ফরিশীদের যীশুর বিষয়ে বিচার এবং ফরিশীদের প্রতি যীশুর ভর্ৎসনা

ফরিশীদের যীশুর বিষয়ে বিচার

মার্ক ৩:২১-২২ যীশুর আত্মীয়েরা একথা শুনে তাঁকে ধরে আনতে গেল সেখানে। তারা বলল, যীশু পাগল হয়ে গেছেন। জেরুশালেম থেকে এসেছিলেন কয়েকজন শাস্ত্রী, তাঁরা বললেন, যীশুর ওপর বেলসবুল ভর করেছে, ভূতের রাজার সাহায্যেই ও ভূত তাড়ায়।

ফরিশীদের প্রতি যীশুর ভর্ৎসনা

মথি ১২:৩১-৩২ আর এজন্যই আমি তোমাদের বলছি, মানুষের সমস্ত পাপ ও ঈশ্বর নিন্দা ক্ষমা করা হবে, কিন্তু পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে নিন্দার ক্ষমা নেই। মানবপুত্রের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বললে সে ক্ষমা লাভ করবে, কিন্তু পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে যদি কেউ কোনো কথা বলে তার ক্ষমা সে কিছুতেই পাবে না—ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়।

মথি ২৩:১৩-১৫ ভণ্ড শাস্ত্রী ও ফরিশীর দল, ধিক তোমাদের। তোমরা লোকের সামনে স্বর্গরাজ্যের দরজা বন্ধ করে দাও। নিজেরা তো প্রবেশ করই না, যারা চায় তাদেরও ঢুকতে দাও না। ভণ্ড শাস্ত্রী ও ফরিশীর দল, ধিক তোমাদের। তোমরা বিধবাদের বিষয়-সম্পত্তি গ্রাস কর, অথচ ধর্মের ভাণ করে লম্বাচওড়া প্রার্থনা আওড়াও, এজন্য বিচারে তোমাদের আরও গুরুতর শাস্তি হবে। ভণ্ড শাস্ত্রবিদ ও ফরিশীর দল। ধিক তোমাদের! একটি লোককে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টায় তোমরা জলে স্থলে ঘুরে বেড়াও, আর কাউকে যদি তা করতে পার তাহলে তোমরা তাকে নিজেদের চেয়েও বড় পাষণ্ড করে তোল।

উপরের অনুচ্ছেদদুটির বিষয়বস্তু পৃথক। আগে প্রথম অনুচ্ছেদটির দিকে এক ঝলক নজর দেওয়া যাক: ফরিশীদের যীশুর বিষয়ে বিচার।

বাইবেলে, স্বয়ং যীশু ও তাঁর কার্যকলাপের বিষয়ে ফরিশীদের মূল্যায়ন হল: “… তারা বলল, যীশু পাগল হয়ে গেছেন। … যীশুর ওপর বেলসবুল ভর করেছে, ভূতের রাজার সাহায্যেই ও ভূত তাড়ায়” (মার্ক ৩:২১-২২)। প্রভু যীশুর সম্পর্কে শাস্ত্রবিদ ও ফরিশীদের এই রায়ে তারা যে নিছক অপরাপর মানুষের কথার অনুকরণ করছিল তা নয়, এমনও নয় যে তা ছিল কোনো ভিত্তিহীন অনুমান—প্রভু যীশুকে তারা যেমন দেখেছিল ও তাঁর কার্যাবলীর বিষয়ে যা শুনেছিল, তা থেকেই তাঁর সম্বন্ধে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে তাদের এই সিদ্ধান্ত যদিও বিচারের নামেই গৃহিত হয়েছিল, এবং মানুষের নজরে তা সুপ্রতিষ্ঠিত বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু যে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে তারা প্রভু যীশুর বিচার করেছিল, তা সংযত রাখা এমনকি তাদের পক্ষেও কঠিন ছিল। প্রভু যীশুর প্রতি তাদের ঘৃণাসঞ্জাত প্রমত্ত কর্মোদ্যম অনাবৃত করেছিল তাদের নিজস্ব উদ্দাম উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে, তাদের দুষ্ট শয়তানোচিত মুখাবয়বকে, এবং সেইসাথে, তাদের যে পরশ্রীকাতর প্রকৃতির কারণে তারা ঈশ্বরের প্রতিরোধ করেছিল, তা। প্রভু যীশুর সম্পর্কে তাদের ফয়সালায় তাদের এই উক্তিগুলি তাদের উন্মত্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা, এবং ঈশ্বর ও সত্যের প্রতি তাদের বৈরিতার কুৎসিত ও পরশ্রীকাতর প্রকৃতির দ্বারা চালিত হয়েছিল। প্রভু যীশুর কার্যকলাপগুলির উৎসের বিষয়ে তারা খোঁজখবর নেয় নি, এবং তাঁর বাক্যনিচয় ও কার্যাবলীর সারসত্যের বিষয়েও তারা অনুসন্ধান করেনি। বরং, অন্ধের মতো, প্রমত্ত উত্তেজনার বশে, এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষ নিয়ে, তারা তাঁর কীর্তিগুলিকে আক্রমণ ও অমর্যাদা করেছিল। এমনকি তারা জেনেশুনে তাঁর আত্মার, অর্থাৎ পবিত্র আত্মার, যিনি হলেন ঈশ্বরের আত্মা, তাঁর মর্যাদাহানি ঘটিয়েছিল। তাদের “যীশু পাগল হয়ে গেছেন”, “বেলসবুল”, এবং “ভূতের রাজা” কথাগুলির মাধ্যমে তারা এই অর্থই নির্দেশ করেছিল। অর্থাৎ, ঈশ্বরের আত্মাকে তারা বেলসবুল ও শয়তানদের রাজপুত্র বলে অভিহিত করেছিল। দেহের আচ্ছাদনে ভূষিত ঈশ্বরের আত্মার অবতাররূপের কার্যকে তারা পাগলামি বলে চিহ্নিত করেছিল। তারা শুধু যে ঈশ্বরের আত্মাকে বেলসবুল ও শয়তানদের রাজপুত্র বলে অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিল তা-ই নয়, উপরন্তু ঈশ্বরের কার্যের নিন্দা করেছিল এবং প্রভু যীশু খ্রীষ্টেরও নিন্দা ও অবমাননা করেছিল। তাদের প্রতিরোধ ও ঈশ্বর-নিন্দার সারসত্য শয়তান ও দানবদের প্রদত্ত প্রতিরোধ ও ঈশ্বর-নিন্দার হুবহু অনুরূপ ছিল। তারা শুধু যে ভ্রষ্ট মানবদের প্রতিনিধিত্ব করেছিল তা-ই নয়, বরং, আরো বেশি করে, তারা ছিল শয়তানের মূর্ত রূপ। মানবজাতির মাঝে তারা ছিল শয়তানের কর্মকাণ্ডের এক মাধ্যম, এবং তারা ছিল শয়তানের দুষ্কর্মের সহযোগী ও হীন অনুচর। তাদের ঈশ্বর-নিন্দা ও প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে হেয় করার সারমর্ম ছিল মর্যাদার জন্য ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম, ঈশ্বরের সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এবং ঈশ্বরকে তাদের অন্তহীন যাচাইকরণ। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ও তাঁর প্রতি তাদের বৈরীমনোভাব, এবং সেই সাথে, তাদের কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনার সারমর্ম সরাসরি ঈশ্বরের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিল এবং ঈশ্বরের আত্মাকে তা করেছিল রাগান্বিত। সেই কারণেই, তাদের বক্তব্য ও কর্মের ভিত্তিতে ঈশ্বর এক যুক্তিযুক্ত বিচার নিরূপণ করেছিলেন, এবং ঈশ্বর এবং তাদের ক্রিয়াকলাপকে ঈশ্বর পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে অশ্রদ্ধা প্রকাশের পাপ বলে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। এই বিশ্বে এবং আগামী বিশ্বেও বটে, এই পাপ অমার্জনীয়, যা শাস্ত্রের পরবর্তী অনুচ্ছেদে সমর্থিত হয়েছে: “পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে নিন্দার ক্ষমা নেই”, এবং “পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে যদি কেউ কোনো কথা বলে তার ক্ষমা সে কিছুতেই পাবে না—ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়।” আজ, ঈশ্বরের এই বাক্যগুলির প্রকৃত অর্থের বিষয়ে আলোচনা করা যাক: “তার ক্ষমা সে কিছুতেই পাবে না–ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়।” অর্থাৎ, রহস্য উন্মোচন করে দেখা যাক যে, কীভাবে ঈশ্বর এই বাক্যগুলি কার্যায়িত করেন: “তার ক্ষমা সে কিছুতেই পাবে না–ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়।”

আমরা যা যা বিষয়ে আলোচনা করেছি তার সবই ঈশ্বরের স্বভাব এবং মানুষ, ঘটনাবলী, ও বস্তুসমূহের প্রতি তাঁর মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বভাবতই, উপরের দুটি অনুচ্ছেদও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। শাস্ত্রবাক্যের এই দুটি অনুচ্ছেদের মধ্যে তোমরা কি কিছু লক্ষ্য করেছো? কেউ কেউ বলে এগুলির মধ্যে তারা ঈশ্বরের ক্রোধ দেখতে পায়। কিছু মানুষ বলে যে, তারা ঈশ্বরের স্বভাবের সেই দিকটি দেখতে পায়, যা মানবজাতির অপরাধকে মার্জনা করে না, বলে যে, মানুষ যদি ঈশ্বরের সম্মানহানিকর কোনো কাজ করে, তাহলে তারা তাঁর মার্জনা লাভ করবে না। এই দুটি অনুচ্ছেদে মানুষ যে ঈশ্বরের ক্রোধ ও মানবজাতির অপরাধের প্রতি তাঁর অসহিষ্ণুতা দর্শন ও অনুভব করে, একথা সত্য হলেও, তবু তাঁর মনোভাবকে তারা যথার্থভাবে উপলব্ধি করে না। যে মানুষগুলি তাঁর নিন্দা করে ও তাঁকে রাগান্বিত করে, তাদের প্রতি ঈশ্বরের প্রকৃত মনোভাব ও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রচ্ছন্ন উল্লেখ এই দুটি অনুচ্ছেদে অন্তর্নিহিত রয়েছে। তাঁর মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিই নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদটির প্রকৃত অর্থকে প্রতিপন্ন করে: “পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে যদি কেউ কোনো কথা বলে তার ক্ষমা সে কিছুতেই পাবে না—ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়।” মানুষ যখন ঈশ্বরনিন্দা করে, এবং যখন তাঁকে রাগান্বিত করে, তখন তিনি একটি রায় দান করেন, এবং এই রায়টিই হল তাঁর দ্বারা উচ্চারিত পরিণতি। বাইবেলে এটি এই ভাবে বর্ণিত হয়েছে: “আর এজন্যই আমি তোমাদের বলছি, মানুষের সমস্ত পাপ ও ঈশ্বর নিন্দা ক্ষমা করা হবে, কিন্তু পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে নিন্দার ক্ষমা নেই” (মথি ১২:৩১), এবং “ভণ্ড শাস্ত্রী ও ফরিশীর দল, ধিক তোমাদের!” (মথি ২৩:১৩)। কিন্তু, সেই শাস্ত্রবিদ ও ফরিশীদের, এবং এই বাক্যগুলি উচ্চারণ করার পর যারা প্রভু যীশুকে উন্মাদ বলে অভিহিত করেছিল তাদের পরিণাম কী ছিল, বাইবেলে কি তার উল্লেখ আছে? এমন কি নথিভুক্ত আছে যে তারা কোনো শাস্তি ভোগ করেছিল? না, নেই—তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এখানে “না” বলার অর্থ এটা নয়, যে, এমন কোনো তথ্যসূত্র ছিল না, বস্তুত বরং কেবল এটুকুই বলা হচ্ছে যে মানুষের চর্মচক্ষে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো পরিণামের উল্লেখ ছিল না। “এটি নথিভুক্ত ছিল না” বললে ঈশ্বরের মনোভাব এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যাপারের পরিচালনায় তাঁর অনুসৃত নীতির বিষয়টি পরিস্ফুট হয়। যে মানুষ তাঁর নিন্দা করে বা তাঁকে প্রতিরোধ করে, বা যারা তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়—যে মানুষগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে আক্রমণ করে, কলঙ্কিত করে, ও গালাগাল করে—তাদের প্রতি ঈশ্বর অন্ধ বা বধির হয়ে থাকেন না, বরং তাদের প্রতি তিনি এক স্পষ্ট মনোভাব পোষণ করেন। এই মানুষগুলিকে তিনি ঘৃণা করেন, এবং তাঁর অন্তরে তিনি তাদের দোষী সাব্যস্ত করেন। এমনকি তাদের পরিণতি কী হবে, তা-ও তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, যাতে মানুষ জানতে পারে যে, ঈশ্বর-নিন্দুকদের প্রতি তাঁর একটি স্পষ্ট মনোভাব রয়েছে, এবং কীভাবে তিনি তাদের পরিণতি নির্ধারণ করবেন সে বিষয়ে যাতে তারা অবহিত হয়। কিন্তু, এই বাক্যগুলি ঈশ্বর বলার পরেও, এই লোকগুলিকে ঈশ্বর যে ভাবে মোকাবিলা করবেন, সেই বিষয়ে সত্যটি মানুষ কদাচিৎ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, এবং সেই ব্যক্তিগণের প্রতি ঈশ্বরের দ্বারা ঘোষিত পরিণাম ও রায়দানের অন্তর্নিহিত নীতিটি তারা বুঝে উঠতে পারে না। অর্থাৎ, তাদের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের যে নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি রয়েছে, মানুষ তা উপলব্ধি করতে পারে না। বিষয়টি ঈশ্বরের কার্য সম্পাদনের নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিছু মানুষের মন্দ আচরণের মোকাবিলা করতে ঈশ্বর ঘটনার সংঘটনকে ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, তিনি তাদের পাপের ঘোষণা করেন না এবং তাদের পরিণাম নিরূপণ করেন না, বরং, তাদের শাস্তি ও উপযুক্ত প্রতিফল বিতরণ করতে, তিনি সরাসরি ঘটনার সংঘটনকে ব্যবহার করেন। এই ঘটনাসমূহ সংঘটনকালে, মানুষের ঐহিক দেহ শাস্তি ভোগ করে, অর্থাৎ এই শাস্তি এমন, যে তা মানবদৃষ্টির অগোচর। কিছু মানুষের দুষ্ট আচরণের মোকাবিলা করার সময়, ঈশ্বর কেবল তাঁর বাক্যের সাহায্যে তাদের কঠোর ভাষায় অভিসম্পাত করেন এবং তাঁর ক্রোধও তাদের উপর বর্ষিত হয়, কিন্তু যে শাস্তি তারা ভোগ করে, তা মানুষের দৃষ্টিগোচর না-ও হতে পারে। তবু, মানুষের দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিণাম, যেমন শাস্তিপ্রাপ্ত বা নিহত হওয়া অপেক্ষা এহেন পরিণাম আরো বেশি গুরুতর হতে পারে। এর কারণ হল যে, কোনো পরিস্থিতিতে ঈশ্বর যখন এই প্রকারের মানুষদের উদ্ধার না করার, তাদের প্রতি আর কোনো করুণা প্রদর্শন না করার বা সহিষ্ণুতা না দেখানোর, এবং তাদের আর কোনো সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, তখন তাদের প্রতি তিনি একটা উপেক্ষা করার মনোভাব গ্রহণ করেন। এখানে “উপেক্ষা করা” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? এই শব্দবন্ধটির প্রাথমিক অর্থ হল কোনোকিছুকে একপাশে সরিয়ে রাখা, সেটিকে উপেক্ষা করা এবং সেটির প্রতি আর কোনো মনোযোগ না দেওয়া। কিন্তু এখানে, ঈশ্বর যখন কাউকে উপেক্ষা করেন, তখন এর অর্থের দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকে: প্রথম ব্যাখ্যাটি হল যে, তিনি সেই ব্যক্তিটির জীবন ও তার সংক্রান্ত সকলকিছুর দেখভালের দায়ভার শয়তানের হাতে তুলে দিয়েছেন, এবং ঈশ্বর আর ব্যক্তিটির ব্যাপারে দায়বদ্ধ থাকবেন না এবং আর তিনি আর তাকে পরিচালিত করবেন না। ব্যক্তিটি উন্মাদ হোক কি নির্বোধ, বা সে জীবিত হোক কি মৃত, কিংবা তার শাস্তির হেতু সে যদি নরকেও অবতরণ করে থাকে, তবু এসব কিছুর সাথেই ঈশ্বরের কোনো লেনদেন থাকবে না। এর অর্থ হল যে, এহেন এক জীবের সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকবে না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হল এই, যে, ঈশ্বর সংকল্প করেছেন যে তিনি স্বয়ং, তাঁর স্বহস্তে, সেই ব্যক্তিটির ব্যাপারে কিছু একটা ব্যবস্থা নিতে চান। হতে পারে যে, সেই ব্যক্তিটির পরিষেবাকে তিনি কাজে লাগাবেন, কিম্বা তাকে তিনি তাঁর প্রতিতুলনার আধার হিসাবে ব্যবহার করবেন। হতে পারে যে, এমনতর মানুষদের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো বিশেষ পদ্ধতি থাকবে, তাদের প্রতি আচরণে থাকবে কোনো বিশেষ প্রণালী, দৃষ্টান্তস্বরূপ, ঠিক যেমন ছিল পৌলের ক্ষেত্রে। ঈশ্বরের হৃদয়ের নীতি ও মনোভাব অনুসারে তিনি এই প্রকারের মানুষদের মোকাবিলা করার সংকল্প করেছেন। তাই মানুষ যখন ঈশ্বরকে প্রতিরোধ ও কালিমালিপ্ত করে এবং তাঁর নিন্দা করে, তারা যদি তাঁর স্বভাবকে উত্তক্ত করে তোলে, কিম্বা তারা যদি তাঁর সহিষ্ণুতার সীমাকে অতিক্রম করে যায়, তখন এসবের পরিণতি চিন্তা করতেও ভয় হয়। সবথেকে ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটে তখন যখন ঈশ্বর তাদের জীবন ও তাদের সংক্রান্ত সবকিছু চিরকালের জন্য শয়তানের হাতে হস্তান্তরিত করে দেন। অনন্তকালব্যাপী তাদের মার্জনা করা হবে না। এর অর্থ হল যে, সেই ব্যক্তিটি শয়তানের মুখের গ্রাসে, তার হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে, এবং সেই ক্ষণ থেকে তাদের বিষয়ে ঈশ্বরের আর কিছুই করণীয় নেই। তোমরা কল্পনা করতে পারো, যে, শয়তান কর্তৃক ইয়োবের প্রলোভন কি বিরাট মর্মবিদারক ঘটনা ছিল? যদিও শর্ত অনুযায়ী শয়তানের ইয়োবের জীবনের ক্ষতি করার অনুমোদন ছিল না, তবু ইয়োবে অসহ যাতনা ভোগ করেছিল। আর যাকে পুরোপুরি শয়তানের হাতে সঁপে দেওয়া হয়েছে, যে সম্পূর্ণরূপে শয়তানের করায়ত্ত, যে ঈশ্বরের প্রযত্ন ও করুণা একেবারেই হারিয়েছে, যে আর সৃষ্টিকর্তার নিয়মের অধীন নয়, যাকে ঈশ্বর-বন্দনার অধিকার ও ঈশ্বরের নিয়মাধীন এক সত্তা হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, এবং যার সঙ্গে সৃষ্টির প্রভুর সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়েছে, তার উপর শয়তান যে ধ্বংসলীলা চালাবে, তা কল্পনা করা কি আরো বেশি কঠিন নয়? শয়তানের দ্বারা ইয়োবের নিপীড়ন মানুষের দৃষ্টিগোচর ছিল, কিন্তু ঈশ্বর যদি কোনো মানুষের জীবন শয়তানের কাছে হস্তান্তরিত করেন, তখন তার পরিণতি মানুষের কল্পনাতীত হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু মানুষ হয়তো একটা গরু, বা গাধা হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে, সেখানে আরো কিছু মানুষ কলুষিত, দুষ্ট আত্মাদের দ্বারা কবলিত ও আবিষ্ট হয়ে পড়তে পারে, এবং এই ধরনের আরো অনেক কিছু। ঈশ্বরের দ্বারা শয়তানের নিকট হস্তান্তরিত কিছু মানুষের পরিণতি এমনই হয়। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এই যে মানুষগুলি, যারা প্রভু যীশুকে বিদ্রূপ, কালিমালিপ্ত, অভিযুক্ত, ও নিন্দিত করেছিল, তারা কোনো ফলশ্রুতি ভোগ করেনি। কিন্তু বাস্তব সত্যটা হল যে, সকলকিছুর মোকাবিলা করার জন্যই ঈশ্বরের একটা কর্মপদ্ধতি আছে। প্রত্যেক প্রকারের মানুষের সাথে যে-যে ভাবে তিনি মোকাবিলা করেন, তাতে তাদের পরিণতির বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার জন্য কোনো সুস্পষ্ট ভাষা তিনি না-ও ব্যবহার করতে পারেন। কখনো কখনো সরাসরি কথা না বলে তিনি বরং প্রত্যক্ষভাবে ক্রিয়াশীল হন। তিনি যে কোনো ফলাফলের ব্যাপারে কিছু বলেন না, তার মানে এই নয় যে, তা নেই—বস্তুত, সেক্ষেত্রে এমনটাও হতে পারে যে, পরিণতিটি আরো বেশি নিদারুণ। বাহ্যিকভাবে, এমন মনে হতে পারে যেন, কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে ঈশ্বর তাঁর মনোভাবের বিষয়ে পরিস্ফুট করে কিছু বলেন না, কিন্তু বাস্তবে, বহু দিন হল ঈশ্বর সেই ব্যক্তিগণের প্রতি কোনোপ্রকার মনোযোগ দিতে ইচ্ছুক নন। তিনি আর তাদের মুখদর্শন করতে চান না। তাদের সম্পাদিত ক্রিয়াকর্ম ও তাদের আচরণের কারণে, তাদের প্রকৃতি ও সারমর্মের কারণে, ঈশ্বর কেবল চান যেন তারা তাঁর চোখের সামনে থেকে অন্তর্হিত হোক, তিনি সরাসরি তাদের শয়তানের হাতে অর্পণ করতে চান, তাদের আত্মা, অন্তঃকরণ, ও শরীর শয়তানকে প্রদান করতে চান, এবং শয়তানকে তাদের নিয়ে তার ইচ্ছে মতো যা খুশি করার অনুমতি দিতে চান। ঈশ্বর যে কী পরিমাণ তাদের ঘৃণা করেন, কী মাত্রায় তাদের প্রতি তিনি বিতৃষ্ণ তা স্পষ্ট। কোনো মানুষ যদি ঈশ্বরকে এতটাই রাগান্বিত করে যে ঈশ্বর এমনকি তাদের আর দেখতে পর্যন্ত চান না, এবং তাদের বিষয়ে সম্পূর্ণ হাল ছেড়ে দিতেও তিনি প্রস্তুত, এতটাই যে এমনকি তিনি নিজে তাদের সাথে মোকাবিলাও করতে চান না—যদি তাঁর ক্রোধ এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে, তিনি তাদের শয়তানের হাতে তুলে দিয়ে তার যা ইচ্ছে তা-ই করতে দেবেন, তার যে রকম খুশি শয়তানকে তিনি সেভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণ, ভোগ, ও ব্যবহার করার অনুমতি দেবেন—তাহলে বুঝতে হবে যে, সেই মানুষটির আর কোনো আশা নেই। তার মানব হওয়ার যে অধিকার, তা চিরতরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, এবং ঈশ্বরের সৃষ্টির এক সত্তা হওয়ার যে অধিকার, তা-ও সমাপ্তিলগ্নে এসে উপনীত হয়েছে। এ-ই কি নিদারুণতম শাস্তি নয়?

উপরে বর্ণিত সবকিছুই হল এই বাক্যটির এক সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা: “তার ক্ষমা সে কিছুতেই পাবে না–ইহকালেও নয়, পরকালেও নয়”, এবং তা শাস্ত্র থেকে গৃহিত এই অনুচ্ছেদগুলির এক সরল টীকাভাষ্যের ভূমিকাও পালন করে। আমার বিশ্বাস, তোমরা সকলে এখন এই বিষয়টায় একটা উপলব্ধি লাভ করেছো।

—বাক্য, খণ্ড ২, ঈশ্বরকে জানার প্রসঙ্গে, ঈশ্বরের কর্ম, ঈশ্বরের স্বভাব এবং স্বয়ং ঈশ্বর ৩

পূর্ববর্তী: যীশু অলৌকিক কার্য সম্পাদন করলেন

পরবর্তী: পুনরুত্থানের পর তাঁর শিষ্যদের প্রতি যীশুর উক্তি

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।

সম্পর্কিত তথ্য

দ্বিতীয় দিবসে, ঈশ্বরের কর্তৃত্ব জলরাশির আয়োজন করে, এবং তৈরি করে নভোমণ্ডল এবং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে মৌলিক একটি স্থান আবির্ভূত হয়

বাইবেলের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি পাঠ করা যাক: “ঈশ্বর বললেন, সৃষ্ট হোক নভোমণ্ডল, বিভক্ত করুক জলরাশিকে! ঈশ্বর এইভাবে নভোমণ্ডল সৃষ্টি করে তার...

তৃতীয় দিবসে, ঈশ্বরের বাক্যসমূহ জন্ম দেয় পৃথিবী এবং সমুদ্রের এবং ঈশ্বরের কর্তৃত্ব বিশ্বে প্রাণসঞ্চার করে

এরপর, পাঠ করা যাক আদিপুস্তক ১:৯-১১-এর প্রথম বাক্যটি: “ঈশ্বর বললেন, আকাশের নীচে সমস্ত জলরাশি এক স্থানে সংহত হোক, প্রকাশিত হোক শুষ্ক ভূমি!”...

পঞ্চম দিবসে, বিবিধ এবং বৈচিত্র্যময় গঠনের জীবন বিভিন্ন উপায়ে সৃষ্টিকর্তার কর্তৃত্ব প্রদর্শন করে

শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “ঈশ্বর বললেন, জলরাশি পূর্ণ হোক নানা জাতির জলচর প্রাণীতে এবং পৃথিবীর উপরে আকাশে উড়ে বেড়াক পক্ষীকুল। ঈশ্বর সৃষ্টি করলেন...

চতুর্থ দিবসে, ঈশ্বর আবার তাঁর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করায় মানবজাতির বিভিন্ন ঋতু, দিন এবং বছরগুলি সৃষ্টি হয়

সৃষ্টিকর্তা তাঁর পরিকল্পনা সম্পাদনের জন্য তাঁর বাক্যসমূহের ব্যবহার করেছিলেন, এবং এইভাবে তিনি তাঁর পরিকল্পনার প্রথম তিন দিবস অতিবাহিত...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন