ঈশ্বর অবশ্যই সদোমকে ধ্বংস করবেন

আদিপুস্তক ১৮:২৬ এবং যিহোবা বললেন, আমি যদি সদোমে পঞ্চাশজন ধার্মিক ব্যক্তি দেখতে পাই, তাহলে তাদের জন্যই আমি সম্পূর্ণ স্থানটিকে অব্যাহতি দেব।

আদিপুস্তক ১৮:২৯ অব্রাহাম তাঁকে আবার বললেন, যদি সেখানে চল্লিশ জন পাওয়া যায় তাহলে? প্রভু বললেন, তাহলে সেই চল্লিশ জনের জন্য আমি সেই নগর ধ্বংস করব না।

আদিপুস্তক ১৮:৩০ তখন অব্রাহাম যিহোবাকে বলল, ধরুন যদি সেখানে ত্রিশ জন এমন লোক পাওয়া যায়? তিনি বললেন, তাহলে আমি এই কাজ করব না।

আদিপুস্তক ১৮:৩১ অব্রাহাম আবার বলল, ধরুন যদি সেখানে এমন কুড়িজন লোক থাকে? তিনি বললেন, তাহলে আমি এই নগর ধ্বংস করব না।

আদিপুস্তক ১৮:৩২ সে আবার বলল, ধরুন যদি সেখানে মাত্র দশজন এমন লোক থাকে? যিহোবা বললেন, তাহলেও আমি এটা ধ্বংস করব না।

এগুলো বাইবেল থেকে আমার বেছে নেওয়া কয়েকটা উদ্ধৃতি। এগুলো সম্পূর্ণ এবং মূল সংস্করণ নয়। তোমরা সেগুলো দেখতে চাইলে নিজে থেকে বাইবেলে সেগুলো দেখে নিতে পারো; সময় বাঁচানোর জন্য, আমি মূল বিষয়বস্তুর কিছু অংশ বাদ দিয়েছি। এখানে আমি শুধুমাত্র কয়েকটি মূল অনুচ্ছেদ ও বাক্যই বেছে নিয়েছি, অনেক বাক্য বাদ দিয়েছি যেগুলোর আমাদের আজকের আলোচনার উপর কোনো প্রভাব নেই। আমাদের আলোচিত সমস্ত অনুচ্ছেদ এবং বিষয়বস্তুতে আমরা কাহিনীর বিবরণ এবং এতে থাকা মানুষের আচরণের ওপর বেশি লক্ষ্য করি না; পরিবর্তে, আমরা শুধু সেই সময়ে ঈশ্বরের চিন্তাভাবনা ধারণা কেমন ছিল সেই সম্পর্কে কথা বলি। ঈশ্বরের চিন্তাভাবনা ও ধারণায়, আমরা ঈশ্বরের স্বভাব দেখতে পাবো, এবং ঈশ্বর যাকিছু করেছেন তা থেকে আমরা স্বয়ং সত্য ঈশ্বরকে দেখতে পাবো—এর মাধ্যমেই আমরা আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ করব।

যারা ঈশ্বরের বাক্য মান্য করতে পারে ও তাঁর আদেশ অনুসরণ করতে পারে, ঈশ্বর শুধু তাদেরই খেয়াল রাখেন

উপরোক্ত অনুচ্ছেদে অনেক মূল শব্দ রয়েছে: যেমন সংখ্যা। প্রথমত, যিহোবা বলেছিলেন, নগরের মধ্যে পঞ্চাশজন ধার্মিক লোক খুঁজে পেলেই তিনি সম্পূর্ণ স্থানটাকে রেহাই দেবেন, অর্থাৎ তিনি নগরটা ধ্বংস করবেন না। তাহলে, প্রকৃতপক্ষে সদোমে কি পঞ্চাশজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিল? না ছিল না। তার ঠিক পরেই অব্রাহাম ঈশ্বরকে কি বলেছিল? সে বলেছিল, ঘটনাচক্রে যদি চল্লিশজন এমন লোক পাওয়া যায়? এবং ঈশ্বর বলেছিলেন, আমি তাহলে এই কাজ থেকে বিরত থাকব। তারপর অব্রাহাম বলেছিল, ধরুন যদি ত্রিশজন এমন লোক পাওয়া যায়? এবং ঈশ্বর বলেছিলেন, আমি তাহলে এই কাজ করব না। এবং যদি কুড়িজনকে পাওয়া যায়? আমি তাহলে এই কাজ করব না। দশজন? তাহলেও আমি এ কাজ করব না। নগরের মধ্যে কি প্রকৃতপক্ষে দশজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিল? দশজন ছিল না—কিন্তু একজন ছিল। আর সেই একজন কে ছিল? সে ছিল লোট। সেই সময়ে সদোমে মাত্র একজনই ধার্মিক ব্যক্তি ছিল, তবে ঈশ্বর কি এই সংখ্যার বিষয়ে খুব কঠোর বা অনমনীয় ছিলেন? না, তা ছিলেন না! আর তাই যখন মানুষ অবিরত জিজ্ঞাসা করে গিয়েছিল, “চল্লিশজন হলে কী হবে?” “ত্রিশজন হলে কী হবে?”, এইভাবে “দশজন হলে কী হবে?” এই প্রশ্ন উপস্থিত হলে ঈশ্বর বলেছিলেন, “সেখানে যদি শুধু দশজনও এমন লোক থাকে, তাহলেও আমি এই নগর ধ্বংস করব না; আমি এই নগরকে অব্যাহতি দেব, আর এই দশজনের পাশাপাশি বাকিদেরও ক্ষমা করে দেব।” যদি মাত্র দশজনও থাকত, তাহলেও তা যথেষ্ট দুঃখজনক ব্যাপার হতো, কিন্তু দেখা গেল যে সদোমে এমনকি ততজন ধার্মিকও ছিল না। তাহলে তোমরা দেখতে পাচ্ছ, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে সেই নগরের মানুষদের পাপ ও মন্দ কর্মের মাত্রা এতটাই ছিল যে তাদের ধ্বংস করা ছাড়া ঈশ্বরের আর কোনো বিকল্প ছিল না। ঈশ্বর যখন বলেছিলেন যে পঞ্চাশজন ধার্মিক থাকলেই তিনি নগরটাকে ধ্বংস করবেন না, তখন তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন? এই সংখ্যা ঈশ্বরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই নগরে ঈশ্বরের কাঙ্ক্ষিত ধার্মিক প্রকৃতির মানুষ আদৌ ছিল কি না। যদি নগরে একজনও ধার্মিক ব্যক্তি থাকত, তাহলেও ঈশ্বর তাঁর সেই নগর ধ্বংসের কারণে তাদের ক্ষতি হতে দিতেন না। এর অর্থ হল, ঈশ্বর এই নগরকে ধ্বংস করুন বা না করুন এবং সেখানে যতই ধার্মিক লোক থাকুক, তাঁর কাছে এই পাপপূর্ণ নগর ছিল অভিশপ্ত ও ঘৃণিত, এবং এই নগরের ধ্বংস হওয়া উচিত, তাঁর চোখের সামনে থেকে নিশ্চিহ্ন হওয়া উচিত, শুধু ধার্মিকদের রয়ে যাওয়া উচিত। যুগ নির্বিশেষে এবং মানবজাতির বিকাশের পর্যায় নির্বিশেষে, ঈশ্বরের মনোভাব অপরিবর্তিত থেকে যায়: তিনি মন্দকে ঘৃণা করেন এবং যারা তাঁর দৃষ্টিতে ধার্মিক তাদের বিষয়ে চিন্তা করেন। ঈশ্বরের এই স্পষ্ট মনোভাব ঈশ্বরের সারসত্যেরও প্রকৃত প্রকাশ। নগরের মধ্যে যেহেতু মাত্র একজন ছাড়া আর কেউ ধার্মিক ব্যক্তি ছিল না, তাই ঈশ্বর আর দ্বিধা করেননি। অনিবার্যভাবে সদোমের ধ্বংসসাধনই ছিল এর শেষ ফলাফল। এতে তোমরা কী প্রত্যক্ষ করলে? সেই যুগে, নগরের মধ্যে পঞ্চাশজন ধার্মিক ব্যক্তি থাকলে ঈশ্বর তা ধ্বংস করতেন না, এমনকি দশজন থাকলেও করতেন না, এর অর্থ হল ঈশ্বর মানবজাতিকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নিতেন ও তাদের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখাতেন, অথবা তাদের পথনির্দেশ দেওয়ার কাজ করতেন, সেই অল্প কিছুসংখ্যক মানুষের জন্য যারা তাঁকে সম্মান করতে ও তাঁর উপাসনা করতে সক্ষম। মানুষের ধার্মিক কর্মের উপর ঈশ্বরের আস্থা সুবিশাল, যারা তাঁকে উপাসনা করতে সক্ষম ও তাঁর সম্মুখে ভালো কাজ করতে সক্ষম তাদের উপরেও তাঁর প্রভূত আস্থা।

প্রাচীনতমকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত, কখনো কি তোমরা বাইবেলে পড়েছ যে ঈশ্বর কোনো মানুষের কাছে সত্য জ্ঞাপন করছেন, বা ঈশ্বরের পথের বিষয়ে কথা বলছেন? না, কখনোই না। মানুষের প্রতি ঈশ্বরের যে বাক্যগুলো আমরা পড়েছি, সেগুলোতে শুধুমাত্র বলা রয়েছে মানুষের কী করণীয়। কেউ কেউ এগিয়ে এসে সেই কাজ করেছিল, কেউ করেনি; কেউ বিশ্বাস করেছিল আবার কেউ করেনি। সেখানে যা ছিল তা শুধু এই। এইভাবে, সেই যুগের ধার্মিক ব্যক্তি—যারা ঈশ্বরের চোখে ধার্মিক ছিল—তারা ছিল শুধুমাত্র সেইসব মানুষ যারা ঈশ্বরের বাক্য শুনতে পারতো ও ঈশ্বরের আদেশ পালন করতে পারতো। তারা ছিল সেই সেবক যারা ঈশ্বরের বাক্য মানুষের মাঝে সম্পাদন করেছিল। এই রকম মানুষরা ঈশ্বরকে জানে, এমনটা কি বলা যায়? তাদের কি ঈশ্বরের দ্বারা নিখুঁত হয়ে ওঠা মানুষ হিসাবে গণ্য করা যায়? না, যায় না। সুতরাং তাদের সংখ্যা যতই হোক না কেন, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে কি এরা ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ বিবেচিত হওয়ার উপযোগী? এদের কি ঈশ্বরের সাক্ষী বলা যেতে পারে? অবশ্যই না! নিশ্চিতভাবেই তারা ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ বা সাক্ষী বলে গণ্য হওয়ার মতো মূল্যবান নয়। তাহলে, ঈশ্বর এই মানুষদের কী বলে সম্বোধন করেছিলেন? বাইবেলের পুরাতন নিয়মে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে ঈশ্বর তাদের “আমার সেবক” বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ সেই সময়ে, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে এই ধার্মিক লোকেরা ছিল ঈশ্বরের সেবক, তারা ছিল সেইসব মানুষ যারা পৃথিবীতে তাঁর সেবা করেছিল। আর ঈশ্বর কীভাবে এই উপাধির বিষয়ে ভেবেছিলেন? তিনি তাদের এই নামে সম্বোধন করেছিলেন কেন? মানুষকে তিনি যে নামে ডাকেন, সেই উপাধি স্থির করার বিষয়ে ঈশ্বরের হৃদয়ে কি কোনো মানদণ্ড রয়েছে? অবশ্যই রয়েছে। ধার্মিক, নিখুঁত, ন্যায়পরায়ণ, বা সেবক—ঈশ্বর মানুষকে যে নামেই ডাকুন না কেন, তাঁর মানদণ্ড রয়েছে। যখন তিনি কাউকে নিজের সেবক বলে সম্বোধন করেন, তখন তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে এই ব্যক্তি তাঁর দূতদের গ্রহণ করতে সক্ষম, তাঁর আদেশ পালনে সক্ষম, এবং দূতদের প্রদত্ত আদেশ পালনে সক্ষম। এই ব্যক্তি কী সম্পাদন করে? ঈশ্বর মানুষকে যা করতে আদেশ করেন, পৃথিবীতে যা কিছু সম্পাদন করতে বলেন, তারা সেটা পালন করে। সেই সময়, ঈশ্বর মানুষকে যা করতে বলেছিলেন এবং যে কাজ পৃথিবীতে সম্পাদন করতে বলেছিলেন, সেটাকে কি ঈশ্বরের পথ বলা যেতে পারে? না, পারে না। কারণ সেই সময়ে, ঈশ্বর শুধু চেয়েছিলেন মানুষ যেন কয়েকটা সহজ কাজ করে; তিনি সহজ কয়েকটা আদেশ উচ্চারণ করেছিলেন, মানুষকে শুধু এটা ওটা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এর থেকে বেশি কিছু নয়। ঈশ্বর তাঁর পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করছিলেন। কারণ সেই সময়ে অনেক অবস্থার উপস্থিত হওয়া বাকি ছিল, উপযুক্ত সময় আসা বাকি ছিল, এবং মানুষের পক্ষে ঈশ্বরের পথ অবলম্বন করা কঠিন ছিল, ফলে ঈশ্বরের হৃদয় থেকে প্রকৃত পথ নির্গত হওয়া তখনও শুরু হয়নি। ঈশ্বর যে ধার্মিক ব্যক্তিদের কথা বলেছিলেন, যাদের আমরা এখানে দেখতে পাই—ত্রিশ হোক বা কুড়ি জন—তাদের তিনি তাঁর সেবক হিসাবে দেখতেন। ঈশ্বরের দূতরা এই ভৃত্যদের কাছে এলে তারা তাদের গ্রহণ করতে পারত, তাদের আদেশ অনুসরণ করতে পারত, এবং তাদের কথা অনুসারে কাজ করতে পারত। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে যারা সেবক হিসাবে গণ্য হতো তাদের জন্য ঠিক এটাই ছিল করণীয় এবং অর্জনীয়। মানুষকে উপাধি প্রদানের বিষয়ে ঈশ্বর বিচক্ষণ। ঈশ্বর যে তাদের সেবক বলে সম্বোধন করেছিলেন তা এই জন্য নয় যে আজ তোমরা যেমন অবস্থায় রয়েছে তারা সেই অবস্থায় ছিল—এই জন্যও নয় যে তারা প্রচুর ধর্মপ্রচার শুনেছিল, অথবা তারা জানতো ঈশ্বর কী করতে চলেছেন, ঈশ্বরের ইচ্ছাকে অনেকটাই বুঝতে পারতো, এবং তাঁর পরিচালনামূলক পরিকল্পনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিল—বরং এইজন্য যে তাদের মানবিকতায় তারা ছিল সৎ, এবং তারা ঈশ্বরের বাক্যের সাথে সঙ্গত থাকতে সমর্থ ছিল; ঈশ্বর যখন তাদের আদেশ করতেন, তারা তাদের কাজ সরিয়ে রেখে ঈশ্বর যে আদেশ করেছেন তা নির্বাহ করতে সক্ষম ছিল। তাই ঈশ্বরের কাছে এই সেবক নামের অন্য আর একটা অর্থ হলো যে তারা পৃথিবীতে ঈশ্বরের কাজে সহায়তা করেছে, এবং যদিও তারা ঈশ্বরের দূত ছিল না, তবুও তারা পৃথিবীতে ঈশ্বরের বাক্যের সম্পাদনকারী ও প্রয়োগকর্তা ছিল। তাহলে তোমরা দেখতেই পাচ্ছ, এই সেবক বা ধার্মিক ব্যক্তিরা ঈশ্বরের অন্তরে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পৃথিবীতে ঈশ্বরের যে কাজের সূচনা করার ছিল, তাঁর সাথে সহযোগিতা করার মতো লোক না থাকলে তা সম্ভব ছিল না, আর ঈশ্বরের সেবকরা যে ভূমিকা পালন করেছিল তা ঈশ্বরের দূতদের দ্বারা সম্পাদিত হওয়া সম্ভব ছিল না। ঈশ্বর এই সেবকদের যে সমস্ত কাজের আদেশ দিয়েছিলেন তার প্রতিটাই তাঁর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আর তাই তাদের হারানো তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। ঈশ্বরের সাথে এই সেবকদের সহযোগিতা না থাকলে মানবজাতির মাঝে তাঁর কাজ স্থবির হয়ে পড়ত, ফলস্বরূপ ঈশ্বরের পরিচালনামূলক পরিকল্পনা ও তাঁর আশা নিষ্ফল হয়ে যেত।

ঈশ্বর যাদের খেয়াল রাখেন তাদের প্রতি তিনি অসীম করুণাময়, এবং যাদের তিনি ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান করেন তাদের প্রতি তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, সদোমে কি ঈশ্বরের দশজনও সেবক ছিল? না, ছিল না! সেই নগর কি ঈশ্বরের কাছ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য ছিল? সেই নগরের শুধু একজন ব্যক্তি—লোট—ঈশ্বরের দূতদের স্বাগত জানাতে পেরেছিল। এর মর্মার্থ হল, সেই নগরে ঈশ্বরের একজনই ভৃত্য ছিল, এবং তাই লোটকে বাঁচানো ও সদোম নগরকে ধ্বংস করা ছাড়া ঈশ্বরের আর কোনো বিকল্প ছিল না। অব্রাহাম এবং ঈশ্বরের মধ্যের কথোপকথন যে কথোপকথন উপরে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা আপাতভাবে সহজ মনে হলেও তা বেশ গভীর কিছু বিষয় তুলে ধরে, যেমন: ঈশ্বরের কর্মের নির্দিষ্ট কিছু নীতি রয়েছে, এবং কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি দীর্ঘকাল পর্যবেক্ষণ ও চিন্তাভাবনা করবেন; সঠিক সময় হওয়ার আগে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না বা কোনো সিদ্ধান্তে হঠাৎ উপনীত হবেন না। অব্রাহাম এবং ঈশ্বরের মধ্যের কথোপকথন থেকে আমরা দেখতে পাই, ঈশ্বরের হাতে সদোমের ধ্বংস হওয়াটা বিন্দুমাত্রও ভুল ছিল না, কারণ ঈশ্বর ইতিমধ্যেই জানতেন সেই নগরে চল্লিশজন, ত্রিশজন, এমনকি কুড়িজন ধার্মিক লোকও নেই। এমনকি দশজনও ছিল না। সেই নগরের একমাত্র ধার্মিক ব্যক্তি ছিল লোট। সদোমে যা ঘটেছিল এবং সদোমের যা পরিস্থিতি ছিল তা ঈশ্বর লক্ষ্য করেছিলেন, আর সেগুলো ঈশ্বরের কাছে একেবারে তাঁর নিজের হাতের তালুর মতোই পরিচিত ছিল। সুতরাং, তাঁর সিদ্ধান্ত ভুল হতেই পারতো না। এর বিপরীতে, ঈশ্বরের সর্বশক্তিমানতার তুলনায় মানুষ কতই না অসাড়, নির্বোধ, অজ্ঞ, এবং কতই না অদূরদর্শী। আর এটাই আমরা অব্রাহাম ও ঈশ্বরের মধ্যের কথোপকথনে দেখতে পাই। ঈশ্বর সূচনালগ্ন থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত তাঁর স্বভাব প্রকাশিত করে চলেছেন। এখানেও একইভাবে, আমাদের ঈশ্বরের স্বভাবকেই দেখতে হবে। সংখ্যার বিষয়টা সহজ—এগুলোর আলাদা কোনো তাৎপর্য নেই—কিন্তু এখানে ঈশ্বরের স্বভাবের বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ রয়েছে। পঞ্চাশজন ধার্মিক লোক থাকলে ঈশ্বর সেই নগরকে ধ্বংস করতেন না। এর কারণ কি ঈশ্বরের করুণা? তাঁর ভালোবাসা ও সহনশীলতা? তোমরা কি ঈশ্বরের স্বভাবের এই দিকটা প্রত্যক্ষ করেছ? এমনকি দশজন ধার্মিক ব্যক্তি থাকলেও ঈশ্বর সেই নগরকে ধ্বংস করতেন না, শুধু এই দশজন ধার্মিক ব্যক্তির কারণে। এটাই তো ঈশ্বরের ভালোবাসা ও সহনশীলতা, নাকি তা নয়? ধার্মিক ব্যক্তিদের প্রতি ঈশ্বরের করুণা, সহনশীলতা ও উদ্বেগের কারণে, তিনি এই নগর ধ্বংস করতেন না। এটাই ঈশ্বরের সহিষ্ণুতা। এবং পরিশেষে, আমরা কী পরিণতি দেখি? যখন অব্রাহাম বলেছিল, “যদি সেখানে মাত্র দশজন এমন লোক থাকে?” ঈশ্বর জবাব দিয়েছিলেন, “আমি এটা ধ্বংস করব না।” এরপরে অব্রাহাম আর কিছু বলে নি, কারণ সদোমে তার কথামতো দশজন ধার্মিক ব্যক্তিও ছিল না, আর তার বলার মতোও আর কিছু ছিল না, আর তখনই সে উপলব্ধি করেছিল ঈশ্বর কেন সদোমকে ধ্বংস করার জন্য বদ্ধপরিকর। এর মধ্যে তোমরা ঈশ্বরের কোন স্বভাব প্রত্যক্ষ করলে? ঈশ্বর কী ধরনের সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন? ঈশ্বর সংকল্প করেছিলেন, যদি নগরে দশজনও ধার্মিক ব্যক্তি না থাকে, তাহলে তিনি এর অস্তিত্বের অনুমতি দেবেন না, এবং অনিবার্যভাবেই তা ধ্বংস করে দেবেন। এটাই কি ঈশ্বরের ক্রোধ নয়? এই ক্রোধ কি ঈশ্বরের স্বভাবকে উপস্থাপিত করে? এই স্বভাবই কি ঈশ্বরের পবিত্র সারসত্যের উদ্ঘাটন? এটাই কি ঈশ্বরের ধার্মিক সারসত্যের সেই উদ্ঘাটন, যা মানুষের লঙ্ঘন করা একেবারেই অনুচিত? সদোমে দশজনও ধার্মিক ব্যক্তি নেই, এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে ঈশ্বর সংশয়মুক্ত হয়েছিলেন এই নগর ধ্বংস করার বিষয়ে এবং এই নগরের বাসিন্দাদের গুরুতর দণ্ড প্রদানের বিষয়ে, কারণ তারা ঈশ্বরের বিরোধিতা করেছিল, এবং তারা ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত।

আমরা এই অনুচ্ছেদগুলো এইভাবে বিশ্লেষণ করলাম কেন? কারণ এই কয়েকটি সহজ বাক্যই অপার করুণা ও গভীর ক্রোধ সমন্বিত ঈশ্বরের স্বভাবকে সম্পূর্ণভাবে ব্যক্ত করে। সদোমের ধার্মিকদের মূল্যবান জ্ঞান করা, ও তাদের প্রতি করুণা, সহিষ্ণুতা ও যত্ন প্রদর্শনের সাথে সাথে ঈশ্বরের হৃদয়ে ছিল সদোমের সমস্ত দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। এটাই তো অপার করুণা এবং গভীর ক্রোধ, তাই না? ঈশ্বর কোন উপায়ে এই নগর ধ্বংস করেছিলেন? অগ্নির দ্বারা। আর তিনি অগ্নির মাধ্যমেই এটা ধ্বংস করলেন কেন? যখন তুমি কিছু আগুনে পুড়ে যেতে দেখ, অথবা যখন তুমি কিছু একটা পুড়িয়ে দিতে চলেছ, সেটার প্রতি তোমার কী অনুভূতি হয়? তুমি কেন সেটা পুড়িয়ে ফেলতে চাও? তোমার কি মনে হয় যে তোমার আর এটার প্রয়োজন নেই, তুমি আর এটার দিকে তাকাতেও চাও না? তুমি এটাকে পরিত্যাগ করতে চাও? ঈশ্বরের এই অগ্নির ব্যবহারের অর্থ হচ্ছে পরিত্যাগ ও ঘৃণা, এবং তিনি আর সদোম নগরীকে দেখতে চান না। এই আবেগের কারণেই ঈশ্বর সদোমকে অগ্নির মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আগুনের ব্যবহারেই বোঝা যাচ্ছে ঈশ্বর ঠিক কতখানি ক্রুদ্ধ ছিলেন। ঈশ্বরের করুণা ও সহনশীলতা অবশ্যই বর্তমান, কিন্তু ক্রোধ প্রকাশ করার সময়ে তাঁর পবিত্রতা ও ধার্মিকতা মানুষকে ঈশ্বরের সেই দিকটিও প্রদর্শন করে যেখানে কোনোরকম অপরাধ সহ্য করা হয় না। মানুষ যখন ঈশ্বরের আদেশ মান্য করতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়, তাঁর চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কাজ করে, তখন ঈশ্বর মানুষের প্রতি তাঁর অপার করুণা বর্ষণ করেন; আবার মানুষ যখন দুর্নীতি, ঘৃণা, ও তাঁর প্রতি শত্রুতায় পূর্ণ হয়, তখন ঈশ্বর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন। তাঁর এই প্রচণ্ড ক্রোধের মাত্রা কতটা? ঈশ্বরের এই ক্রোধ ততক্ষণ পর্যন্ত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ ও মন্দকর্মের অবসান না দেখছেন, যতক্ষণ না এগুলো তাঁর চোখের সামনে থেকে অপসারিত হচ্ছে। শুধুমাত্র তখনই ঈশ্বরের ক্রোধের অবসান ঘটবে। অন্য ভাষায়, কোনো ব্যক্তি, সে যেই হোক না কেন, যদি তার হৃদয় ঈশ্বরের থেকে দূরে চলে গিয়ে থাকে ও তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকে, কখনোই আর ফিরে না আসে, তাহলে বাহ্যিকভাবে বা তাদের অনুমাননির্ভর আকাঙ্ক্ষায়—যেরকমভাবেই তারা তাদের শরীর ও মনে ঈশ্বরের উপাসনা, অনুসরণ, ও মান্য করতে ইচ্ছা প্রকাশ করুক না কেন, ঈশ্বরের ক্রোধ অবিরাম অর্গলমুক্ত হতে থাকবে। মানুষকে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়ার পরে, ঈশ্বর যখন সুতীব্রভাবে তাঁর ক্রোধ প্রকাশ করবেন, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় থাকবে না, এবং তিনি এমন এক মানবজাতির প্রতি আর কখনোই করুণাময় ও সহিষ্ণু হবেন না। ঈশ্বরের স্বভাবের এটা এমন এক দিক যা কোনো অপরাধ বরদাস্ত করে না। এখানে, ঈশ্বরের দ্বারা নগরের ধ্বংসসাধনের বিষয়টা মানুষের কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়, কারণ, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে পাপে পরিপূর্ণ একটা নগর বিদ্যমান বা অবশিষ্ট থাকতে পারে না, এবং ঈশ্বরের হাতে সেটার ধ্বংসসাধনই যুক্তিযুক্ত ছিল। তবুও তাঁর সদোম ধ্বংস করার আগে এবং পরের ঘটনা থেকে আমরা ঈশ্বরের স্বভাবের সামগ্রিকটা দেখতে পাই। সদয়, সুন্দর, ও ভালো সমস্তকিছুর প্রতি তিনি সহিষ্ণু ও করুণাময়; আবার মন্দ, পাপী, ও দুষ্ট সবকিছুর প্রতি তিনি অত্যন্ত ক্রোধপূর্ণ, এতটাই যে তাঁর সেই ক্রোধ অবিশ্রান্ত। এগুলো হল ঈশ্বরের স্বভাবের দুটি প্রধান এবং সবচেয়ে বিশিষ্ট দিক, এবং এগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের দ্বারাই প্রকাশিত হয়েছে: অপার করুণা এবং সুতীব্র ক্রোধ। তোমাদের বেশিরভাগই ঈশ্বরের করুণার কিছুটা অভিজ্ঞতা লাভ করেছ, কিন্তু খুব কম জনই ঈশ্বরের ক্রোধ উপলব্ধি করেছ। ঈশ্বরের করুণা ও প্রেমময়তা প্রত্যেকের মধ্যেই দেখা যায়; অর্থাৎ, ঈশ্বর প্রত্যেকের প্রতিই অশেষ করুণাময়। তবুও খুব কম ক্ষেত্রেই—অথবা বলা যেতে পারে, কখনোই—তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা তোমাদের মধ্যে কোনো একদল লোকের প্রতি ঈশ্বর গভীরভাবে রাগান্বিত হননি। চিন্তা কোরো না! আগে হোক বা পরে, ঈশ্বরের ক্রোধ প্রত্যেকেই দেখতে পাবে ও তার অভিজ্ঞতা লাভ করবে, কিন্তু এখনও সেই সময় আসে নি। এমনটা কেন? কারণ ঈশ্বর যখন কারোর প্রতি প্রতিনিয়ত ক্রুদ্ধ থাকেন, অর্থাৎ যখন তিনি তাদের উপর নিজের সুতীব্র ক্রোধের অর্গল মুক্ত করেন, তখন বুঝতে হবে যে সেই ব্যক্তির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যানের মনোভাব ছিল, তিনি তাদের অস্তিত্বও ঘৃণা করেন, তাদের অস্তিত্ব আর তিনি সহ্য করতে পারেন না; আর তাঁর ক্রোধ তাদের উপর পড়লেই তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বর্তমানে ঈশ্বরে কাজ এখনও সেই স্থানে পৌঁছয় নি। ঈশ্বর সুতীব্রভাবে ক্রোধান্বিত হলে তোমরা কেউই তা সহন করতে পারবে না। তাহলে তোমরা দেখতেই পাচ্ছ, এই সময়ে তোমাদের প্রতি ঈশ্বর শুধুমাত্র অপার করুণাময়, তাঁর সুতীব্র ক্রোধ এখনও তোমাদের দেখা বাকি। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ এখনও নিশ্চিত না হয়ে থাকো, তাহলে তোমার উপর ঈশ্বরের ক্রোধ বর্ষিত হওয়ার প্রার্থনা করতে পারো, তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে ঈশ্বরের ক্রোধ এবং মানুষের অপরাধ বরদাস্ত না করা তাঁর স্বভাব সত্যিই বিদ্যমান রয়েছে কি না। সে সাহস আছে তোমাদের?

অন্তিম সময়ের মানুষেরা শুধুমাত্র ঈশ্বরের বাক্যেই তাঁর ক্রোধ প্রত্যক্ষ করে, ঈশ্বরের ক্রোধের প্রকৃত অভিজ্ঞতা লাভ করে না

শাস্ত্রের এই অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে ঈশ্বরের স্বভাবের যে দুটো দিক আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, তা কি আলোচনার যোগ্য? এই কাহিনী শুনে কি ঈশ্বর সম্পর্কে তোমাদের নতুন একটা উপলব্ধি হয়েছে? কী ধরনের উপলব্ধি হয়েছে তোমাদের? বলা যায়, সৃষ্টির লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত, এই সর্বশেষ দলের মানুষদের মতো আর কোনো দলই ঈশ্বরের এত করুণা ও প্রেমপূর্ণ মহানুভবতা উপভোগ করেনি। যদিও এই চূড়ান্ত পর্যায়ে ঈশ্বর বিচার ও শাস্তির কাজ করেছেন এবং মহিমা ও ক্রোধ সহকারে তাঁর কাজ করেছেন, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে তাঁর কাজ সম্পন্ন করার জন্য ঈশ্বর শুধুমাত্র বাক্য ব্যবহার করেন; বাক্য ব্যবহার করেই তিনি শিক্ষা দেন ও সিঞ্চন করেন, সরবরাহ করেন ও আহারদান করেন। ইতিমধ্যে ঈশ্বরের ক্রোধ সর্বদা প্রচ্ছন্নই থেকে গেছে, আর ঈশ্বরের বাক্যের মাধ্যমে তাঁর ক্রোধের অভিজ্ঞতা লাভ করা ছাড়া, খুব স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তিই ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ক্রোধের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। অর্থাৎ বলা যায়, ঈশ্বরের বিচার ও শাস্তির কাজের সময়, যদিও ঈশ্বরের বাক্যে প্রকাশিত ক্রোধ থেকে মানুষ তাঁর মহিমা এবং অপরাধের প্রতি তাঁর অসহিষ্ণুতার মনোভাব অনুভব করতে পারে, কিন্তু ঈশ্বরের ক্রোধ তাঁর বাক্যের সীমা অতিক্রম করে যায় না। অন্য ভাষায়, ঈশ্বর বাক্যের মাধ্যমে মানুষকে তিরস্কার করেন, তাকে অনাবৃত করেন, তার বিচার করেন, তাকে শাস্তি দেন, এমনকি নিন্দাও করেন—কিন্তু ঈশ্বর এখনও মানুষের প্রতি তীব্রভাবে ক্রোধান্বিত হননি, এমনকি তাঁর বাক্য ছাড়া আর কোনোভাবেই মানুষের উপর তাঁর ক্রোধ বর্ষণ করেননি। এইভাবে, ঈশ্বরের যে করুণা ও প্রেমপূর্ণ মহানুভবতার অভিজ্ঞতা মানুষ এই যুগে লাভ করেছে, তা ঈশ্বরের প্রকৃত স্বভাবেরই প্রকাশ, এদিকে, মানুষ ঈশ্বরের যে ক্রোধ অনুভব করেছে তা শুধুমাত্র তাঁর কথনের স্বর ও অনুভূতির প্রভাব। অনেকেই এই প্রভাবকে ভুলবশত ঈশ্বরের ক্রোধের প্রকৃত অভিজ্ঞতা ও প্রকৃত জ্ঞান বলে ভেবে নেয়। ফলস্বরূপ, বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করে যে ঈশ্বরের বাক্যের মধ্যে তারা তাঁর করুণা ও প্রেমপূর্ণ মহানুভবতা প্রত্যক্ষ করেছে, মানুষের অপরাধের প্রতি ঈশ্বরের অসহিষ্ণুতাও তারা দেখেছে, এমনকি তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মানুষের প্রতি ঈশ্বরের করুণা ও সহিষ্ণুতার স্তুতিও করেছে। তবে মানুষের আচরণ যত খারাপই হোক অথবা তার স্বভাব যত ভ্রষ্টই হোক না কেন, ঈশ্বর সর্বদাই তা সহ্য করেছেন। এই সহ্য করার মধ্যে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য হলো, তিনি যে বাক্য বলেছেন, যে প্রচেষ্টা করেছেন, ও যে মূল্য প্রদান করেছেন, সেগুলোর প্রভাব তাদের উপর পড়ার জন্য অপেক্ষা করা, যাদের তিনি অর্জন করতে চান। এই ধরনের ফলাফলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, এবং মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হয়, ঠিক যেমন জন্মের পরেই মানুষ যেমন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায় না; প্রাপ্তবয়স্ক হতে আঠারো বা উনিশ বছর সময় লাগে, কারোর ক্ষেত্রে আবার সত্যিকারের পরিণত অবস্থাপ্রাপ্ত হতে কুড়ি বা ত্রিশ বছরও সময় লেগে যায়। ঈশ্বর এই প্রক্রিয়ার সমাপ্তির জন্য অপেক্ষা করেন, এমন সময়ের আগমনের জন্যই অপেক্ষা করেন, এই ফলাফলের এসে পৌঁছনোর জন্য অপেক্ষা করেন। তাঁর এই অপেক্ষার সমস্ত সময়কালে, ঈশ্বর অপার করুণাময়। তবে, ঈশ্বরের কাজের সময়কালে, খুবই অল্প সংখ্যক লোককে আঘাত করা হয় এবং কিছুজন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে গুরুতর বিরোধিতার কারণে শাস্তি পায়। এই ধরনের উদাহরণগুলো মানুষের অপরাধের প্রতি ঈশ্বরের অসহিষ্ণুতার স্বভাবের বৃহত্তর প্রমাণ, এবং নির্বাচিত মানুষদের প্রতি তাঁর সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার বাস্তব অস্তিত্বকে এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করে। অবশ্যই, এইসব সাধারণ উদাহরণে, এই কয়েকটা বিচ্ছিন্ন উদাহরণে, এইসব মানুষদের মধ্যে ঈশ্বরের স্বভাবের যে আংশিক প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়, তা তাঁর সামগ্রিক পরিচালনামূলক পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে না। প্রকৃতপক্ষে, কাজের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঈশ্বর তাঁর অপেক্ষার সম্পূর্ণ সময়কাল জুড়ে সহ্য করেছেন, এবং তাঁর অনুগামীদের পরিত্রাণের জন্য তিনি তাঁর সহনশীলতা ও তাঁর জীবন বিনিময় করেছেন। তোমরা তা দেখতে পাও? ঈশ্বর অকারণে তাঁর পরিকল্পনা ব্যাহত করেন না। তিনি তাঁর ক্রোধ বন্ধনমুক্ত করতে পারেন, এবং তিনি করুণাময়ও হতে পারেন; এটাই ঈশ্বরের স্বভাবের প্রধান দুই অংশের উদ্ঘাটন। এটা কি যথেষ্ট স্পষ্ট, নাকি নয়? অন্য ভাষায়, ঈশ্বরের বিষয়ে বলতে গেলে, ঠিক ও ভুল, ন্যায় ও অন্যায়, ইতিবাচক ও নেতিবাচক—সবই মানুষকে পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে। তিনি কী করবেন, তিনি কী পছন্দ করেন, কোনটা ঘৃণা করেন—সবই সরাসরি তাঁর স্বভাবে প্রতিভাত হয়। এই ধরনের বিষয়গুলো ঈশ্বরের কাজেও সুস্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে দেখা যায় আর সেগুলো অস্পষ্ট বা সাধারণ নয়; পরিবর্তে, এগুলোতে ঈশ্বরের স্বভাব, তাঁর যা আছে এবং তিনি যা, সেগুলো মানুষ বিশেষভাবে মূর্ত, সত্য এবং বাস্তবিক পদ্ধতিতে দেখতে পায়। এটাই স্বয়ং প্রকৃত ঈশ্বর।

ঈশ্বরের স্বভাব কখনোই মানুষের থেকে প্রচ্ছন্ন ছিল না—মানুষের হৃদয়ই ঈশ্বরের থেকে বিপথগামী ছিল

আমি যদি এইসমস্ত বিষয়ে আলোচনা না করতাম, তোমরা কেউই বাইবেলের এই কাহিনীগুলো থেকে ঈশ্বরের স্বভাব প্রত্যক্ষ করতে পারতে না। এটাই সত্যি। কারণ, যদিও বাইবেলের কাহিনীগুলোতে ঈশ্বরের কিছু কাজ নথিবদ্ধ আছে, কিন্তু সেখানে ঈশ্বরের বাক্য বেশ কম, এবং ঈশ্বর তাঁর স্বভাবের প্রত্যক্ষ পরিচয় প্রকাশ করেননি, এবং খোলাখুলিভাবে তাঁর ইচ্ছাও মানুষের কাছে প্রকাশ করেননি। পরবর্তী প্রজন্ম এই নথিবদ্ধ বিবরণকে কাহিনী ছাড়া আর কিছু মনে করেনি, আর তাই মানুষ মনে করে, ঈশ্বর নিজেকে মানুষের থেকে প্রচ্ছন্ন রাখেন এবং মানুষের কাছ থেকে যা গোপন আছে তা ঈশ্বরের ছবি নয়, বরং তাঁর স্বভাব ও ইচ্ছা। আমার আজকের আলোচনার পরে, তোমাদের কি এখনও মনে হয় যে ঈশ্বর মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে রয়েছেন? তোমরা কি এখনও ভাবো যে ঈশ্বরের স্বভাব মানুষের থেকে আড়ালে রয়েছে?

সৃষ্টির লগ্ন থেকে ঈশ্বরের স্বভাব তাঁর কাজের সাথে পা মিলিয়ে চলেছে। তা কখনোই মানুষের থেকে গোপন ছিল না, বরং সর্বসমক্ষে সম্পূর্ণ প্রকাশিত ও, মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা ছিল। তবুও, সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষের হৃদয় ঈশ্বরের থেকে ক্রমে দূরবর্তী হয়ে পড়েছে, আর মানুষের ভ্রষ্টাচার যত গভীরতর হয়েছে, মানুষ ও ঈশ্বর ততই পরস্পরের থেকে আরও দূরে সরে গেছে। ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে, মানুষ ঈশ্বরের দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য গিয়েছে। মানুষ ঈশ্বরকে “প্রত্যক্ষ” করতে অসমর্থ হয়ে উঠেছে, ফলে তার কাছে ঈশ্বরের বিষয়ে কোনো “সংবাদ” আর নেই; তাই সে জানে না ঈশ্বর আছেন কি না, এমনকি সে এতদূর এগিয়ে যায় যে ঈশ্বরের অস্তিত্বই সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে, ঈশ্বরের স্বভাব, এবং তাঁর যা আছে এবং তিনি যা, এই সমস্ত বিষয়ে মানুষের যে উপলব্ধির অভাব, তা ঈশ্বর প্রচ্ছন্ন রয়েছেন বলে হয়নি, বরং ঈশ্বরের থেকে তার হৃদয় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলেই হয়েছে। যদিও মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, কিন্তু তার হৃদয় ঈশ্বরবিহীন, আর ঈশ্বরকে কীভাবে ভালোবাসতে হয় সে বিষয়ে সে অজ্ঞ, এবং ঈশ্বরকে ভালোবাসতেও সে চায় না, কারণ তার হৃদয় কখনোই ঈশ্বরের ঘনিষ্ঠ হতে চায় না ও সর্বদাই ঈশ্বরকে পরিহার করে চলে। ফলস্বরূপ, মানুষের হৃদয় ঈশ্বরের থেকে দূরে চলে গেছে। তাহলে তার হৃদয় কোথায়? প্রকৃতপক্ষে, মানুষের হৃদয় কোথাও যায়নি: ঈশ্বরকে তার হৃদয় সমর্পণ না করে অথবা ঈশ্বরের দেখার জন্য তা প্রকাশ না করে মানুষ তার হৃদয়কে নিজের জন্যই রেখে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও এমন ঘটনাও ঘটে যে কেউ কেউ প্রায়শই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, “হে ঈশ্বর, আমার হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করো—আমার সকল চিন্তাভাবনাই তোমার জানা,” আবার কেউ কেউ তো এমনকি তাদের প্রতি ঈশ্বরের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য শপথ গ্রহণ করে, যাতে শপথ ভঙ্গ করলে ঈশ্বর যেন তাদের শাস্তি দিতে পারেন। যদিও মানুষ ঈশ্বরকে নিজের অন্তঃস্থলে দৃষ্টিপাত করতে দেয়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সে ঈশ্বরের সমন্বয়সাধন ও ব্যবস্থাপনা মান্য করতে সক্ষম, আবার তার অর্থ এটাও নয় যে সে তার নিজের ভাগ্য, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সমস্ত কিছু ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণে সঁপে দিয়েছে। তাই, ঈশ্বরের কাছে তুমি যে শপথ করো বা যা-ই ঘোষণা করো তা নির্বিশেষে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তোমার হৃদয় তাঁর প্রতি এখনও অবরুদ্ধ, কারণ তুমি ঈশ্বরকে শুধু তোমার হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে দাও, তা নিয়ন্ত্রণ করার অনুমতি দাও না। অন্য ভাষায়, তুমি তোমার হৃদয় ঈশ্বরকে একেবারেই সমর্পণ করোনি, ঈশ্বরের শোনার জন্য কিছু তুমি শুধু শ্রুতিমধুর কথা বলো মাত্র; এদিকে তুমি তোমার ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল, ও কুপরিকল্পনা সহ বিভিন্ন রকমের প্রতারণামূলক উদ্দেশ্য ঈশ্বরের কাছ থেকে গোপন রাখো, এবং নিজের ভাগ্য ও নিয়তি নিজের হাতেই ধরে রাখো, গভীর ভয় পাও যে সেগুলো ঈশ্বর কেড়ে নেবেন। সুতরাং, ঈশ্বর কখনোই তাঁর প্রতি মানুষের আন্তরিকতা দেখতে পান না। যদিও মানুষের হৃদয়ের গভীর পর্যন্ত ঈশ্বর পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, এবং মানুষ কী ভাবছে ও কী করতে চায় তা দেখতে পান, দেখতে পান তার হৃদয়ে কী রাখা আছে, দেখতে পান যে মানুষের হৃদয় ঈশ্বরের নয়, এবং সে ঈশ্বরকে তার হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণ দেয়নি। অর্থাৎ বলা যায়, ঈশ্বর পর্যবেক্ষণ করার অধিকারী হলেও নিয়ন্ত্রণের অধিকার পাননি। মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতায় সে নিজেকে ঈশ্বরের ব্যবস্থাপনায় সঁপে দিতে চায় না, বা সেরকম কোনো উদ্দেশ্য তার নেই। মানুষ শুধু যে নিজেকে ঈশ্বরের কাছে রুদ্ধ করে রেখেছে তা-ই নয়, বরং এমন লোকও আছে যারা নিজেদের হৃদয় গুটিয়ে নেওয়ার উপায় চিন্তা করে, সুমধুর কথাবার্তা ও চাটুকারিতার মাধ্যমে মিথ্যা ধারণা তৈরি করে ঈশ্বরের আস্থা অর্জন করে এবং নিজেদের আসল চেহারা ঈশ্বরের দৃষ্টিসীমার বাইরে লুকিয়ে রাখে। ঈশ্বরকে দেখতে না দেওয়ার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য হল, তারা ঠিক কেমন, তা তাঁকে বুঝতে না দেওয়া। তারা তাদের হৃদয় ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করতে চায় না, বরং নিজেদের কাছেই রেখে দিতে চায়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হল, মানুষ যা করে এবং সে যা চায় তা সবই তার পরিকল্পিত, হিসাব করা, এবং নিজের সিদ্ধান্ত প্রসূত; এজন্য তার ঈশ্বরের অংশগ্রহণ বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় না, ঈশ্বরের সমন্বয়সাধন ও ব্যবস্থার প্রয়োজন তো আরোই নেই। অর্থাৎ, ঈশ্বরের আদেশ, তাঁর অর্পিত দায়িত্ব, বা ঈশ্বর মানুষের থেকে যা দাবি করেন, এর যেকোনো বিষয়েই মানুষ নিজের উদ্দেশ্য, অভিপ্রায়, সেই সময়কার অবস্থা ও পরিস্থিতির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষ সর্বদা নিজের পরিচিত জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি এবং নিজের বুদ্ধিমত্তাকেই বিচারের কাজে ও কোন পথ বেছে নেওয়া উচিত সেই সিদ্ধান্ত নিতে কাজে লাগায়, এর মধ্যে ঈশ্বরকে হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ করতে সে দেয় না। ঈশ্বর মানুষের যে হৃদয় প্রত্যক্ষ করেন, সেটা এমনই।

সূচনালগ্ন থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত, শুধু মানুষই ঈশ্বরের সাথে কথোপকথনে সক্ষম। অর্থাৎ, ঈশ্বরের সমস্ত সজীব বস্তু ও প্রাণীকূলের মধ্যে, মানুষ ছাড়া আর কেউই ঈশ্বরের সাথে কথোপকথনে সক্ষম নয়। মানুষের কান তাকে শোনার ক্ষমতা দেয়, চোখ তাকে দেখতে সক্ষম করে; তার রয়েছে নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব ধারণা, ও স্বাধীন ইচ্ছা। ঈশ্বর যা কিছু বলেন তা শোনার জন্য, ঈশ্বরের ইচ্ছা উপলব্ধির জন্য, ও তাঁর অর্পিত দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই মানুষের রয়েছে, আর তাই ঈশ্বর তাঁর সমস্ত ইচ্ছা মানুষের ওপর অর্পণ করেন, মানুষকে এমন এক সঙ্গী বানাতে চান যে তাঁর সমমনস্ক হবে ও তাঁর সাথে চলতে পারবে। যখন থেকে তিনি ব্যবস্থাপনার শুরু করেছেন, ঈশ্বর অপেক্ষা করে রয়েছেন কবে মানুষ তাঁকে হৃদয় সমর্পণ করবে, যাতে তিনি তাকে পরিশোধন ও প্রস্তুত করতে পারেন, তাকে ঈশ্বরের কাছে সন্তোষজনক ও প্রিয় করে তুলতে পারেন, তাকে ঈশ্বরকে সম্মান জ্ঞাপনে এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগে সক্ষম করতে পারেন। ঈশ্বর চিরকাল এই ফলাফলের প্রত্যাশা করেছেন ও এর জন্য অপেক্ষা করেছেন।

—বাক্য, খণ্ড ২, ঈশ্বরকে জানার প্রসঙ্গে, ঈশ্বরের কর্ম, ঈশ্বরের স্বভাব এবং স্বয়ং ঈশ্বর ২

পূর্ববর্তী: অব্রাহামকে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি

পরবর্তী: অনমনীয় ঈশ্বর-বিরোধিতার ফলে মানুষ ঈশ্বরের ক্রোধের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন