ঈশ্বরকে জানাই হল ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগের পথ

আজীবন কীভাবে তোমরা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে এসেছ, সে সম্বন্ধে তোমাদের সকলেরই নতুন করে পরীক্ষা করা উচিত, যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, ঈশ্বরকে অনুসরণ করার প্রক্রিয়ায়, সত্যিই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেছ কিনা, হৃদয়ঙ্গম করেছ কিনা ও তাঁকে প্রকৃতপক্ষে জেনেছ কিনা, তিনি বিভিন্ন প্রকারের মানুষের প্রতি কী মনোভাব পোষণ করেন—তা সত্যিই জানো কিনা, এবং ঈশ্বর তোমার উপর যে কাজ সম্পন্ন করছেন ও তোমার প্রতিটি কাজকে তিনি যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেন—তা তুমি সত্যিই উপলব্ধি করেছ কিনা। এই ঈশ্বর, যিনি তোমার পার্শ্বেই রয়েছেন, তোমাকে অগ্রসর হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন, অদৃষ্টকে আজ্ঞা করছেন, এবং চাহিদা পূরণ করছেন—সবকিছুর পরে, সেই ঈশ্বরকে তুমি কতটা উপলব্ধি করো? এই ঈশ্বর সম্বন্ধে তুমি সত্যিই কতটা জানো? তুমি কি জানো ঈশ্বর প্রতিদিন তোমার মাধ্যমে কর্ম করে চলেছেন? তাঁর প্রতিটি কর্মের নীতি ও উদ্দেশ্যগত ভিত্তি কি তোমার জানা আছে? তিনি কীভাবে তোমায় পথ দেখান, তা কি তুমি জানো? তিনি কোন উপায়ে তোমার জন্য সরবরাহ করেন, সে বিষয়ে কি তুমি অবগত? তোমাকে তিনি কোন পদ্ধতিতে পথ দেখান, তা কি তোমার জানা? তিনি তোমার কাছ থেকে কী চান এবং তোমার মধ্যে কী লাভ করতে চান, তা কি জানো? তোমার বিভিন্ন আচরণের প্রতি তিনি কোন মনোভাব পোষণ করেন, তা জানো? তুমি তাঁর প্রিয় মানুষ কিনা, তা কি তুমি জানো? তাঁর হর্ষ, ক্রোধ, বিষাদ ও পুলকের উৎস, সেগুলির নিহিত চিন্তা ও ধারণা, এবং তাঁর সারসত্য কি তুমি জানো? তুমি যে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করো, তিনি আসলে কেমন, তা কি জানো? এই প্রশ্নগুলি সহ এই ধরনের অন্যান্য আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর কি তুমি কখনই বুঝতে পার নি বা ভেবে দেখ নি? ঈশ্বর বিশ্বাসের পথে, তাঁর বাক্যের প্রকৃত রসাস্বাদন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, তুমি কি তাঁর সম্বন্ধে ভুল ধারণাগুলি ত্যাগ করেছ? ঈশ্বরের অনুশাসন ও শাস্তি গ্রহণ করার পরে তুমি কি প্রকৃতরূপে অনুগত ও যত্নশীল হয়েছ? ঈশ্বরের শাস্তিদান ও বিচারের মাঝে, তুমি কি মানুষের অবাধ্যতা ও শয়তানোচিত স্বভাব সম্বন্ধে জানতে পেরেছ, এবং ঈশ্বরের পবিত্রতা সম্বন্ধে সামান্য হলেও উপলব্ধি অর্জন করেছ? ঈশ্বরের বাক্যের দ্বারা পথপ্রদর্শন ও আলোকপ্রাপ্তি থেকে জীবন সম্বন্ধে কি তোমার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে? ঈশ্বর দ্বারা নির্ধারিত পরীক্ষাগুলির মাঝে, তুমি কি কখনো মানুষের অপরাধের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের অসহিষ্ণুতা অনুভব করেছ, এমনকি তিনি তোমার কাছ থেকে কী চান ও কীভাবে তোমাকে উদ্ধার করছেন, তা উপলব্ধি করেছ? ঈশ্বরকে ভুল বোঝা আসলে কী বা, এই ভুল বোঝা কীভাবে দূর করা যায়, তা তুমি যদি না জানো, তাহলে বলা যায় যে তুমি কখনোই ঈশ্বরের সাথে প্রকৃত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারো নি, কখনোই তাঁকে উপলব্ধি করতে পারো নি, অথবা অন্ততপক্ষে কেউ এমন বলতেই পারে, যে, তুমি কোনোদিনও তাঁকে বুঝতেই চাও নি। তুমি যদি ঈশ্বরের অনুশাসন ও শাস্তি কী—তা না জানো, তাহলে তুমি নিশ্চিতভাবেই আজ্ঞাকারিতা ও যত্নশীলতা কী—তাও জানো না, অথবা অন্ততপক্ষে তুমি কখনোই ঈশ্বরের প্রতি বাস্তবে আজ্ঞাকারী বা যত্নশীল হও নি। তুমি যদি কখনই ঈশ্বরের শাস্তি ও বিচারের অভিজ্ঞতা লাভ না করে থাকো, তাহলে নিশ্চিতরূপেই তাঁর পবিত্রতা সম্বন্ধেও অজ্ঞাত রয়েছ, এবং মানুষের অবাধ্যতা সম্বন্ধে তোমার জ্ঞান আরও অস্পষ্ট। যদি জীবন সম্বন্ধে তোমার কখনোই যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনে সঠিক লক্ষ্য না থেকে থাকে, জীবনে অগ্রসর হওয়ার সময় তুমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থাকো, যদি তোমার ভবিষ্যতে কোন পথে চলবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে এমন নিশ্চিত যে তুমি কখনোই ঈশ্বরের আলোকপ্রাপ্তি ও পথনির্দেশনা লাভ করো নি; আবার এমনও বলা যেতে পারে যে তোমাকে প্রকৃতপক্ষে কখনোই ঈশ্বরের বাক্য সরবরাহ অথবা পুনঃসঞ্চিত করা হয় নি। যদি তুমি এখনও ঈশ্বরের পরীক্ষার সম্মুখীন না হয়ে থাকো, তাহলে মানুষের অপরাধের প্রতি ঈশ্বরের অসহিষ্ণুতার বিষয়ে তুমি জানবে না, ঈশ্বর তোমার কাছ থেকে আসলে কী চান—তাও উপলব্ধি করতে পারবে না, মানুষের ব্যবস্থাপনা ও উদ্ধারের কাজ আসলে কী—তা তো আরোই পারবে না। কোনো ব্যক্তি ঈশ্বরকে যত বছর ধরেই বিশ্বাস করে থাকুক না কেন, সে যদি কখনও ঈশ্বরের বাক্যে কোনোকিছুর অভিজ্ঞতা লাভ বা উপলব্ধি না করে, তাহলে সে নিশ্চিতরূপেই কখনো পরিত্রাণের পথে যায় নি, তার ঈশ্বরবিশ্বাস নিশ্চিতভাবেই আদতে ভিত্তিহীন, ঈশ্বর সম্বন্ধে তাদের জ্ঞানও নিশ্চিতরূপেই শূন্য, এবং বলাই বাহুল্য যে, ঈশ্বরকে সম্মান প্রদর্শন সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণাই নেই।

ঈশ্বরের সম্পত্তি এবং অস্তিত্ব, তাঁর সারসত্য এবং স্বভাব – এগুলি সকলই তাঁর মানবজাতিকে বলা বাক্যের মাধ্যমেই পরিচিত হয়েছে। ঈশ্বরের বাক্যের অভিজ্ঞতা লাভের সময়ে, সেগুলি অনুশীলনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় মানুষ ঈশ্বরের বাক্যের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে, তার উৎস ও পটভূমি উপলব্ধি করে, এবং সেই বাক্যের অভিপ্রেত প্রভাব উপলব্ধি এবং প্রশংসা করতে পারে। মানবজাতির কাছে, সত্য ও জীবন অর্জনের জন্য, ঈশ্বরের অভিপ্রায় উপলব্ধির জন্য, নিজ স্বভাবে পরিবর্তন আনার জন্য, এবং ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব ও ব্যবস্থাকে মান্য করতে সক্ষম হওয়ার জন্য, মানুষকে অবশ্যই এই সকল বিষয়ে অনুভব, উপলব্ধি এবং অর্জন করতে হবে। যখন মানুষ এই সকল বিষয়কে অনুভব, উপলব্ধি এবং অর্জন করে, সেই সময়েই সে ধীরে ধীরে ঈশ্বর সম্পর্কে উপলব্ধি অর্জন করে, এবং সেই সময়েই সে তাঁর সম্পর্কে ভিন্ন মাত্রায় জ্ঞানও লাভ করে। এই উপলব্ধি বা জ্ঞান কিন্তু মানুষের কল্পিত বা রচিত কিছুর থেকে আসে না, বরং তা আসে সে তার নিজের অন্তরে যা কিছু প্রশংসা, অভিজ্ঞতা, অনুভব এবং নিশ্চয়তা অর্জন করে, তা থেকেই। কেবলমাত্র এই সকল বিষয়ে প্রশংসা, অভিজ্ঞতা, অনুভব এবং নিশ্চয়তা অর্জনের মাধ্যমেই ঈশ্বরের বিষয়ে মানুষের জ্ঞান অর্জিত হয়; একমাত্র এই সময়েই মানুষ প্রকৃত, বাস্তব, নির্ভুল জ্ঞান লাভ করে, এবং তাঁর বাক্য সম্বন্ধে উপলব্ধি, অনুভব এবং নিশ্চয়তা অর্জনের মাধ্যমে ঈশ্বর সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি ও জ্ঞান লাভের এই প্রক্রিয়াই হল মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যেকার আসল যোগাযোগ। এই ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমেই, মানুষ প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য উপলব্ধি ও অনুধাবন করতে পারে, ঈশ্বরের সম্পত্তি ও অস্তিত্ব এবং তাঁর সারসত্য সম্পর্কে প্রকৃত অর্থেই উপলব্ধি করতে ও জানতে পারে, ঈশ্বরের স্বভাব সম্পর্কে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে ও জানতে পারে, এবং, সকল সৃষ্টির পিছনে ঈশ্বরের যে আধিপত্য রয়েছে, সেই বিষয়ে সম্যক ধারণায় উপনীত হয় তার সঠিক সংজ্ঞা বুঝতে পারে, এবং ঈশ্বরের পরিচয় এবং মর্যাদার অত্যাবশ্যক তাৎপর্য নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করে। এই ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমেই মানুষ ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়, ঈশ্বর সম্পর্কে তার ধারণা পালটায়, সে আর অস্পষ্টভাবে তাঁর কল্পনা করে না, অথবা তাঁর প্রতি থাকা সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি, এবং নিন্দায় ক্ষেত্রে, অথবা তাঁকে বিচার বা সন্দেহ করায়, রাশ টানে। এইভাবে, ঈশ্বরের সাথে মানুষের বিরোধ কম হবে, দ্বন্দ্ব কম হবে, এবং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহের ঘটনাও কম ঘটবে। পক্ষান্তরে, ঈশ্বরের প্রতি মানুষের যত্নশীলতা এবং আজ্ঞাকারিতা আরও বৃদ্ধি পাবে, এবং তাঁর প্রতি তার সম্মান বাস্তবতর ও গভীরতর হবে। এই ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমে, মানুষ যে কেবল সত্যের বিধান এবং জীবনের বাপ্তিষ্ম অর্জন করবে—তা-ই নয়, বরং একই সাথে সে ঈশ্বরের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন করবে। এই ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমে, মানুষের যে কেবল স্বভাবের পরিবর্তন হবে এবং সে শুধুমাত্র পরিত্রাণ লাভ করবে তা-ই নয়, বরং একই সাথে সে ঈশ্বরের প্রতি সৃষ্ট সত্তার প্রকৃত সম্মান ও শ্রদ্ধাও অর্জন করবে। এই ধরনের যোগাযোগের ফলে, ঈশ্বরের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আর সাদা কাগজের মতো বা ফাঁকা বুলি হয়েই পড়ে রইবে না, অথবা অন্ধভাবে অন্বেষণ করা অথবা উপাস্য পাত্রে পরিণত করা হিসাবেই রয়ে যাবে না; কেবল এই ধরনের যোগাযোগেই মানুষের জীবন দিনে দিনে পরিণত হয়ে উঠবে, শুধুমাত্র তখনই তার স্বভাব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে, ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাস অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত আস্থা থেকে প্রকৃত আজ্ঞাকারিতা এবং যত্ন এবং শ্রদ্ধাশীলতায় পরিবর্তিত হবে, এবং মানুষও, ঈশ্বরকে অনুসরণ করার প্রক্রিয়ায়, ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় থেকে সক্রিয় অবস্থানের দিকে, নেতিবাচক থেকে ইতিবাচকের দিকে অগ্রসর হবে; কেবলমাত্র এই ধরনের যোগাযোগের ফলেই মানুষ ঈশ্বর সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি ও বোধগম্যতা, ঈশ্বরের বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞান, লাভ করবে। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ কখনোই ঈশ্বরের সাথে প্রকৃত যোগাযোগ করে উঠতে পারে নি, সেহেতু তাদের ঈশ্বর-বিশ্বাস তাত্ত্বিক, আক্ষরিক ও মতবাদের স্তরে এসেই থেমে যায়। অর্থাৎ বলা যায় যে, অধিকাংশ মানুষ যত বছর ধরেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করে আসুক না কেন, ঈশ্বরকে জানার বিষয়ে তারা আদতে সূচনা বিন্দুতেই রয়ে গিয়েছে, নিজেদের সংশ্লিষ্ট সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কার এবং আবেগপ্রবণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের গতানুগতিক ভিত্তিতেই আটকে রয়েছে। মানুষের ঈশ্বর সম্পর্কে জ্ঞান সূচনা বিন্দুতেই আটকে রয়েছে—এই বাক্যের অর্থ হল প্রকৃতপক্ষে তার কোনও অস্তিত্বই নেই। ঈশ্বরের মর্যাদা এবং পরিচয় সম্পর্কে মানুষের স্বীকৃতি ছাড়াও, তাঁর প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখনও অস্পষ্ট অনিশ্চয়তার অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায়, মানুষ ঈশ্বরের প্রতি কতমাত্রায় প্রকৃত শ্রদ্ধা রাখতে পারে?

তুমি ঈশ্বরের অস্তিত্বে যত দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করো না কেন, তা কখনোই ঈশ্বর সম্বন্ধে তোমার জ্ঞান বা ঈশ্বরের প্রতি তোমার শ্রদ্ধার প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তুমি তাঁর আশীর্বাদ ও অনুগ্রহে যতই ধন্য হও না কেন, তা কখনোই তোমার ঈশ্বর-জ্ঞানের প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তুমি তাঁর স্বার্থে নিজেকে যতই আদ্যোপান্ত পবিত্র ও প্রসারিত করতে ইচ্ছুক থাকো না কেন, তা কখনোই তোমার ঈশ্বর-জ্ঞানের প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তুমি ঈশ্বরের বাক্যের সঙ্গে পরিচিত হয়ে থাকতে পারো অথবা সেগুলি হৃদয়ঙ্গম করতে পারো, কণ্ঠস্থও করতে পারো, কিন্তু তা কোনোভাবেই ঈশ্বর সম্বন্ধে তোমার জ্ঞানের প্রতিস্থাপন করতে পারে না। মানুষ যতই একনিষ্ঠভাবে ঈশ্বরের অনুসরণ করুক না-কেন, যদি তার কখনোই ঈশ্বরের সঙ্গে প্রকৃত যোগাযোগ না হয়ে থাকে বা সে কখনোই ঈশ্বরের বাক্যের প্রকৃত অভিজ্ঞতা লাভ না করে থাকে, তাহলে তার ঈশ্বরের জ্ঞান শূন্যস্থান বা অন্তহীন দিবাস্বপ্ন ব্যতীত আর কিছুই নয়; কারণ, তুমি হয়ত অতীতে ঈশ্বরের ঈষৎ সংস্পর্শে এসে থাকতে পারো অথবা, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে থাকতে পারো, তা সত্ত্বেও তোমার ঈশ্বরের জ্ঞান শূন্যই থাকবে এবং ঈশ্বরের প্রতি তোমার শ্রদ্ধা কেবল ফাঁকা বুলি বা আদর্শ হিসেবে ধার্য ধারণা হিসাবেই রয়ে যাবে।

অনেকেই দৈনন্দিন ভাবে ঈশ্বরের বাক্য তুলে ধরে পাঠ করে, এমনকি মহার্ঘতম সম্পদ হিসাবে সকল শ্রেষ্ঠ অনুচ্ছেদগুলি সন্তর্পণে মুখস্থও করে ফেলে, এবং, উপরন্তু, সর্বত্র ঈশ্বরের বাক্যের প্রচার এবং ঈশ্বরের বাক্য দ্বারা অপরকে সরবরাহ ও সহায়তা করে। তারা মনে করে যে, এমনটাই হল ঈশ্বরের সাক্ষ্য দেওয়া, তাঁর বাক্যের সাক্ষ্য দেওয়া, এমনটাই হল তাঁর পথ অনুসরণ করা; তারা ভাবে যে, এমনটা করার অর্থই হল ঈশ্বরের বাক্য অনুযায়ী জীবনযাপন করা, এমনটা করাই হল তাঁর বাক্যকে তাদের প্রকৃত জীবনে নিয়ে আসা, যে, এমনটা করলেই তারা ঈশ্বরের প্রশংসা পেতে, এবং তাঁর দ্বারা উদ্ধার এবং নিখুঁতকরণ প্রাপ্ত হতে, সক্ষম হবে। ঈশ্বরের বাক্য প্রচার করা সত্ত্বেও তারা সেগুলির অনুশীলন করে না, অথবা ঈশ্বরের বাক্যে প্রকাশিত বিষয়ের সাথে নিজেদের তুলনা করার চেষ্টা করে না। বরং, তারা প্রতারণার মাধ্যমে অপরের সমাদর এবং ভরসা আদায়ের উদ্দেশ্যে, স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে ব্যবস্থাপনায় প্রবেশের উদ্দেশ্যে, এবং ঈশ্বরের গৌরব আত্মসাৎ ও চুরি করার উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের বাক্য ব্যবহার করে। তারা বৃথা আশা করে যে, ঈশ্বরের বাক্য প্রসারের মাধ্যমে তারা প্রদত্ত সুযোগকে কাজে লাগাবে, যাতে ঈশ্বরের কর্ম দ্বারা তারা পুরস্কৃত হতে পারে এবং তাঁর প্রশংসা পেতে পারে। কত বছর অতিবাহিত হয়েছে, তবু সেই মানুষেরা যে কেবল ঈশ্বরের বাক্য প্রচারের প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রশংসা অর্জনে অক্ষম রয়ে গিয়েছে তা-ই নয়, ঈশ্বরের বাক্যের সাক্ষ্য দেওয়ার প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যে অনুসরণীয় পথ আবিষ্কার করার বিষয়েও তারা অক্ষম রয়ে গিয়েছে, এবং তারা যে কেবল অপরকে ঈশ্বরের বাক্যের সহায়তা ও সরবরাহদানের প্রক্রিয়ায় সহায়তা ও সরবরাহ প্রদান করতে পারে নি তা-ই নয়, এবং তারা যে কেবলমাত্র ঈশ্বরকে জানতে বা নিজেদের অন্তরে তাঁর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জাগ্রত করতেও তারা অক্ষম রয়ে গিয়েছে এই সমস্ত কিছু করার প্রক্রিয়ায়, শুধু তা-ই নয়; বরং, তদপরিবর্তে, ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ভুল বোঝাবুঝি ক্রমশ গভীরতর হয়, তাঁর প্রতি অবিশ্বাস গুরুতর হয় এবং তাঁর সম্পর্কে কল্পনা অধিকতর অতিরঞ্জিত হয়ে ওঠে। ঈশ্বরের বাক্য সম্পর্কে স্বীয় তত্ত্বসমূহের দ্বারা পুষ্ট ও নির্দেশিত হয়ে তারা নিজেদের এমনভাবে তুলে ধরে, যে মনে হয় যেন তারা সম্পূর্ণরূপে স্বচ্ছন্দে বিরাজ করছে, যেন তারা অনায়াসেই দক্ষতা প্রয়োগে সক্ষম, যেন তারা জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পেয়ে গিয়েছে, যেন এক নবজীবন লাভ করে ফেলেছে এবং উদ্ধারপ্রাপ্ত হয়েছে, যেন তাদের মুখ থেকে অনর্গল ঈশ্বরের বাক্য নিঃসৃত হতে-হতে তারা সত্য অর্জন করে ফেলেছে, ঈশ্বরের অভিপ্রায় উপলব্ধি করে ফেলেছে, ঈশ্বরকে জানার পথ আবিষ্কার করে ফেলেছে, যেন ঈশ্বরের বাক্য প্রচারকালে তারা প্রায়শই ঈশ্বরের সম্মুখীন হয়ে থাকে। অধিকন্তু, তারা প্রায়শই ক্রন্দনের পর্যায়ে “চালিত” হয়, এবং, মাঝেমধ্যেই ঈশ্বরের বাক্যের মধ্যেকার “ঈশ্বরের” দ্বারা পরিচালিত হয়, মনে হয় যে, তারা যেন ঈশ্বরের আন্তরিক অনুরোধ ও সদয় অভিপ্রায় নিরন্তর উপলব্ধি করার পাশাপাশি, সেই একই সময়ে মানুষের প্রতি ঈশ্বরের পরিত্রাণ এবং তাঁর ব্যবস্থাপনাকেও উপলব্ধি করেছে, তাঁর সারসত্য জানতে, এবং তাঁর ধার্মিক স্বভাব উপলব্ধি করতে পেরেছে। এরই ভিত্তিতে, তারা যেন ঈশ্বরের অস্তিত্বে আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তাঁর উচ্চতম অবস্থা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হয়, এবং আরও গভীরভাবে তাঁর মহিমা ও উৎকর্ষ উপলব্ধি করে। ঈশ্বরের বাক্যে তাদের ভাসা ভাসা জ্ঞান দেখে, মনে হতে পারে যে, তাদের বিশ্বাস সমৃদ্ধ হয়েছে, দুঃখকষ্ট সহ্য করার সংকল্প শক্তিশালী হয়েছে, এবং ঈশ্বর সম্বন্ধে জ্ঞান গভীরতর হয়েছে। তবে তারা জানেই না, যে, প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের বাক্যের অভিজ্ঞতা লাভ না করা পর্যন্ত, ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের সকল জ্ঞান ও ধারণাসমূহ স্ব-কল্পিত এবং অনুমানপ্রসূত। ঈশ্বরের কোনো ধরনের পরীক্ষাতেই তাদের বিশ্বাস টিকবে না, তাদের তথাকথিত আধ্যাত্মিকতা এবং উচ্চতা ঈশ্বরের পরীক্ষা বা পরিদর্শনের সামনে টিকে থাকবে না, তাদের সিদ্ধান্ত নিছক বালির বাঁধ ব্যতীত আর কিছুই নয়, এবং তাদের তথাকথিত ঈশ্বর-জ্ঞান কেবল তাদেরই কাল্পনিক উদ্ভাবন ব্যতীতঅন্য কিছু নয়। আসলে এই ঈশ্বরের বাক্যের প্রতি প্রচণ্ড প্রয়াসী মানুষেরা কখনোই প্রকৃত বিশ্বাস, প্রকৃত আজ্ঞাকারিতা, প্রকৃত যত্নশীলতা অথবা ঈশ্বরের প্রকৃত জ্ঞান কি, তা উপলব্ধি করে নি। তারা তত্ত্ব, কল্পনা, জ্ঞান, উপহার, ঐতিহ্য, কুসংস্কার এবং এমনকি মানবতার নৈতিক মূল্যবোধগুলিকে গ্রহণ করে, সেগুলিকে ঈশ্বর-বিশ্বাস এবং তাঁকে অনুসরণ করার “পুঁজি” এবং “অস্ত্র”-তে পরিণত করে, এমনকি সেগুলিকে তাদের ঈশ্বর-বিশ্বাস এবং তাঁকে অনুসরণের ভিত্তি করে তোলে। একই সাথে, তারা এই পুঁজি এবং অস্ত্র গ্রহণ করে সেগুলিকে যাদুমন্ত্রপুত রক্ষাকবচে পরিণত করে, যার মাধ্যমে তারা ঈশ্বরকে জানে, যাতে ঈশ্বরের পরিদর্শন, পরীক্ষা, শাস্তি, এবং বিচারের মুখোমুখি হওয়া যায় ও মোকাবিলা করা যায়। শেষ পর্যন্ত, তাদের ঝুলিতে কেবলমাত্র যা পড়ে থাকে তা হল ঈশ্বর সম্পর্কে কিছু সিদ্ধান্ত, যা ধর্মীয় ব্যঞ্জনা ও সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কারে নিমজ্জিত, এবং আবেগঘন, অদ্ভুত ও হেঁয়ালীপূর্ণ। তাদের ঈশ্বরকে জানার ও সংজ্ঞায়িত করার উপায় সেই একই গড়পড়তা ধাঁচের রয়ে গিয়েছে, যেখানে মানুষেরা শুধুমাত্র ঊর্ধ্বস্থিত স্বর্গে বিশ্বাস করে, অথবা আকাশে অবস্থিত প্রবীণ ব্যক্তির উপরেই বিশ্বাস রাখে, যেখানে ঈশ্বরের বাস্তবিকতা, সারসত্য, স্বভাব, সম্পদ ও অস্তিত্ব – এবং এই প্রকার সমস্ত কিছু, যা স্বয়ং বাস্তব ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কিত – তা উপলব্ধি করতে তাদের জ্ঞানশক্তি অক্ষম থেকেছে, যা থেকে তাদের জ্ঞান এতটাই সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছেদপ্রাপ্ত থেকেছে যে, তারা যেন দুইটি বিপরীত মেরুতে অবস্থিত। এইভাবে, এই ব্যক্তিগণ ঈশ্বরের বাক্যের বিধান ও পোষণে লালিত হলেও, তারা কিন্তু আদতে ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করে চলার পথে হাঁটতে অক্ষম। এর আসল কারণ হল, তারা কোনোদিনই ঈশ্বরের সাথে পরিচিত হয় নি, তাঁর সাথে প্রকৃত যোগাযোগ বা সংযোগ স্থাপন করে নি, এবং তাই তাদের পক্ষে ঈশ্বরের সাথে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় পৌঁছনো, অথবা ঈশ্বরকে অনুসরণ বা উপাসনা করার প্রকৃত বিশ্বাস নিজ অন্তরে জাগ্রত করে তোলা অসম্ভব। তারা যে এইভাবে ঈশ্বরের বাক্যগুলিকে বিবেচনা করে, তারা যে এইভাবে ঈশ্বরকে এইভাবে বিবেচনা করে – এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোভাবই তাদেরকে নিজ প্রচেষ্টা থেকে খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে, ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করার পথে চলতে তাদের চিরতরে অক্ষম করে দিয়েছে। যে লক্ষ্যের প্রতি তারা উদ্দেশ্য করছে, এবং যে দিশায় ধাবিত হচ্ছে, তা থেকে বোঝা যায় যে, তারা অনন্তকাল ধরেই ঈশ্বরের শত্রু, এবং অনন্তকাল যাবৎ তারা কখনোই পরিত্রাণ লাভ করতে পারবে না।

যদি, বহু বছর ধরে কেউ ঈশ্বরকে অনুসরণ করা সত্ত্বেও, তাঁর বাক্যের সংস্থান উপভোগ করা সত্ত্বেও, যদি ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অনেকটা মূর্তির সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হওয়া কোনো ব্যক্তির সমতুল্য হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, সেই ব্যক্তি ঈশ্বরের বাক্যের বাস্তবতা অর্জন করতে পারে নি। এর কারণ হল, তারা ঈশ্বরের বাক্যের বাস্তবিকতায় বিন্দুমাত্রও প্রবেশ করে নি, এবং এই কারণেই, ঈশ্বরের বাক্যের মধ্যে নিহিত বাস্তবিকতা, সত্য, অভিপ্রায়সমূহ এবং মানবজাতির উপর করা দাবিদাওয়ার সাথে সেই ব্যক্তির কোনও সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, বলা যেতে পারে যে, সেই ব্যক্তি ঈশ্বরের বাক্যের বাহ্যিক অর্থ অনুধাবনের যতই চেষ্টা করুক না কেন, সবই হবে নিষ্ফল: যেহেতু তারা কেবলমাত্র বাক্যেরই অন্বেষণ করে, সেহেতু তারা নিছক বাক্যই অর্জন করবে। ঈশ্বরের বাক্যগুলি বাহ্যিক রূপে সাধারণ বা গভীর—যেমনই হোক না কেন, সেগুলি কিন্তু জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে মানুষের পক্ষে অপরিহার্য সত্য; সেগুলি হল সঞ্জীবনী বারিধারা, যা মানুষকে দৈহিক ও আধ্যাত্মিক ভাবে বেঁচে থাকতে সক্ষম করে। সেগুলি মানুষের বেঁচে থাকার পক্ষে যা যা প্রয়োজন তা সরবরাহ করে; যেমন দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নীতি ও বিশ্বাস, পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে আবশ্যিকভাবে যে পথ বেছে নিতে হবে তা, তদসহযোগে, সেই পথের লক্ষ্য ও অভিমুখ; ঈশ্বরের সম্মুখে সৃষ্ট সত্তা হিসাবে যে সকল সত্য তার থাকা উচিত; এবং মানুষ কীভাবে ঈশ্বরকে মান্য ও উপাসনা করে সেই বিষয়ক সমস্ত সত্য। এইগুলি হল মানুষের টিকে থাকার নিশ্চয়তা প্রদানকারী অঙ্গীকার, এগুলি হল মানুষের দৈনন্দিনের আহার্যস্বরূপ, এবং এগুলি মানুষের শক্তিশালী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্যকারী বলিষ্ঠ অবলম্বনও বটে। এগুলি সত্যের বাস্তবিকতায় ভরপুর, যেগুলির সাহায্যে সৃষ্ট মানবজাতি স্বাভাবিক মানবিকতা যাপন করে, মানবজাতিকে ভ্রষ্টাচারের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার এবং শয়তানের পাতা ফাঁদ এড়িয়ে চলার উদ্দেশ্যে যথাযথ সত্য দ্বারা পুষ্ট করে, সমৃদ্ধ করে সৃষ্টিকর্তার দ্বারা সৃষ্ট মানবজাতির উদ্দেশ্যে যে অক্লান্ত শিক্ষা, উপদেশ, উৎসাহ এবং সান্ত্বনা প্রদত্ত হয়, তার মাধ্যমে। এগুলি হল মানুষকে ইতিবাচক সমস্ত কিছু বোঝার নির্দেশনা এবং আলোকপ্রাপ্তি প্রদানকারী আলোক-সংকেত, যা নিশ্চিত করে যে, মানুষেরা জীবনযাপন করবে এবং ধার্মিক ও শুভকর সমস্তকিছুর অধিকারী হবে, এই মানদণ্ডের দ্বারাই সকল মানুষ, ঘটনা এবং বস্তুর পরিমাপ করা হয়, এবং এই দিকনির্দেশক সংকেতই মানুষকে পরিত্রাণ এবং আলোর পথে নিয়ে চলে। একমাত্র ঈশ্বরের বাক্যের ব্যবহারিক উপলব্ধির দ্বারাই মানুষকে সত্য ও জীবন সরবরাহ করা যায়; কেবলমাত্র এভাবেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে স্বাভাবিক মানবতা, অর্থপূর্ণ জীবন, প্রকৃত সৃষ্ট সত্তা বলতে কী বোঝায়, ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত আজ্ঞাকারিতা বলতে কী বোঝায়; একমাত্র এভাবেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে কীভাবে ঈশ্বরের যত্ন নেওয়া উচিত, কীভাবে সৃষ্ট সত্তার দায়িত্ব পালন করা উচিত, এবং কীভাবে প্রকৃতরূপে মানবোচিত গুণের অধিকারী হওয়া উচিত; একমাত্র এভাবেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে প্রকৃত বিশ্বাস ও প্রকৃত উপাসনা বলতে কী বোঝায়; একমাত্র এভাবেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে আকাশ ও পৃথিবী এবং সমস্তকিছুর শাসক কে; একমাত্র এভাবেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে—সেই একজন যিনি সকল সৃষ্টির মালিক, তিনি কোন উপায়ে সৃষ্টিকে শাসন করেন, নেতৃত্ব দেন এবং সৃষ্টির ব্যবস্থা করেন; এবং একমাত্র এভাবেই মানুষ আকাশ, পৃথিবী এবং সমস্তকিছুর মালিকের অস্তিত্ব, তাঁর প্রতীয়মানতা এবং কর্ম সম্পর্কে উপলব্ধি এবং অনুধাবন করতে পারে। ঈশ্বরের বাক্যের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে, ঈশ্বরের বাক্য এবং সত্যের বিষয়ে মানুষের বাস্তবিক জ্ঞান অথবা অন্তর্দৃষ্টি নেই। এই ধরনের ব্যক্তিগণ ঠিক যেন জীবন্ত মরদেহ, যেন নিঃশেষিত খোলস, যার সাথে স্রষ্টা-সম্বন্ধিত সকল জ্ঞানের কোনোপ্রকার সম্পর্কমাত্র নেই। ঈশ্বরের চোখে, এই ধরনের মানুষ কোনোদিন তাঁকে বিশ্বাস করে নি, অনুসরণও করে নি, এবং তাই ঈশ্বর তাকে তাঁর বিশ্বাসী অথবা অনুগামী হিসাবে স্বীকৃত করেন না, প্রকৃত সৃষ্ট সত্তা হিসাবে তো আরোই করেন না।

একজন প্রকৃত সৃষ্ট সত্তার অবশ্যই জানা উচিত যে সৃষ্টিকর্তা কে, মানুষের সৃষ্টির কারণ কী, সৃষ্ট সত্তার দায়দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হয়, এবং সমস্ত সৃষ্টির প্রভুকে কীভাবে উপাসনা করতে হয়। তার অবশ্যই সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায়, ইচ্ছা ও চাহিদা সম্বন্ধে অনুধাবন করা, উপলব্ধি করা, জানা ও প্রযত্ন নেওয়া উচিত, এবং অবশ্যই ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগের যে পথ সৃষ্টিকর্তার – তা অনুসারে কাজ করে উচিত।

ঈশ্বরে ভীতি অর্থে কী বোঝায়? আর কীভাবেই বা মন্দকে পরিহার করা যায়?

“ঈশ্বরভীতি”-র অর্থ অজানা ভয় বা আতঙ্ক নয়, অথবা এড়িয়ে যাওয়া, দূরত্ব সৃষ্টি করা, উপাস্যতা স্থাপন বা কুসংস্কারও নয়। বরং, তা হল প্রশংসা, সম্মান, বিশ্বাস, উপলব্ধি, যত্নশীলতা, আজ্ঞাকারিতা, পবিত্রতা, ভালবাসা, এবং তৎসহযোগে, নিঃশর্ত ও অনুযোগহীন উপাসনা, পরিশোধ, এবং সমর্পণ। ঈশ্বর-বিষয়ক প্রকৃত জ্ঞান বিহনে, মানবজাতির প্রকৃত প্রশংসা, আস্থা, উপলব্ধি, প্রযত্ন অথবা আজ্ঞাকারিতা রইবে না, রইবে কেবল ভয় এবং অস্বস্তি, সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি, এড়িয়ে যাওয়া, এবং পরিহার করা। প্রকৃত ঈশ্বর-জ্ঞান ব্যতীত, মানবজাতির কাছে প্রকৃত পবিত্রতা এবং পরিশোধ রইবে না; না-রইবে উপাসনা এবং সমর্পণ, রইবে কেবল অদূরদর্শী উপাস্যতা আরোপ এবং কুসংস্কার; প্রকৃত ঈশ্বর-জ্ঞান ব্যতীত, মানবজাতি কোনোমতেই ঈশ্বরের পথ অনুসারে কাজ করতে পারে না, অথবা ঈশ্বরকে ভয় করতে বা মন্দকে পরিহার করতে পারে না। পক্ষান্তরে, সত্য এবং ঈশ্বরের বাক্যের প্রকৃত অর্থের পরিবর্তে, মানুষের জড়িত থাকা প্রতিটি কার্যকলাপ এবং আচরণ বিদ্রোহ এবং অবাধ্যতায় পূর্ণ হবে, তাঁর সম্পর্কে কুৎসাপূর্ণ রটনা এবং অবমাননাকর বিচারে, ও সত্য তথা ঈশ্বরের বাক্যের প্রকৃত অর্থের বিপরীতপথে ধাবিত মন্দ আচরণে পরিপূর্ণ হবে।

একবার ঈশ্বরে প্রকৃত বিশ্বাস অর্জন করে নেওয়ার পর, মানবজাতি তাঁকে আন্তরিকভাবে অনুসরণ করতে এবং আন্তরিকভাবে তাঁর ওপর নির্ভরশীল হতে পারবে; একমাত্র ঈশ্বরে প্রকৃত বিশ্বাস এবং নির্ভরতার মাধ্যমেই মানবজাতি প্রকৃত উপলব্ধি ও বোধগম্যতা প্রাপ্ত হতে পারে; ঈশ্বরের বিষয়ে প্রকৃত বোধগম্যতার মাধ্যমেই তাঁর প্রতি বাস্তবিক যত্নশীলতার আবির্ভাব হয়; এই প্রকৃত যত্নশীলতা থেকেই মানবজাতি প্রকৃত আজ্ঞাকারিতা প্রাপ্ত হয়; কেবলমাত্র ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত আজ্ঞাকারিতার মাধ্যমেই মানবজাতি প্রকৃত পবিত্রতা লাভ করতে পারে; কেবলমাত্র ঈশ্বরের প্রতি অকৃত্রিম পবিত্রতা থেকেই মানবজাতি নিঃশর্ত এবং অনুযোগহীন পরিশোধ অর্জন করতে পারে; কেবলমাত্র প্রকৃত আস্থা ও নির্ভরতা, প্রকৃত উপলব্ধি, যত্নশীলতা, আজ্ঞাকারিতা, পবিত্রতা এবং পরিশোধের মাধ্যমেই, মানবজাতি ঈশ্বরের স্বভাব ও সারসত্যের বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারে, এবং সৃষ্টিকর্তার পরিচয় জানতে পারে; কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তার পরিচয় জানার পরেই মানবজাতি নিজেদের মধ্যে প্রকৃত উপাসনা ও সমর্পণের ভাব জাগরিত করতে পারে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রকৃত উপাসনা ও সমর্পণের থাকলে কেবলমাত্র তবেই মানবজাতি বাস্তবিকভাবে স্বীয় মন্দ পথগুলিকে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হবে, অর্থাৎ মন্দকে পরিহার করতে পারবে।

এই-ই হল “ঈশ্বরে ভীতি ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগ” করার সামগ্রিক পদ্ধতি, এবং এই-ই ঈশ্বরে ভীতি ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগের সামগ্রিক বিষয়বস্তুও বটে। ঈশ্বরে ভীতি ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করা অর্জন করতে হলে, আবশ্যিকভাবে এই পথেই চলতে হবে।

“ঈশ্বরে ভীতি ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগ” করা এবং ঈশ্বরকে জানা—এগুলি অগণিত সূত্র দ্বারা অদৃশ্যভাবে যুক্ত আর তাদের সেই সংযোগ স্বতঃসিদ্ধ। কেউ মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করতে চাইলে, সর্বাগ্রে তার মধ্যে অবশ্যই ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত ভীতি থাকতে হবে; ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত ভীতি অর্জন করতে হলে, তার অবশ্যই সর্বাগ্রে ঈশ্বর সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান থাকতে হবে। ঈশ্বর সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হলে, সর্বাগ্রে সেই ব্যক্তিকে ঈশ্বরের বাক্য অভিজ্ঞতা করতে হবে, তাঁর বাক্যের বাস্তবিকতায় প্রবেশ করতে হবে, তাঁর শাস্তি ও অনুশাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে হবে; কেউ ঈশ্বরের বাক্যের অভিজ্ঞতা লাভ করতে চাইলে, তাকে অবশ্যই সর্বাগ্রে তাঁর বাক্যের মুখোমুখি হতে হবে, ঈশ্বরের মুখোমুখি হতে হবে, এবং তাঁকে বলে হবে যে, তিনি যেন ব্যক্তি, ঘটনা ও বস্তুর সাথে সম্বন্ধিত সকল প্রকার পরিবেশে ঈশ্বরের বাক্যের অভিজ্ঞতালাভের সুযোগ করে দেন। কেউ ঈশ্বরের এবং তাঁর বাক্যের মুখোমুখি হতে চাইলে, সর্বাগ্রে তার থাকতে হবে একটি সরল ও সৎ হৃদয়, সত্যকে গ্রহণ করার তৎপরতা, দুঃখকষ্ট সহ্য করার ইচ্ছা, মন্দকে পরিহার করার সাহস এবং সংকল্প, এবং প্রকৃত সৃষ্ট সত্তা হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা… এই উপায়েই, ধাপ ধাপে এগিয়ে চলে, তুমি ঈশ্বরের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে, তোমার হৃদয় হয়ে উঠবে পরিশুদ্ধতর, এবং ঈশ্বরকে জানার সাথে সাথেই, তোমার জীবন ও বেঁচে থাকার মূল্য হয়ে উঠবে আরও অর্থবহ এবং সমুজ্জ্বল। এভাবেই একদিন, তুমি অনুভব করবে যে সৃষ্টিকর্তা আর প্রহেলিকাময় নন, তিনি কখনোই তোমার অন্তরালে থাকেন নি, কখনোই তোমার থেকে তাঁর মুখ গোপন করে রাখেন নি, যে তিনি তোমার থেকে বিন্দুমাত্র দূরে ছিলেন না, যে সৃষ্টিকর্তা আর সেই একজন নন যাঁর জন্য তুমি মনেপ্রাণে আকুল হয়েও কখনোই অনুভবের দ্বারা যাঁর কাছে পৌঁছতে পারো নি, তিনি যথার্থভাবেই এবং প্রকৃত অর্থেই তোমার চারিদিকে প্রহরায় দণ্ডায়মান, এবং তিনি তোমার জীবনের সরবরাহকারী, তথা নিয়তির নিয়ন্ত্রক। তিনি দূর দিগন্তে অবস্থিত নন, আবার নিজেকে সুউচ্চ মেঘের অন্তরালে গোপন করেও রাখেন নি। তিনি তোমার পাশেই রয়েছেন, সকলের অধিষ্ঠাতা হিসাবে রয়েছেন, তিনিই তোমার সকল, তথা একমাত্র সম্বল। এই রকম ঈশ্বরই তোমায় অনুমোদিত করেন তাঁকে অন্তর থেকে ভালবাসতে, আঁকড়ে ধরে থাকতে, কাছে ধরে রাখতে, তাঁর প্রশংসা করতে, তাঁকে হারাতে ভীত হতে, এবং তোমায় অনিচ্ছুক করেন তাঁকে আর কখনও পরিত্যাগ করতে, তাঁর অবাধ্য হয়ে রইতে, তাঁকে এড়িয়ে চলতে, অথবা তাঁকে দূরে ঠেলে দিতে। তুমি শুধুমাত্র যা চাও তা হল তাঁর প্রতি যত্নবান হতে, তাঁকে মান্য করে চলতে, তিনি তোমাকে যা দেন তা পরিশোধ করতে, এবং তাঁর রাজত্বে নিজেকে সমর্পণ করতে। তুমি আর তাঁর দ্বারা পরিচালিত হতে, সরবরাহ প্রাপ্ত হতে, তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকতে, এবং তাঁর দ্বারা পালিত হতে অস্বীকার করবে না, তিনি তোমার প্রতি যে আদেশ এবং আজ্ঞা করেন, তাও আর অস্বীকার করবে না। তোমার একমাত্র চাহিদা হল তাঁর অনুসরণ করা, তাঁর সাহচর্যে ও তাঁর পরিপার্শ্বে থাকা; তাঁকে তোমার একমাত্র জীবন, একমাত্র প্রভু এবং একমাত্র ঈশ্বর হিসাবে গ্রহণ করা।

১৮ই আগস্ট, ২০১৪

পূর্ববর্তী: ঈশ্বর সমগ্র মানবজাতির ভাগ্য নির্ধারক

পরবর্তী: ঈশ্বরের বিচার ও শাস্তির মধ্যে তাঁর উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।👇

সম্পর্কিত তথ্য

একটি সাধারণ আধ্যাত্মিক জীবন মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে যায়

তোমরা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের পথে খুব সামান্য অংশই হেঁটেছো, এবং তোমরা এখনও সঠিক পথে প্রবেশ করতে পারোনি, তাই তোমরা এখনও ঈশ্বরের নির্ধারিত...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন