আইন-কানুনের যুগের কর্মকাণ্ড

যিহোবা ইস্রায়েলীদের উপর যে কাজ করেছিলেন, তা মানবজাতির কাছে ঈশ্বরের উত্থানের পার্থিব স্থানটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই পবিত্র স্থানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর কাজ ইস্রায়েলে মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। ইস্রায়েলের বাইরে তিনি কাজ করেননি, বরং এমন মানুষদেরই মনোনীত করেছিলেন, যারা তাঁর কাজের পরিধিকে সীমাবদ্ধ রাখার উপযুক্ত। ইস্রায়েলই সেই স্থান যেখানে ঈশ্বর আদম ও ইভকে সৃষ্টি করেছিলেন, এবং এখানকার ধূলার মধ্য থেকে যিহোবা গড়ে তুলেছিলেন মানবজাতিকে। এই স্থানই পৃথিবীতে ঈশ্বরের কাজের ভিত্তি হিসাবে গড়ে ওঠে। নোহ এবং আদমের বংশধর ইস্রায়েলীরাই ছিল পৃথিবীতে যিহোবার কাজের মানব ভিত্তি ছিল।

এই সময় ইস্রায়েলে যিহোবার কাজের তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং বিভিন্ন পদক্ষেপের পিছনে ছিল গোটা বিশ্বে তাঁর কাজের সূচনা করা, যে কাজ ইস্রায়েলকে কেন্দ্র করে, ক্রমে বিধর্মী জাতিবর্গের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ছিল তাঁর নীতি যার উপর ভিত্তি করে তিনি বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র কাজ করেন। এই নীতির মূল কথাই হল প্রথমে একটি উদাহরণ স্থাপন করা এবং তার পরিধিকে ক্রমে বিস্তৃত করা, যতক্ষণ না বিশ্বের সব মানুষ তাঁর সুসমাচার গ্রহণ করে। প্রথম ইস্রায়েলীরা ছিল নোহর বংশধর। এই মানবগোষ্ঠী যিহোবার নিঃশ্বাসের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছিল আর তারা তাদের জীবনের মূল প্রয়োজন মেটানোর জন্য উপযুক্ত জ্ঞানটুকুই পেয়েছিল। কিন্তু যিহোবা কেমন ঈশ্বর, মানবজাতির সম্পর্কে তাঁর কী ইচ্ছা এসব তারা জানতো না। এমনকি, সকল সৃষ্টির মূলে যে ঈশ্বর, তাঁর সম্মান কীভাবে করতে হবে, তাও তাদের অজানা ছিল। যেমন, তাদের কোনো নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে কিনা,[ক] অথবা, স্রষ্টার প্রতি সৃষ্ট মানবজাতির কি কোনো কর্তব্য পালনীয়-আদমের উত্তরপুরুষ এসবের কিছুই জানতো না। তারা কেবল জানতো যে, স্বামী তার পরিবার প্রতিপালনের জন্য পরিশ্রম করবে, আর স্ত্রী তার স্বামীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে এবং যিহোবার সৃষ্ট মানবজাতির বংশধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখার কাজ করবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, এই ধরনের লোকেরা যারা যিহোবার নিঃশ্বাস এবং তাঁর জীবনের ছোঁয়া পেয়েছিল, তারা ঈশ্বরের অনুশাসন পালন অথবা সৃষ্টিকর্তাকে কী উপায়ে সন্তুষ্ট করা যায়, এসব সম্পর্কে কিছুই জানতো না। তাদের জ্ঞানের পরিধি বড়ই সামান্য ছিল। যদিও তাদের হৃদয়ে কোনো কুটিলতা অথবা শঠতা ছিল না এবং তাদের মধ্যে ঈর্ষার আধিক্য বা পারস্পরিক বিবাদ দেখা দেয়নি, তা সত্ত্বেও সকল সৃষ্টির আদি স্রষ্টা যিহোবা সম্পর্কে তাদের না ছিল জ্ঞান, না কোনো বোধ। মানবজাতির এই আদি পূর্বপুরুষরা কেবল যিহোবার দেওয়া খাদ্য খেতে এবং তাঁর দেওয়া বস্তু উপভোগ করতে জানতো। কিন্তু কীভাবে তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে হবে তা জানতো না। তারা এই সত্য সম্পর্কে অবহিত ছিলনা যে যিহোবাই সেই সর্বশক্তিমান, যাঁর সামনে তাদের নতজানু হয়ে প্রার্থনা করা উচিত। অতএব তাদের কীভাবে তাঁর সৃষ্ট জীব বলা যাবে? যদি তাই হত, তাহলে “যিহোবা হলেন সকল সৃষ্টির প্রভু” এবং “তিনি মানবজাতির সৃষ্টি করেন যাতে তাদের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রকাশ ঘটে, তারা তাঁকে গৌরবান্বিত করে এবং তাঁর প্রতিনিধিত্ব করে”- এইসব কথা কি অর্থহীন হয়ে যেত না? যে মানুষের যিহোবার প্রতি কোনো ভক্তি নেই, তারা তাঁর সম্মানের সাক্ষ্য কীভাবে হতে পারে? কীভাবেই বা তারা তাঁর মহিমার প্রকাশ রূপে দেখা দিতে পারে? তাহলে কী যিহোবার কথা “মানুষকে আমি আমার প্রতিচ্ছবি হিসাবে গড়ে তুলেছি”-শয়তানের, এক অশুভ শক্তির, হাতের অস্ত্র হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যাবে না? এই কথাগুলি কি তাহলে যিহোবার মানবজাতি সৃষ্টিকে অসম্মান করার চিহ্ন হয়ে ওঠে না? এই পর্যায়ের কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য যিহোবা মানবজাতিকে সৃষ্টি করার পরে আদম থেকে নোহ পর্যন্ত, তাদের কোনো নির্দেশ দেননি অথবা পরিচালনা করেননি। বরং, বিধ্বংসী বন্যায় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেই তিনি আদম ও নোহর উত্তরপুরুষ ইস্রায়েলীদের দিকনির্দেশ করা শুরু করেন। তাঁর কাজ এবং কথন ইস্রায়েলের সব মানুষ, যারা সেই দেশে তাদের জীবনযাপন করছিল, তাদের পরিচালনা করেছে, এইভাবে মানবজাতিকে এই সত্য দেখাতে পেরেছেন যে, যিহোবা শুধু মানুষকে জীবন দান করতে পারেননা, তাঁর মাধ্যমে ধূলার থেকে মানবজাতির সৃষ্টিই শুধু হয়না, তিনি প্রয়োজনে মানবজাতিকে ভস্মীভূত করতে পারেন, তাদের অভিসম্পাত করতে পারেন এবং তাঁর ন্যায়দণ্ড দিয়ে তাদের পরিচালনাও করতে পারেন। তাই তারা এও দেখেছিল যে, যিহোবা পৃথিবীতে মানুষের জীবনের দিকনির্দেশ করতে পারেন এবং দিনে ও রাতে যেকোনো সময়েই মানবজাতির সঙ্গে কথা বলতে ও তাদের মধ্যে কাজ করতে পারেন। তাঁর কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁর সৃষ্ট প্রাণীরা যাতে জানতে পারে যে তাঁর চয়ন করা ধূলার থেকেই মানবজাতির জন্ম এবং মানুষ তাঁরই হাতে সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর কাজ ইস্রায়েলেই শুরু করেছিলেন যাতে অন্যান্য মানুষ এবং রাষ্ট্র (যারা বস্তুত ইস্রায়েলের থেকে পৃথক নয়, বরং ইস্রায়েলীদের শাখা-প্রশাখা হিসাবে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আদম ও ইভেরই বংশধর) ইস্রায়েলের থেকে যিহোবার সুসমাচার গ্রহণ করতে পারে, যাতে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সকল প্রাণী যিহোবার প্রতি সম্মানশীল হয়ে তাঁকে মহান হিসাবে গণ্য করতে পারে। যিহোবা যদি তাঁর কাজ ইস্রায়েলে শুরু না করে তার পরিবর্তে মানবজাতিকে সৃষ্টি করে পৃথিবীর বুকে ইচ্ছামতো জীবনযাপন করতে দিতেন, তাহলে সেই ক্ষেত্রে মানুষের জৈবিক প্রকৃতির কারণেই (এক্ষেত্রে প্রকৃতির অর্থ হল, মানুষ চোখে যা দেখতে পায়না, তা তারা কোনোদিনই জানতে পারেনা, অর্থাৎ তারা কখনোই জানতে পারতো না যে যিহোবাই মানবজাতির সৃষ্টি করেছেন, এমনকি কেন তা করেছেন, তাও উপলব্ধি করতে পারতো না) তারা জানতেও পারতো না যে যিহোবাই মানবজাতির সৃষ্টি করেছেন অথবা তিনিই সকল সৃষ্টির প্রভু। যিহোবা যদি মানবজাতির সৃষ্টি করে তাদের পৃথিবীতে এনে, তাদের মধ্যে থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের পথনির্দেশ না দিয়ে, তাদের থেকে শুধু হাত ঝেড়ে চলে যেতেন, তাহলে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বই আজ অর্থহীন হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, আকাশ ও পৃথিবী এবং তাঁর সৃষ্টি করা অগণ্য সমস্ত কিছু সকল মানবজাতি শূন্যতার পথে চলে যেত এবং সর্বোপরি তারা শয়তানের দ্বারা পদদলিত হয়ে যেত। এইভাবে “এই পৃথিবীতে, অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টির মাঝে তাঁর এক পবিত্র অবস্থান থাকা উচিত” এই মর্মে যিহোবার যে ইচ্ছা তা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যেত। আর তাই, মানবজাতিকে সৃষ্টি করে তিনি তাদের মধ্যে অবস্থান করে তাদের দিকনির্দেশ করতে অথবা তাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন একটিই উদ্দেশ্যে—যাতে তাঁর ইচ্ছা, তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। তাঁর সৃষ্টিরও আগে তিনি যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তার রূপায়ণের জন্যই তিনি ইস্রায়েলে কাজ করতে শুরু করেছিলেন। তাই তাঁর প্রথমে ইস্রায়েলে কাজ করা এবং সকল প্রাণীর সৃষ্টি করার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং দুটিই করা হয়েছিল তাঁর ব্যবস্থাপনা, তাঁর কাজ ও তাঁর মহিমার কারণে। সেইসঙ্গে মানবজাতি সৃষ্টির অর্থকে আরও গভীরতা দেওয়ার জন্যও তিনি এই কাজ করেছিলেন। নোহর পরে আরো দুহাজার বছর পর্যন্ত তিনি মানবজাতির জীবনের দিকনির্দেশ করেছেন। এইসময় তিনি মানবজাতিকে শিখিয়েছিলেন যে যিহোবা, যিনি সকল সৃষ্টির প্রভু, তাঁর প্রতি কীভাবে সম্মান জ্ঞাপন করতে হয়, কীভাবে নিজেদের জীবনকে পরিচালনা করতে হয় এবং সর্বোপরি কীভাবে যিহোবার সাক্ষী হিসাবে কাজ করতে, তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে ও সম্মান জ্ঞাপন করতে হয়, এমনকি সঙ্গীতের মাধ্যমে তাঁর স্তুতি করতেও শিখিয়েছিলেন, যেমন ডেভিড ও তার ধর্মযাজকরা করেছিল।

যিহোবা যে দুহাজার বছর ধরে কাজ করেছিলেন, তার আগে মানুষ কিছুই জানতো না। শুধু তাই নয়, সমগ্র মানবজাতি দুরাচারে ডুবে ছিল। বিধ্বংসী বন্যায় পৃথিবী ধ্বংসের আগে তারা অশ্লীলতা এবং ভ্রষ্টাচরণে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল যে তাদের হৃদয় যিহোবার পুণ্য পরশ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছিল, তারা তাঁর সঠিক পথের আশায় বসে ছিল। যিহোবা যে কোন কাজ করবেন তা তাদের ধারণার বাইরে ছিল। তাদের মধ্যে যুক্তিবোধের অভাব ছিল, জ্ঞানের অভাব আরও বেশি ছিল এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যন্ত্রের মতো তারা সম্পূর্ণভাবে মানুষ, ঈশ্বর, পৃথিবী, জীবন ইত্যাদি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। সাপুড়ে যেমন সাপকে নানা প্রলোভন দেখাবার খেলা করে, ঠিক তেমনই পৃথিবীতে তারা নানা প্রলোভন মূলক কাজে লিপ্ত ছিল এবং এমন কথা বলত, যা যিহোবার কাছে আপত্তিকর। কিন্তু তারা অজ্ঞ ছিল বলে যিহোবা তাদের শাস্তি প্রদান করেননি বা শৃঙ্খলাপরায়ণ করে তোলেন নি। কেবল বন্যার শেষে নোহর বয়স যখন ৬০১ বছর, তখন যিহোবা নোহর সামনে আবির্ভূত হন। নোহ ও তার বংশধরদের এবং যেসব পশুপাখি বন্যার পরেও জীবিত ছিল, তাদের তিনি পথনির্দেশ করেন। এই প্রক্রিয়া আইন-কানুনের যুগের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল, অর্থাৎ মোট ২৫০০ বছর। তিনি ইস্রায়েলে কাজ করেছিলেন, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে সব মিলিয়ে ২০০০ বছর ধরে কাজ করা হয়েছিল, আর ইস্রায়েলের সাথেই তার বাইরের ভূখণ্ডে কাজ করেছিলেন ৫০০ বছর ধরে, অর্থাৎ মোট ২৫০০ বছর। এই সময়কালে তিনি ইস্রায়েলীদের নির্দেশ দেন যে, যিহোবার সেবা করতে হলে তাদের উপাসনাগৃহ নির্মাণ করতে হবে, ভোরবেলা ধর্মযাজকের পোশাক পরে খালি পায়ে উপাসনাগৃহে আসতে হবে। তাদের জুতোর দ্বারা যদি উপাসনাগৃহ অপবিত্র হয়, তাহলে উপাসনাগৃহের চূড়া থেকে তাদের উপর আগুন নিক্ষেপিত হবে এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হবে। তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছিল এবং যিহোবার পরিকল্পনার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করেছিল। তারা উপাসনাগৃহে যিহোবার উপাসনা করত এবং যিহোবার দৈববাণী বা তাঁর কথা শোনার পরে তারা অসংখ্য মানুষকে নেতৃত্ব দেয় এবং তাদের ঈশ্বর যিহোবাকে কীভাবে সম্মান নিবেদন করতে হবে, তাও শেখায়। যিহোবা তাদের শিখিয়েছিলেন যে তাদের উপাসনাগৃহ এবং বেদী নির্মাণ করতে হবে এবং যিহোবার দ্বারা নির্ধারিত সময়ে, অর্থাৎ যীশুর পুনর্ভ্যুত্থানের পর্বের সময় তাদের সদ্যোজাত গাভী এবং ভেড়াকে যিহোবার সেবা করার জন্য জন্য বেদীতে বলি দিতে হবে। এই নির্দেশের মূলে ছিল মানবজাতিকে সংযত করা এবং তাদের হৃদয়ে যিহোবার প্রতি সম্মান জাগ্রত করা। এই আইন তারা মান্য করছে কিনা, তাই ছিল যিহোবার প্রতি তাদের আনুগত্যের মাপকাঠি। যিহোবা তাদের জন্য একটি বিশ্রামবারের নির্দেশ দেন, যা ছিল তাঁর সৃষ্টির সপ্তম দিন। বিশ্রামবারের পরবর্তী দিনটি তিনি প্রথম দিন হিসাবে চিহ্নিত করেন, সেইদিনটি হল যিহোবাকে বন্দনার দিন, তাঁকে পশু উৎসর্গের দিন এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সঙ্গীত পরিবেশনের দিন। এই দিন যিহোবা সকল ধর্মযাজকদের ডেকে বেদীতে উৎসর্গ করা সব পশুর মাংস সবাইকে খাওয়ার জন্য বিতরণ করার নির্দেশ দেন, যাতে তারা যিহোবার প্রতি নিবেদন করা উৎসর্গকে উপভোগ করতে পারে। এবং যিহোবা বলেন যে তারা আশীর্বাদধন্য কারণ তারা যিহোবার সঙ্গে খাদ্য ভাগ করার সৌভাগ্য লাভ করেছে। তারা তাঁর নির্বাচিত মানবগোষ্ঠী (এটিই ছিল ইস্রায়েলীদের সঙ্গে যিহোবার চুক্তি)। এই কারণেই আজ পর্যন্ত ইস্রায়েলের মানুষ মনে করে যিহোবা হলেন কেবলমাত্র তাদেরই ঈশ্বর, অন্য কোনো বিধর্মী জাতির ঈশ্বর নন।

আইন কানুনের যুগের সময় যিহোবা বহু সংখ্যক আদেশ মোশির জন্য তৈরি করেছিলেন যাতে তিনি তা সেইসব ইস্রায়েলীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন, যারা তাঁকে অনুসরণ করে মিশরের বাইরে চলে এসেছিল। এই আদেশগুলি ছিল ইস্রায়েলীদেরই জন্য, মিশরীয়দের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিলনা। এগুলি ছিল ইস্রায়েলীদের সংযত রাখার জন্য, এবং তিনি এই নির্দেশের সাহায্যে তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু জিনিস দাবি করেন। তারা বিশ্রামবার পালন করে কিনা, তারা বাবা-মার প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিনা, তারা মূর্তির উপাসনা করে কিনা ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিচার করা হত তারা পাপী না ধার্মিক। এদের মধ্যে যিহোবার আগুনে দগ্ধ হয়ে কারো মৃত্যু হয়, কারো পাথরের আঘাতে মৃত্যু হয়, আবার কেউ কেউ যিহোবার আশীর্বাদ লাভ করে। এই সবকিছুই নির্ধারিত হয় তারা যিহোবার আদেশ পালন করেছে কিনা। যারা বিশ্রামবার পালন করেনি, তাদের মৃত্যু হয়েছে পাথরের আঘাতে। যেসব ধর্মযাজক বিশ্রামবার পালন করেনি, তারা যিহোবার আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। যারা বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করেনি, তাদেরও মৃত্যু হয়েছে পাথরের আঘাতে। এই সবই ছিল যিহোবার নির্দেশ। যিহোবা তাঁর নির্দেশ এবং আইন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যাতে তিনি মানুষের জীবনে তাদের নেতৃত্ব দিতে পারেন, মানুষ তাঁর কথা শুনবে এবং তা পালন করবে আর তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না। এই আইন ব্যবহার করে তিনি সদ্যোজাত মানবজাতির উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ রাখতে এবং তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। আর তাই, যিহোবার করা কাজের ভিত্তিতে প্রথম যুগকে বলা হয় আইন-কানুনের যুগ। যদিও যিহোবা অনেক কথন বলেছিলেন এবং বহু কাজ করেছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি মানবজাতিকে ইতিবাচক পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। এই অজ্ঞ মানবজাতিকে তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে মানবিক হয়ে উঠতে হয়, কীভাবে বাঁচতে হয় কীভাবে যিহোবার নির্দেশিত পথের সঠিক অর্থ বুঝতে হয়। অধিকাংশ সময়েই তাঁর কাজের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তাঁর সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া এবং তারা যাতে তাঁর নির্দিষ্ট অনুশাসন মেনে চলে তার ব্যবস্থা করা। তিনি কাজ করেছিলেন সেইসব মানুষের উপর যারা গভীরভাবে ভ্রষ্ট নয়। সেই কাজের ফলে তাদের স্বভাব অথবা জীবনের অগ্রগতিতে আমূল পরিবর্তন আসেনি। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আইনের ব্যবহার করে মানুষকে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করা। তৎকালীন ইস্রায়েলীদের কাছে যিহোবা ছিলেন নিছকই উপাসনাগৃহে থাকা এক ঈশ্বর, স্বর্গের ঈশ্বর। তিনি ছিলেন মেঘের স্তম্ভ, আগুনের স্তম্ভ। যিহোবা কেবল চেয়েছিলেন যে মানুষ তাঁর আইন এবং নির্দেশ মেনে চলুক, যাকে আজ মানুষ তাঁর সৃষ্ট নিয়মও বলতে পারে। এর কারণ হল যিহোবা মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে চাননি। তিনি তাদের এমন কিছু দিতে চেয়েছিলেন যা তাদের কাছে থাকা উচিত। তিনি নিজের মুখে তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন কারণ সৃষ্টির পর থেকে মানুষের কাছে এমন কিছুই ছিলনা যা তাদের থাকা উচিত। তাই যিহোবা তাদের এমন কিছু দিয়েছিলেন যা পৃথিবীর বুকে তাদের জীবনের জন্য তাদের কাছে থাকা উচিত, যাতে তাঁর নেতৃত্বাধীন মানুষেরা তাদের পূর্বপুরুষদের অর্থাৎ আদম ও ইভকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ যিহোবা তাদের যা দিয়েছিলেন তা সৃষ্টির আদিপর্বে আদম ও ইভকে দেননি। সবকিছু নির্বিশেষে যিহোবা ইস্রায়েলে যা করেছিলেন, তা ছিল মানবজাতিকে পথনির্দেশ করা এবং তাদের স্রষ্টাকে চিনতে পারার ক্ষমতা তৈরি করা। তিনি তাদের জয়ও করেননি, রূপান্তরও করেননি, কেবল পথনির্দেশ করেছেন। এই হল আইন-কানুনের যুগে যিহোবার কর্মকাণ্ডের মূল সারসত্য। এটি হল সত্য ঘটনা সম্বলিত এক প্রেক্ষাপট, ইস্রায়েলে তাঁর কাজের সারসত্য এবং পরবর্তী ছয় হাজার বছরের তাঁর কাজের সূচনা—এই কাজের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানবজাতিকে যিহোবার নিয়ন্ত্রণে রাখা। এর থেকেই তাঁর ছয় হাজার বছরের পরিচালনামূলক পরিকল্পনায় আরো অনেক কাজের সূচনা হয়েছে।

পাদটীকা:

ক। মূল পাঠ্যে “মেনে চলতে হবে কিনা” বাক্যাংশটি নেই।

পূর্ববর্তী: তোমরা সকলে চরিত্রের দিক থেকে অত্যন্ত অভব্য!

পরবর্তী: ঈশ্বর এবং তাঁর কাজকে যারা জানে শুধুমাত্র তারাই ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে পারে

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? অনুগ্রহ করে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। 😊

সম্পর্কিত তথ্য

শুধুমাত্র অন্তিম সময়ের খ্রিষ্ট মানুষকে অনন্ত জীবনের পথ দেখাতে পারেন

জীবনের গতিপথ কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না, বা এটি সহজে অর্জন করতে পারার মতো বিষয়ও নয়। কারণ জীবন কেবল ঈশ্বর প্রদত্ত, অর্থাৎ, শুধুমাত্র ঈশ্বর...

সর্বশক্তিমানের দীর্ঘশ্বাস

তোমার হৃদয়ে এক বিপুল গোপন বিষয় আছে যার ব্যাপারে তুমি কখনও সচেতন ছিলে না, কারণ তুমি বেঁচে আছ আলোহীন এক জগতে। তোমার হৃদয় আর তোমার আত্মা দখল...

একটি সাধারণ আধ্যাত্মিক জীবন মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে যায়

তোমরা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের পথে খুব সামান্য অংশই হেঁটেছো, এবং তোমরা এখনও সঠিক পথে প্রবেশ করতে পারোনি, তাই তোমরা এখনও ঈশ্বরের নির্ধারিত...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন