অধ্যায় ১৬

মানুষের পরিপ্রেক্ষিত থেকে ঈশ্বর এত মহান, এত প্রাচুর্যপূর্ণ, এত বিস্ময়কর, এত অতল; মানুষের চোখে ঈশ্বরের বাক্যগুলি মাথা চাড়া দিয়ে ঊর্ধ্বে ওঠে, এবং মনে হয় যেন পৃথিবীর এক মহান শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। কিন্তু মানুষের প্রচুর বিচ্যুতি আছে বলে, তাদের মন খুব সরল বলে, এবং তদুপরি, তাদের গ্রহণ ক্ষমতা অতি নগণ্য বলে, ঈশ্বর যত প্রাঞ্জলভাবেই তাঁর বাক্য উচ্চারণ করুন না কেন, তারা অনড় ও নিশ্চল থাকে, যেন মানসিক রোগগ্রস্ত। যখন তারা ক্ষুধার্ত, তারা বোঝে না তাদের খেতে হবে; যখন তারা তৃষ্ণার্ত, তারা বোঝে না তাদের পান করতে হবে; তারা শুধু চিৎকার ও আর্তনাদ করে যায়, যেন তারা তাদের আত্মার গভীরে কোনো অবর্ণনীয় ক্লেশ অনুভব করছে, কিন্তু সে ব্যাপারে কিছু বলতে পারছে না। ঈশ্বর যখন মানবজাতি সৃষ্টি করেন, তখন তাঁর অভিপ্রায় ছিল মানুষ স্বাভাবিক মানবতার মধ্যে জীবনধারণ করবে এবং তাদের প্রবৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঈশ্বরের বাক্যকে গ্রহণ করবে। কিন্তু যেহেতু, একদম আদিতেই মানুষ শয়তানের প্রলোভনের বশীভূত হয়েছিল, তাই আজ তারা নিজেকে মুক্ত করতে অসমর্থ রয়ে গেছে, এবং এখনও তারা হাজার-হাজার বছর ধরে শয়তানের দ্বারা সম্পাদিত কপট দুরভিসন্ধিগুলি সনাক্ত করতে অক্ষম। অধিকন্তু, মানুষের ঈশ্বরের বাক্যগুলি সম্পূর্ণভাবে বোঝার উপযুক্ত ধীশক্তির অভাব রয়েছে–এই সবকিছুর থেকেই বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভুত হয়েছে। আজকের পরিস্থিতিতে, মানুষ এখনো শয়তানের দ্বারা প্রলোভিত হওয়ার বিপদের মধ্যে বাস করে, আর তাই ঈশ্বরের বাক্যকে সঠিকভাবে মূল্যয়ন করতে অসমর্থ রয়ে যায়। স্বাভাবিক মানুষের প্রকৃতির মধ্যে কোনো কুটিলতা ও কপটতা থাকে না, পরস্পরের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে না, এবং তাদের জীবন মধ্যম মানেরও নয়, অধঃপতিতও নয়। তাই ঈশ্বরও সকলের দ্বারা বন্দিত হন; তাঁর বাক্য মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, মানুষ একে অপরের সাথে শান্তিতে এবং ঈশ্বরের তত্ত্বাবধান ও সুরক্ষার ছত্রছায়ায় বসবাস করে, পৃথিবী, সুসমন্বিত ও শয়তানের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে ওঠে, এবং ঈশ্বরের মহিমা মানুষের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত হয়। এই ধরণের মানুষরা দেবদূতদের অনুরূপ: বিশুদ্ধ, প্রাণশক্তিময়, যারা ঈশ্বরের বিষয়ে কখনো অভিযোগ করে না, এবং তাদের সকল প্রচেষ্টাকে শুধুমাত্র পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের মহিমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। এখন কৃষ্ণ রজনীকাল–সকলে হাতড়ে ও সন্ধান করে ফিরছে, এই নিকষ কালো রাত্রি তাদের শিহরিত করে, আর তারা কম্পিত না হয়ে পারে না; কান পেতে শুনলে, দমকার পর দমকায় বয়ে যাওয়া আর্তনাদরত উত্তর-পশ্চিমী হাওয়ার সাথে মানুষের শোকার্ত ফোঁপানি মিশে আছে বলে মনে হয়। তাদের অদৃষ্টের জন্য মানুষ দুঃখ এবং অশ্রুপাত করে। এমন কেন হয় যে তারা ঈশ্বরের বাক্য পাঠ করে অথচ তা উপলব্ধি করতে পারে না? মনে হয় যেন তাদের জীবন হতাশার কিনারায় পৌঁছে গেছে, যেন তাদের মৃত্যু হতে চলেছে, যেন তাদের অন্তিম দিন তাদের চোখের সামনে সমাগত। এহেন দুর্বিষহ পরিস্থিতিই সেই বিশেষ ক্ষণ যখন ভঙ্গুর দেবদূতগণ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ডেকে ওঠে, একের পর এক শোকাকুল কান্নার দমকের মাঝে তাদের দুঃখগাথার বিবরণ দেয়। এই কারণেই যে দেবদূতরা ঈশ্বরের সন্তান ও লোকেদের মাঝে কাজ করে, আর কখনো তারা মানুষের কাছে নেমে আসবে না; যাতে তারা দেহীরূপে থাকাকালীন শয়তানের নিপূন পরিচালনার মাঝে ধরা পড়ে নিজেদের মুক্ত করতে অসমর্থ না হয়, এবং সেহেতু তারা শুধু মানুষের কাছে অদৃশ্য আধ্যাত্মিক জগতে কাজ করে। তাই, ঈশ্বর যখন বলেন, “যে মুহূর্তে আমি মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে আরোহন করবো, সেই মুহূর্তেই আমার সন্তান ও আমার লোকেরা পৃথিবী শাসন করবে,” তিনি সেই ক্ষণটির কথা বলছেন যখন পৃথিবীর দেবদূতরা স্বর্গে ঈশ্বরের সেবা করার আশীর্বাদ উপভোগ করবে। যেহেতু মানুষ দেবদূতদের আত্মার অভিব্যক্তি, ঈশ্বর বলেন যে, মানুষের কাছে পৃথিবীতে অবস্থান করা স্বর্গে থাকার অনুরূপ; কারণ মানুষের পৃথিবীতে থেকে ঈশ্বরের সেবা করা দেবদূতদের স্বর্গে সরাসরি ঈশ্বরের সেবা করার সমতুল–এবং সেহেতু, পৃথিবীতে থাকাকালীন মানুষ তৃতীয় স্বর্গের আশীর্বাদ উপভোগ করে। এই বাক্যগুলির মাধ্যমে বস্তুত এটাই বলা হচ্ছে।

ঈশ্বরের বাক্যের মধ্যে প্রভূত অর্থ লুকিয়ে রয়েছে। “যখন সময় হবে, মানুষ তাদের অন্তরের গভীরে আমায় জানবে, এবং তাদের চিন্তায় আমায় স্মরণ করবে” এই বাক্যগুলি মানুষের আত্মার প্রতি উদ্দিষ্ট। দেবদূতগণ তাদের ভঙ্গুরতার কারণে সব বিষয়ে সব সময়ে ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে, এবং তারা চিরকাল ঈশ্বরের প্রতি অনুরক্ত ছিল ও তাঁকে ভক্তি করতো। কিন্তু শয়তানের উপদ্রবের কারণে, তারা নিজেদের সংযত করতে পারে না এবং আত্মনিয়ন্ত্রণে অপারগ; তারা ঈশ্বরকে ভালোবাসতে চায় কিন্তু সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে তাঁকে ভলোবাসতে অক্ষম, আর তাই তারা কষ্ট পায়। ঈশ্বরের কার্য যখন একটা বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছাবে, একমাত্র তখনই এই বেচারা দেবদূতদের ঈশ্বরকে যথার্থই ভালোবাসার বাসনা বাস্তবায়িত হতে পারে, এই কারণেই ঈশ্বর এই বাক্যগুলি বলেছিলেন। দেবদূতদের প্রকৃতি হল ঈশ্বরকে ভালোবাসা, লালন করা, ও মান্য করা, তবু পৃথিবীতে এগুলি অর্জন করতে তারা অসমর্থ হয়েছে, এবং বর্তমান সময় না আসা পর্যন্ত ধৈর্য অবলম্বন করা ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর থাকে নি। তোমরা আজকের পৃথিবীর দিকে একবার তাকিয়ে দেখতে পারো: সকল মানুষের অন্তরে এক ঈশ্বর রয়েছেন, তবু তাদের অন্তরে স্থিত এই ঈশ্বর প্রকৃত ঈশ্বর নাকি কোনো ভণ্ড ঈশ্বর–সেই পার্থক্য নিরূপণ করতে মানুষ অসমর্থ, এবং যদিও তারা তাদের এই ঈশ্বরকে ভালোবাসে, কিন্তু যথার্থ ঈশ্বরপ্রেমে তারা অক্ষম, যার অর্থ হল তাদের নিজেদের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ঈশ্বরের দ্বারা উন্মোচিত মানুষের কুৎসিত অবয়ব হল আধ্যাত্মিক জগতে শয়তানের প্রকৃত অবয়ব। মানুষ আদিতে নিরপরাধ ও নিষ্পাপ ছিল, এবং সেহেতু, মানুষের সমস্ত ভ্রষ্ট, কুৎসিত আদবকায়দা হল আধ্যাত্মিক জগতে শয়তানের ক্রিয়াকলাপ, এবং তা আধ্যাত্মিক জগতের ঘটনাবলীর এক বিশ্বস্ত নথি। “আজ মানুষের যোগ্যতা রয়েছে, এবং তারা ভাবে আমার সামনে তারা সদর্পে চলাফেরা করতে পারে, কোনোরকম সংকোচ না করে আমার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে পারে, এবং আমাকে সমপর্যায়ের মানুষের মতো সম্বোধন করতে পারে। এখনও মানুষ আমায় জানে না, এখনও তারা মনে করে আমরা প্রকৃতিতে অভিন্ন, আমরা উভয়েই দেহজ সত্তা, এবং উভয়েই মানব-জগতে বাস করি।” মানুষের হৃদয়ে শয়তান এটাই করেছে। ঈশ্বরের বিরোধিতা করতে শয়তান মানুষের পূর্বধারণা ও চর্মচক্ষুর ব্যবহার করে, ঈশ্বর তবু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানুষকে এই ঘটনাবলীর বিষয়ে বলেন, যাতে মানুষ এখানে বিপর্যয় এড়াতে পারে। সকল মানুষের মারণ-দুর্বলতা হল এই যে তারা কেবল “রক্ত-মাংসের একটা শরীর; এবং ঈশ্বরের আত্মাকে অনুভব করে না।” দেখে। এটাই শয়তানের মানুষকে প্রলোভনর একটি অভিমুখের ভিত্তি। সকল মানুষ বিশ্বাস করে যে শুধুমাত্র দেহরূপ রআত্মাকেই ঈশ্বর বলা যায়। কেউ বিশ্বাস করে না যে আজ, আত্মাই দেহে পরিণত হয়েছেন এবং বস্তুতই তাদের চোখের সামনে আবির্ভূত হয়েছেন; মানুষ ঈশ্বরকে দুটি অংশ হিসাবে দেখে–“পরিচ্ছদ ও দেহ”–এবং কেউই ঈশ্বরকে আত্মার অবতাররূপ হিসাবে দেখে না, কেউ বোঝে না যে দেহের সারসত্যই হল ঈশ্বরের স্বভাব। মানুষের কল্পনায়, ঈশ্বর সবিশেষরূপে স্বাভাবিক, কিন্তু তারা কি জানে না যে এই স্বাভাবিকতার মধ্যে ঈশ্বরের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিক লুকিয়ে আছে?

ঈশ্বর যখন সমগ্র বিশ্বকে আবৃত করতে শুরু করেন, তখন তা ঘোর তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, এবং মানুষ যখন নিদ্রামগ্ন, তখন ঈশ্বর মানুষের মধ্যে অবতরণের এই সুযোগ গ্রহণ করেন, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মাকে পৃথিবীর সকল প্রান্তে প্রেরণ করতে শুরু করেন, এবং মানবজাতিকে উদ্ধারের কাজে প্রবৃত্ত হন। বলা যায়, ঈশ্বর যখন দেহরূপ ধারণ আরম্ভ করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে পৃথিবীতে কার্য করেছিলেন। তখন আত্মার কার্য শুরু হয়েছিল, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীতে সকল কাজের সূচনা হয়েছিল। দুহাজার বছর ধরে ঈশ্বরের আত্মা সারা মহাবিশ্ব জুড়ে ক্রমাগত কাজ করেছেন। মানুষ তা জানেও না, আঁচও করে না, কিন্ত অন্তিম সময়ে, যখন, অনতিদূর ভবিষ্যতে, বর্তমান এই যুগের সমাপ্তি সমাগত, ঈশ্বর স্বয়ং কার্য করার জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন। অন্তিম সময়ে, যারা জন্ম নিয়েছিল, যারা দেহীরূপে অবস্থানকারী ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি ব্যক্তিগতভাবে দর্শন করতে সমর্থ, তাদের কাছে এ হল আশীর্বাদস্বরূপ। “সমুদ্রের সমগ্র পৃষ্ঠদেশ যখন অস্পষ্ট ছিল, মানুষের মধ্যে আমি জগতের তিক্ততার আস্বাদন শুরু করেছিলাম। আমার আত্মা সারা পৃথিবী ব্যাপী পর্যটন করে এবং সকল মানুষের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তবুও, তেমনই, আমি আমার অবতার দেহে মানবজাতিকে জয় করি।” স্বর্গের ঈশ্বর ও পৃথিবীর ঈশ্বরের মধ্যে সুসমন্বিত সহযোগিতা এমনটাই। পরিশেষে, তাদের চিন্তায় মানুষ বিশ্বাস করবে যে, পৃথিবীর ঈশ্বরই স্বর্গের ঈশ্বর, আকাশ ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যের সমস্তকিছু পৃথিবীর ঈশ্বরের দ্বারাই সৃষ্ট হয়েছিল, পৃথিবীর ঈশ্বরের দ্বারাই মানুষ নিয়ন্ত্রিত হয়, পৃথিবীর ঈশ্বরই স্বর্গে পৃথিবীর উপর কার্য করেন, এবং স্বর্গের ঈশ্বর অবতাররূপে আবির্ভূত হয়েছেন। এটাই পৃথিবীর উপর ঈশ্বরের কার্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য, এবং তাই, এই পর্যায় হল অবতাররূপের সময়কালে সম্পাদিত কার্যের সর্বোচ্চ মান; এটি দেবত্বে সম্পন্ন হয়, এবং সকল মানুষকে ঐকান্তিকভাবে প্রতীত করে তোলে। মানুষ যত তাদের পূর্বধারণার মধ্যে ঈশ্বরের খোঁজ করে, তত তাদের মনে হয় যে পৃথিবীর ঈশ্বর বাস্তব নন। এই কারণেই, ঈশ্বর বলেন যে মানুষ ফাঁকা বুলি ও মতবাদসমূহের মধ্যে ঈশ্বরের খোঁজ করে। মানুষ যত বেশি তাদের পূর্বধারণার মাধ্যমে ঈশ্বরকে জানে, এইসব কথা ও মতবাদ বলার ব্যাপারে তারা তত বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে এবং তত বেশি তারা প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে; মানুষ যত বেশি করে কথা ও মতবাদ আওড়ায়, ঈশ্বর থেকে তারা তত দূরে সরে যায়, মানুষের সারসত্যকে জানার পক্ষে তারা তত অসমর্থ হয়ে পড়ে, তত বেশি করে তারা ঈশ্বরকে অমান্য করে, এবং ঈশ্বরের চাহিদা থেকে তারা তত বেশি বিচ্যুত হয়। মানুষের থেকে ঈশ্বরের চাহিদা লোকে যতটা অতিপ্রাকৃত বলে কল্পনা করে ততটা মোটেই নয়, তবু কেউ কখনো ঈশ্বরের অভিপ্রায়কে যথার্থভাবে উপলব্ধি করেনি, এবং সেহেতু ঈশ্বর বলেন, “মানুষ শুধু সীমাহীন আকাশে, বা তরঙ্গায়িত সমুদ্রের উপর, বা নিথর হ্রদের উপর, অথবা শূণ্যগর্ভ শব্দার্থ ও মতবাদের ভিতরেই সন্ধান করে।” মানুষের কাছে ঈশ্বর যত বেশি চাহিদা রাখেন, মানুষ ঈশ্বরকে তত বেশি করে অনধিগম্য বলে বোধ করে, এবং তারা তত বেশি করে বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর মহান। তাই, তাদের সচেতনতায়, ঈশ্বরের মুখ থেকে উচ্চারিত সকল বাক্যই মানুষের পক্ষে অলভ্য, ফলে ঈশ্বরের ব্যক্তিগতভাবে কাজে উদ্যোগী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না; এদিকে, মানুষের ঈশ্বরের সাথে সহযোগিতা করার বিন্দুমাত্র প্রবৃত্তি দেখা যায় না, এবং কেবলমাত্র মাথা নত করার ও পাপ স্বীকার করার অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়, বিনয়ী ও অনুগত হতে চেষ্টা করে। বলতে গেলে, কিছু উপলব্ধি না করেই মানুষ এমনতর নতুন ধর্মে ও ধর্মীয় আচরণবিধির মধ্যে প্রবেশ করে যা এমনকি ধর্মীয় গির্জার আচরণবিধির চেয়েও বেশি চরম। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের নিজ-নিজ নেতিবাচক স্থিতিকে ইতিবাচক স্থিতিতে রূপান্তরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন; নচেৎ, মানুষ গভীরতরভাবে ফাঁদে পড়ে যাবে।

ঈশ্বর তাঁর এতো বেশি সংখ্যক উচ্চারণে কেন পর্বতরাজী ও জলরাশির বর্ণনায় মনোনিবেশ করেছেন? এই শব্দগুলির কি সাঙ্কেতিক অর্থ আছে? ঈশ্বর কেবল যে মানুষকে তাঁর দেহরূপে সম্পাদিত কার্য দেখতে দেন তা-ই নয়, অন্তরীক্ষে তাঁর ক্ষমতাও মানুষকে উপলব্ধি করার সুযোগ দেন। এই ভাবে, ইনিই যে দেহরূপী ঈশ্বর তা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করার সাথে সাথে, মানুষ বাস্তববাদী ঈশ্বরের কাজকর্মের বিষয়েও জানতে পারে, এবং এইভাবে মর্ত্যের ঈশ্বর স্বর্গ অভিমুখে প্রেরিত হন, এবং স্বর্গের ঈশ্বর ধরায় অবতরণ করেন, কেবল এর পরেই মানুষ ঈশ্বর যা সব, তা আরো সম্পূর্ণভাবে দেখতে ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিষয়ে প্রগাঢ়তর জ্ঞান অর্জনে সমর্থ হয়। দেহরূপে ঈশ্বর মানবজাতিকে যত বেশি করে জয় করতে এবং ঊর্ধ্বে ও সারা মহাবিশ্বে ভ্রমণ করার জন্য যত বেশি করে দেহকে অতিক্রম করতে সমর্থ হন, তত বেশি করে মানুষ বাস্তববাদী ঈশ্বরকে দর্শনের মাধ্যমে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ড দর্শন করতে সক্ষম হয়, এবং এইভাবে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে ঈশ্বরের কার্যের সত্যতাকে জানতে সমর্থ হয়–জানতে পারে তা মিথ্যা নয়, বাস্তব–এবং সেহেতু তারা জানতে পারে যে আজকের বাস্তববাদী ঈশ্বর হলেন আত্মার মূর্ত প্রকাশ, এবং তিনি মানুষের অনুরূপ দেহধারী কেউ নন। তাই, ঈশ্বর বলেন, “কিন্তু আমি যখন আমার ক্রোধকে অর্গলমুক্ত করি, পর্বতমালা তৎক্ষণাৎ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, মৃত্তিকা সেই মুহূর্তেই প্রকম্পিত হতে শুরু করে, জল তখনই বিশুষ্ক হয়ে যায়, এবং মানুষ অচিরাৎ বিপর্যয়-কবলিত হয়।” মানুষ যখন ঈশ্বরের বাক্য পাঠ করে, বাক্যগুলিকে তারা ঈশ্বরের দেহরূপের সাথে সংশ্লিষ্ট করে, আর এই ভাবে, আধ্যাত্মিক জগতের কার্য ও বাক্য সরাসরি দেহধারী ঈশ্বরের দিকে নির্দেশ করে, যা আরো কার্যকরী ফলাফল এনে দেয়। ঈশ্বর যখন বাক্য বলেন, তা প্রায়শই স্বর্গ থেকে পৃথিবীর দিকে চালিত হয়, এবং তারপর পুনরায় হয় পৃথিবী থেকে স্বর্গের দিকে চালিত, ফলে সকল মানুষই ঈশ্বরের বাক্যের প্রেরণা ও উৎস অনুধাবন করতে অসমর্থ হয়। “আমি যখন গগনমণ্ডলের মাঝে থাকি, আমার উপস্থিতিতে কখনো নক্ষত্ররাজি ত্রাসে জর্জরিত হয়নি। পরিবর্তে, আমার হয়ে তাদের কাজে তারা মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছে।” এই হল স্বর্গের পরিস্থিতি। ঈশ্বর নিয়মনিষ্ঠভাবে সবকিছু তৃতীয় স্বর্গে বিন্যস্ত করেন, যেখানে ঈশ্বরের সেবায় নিয়োজিত সকল পরিচারক ঈশ্বরের নিমিত্ত তাদের নিজ নিজ কর্ম সম্পাদন করে। ঈশ্বরের অবাধ্য হয়ে তারা কখনো কোনো কাজ করেনি, তাই, ঈশ্বরকথিত ত্রাস-বিচলিত না হয়ে, পরিবর্তে তারা নিজ-নিজ কর্মে মনপ্রাণ নিয়োজিত করে; কখনো কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না, আর তাই সকল দেবদূত ঈশ্বরের আলোর মধ্যে বাস করে। অন্যদিকে, তাদের অবাধ্যতার কারণে, এবং তারা ঈশ্বরকে জানে না বলে, পৃথিবীর সকল মানুষ অন্ধকারে বাস করে, আর তারা যত ঈশ্বরের বিরোধিতা করে, তত বেশি করে তারা তমসাচ্ছন্ন জীবনধারণ করে। ঈশ্বর যখন বলেন, “আকাশ যত উজ্জ্বলতর, নিম্নের পৃথিবী তত বেশি অন্ধকারময়,” ঈশ্বরের দিন ক্রমাগত কীভাবে সমগ্র মানবজাতির নিকটে ঘনিয়ে আসছে তিনি তার প্রতি নির্দেশ করেছেন। সুতরাং, তৃতীয় স্বর্গে ঈশ্বরের ৬,০০০ বছরের ব্যস্ততা শীঘ্রই সমাপ্ত হবে। পৃথিবীর সকলকিছু অন্তিম পরিচ্ছেদে প্রবেশ করেছে, এবং শীঘ্রই প্রত্যেককে ঈশ্বরের হাত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। অন্তিম সময়ের মেয়াদের মধ্যে মানুষ যত বেশি দূর অবধি অগ্রসর হয়, তত বেশি করে তারা মানবজগতের অনাচার আস্বাদন করতে সক্ষম হয়; অন্তিম সময়ের মেয়াদের মধ্যে তারা যত বেশি দূর অবধি প্রবিষ্ট হয়, নিজস্ব দৈহিক কামনার বিষয়ে তারা তত বেশি অসংযত হয়। এমনও অনেকে রয়েছে যারা বিশ্বের এই শোচনীয় অবস্থার গতিমুখ ফেরাতে চায়, কিন্তু ঈশ্বরের ক্রিয়াকর্মের কারণে দীর্ঘশ্বাসের মাঝে তাদের আশা লুপ্ত হয়। এই ভাবে, মানুষ যখন বসন্তের উত্তাপ টের পায়, ঈশ্বর তাদের চোখ আবৃত করেন, আর তাই তারা প্রবহমান তরঙ্গে ভেসে চলে, তাদের কেউই দূরবর্তী উদ্ধার-তরীর নাগাল পেতে সমর্থ হয় না। মানুষ যেহেতু মজ্জাগতভাবে দুর্বল, ঈশ্বর বলেন যে এমন কেউ-ই নেই যে পরিস্থিতির মোড় ফেরাতে পারে। মানুষ যখন আশা হারিয়ে ফেলে, ঈশ্বর সমগ্র বিশ্বজগতের উদ্দেশ্যে কথন আরম্ভ করেন। সমগ্র মানবজাতিকে তিনি উদ্ধার আরম্ভ করেন, এবং একমাত্র তার পরেই মানুষ সেই নতুন জীবনকে উপভোগ করতে পারে, যেখানে পরিস্থিতির মোড় একবার ফেরানো গেলে তবেই উপনীত হওয়া যায়। আজকের মানুষ আত্ম-প্রতারণার পর্যায়ে আছে। তাদের সম্মুখবর্তী পথ এতো ঊষর ও অস্পষ্ট বলে, এবং তাদের ভবিষ্যৎ “সীমাহীন” ও “সীমান্তহীন” বলে, এই যুগের মানুষের লড়াই করার কোনো মানসিকতা নেই, এবং এরা শুধু এদের দিনগুলি অপরিণামদর্শী ভাবে অতিবাহিত করতে পারে। এমন কখনো কেউ থাকে নি যে তার জীবন ও মানুষের অস্তিত্ব বিষয়ক জ্ঞানকে গুরুত্ব সহকারে অনুসরণ করেছে; পরিবর্তে, তারা সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে যেদিন স্বর্গস্থিত উদ্ধারকর্তা অকস্মাৎ জগতের শোচনীয় অবস্থার মোড় ফেরাবার জন্য অবরোহন করবে, একমাত্র তার পরেই তারা ঐকান্তিকভাবে জীবন যাপনে সচেষ্ট হবে। এ-ই হল সমগ্র মানবজাতির এবং সকল মানুষের মানসিকতার প্রকৃত অবস্থা।

আজ, মানুষের বর্তমান মানসিকতা বিবেচনা করে ঈশ্বর মানুষের ভবিষ্যৎ নতুন জীবন বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এটাই ঈশ্বর-কথিত আলোর আবির্ভাবের ক্ষীণ আভাস। ঈশ্বর যা ভবিষ্যদ্বাণী করেন তা হল অন্তিমে ঈশ্বরের দ্বারা যা অর্জিত হবে, এবং তা শয়তানের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের জয়লাভের ফসল। “সকল মানুষের ঊর্ধ্বে আমি বিচরণ করি এবং সর্বত্র আমি লক্ষ্য রাখছি। কোনোকিছুই আর কখনো পুরাতন দেখায় না, এবং কোনো মানুষই আর আগের মতো নেই। সিংহাসনের উপর আমি বিশ্রাম নিই, সমগ্র মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বে আমি এলিয়ে পড়ি…” এ-ই হল ঈশ্বরের বর্তমান কার্যের ফলাফল। ঈশ্বরের সকল মনোনীত মানুষ তাদের আদি রূপে ফিরে আসে, যার ফলে যে দেবদূতরা বহু বছর ধরে কষ্ট পেয়েছে তারা মুক্তি পায়, ঠিক যেমনটি ঈশ্বর বলেন, “তাদের মুখাবয়ব মানুষের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত পবিত্র ঈশ্বরের মতো।” যেহেতু দেবদূতগণ পৃথিবীতে কাজ করে এবং পৃথিবীতে ঈশ্বরের সেবা করে, এবং যেহেতু ঈশ্বরের মহিমা সমগ্র বিশ্বময় পরিব্যপ্ত হয়, সেহেতু স্বর্গ পৃথিবীতে আনীত হয়, এবং পৃথিবী স্বর্গে উত্থিত হয়। সেহেতু, মানুষ হল সেই যোগসূত্র যা স্বর্গ ও পৃথিবীকে সংযুক্ত করে; স্বর্গ ও পৃথিবী আর পরস্পর দূরবর্তী নয়, আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং তারা সংযুক্ত হয়ে এক হয়ে গিয়েছে। সারা বিশ্ব জুড়ে শুধু ঈশ্বর ও মানুষ রয়েছে। কোনো ধূলা বা ময়লা নেই, এবং সবকিছু নবায়িত হয়েছে, যেন আকাশের নীচে এক শ্যামল তৃণভূমিতে ছোট্ট একটা মেষশাবক শুয়ে আছে, ঈশ্বরের সকল মহিমা উপভোগ করছে। এবং এই শ্যামলিমার আবির্ভাবের কারণেই জীবনের শ্বাসবায়ু দীপ্যমান হয়ে উঠেছে, কারণ অনন্তকালের জন্য মানুষের সাথে বাস করার জন্য ঈশ্বর পৃথিবীতে আগত হন, ঈশ্বরের মুখ থেকে ঠিক যেমন বলা হয়েছিল যে, “আরেকবার আমি শান্তিতে সিয়োনে বাস করতে পারি।” এ-ই হল শয়তানের পরাজয়ের প্রতীক, এ হল ঈশ্বরের বিশ্রামের দিন, এবং এই দিনটি সকল মানুষের দ্বারা প্রশংসিত ও প্রচারিত হবে, এবং সকল মানুষের দ্বারা এর স্মৃতি সংরক্ষিত হবে। সিংহাসনের উপর ঈশ্বর যখন বিশ্রামরত, তা-ই হল সেই ক্ষণ যখন ঈশ্বর পৃথিবীতে তাঁর কার্য সমাপন করেন, এবং তা হল ঠিক সেই মুহূর্ত যখন ঈশ্বরের সকল রহস্য মানুষের কাছে প্রদর্শিত হয়; ঈশ্বর ও মানুষ চিরটাকাল সুসমন্বিত রইবে, কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না–রাজ্যের মনোরম দৃশ্যাবলী এমনই!

রহস্যের ভিতর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে; ঈশ্বরের বাক্য প্রকৃতপক্ষেই নিগূঢ় এবং অতল!

পূর্ববর্তী: অধ্যায় ২৯

পরবর্তী: অধ্যায় ১৬

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।👇

সম্পর্কিত তথ্য

ঈশ্বরের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

যে পথে মানুষ ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে এবং ঈশ্বরের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে, সেই পথটি হল নিজের হৃদয়ে ঈশ্বরের পরম শক্তিকে স্থান দিয়ে তাঁর...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন