন্থা শেখা নয়, জীবনে, উন্নতি করা বা অন্যদের বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তো নয়ই। বেঁচে থাকার যে সব বিভিন্ন দক্ষতা আয়ত্ত করতে মানুষ তাদের জীবন ব্যয় করে, তা তাকে প্রচুর পরিমাণে পার্থিব স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে, কিন্তু সেগুলি কখনই হৃদয়ে প্রকৃত শান্তি এবং সান্ত্বনা আনে না, বরং এর পরিবর্তে তা মানুষকে ক্রমাগত দিকভ্রান্ত করে, সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে অসুবিধায় পড়ে এবং জীবনের অর্থ বোঝার প্রতিটি সুযোগ হাতছাড়া করে। কীকরে সঠিকভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়া যায় সে বিষয়ে উদ্বেগের চোরাস্রোত তৈরী করে জীবনধারণের এই দক্ষতাগুলি। মানুষের জীবন এইভাবেই ধ্বংস হয়। সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেকের সাথেই ন্যায্য আচরণ করেন, তাঁর সার্বভৌমত্ব উপলব্ধি করতে ও জানতে তিনি প্রত্যেককেই তার জীবনকালে মূল্যবান সুযোগ দেন, তবু যখন মৃত্যু ঘনিয়ে আসে, যখন দেখা যায় মৃত্যুর অপচ্ছায়া, একমাত্র তখনই মানুষ আলো্র সন্ধান পায়—এবং তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে!

অর্থ ও খ্যাতির পিছনে ধাওয়া করে মানুষ জীবন কাটায়; এই খড়কুটোগুলিকে আঁকড়ে ধরে, মনে করে তাদের সহায়তার একমাত্র মাধ্যম এইগুলিই, যেন এইগুলি পেলেই তারা বেঁচে থাকতে সক্ষম হবে, রেহাই পাবে মৃত্যু থেকে। কিন্তু যখন তারা মৃত্যুমুখে একমাত্র তখনই তারা বুঝতে পারে যে তাদের থেকে এই জিনিসগুলি কতটা দূরে, মৃত্যুর মুখে তারা কতটা দুর্বল, কত সহজে ভেঙ্গে পড়ে, তারা কত একাকী এবং অসহায়, কোথাও যাওয়ার ঠাঁই নেই। তারা উপলব্ধি করে যে অর্থ বা খ্যাতি দিয়ে জীবন কেনা যায় না, কোনো ব্যক্তি যতই ধনী বা তার অবস্থান যতই উচ্চ হোক না কেন, মৃত্যুর মুখে সবাই সমান দরিদ্র ও নগণ্য। তারা বুঝতে পারে যে অর্থ জীবন কিনতে পারে না, মৃত্যুকে মুছে ফেলতে পারে না খ্যাতি, অর্থ বা খ্যাতি কোনও ব্যক্তির জীবন এক মিনিট, এক সেকেন্ডও দীর্ঘায়িত করতে পারে না। মানুষ যত বেশি এইভাবে অনুভব করে, ততই তারা বেঁচে থাকতে চায়; মানুষ যত বেশি এইভাবে অনুভব করে, ততই তারা মৃত্যুর সম্মুখীন হতে ভয় পায়। শুধুমাত্র সেই মুহূর্তে তারা সত্যই উপলব্ধি করে যে তাদের জীবন তাদের নয়, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতেও তারা অপারগ, জীবন ও মৃত্যু নিয়ে কারোরই কিছু বলবার নেই—এই সব কিছুই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

৪. সৃষ্টিকর্তার রাজত্বের অধীনে এসো এবং শান্তভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হও

কোনো ব্যক্তির জন্ম-মুহূর্তে, একাকী এক আত্মা পৃথিবীতে শুরু করে তার জীবনের অভিজ্ঞতা, তার স্রষ্টার কর্তৃত্বের অভিজ্ঞতা, যেটি সৃষ্টিকর্তা তার জন্য ব্যবস্থা করেছেন। বলা বাহুল্য, ব্যক্তির—অর্থাৎ আত্মার—জন্য এটি সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার, তাঁর কর্তৃত্বকে জানার এবং ব্যক্তিগতভাবে তা অনুভব করার এক অপূর্ব সুযোগ। মানুষ তার জীবনযাপন করে স্রষ্টা-নির্ধারিত ভাগ্যের নিয়মের মধ্যে, এবং বিবেকসম্পন্ন যে কোনো যুক্তিবাদী ব্যক্তির পক্ষে, তাদের জীবনের কয়েক দশক ধরে, সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বের সাথে মিলিত হওয়া এবং তাঁর কর্তৃত্বকে জানা কঠিন নয়। সুতরাং, কয়েক দশক ধরে প্রতিটি ব্যক্তির পক্ষে তাদের নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে খুব সহজেই উপলব্ধি করা উচিত যে মানুষের ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত, এবং অতি সহজেই বোঝা উচিত বা সারমর্ম গ্রহণ করা উচিত যে জীবিত থাকার অর্থ কী। জীবনের এই শিক্ষাগুলি যখন কেউ গ্রহণ করে, তখন ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে জীবন কোথা থেকে এসেছে, উপলব্ধি করে হৃদয়ের প্রকৃত চাহিদা কী, জীবনের প্রকৃত পথে মানুষকে কী পরিচালিত করে এবং মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত। মানুষ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে যে কেউ যদি স্রষ্টার উপাসনা না করে, যদি কেউ তাঁর রাজত্বের অধীনে না আসে, তবে যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সময় আসে—যখন তার আত্মা আরও একবার স্রষ্টার মুখোমুখি হতে চলেছে—তখন তার হৃদয় অসীম ভয় ও অস্থিরতায় পূর্ণ হবে। যদি কোনো ব্যক্তি কয়েক দশক ধরে পৃথিবীতে থেকেও বুঝতে না পারে যে মানবজীবন কোথা থেকে এসেছে এবং জানতে না পারে কার হাতে মানুষের ভাগ্য রয়েছে, তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে তারা শান্তভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারবে না। জীবনের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় যে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছে, সে-ই হল জীবনের অর্থ এবং মূল্য সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি সহ এক ব্যক্তি। এই ধরনের ব্যক্তি জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, যার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং স্রষ্টার সার্বভৌমত্বের উপলব্ধি রয়েছে এবং এসবের ঊর্ধে, যে স্রষ্টার কর্তৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করতে সক্ষম। এই ধরনের ব্যক্তি উপলব্ধি করেন ঈশ্বরের মানবজাতিকে সৃষ্টি করার অর্থ, বোঝেন যে মানুষের উচিত স্রষ্টার উপাসনা করা, মানুষের যা কিছু আছে সবই স্রষ্টার কাছ থেকে আসে এবং অদূর ভবিষ্যতে কোনোদিন তাঁর কাছে ফিরে যাবে। এই ধরনের ব্যক্তি বোঝেন যে মানুষের জন্মের ব্যবস্থা স্রষ্টাই করেন এবং মানুষের মৃত্যুর উপর তাঁর সার্বভৌম অধিকার, এবং জীবন ও মৃত্যু উভয়ই স্রষ্টার কর্তৃত্বের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত। সুতরাং, যখন কেউ সদর্থে এই বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে পারে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে শান্তভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে সক্ষম হবে, নিজের সমস্ত পার্থিব সম্পদকে শান্তভাবে পরিহার করে, পরবর্তী সমস্ত কিছুকে সানন্দে গ্রহণ ও সমর্পণ করে, এবং জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণে অন্ধভাবে ভীত হয়ে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার পরিবর্তে ঈশ্বর যে ভাবে সেই সন্ধিক্ষণ আয়োজন করেছেন, তাকে ঠিক সেইভাবেই স্বাগত জানাতে সক্ষম হবে। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব উপলব্ধির এবং তাঁর কর্তৃত্বকে জানার সুযোগ হিসাবে যদি কেউ জীবনকে দেখে, যদি কেউ নিজের জীবনকে একজন সৃষ্ট মানুষ হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালন করার এবং নিজের উদ্দেশ্য পুরণ করার একটি বিরল সুযোগ হিসাবে দেখে, তবে জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী অবশ্যই সঠিক হবে, সে অবশ্যই স্রষ্টার আশীর্বাদপূর্ণ এবং স্রষ্টার দ্বারা পরিচালিত জীবনযাপন করবে, অবশ্যই স্রষ্টার আলোয় চলবে, অবশ্যই স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব জানবে, অবশ্যই তাঁর রাজত্বের অধীনে আসবে এবং অবশ্যই তাঁর অলৌকিক কাজের সাক্ষী হবে, সাক্ষ্য দেবে তাঁর কর্তৃত্বের। বলা বাহুল্য, এমন ব্যক্তিকে অবশ্যই স্রষ্টা ভালবাসবেন ও গ্রহণ করবেন, এবং শুধুমাত্র এই ধরনের ব্যক্তিই মৃত্যুর প্রতি শান্ত মনোভাব রাখতে পারে এবং জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণকে সানন্দে স্বাগত জানাতে পারে। এমন এক ব্যক্তি যে নির্দ্বিধায় মৃত্যুর প্রতি এই ধরনের মনোভাব পোষণ করেছিলো সে হল ইয়োব। ইয়োব তার জীবনের চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণকে সুখের সাথে গ্রহণ করার অবস্থানে ছিল এবং সে তার জীবনের যাত্রাকে একটি মসৃণ উপসংহারে নিয়ে এসে জীবনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ করে, সৃষ্টিকর্তার পাশে ফিরে যায়।

৫. ইয়োবের জীবনের সাধনা এবং প্রাপ্তি তাকে শান্তভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হতে দেয়

ইয়োব সম্পর্কে লেখা হয়েছে: “অবশেষে ইয়োব পূর্ণপরিণত বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন” (ইয়োব ৪২:১৭)। এর অর্থ হল যখন ইয়োবের মৃত্যু হয়, তাঁর কোনো অনুশোচনা ছিল না এবং তাঁকে কোনো যন্ত্রণাও ভোগ করতে হয়নি, বরং স্বাভাবিকভাবে এই পৃথিবী থেকে তিনি প্রস্থান করেন। সকলেই জানে, ইয়োব তাঁর জীবতকালে ঈশ্বরে ভীতি রেখে এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করে চলতেন। তাঁর কীর্তি ঈশ্বরের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে এবং অন্যান্যদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থেকেছে, এবং তাঁর জীবনের সেই মূল্য ও গুরুত্ব আছে বলে মনে করা হয়, যা অন্য সকলের থেকেই অনেক বেশি। ইয়োব ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করেছেন এবং তাঁর দ্বারা এই পৃথিবীতে ধার্মিক হিসাবে অভিহিত হয়েছেন, এবং সেইসঙ্গে ঈশ্বর তাঁকে পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং শয়তানও তাঁকে পরখ করেছে। তিনি ঈশ্বরের হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং স্বীয় যোগ্যতায় ঈশ্বরের দ্বারা ধার্মিক পরিচয়ে অভিহিত হয়েছেন। ঈশ্বর তাঁকে পরীক্ষা করে দেখার পরের দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি যে জীবন যাপন করেন, তা ছিল আগের জীবনের তুলনায় অধিক মূল্যবান, অর্থপূর্ণ, বাস্তবমুখী এবং শান্তিপূর্ণ। তাঁর ধার্মিক কীর্তির জন্য, ঈশ্বর তাঁকে পরীক্ষা করে দেখেন, এবং ধার্মিক কীর্তির জন্যই ঈশ্বর তাঁর কাছে আবির্ভূত হন এবং তাঁর সঙ্গে সরাসরি বার্তালাপ করেন। তাই তাঁকে পরীক্ষা করার পরের বছরগুলিতে ইয়োব আরো সুস্পষ্টভাবে জীবনের মূল্যকে বুঝতে এবং তার মর্ম উপলব্ধি করতে পারেন, সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বকে আরো গভীরভাবে বুঝতে পারেন, এবং সৃষ্টিকর্তা কীভাবে তাঁর আশীর্বাদ দান এবং প্রত্যাহার করেন সেই বিষয়ে আরো সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট জ্ঞান লাভ করেন। ইয়োবের গ্রন্থে নথিভুক্ত আছে যে যিহোবা ঈশ্বর তাঁর উপর আগের থেকেও অধিক আশীর্বাদ বর্ষণ করেন, যার ফলে ইয়োব সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বকে জানা এবং মৃত্যুকে শান্তভাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অধিকতর উন্নত অবস্থায় পৌঁছে যান। তাই যখন ইয়োব বার্ধক্যে পৌঁছন এবং মৃত্যুর সম্মুখীন হন, তখন নিশ্চিতভাবেই সম্পত্তি নিয়ে তাঁর কোনো চিন্তা ছিলো না। তাঁর কোনো উদ্বেগ ছিলো না, অনুশোচনা করার মত কিছু ছিলো না, এবং নিশ্চিতভাবেই তিনি মৃত্যুকে ভয় পাননি, কারণ তিনি সমগ্র জীবন প্রকৃত পথে ঈশ্বরে ভীতি রেখে এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করে চলেছেন। নিজের পরিণাম নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তার কোনো কারণই ছিলো না। ইয়োব মৃত্যুর সময় যেভাবে চলেছিলেন, বর্তমানে কতজন মানুষ মৃত্যর সময় ইয়োবের মতো সেই সব পথে চলতে পারবে? কেন কেউ এমন অনাড়ম্বর বাহ্যিক প্রকৃতি বজায় রাখতে পারে না? তার একটাই কারণঃ ইয়োব তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের প্রতি বিশ্বাস, স্বীকৃতি এবং সমর্পণের বস্তুগত সাধনায়, এবং এই বিশ্বাস, স্বীকৃতি এবং সমর্পণের সাহায্যেই তিনি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করেছেন, জীবনের অন্তিম পর্ব পেরিয়েছেন এবং জীবনের চরম সন্ধিক্ষণকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। ইয়োবের অভিজ্ঞতা নির্বিশেষে তাঁর জীবনের সাধনা ও লক্ষ্য যন্ত্রণাদায়ক ছিলো না, বরং তা ছিলো আনন্দময়। শুধু তাঁর উপর সৃষ্টিকর্তার বর্ষিত আশীর্বাদ অথবা প্রশংসার কারণে তিনি সুখী ছিলেন তা নয়, বরং আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল তাঁর সাধনা এবং জীবনের লক্ষ্য, সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে তাঁর ক্রমবর্ধমান জ্ঞান এবং প্রকৃত বোধ যা তিনি অর্জন করেছিলেন ঈশ্বরে ভীতি রেখে এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগের মাধ্যমে, এবং সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বের একজন প্রজা হিসাবে, ঈশ্বরের বিস্ময়কর কীর্তির সাক্ষী হিসাবে এবং মানুষ ও ঈশ্বরের সহাবস্থান, পরিচিতি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার কোমল অথচ অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতির কারণে। ইয়োব সুখী ছিলেন সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায়কে জানার মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্য এবং আনন্দের কারণে, এবং ঈশ্বর যে মহৎ, বিস্ময়কর, প্রেমময় এবং অনুগত এগুলি প্রত্যক্ষ করার ফলে যে শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়, তার কারণেই। ইয়োব কোনো কষ্ট ছাড়াই মৃত্যুর সম্মুখীন হন, কারণ তিনি জানতেন মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিকর্তার পারশ্বে ফিরে যাবেন। তাঁর জীবনের সাধনা এবং প্রাপ্তি তাঁকে শান্তভাবে মৃত্যুর সম্মুখীণ হতে অনুমোদন দেয়, সৃষ্টিকর্তা তাঁর জীবনীশক্তি ফিরিয়ে নেবেন এই সম্ভাবনাকে শান্তভাবে গ্রহণ করতে অনু্মোদন দেয়, এবং সৃষ্টিকর্তার সম্মুখে বিশুদ্ধ ও মুক্ত চিত্তে দাঁড়াবার শক্তি প্রদান করে। বর্তমান যুগের মানুষেরা কি সেই প্রকারের আনন্দ অর্জন করতে পারবে যা ইয়োবের ছিল? তোমাদের কাছে কি তা করার উপযুক্ত অবস্থা আছে? যেহেতু বর্তমানের মানুষদের কাছে এইসব প্রয়োজনীয় অবস্থা আছে, তাহলে তারা ইয়োবের মতো সুখে দিনযাপন করতে পারে না কেন? কেন তারা মৃত্যুভয়ের পীড়া থেকে মুক্ত হতে পারে না? মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে কেউ অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রস্রাব করে ফেলে, অনেকে কেঁপে ওঠে, অচৈতন্য হয়ে পড়ে, স্বর্গ, মানুষ নির্বিশেষে বাক্যবাণ বর্ষণ করে, এমন কি কেউ কেউ হাহাকার বা ক্রন্দন করে। মৃত্যু নিকটে এলে অকস্মাৎ এই ধরনের প্রতিক্রিয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। মানুষ এইরকম অস্বস্তিকর ব্যবহার করে কারণ হৃদয়ের গভীরে তারা মৃত্যুকে ভয় পায়, কারণ ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান এবং উপলব্ধি নেই, সদর্থে তাঁর কাছে সমর্পণ করারও কোনো ধারণা নেই। মানুষ এইভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কারণ তারা সব কিছু নিজেরাই স্থির ও নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া আর কিছু চায় না। তারা নিজেদের ভাগ্য, জীবন এবং মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাই তারা যে মৃত্যুভয় থেকে কখনোই মুক্তি পায় না, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

৬. একমাত্র সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করলেই মানুষ তাঁর পার্শ্বে ফিরে যেতে পারে

যখন সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মানুষের স্পষ্ট জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা থাকে না, নিয়তি এবং মৃত্যু সম্পর্কে তার জ্ঞান অবশ্যই অসংলগ্ন হবে। মানুষ স্পষ্টভাবে দেখতে পায় না যে সবকিছুই রয়েছে ঈশ্বরের করতলে, তারা বুঝতে পারে না যে সবকিছুই ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বভৌমত্বের অধীনে, তারা বুঝতে পারে না যে মানুষ এই সার্বভৌমত্বকে পরিত্যাগ করতে অথবা তার থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। সেই কারণেই, যখন মৃত্যুর সম্মুখীন হবার সময় আসে, তখন তাদের শেষ কথা, দুশ্চিন্তা এবং অনুশোচনার কোনো অন্ত থাকে না। তারা কত বোঝা, কত অনিচ্ছা এবং কত বিভ্রান্তির ভারে নত হয়ে যায়। এর ফলেই তারা মৃত্যুকে ভয় পায়। এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া যে কোনো মানুষের জন্যই জন্ম হল প্রয়োজনীয় এবং মৃত্যু অনিবার্য; কেউই এই ঘটনাচক্রের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না। কেউ যদি যন্ত্রণাহীনভাবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চায়, কেউ যদি কোনো অনিচ্ছা এবং দুশ্চিন্তা ছাড়া জীবনের অন্তিম সন্ধিক্ষণের সম্মুখীন হতে চায়, তাহলে তার একমাত্র উপায় হল কোনো অনুতাপ না রাখা। আর অনুতাপ ছাড়া বিদায় নেবার একমাত্র উপায় হল, সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বকে জানা, তাঁর কর্তৃত্বকে জানা, এবং তাদের কাছে সমর্পণ করা। একমাত্র এইভাবেই একজন মনুষ্যজনোচিত কলহ, মন্দতা, শয়তানের দাসত্ব থেকে দূরে থাকতে পারবে এবং এইভাবেই সে ইয়োবের মত জীবন যাপন করতে পারবে, এমন জীবন যা সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ এবং আশীর্বাদপ্রাপ্ত, এমন জীবন যা স্বাধীন ও মুক্ত, এমন জীবন যা মূল্যবান এবং অর্থপূর্ণ, এমন জীবন যা সৎ এবং মুক্তহৃদয়ের। একমাত্র এইভাবেই কেউ ইয়োবের মত সৃষ্টিকর্তার বিচার এবং বঞ্চনার কাছে, তাঁর সুসমন্বয়সাধন এবং ব্যবস্থাপনার কাছে সমর্পণ করতে পারবে। একমাত্র এইভাবেই কেউ সারা জীবন ধরে সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করতে পারবে এবং তাঁর প্রশংসা লাভ করতে পারবে, ঠিক যেমন ইয়োব করেছিলেন, এবং তাঁর কন্ঠস্বর শুনতে পাবে এবং তাঁর আবির্ভাবকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে। একমাত্র এইভাবেই একজন ইয়োবের মত আনন্দের সঙ্গে বাঁচতে এবং মৃত্যুবরণ করতে পারবে, কোনো যন্ত্রণা, দুশ্চিন্তা, অনুশোচনা ছাড়া। একমাত্র এইভাবেই একজন মানুষ ইয়োবের মত আলোকময় জীবন যাপন করতে পারবে, জীবনের প্রতিটি সন্ধিক্ষণ আলোকিতভাবে অতিক্রম করতে পারবে, বিনা বাধায় নিজের যাত্রাপথ আলোর মধ্যে সম্পূর্ণ করতে পারবে, সৃষ্ট জীব হিসাবে সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বকে জানা, চেনা এবং তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করার উদ্দেশ্য সফলভাবে সাধন করতে পারবে এবং আলোর মধ্যেই চিরবিদায় নিয়ে সৃষ্ট জীব হিসাবে চিরকালের জন্য সৃষ্টিকর্তার পার্শ্বে দাঁড়াবার এবং তাঁর প্রশংসা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

—বাক্য, খণ্ড ২, ঈশ্বরকে জানার প্রসঙ্গে, স্বয়ং অনন্য ঈশ্বর ৩

পূর্ববর্তী: পঞ্চম সন্ধিক্ষণ: পরবর্তী প্রজন্ম

পরবর্তী: সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব জানার সুযোগ হারাবেন না

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।

সম্পর্কিত তথ্য

ষষ্ঠ দিবসে, সৃষ্টিকর্তা কথা বলেন, এবং তাঁর মনের মধ্যে থাকা প্রতিটি জীব একাদিক্রমে আবির্ভূত হয়

ইন্দ্রিয়াতীতভাবে, সৃষ্টিকর্তার সমস্ত সৃষ্টিকার্য পাঁচ দিন ধরে অব্যাহত ছিল, ঠিক তার পরপরই সৃষ্টিকর্তা তাঁর সকল বস্তু সৃষ্টির ষষ্ঠ দিবসকে...

পঞ্চম দিবসে, বিবিধ এবং বৈচিত্র্যময় গঠনের জীবন বিভিন্ন উপায়ে সৃষ্টিকর্তার কর্তৃত্ব প্রদর্শন করে

শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “ঈশ্বর বললেন, জলরাশি পূর্ণ হোক নানা জাতির জলচর প্রাণীতে এবং পৃথিবীর উপরে আকাশে উড়ে বেড়াক পক্ষীকুল। ঈশ্বর সৃষ্টি করলেন...

তৃতীয় দিবসে, ঈশ্বরের বাক্যসমূহ জন্ম দেয় পৃথিবী এবং সমুদ্রের এবং ঈশ্বরের কর্তৃত্ব বিশ্বে প্রাণসঞ্চার করে

এরপর, পাঠ করা যাক আদিপুস্তক ১:৯-১১-এর প্রথম বাক্যটি: “ঈশ্বর বললেন, আকাশের নীচে সমস্ত জলরাশি এক স্থানে সংহত হোক, প্রকাশিত হোক শুষ্ক ভূমি!”...

ঈশ্বর হবাকে সৃষ্টি করলেন

আদিপুস্তক ২:১৮-২০ তারপর প্রভু পরমেশ্বর বললেন, মানুষের একা থাকা ভাল নয়, আমি তাকে তার যোগ্য এক সঙ্গিনী দেব। প্রভু পরমেশ্বর মৃত্তিকা থেকে...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন