স্বয়ং অনন্য ঈশ্বর ৬

ঈশ্বরের পবিত্রতা (৩)

আগেরবার আমরা যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম তা ছিল ঈশ্বরের পবিত্রতা। ঈশ্বরের পবিত্রতা স্বয়ং ঈশ্বরের কোন বৈশিষ্ট্যটির সাথে সম্পর্কয়ুক্ত? তা কি ঈশ্বরের সারসত্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত? (হ্যাঁ।) তাহলে, ঈশ্বরের সারসত্যের যে মূল দিকটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম সেটি কী? তা কি ঈশ্বরের পবিত্রতা? ঈশ্বরের পবিত্রতা হচ্ছে ঈশ্বরের অনন্য সারসত্য। আমাদের গতবারের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু কী ছিল? (শয়তানের মন্দত্বকে উপলব্ধি করা। অর্থাৎ, শয়তান কীভাবে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রথাগত সংস্কৃতি, কুসংস্কার, ও সামাজিক প্রবণতা ব্যবহার করে মানবজাতিকে ভ্রষ্ট করে।) আমাদের গতবারের আলোচনার এটাই ছিল মূল বিষয়স্তু। শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট করার জন্য জ্ঞান, বিজ্ঞান, কুসংস্কার, প্রথাগত সংস্কৃতি, ও সামাজিক প্রবণতাকে ব্যবহার করে; এগুলিই সেই পথ—মোট পাঁচটি—যে পথে শয়তান মানুষকে কলুষিত করে। এর মধ্যে কোন পথটিকে শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে বলে তোমার মনে হয়? মানুষকে সবচেয়ে গভীরভাবে ভ্রষ্ট করতে কোনটি ব্যবহৃত হয়? (প্রথাগত সংস্কৃতি। এর কারণ হল, শয়তানোচিত দর্শন, যেমন কনফুসিয়াস এবং মেনসিয়াসের মতবাদ, এগুলি আমাদের মনে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে।) তাহলে কিছু ভাই বোন মনে করে যে উত্তরটা হল “প্রথাগত সংস্কৃতি”। কারও কাছে কি অন্য কোনো উত্তর রয়েছে? (জ্ঞান। জ্ঞান আমাদের কখনোই ঈশ্বরের উপাসনা করতে দেবে না। তা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, এবং ঈশ্বরের শাসনকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ বলা যায়, শয়তান আমাদের অল্পবয়স থেকেই অধ্যয়ন শুরু করতে বলে, এবং বলে যে শুধুমাত্র অধ্যয়ন ও জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই আমরা উজ্জ্বল ভবিষ্যত ও আনন্দময় ভাগ্য লাভ করতে পারবো।) তোমার ভবিষ্যৎ ও ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শয়তান জ্ঞানকে ব্যবহার করে, এবং তারপর সে তোমাকে তার ইচ্ছায় চলতে বাধ্য করে; তুমি মনে করো যে এই ভাবেই শয়তান মানুষকে সবচেয়ে গভীরভাবে ভ্রষ্ট করে। তাহলে তোমাদের মধ্যে বেশিরভাগই মনে করো যা ব্যবহার করে শয়তান মানুষকে গভীরতম ভাবে ভ্রষ্ট করে তা হল জ্ঞান। অন্য কারও কি অন্য কোনও মতামত রয়েছে? যেমন ধরো, বিজ্ঞান বা সামাজিক প্রবণতার ক্ষেত্রে কী বলা যায়? কেউ কি উত্তর হিসাবে এইগুলির কোনোটিকে চিহ্নিত করবে? (হ্যাঁ।) আজকে আমি আবারও আলোচনা করব সেই পাঁচটি উপায়ের বিষয়ে যার মাধ্যমে শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট করে, এবং আমার বলা হয়ে গেলে আমি তোমাদের আরও কয়েকটি প্রশ্ন করব, যাতে আমরা দেখতে পারি মানুষকে সবচেয়ে গভীরভাবে ভ্রষ্ট করার জন্য শয়তান এর মধ্যে কোন উপায়টি ব্যবহার করে।

শয়তান যে পাঁচটি উপায়ে মানুষকে ভ্রষ্ট করে, তার মধ্যে আমরা প্রথম যেটির উল্লেখ করেছিলাম তা হল জ্ঞান, তাহলে জ্ঞানকেই আমাদের আলোচনার প্রথম বিষয় হিসাবে নেওয়া যাক। শয়তান জ্ঞানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। ভালো করে শুনে রাখো: জ্ঞান এক প্রকার টোপ মাত্র। মানুষকে প্রলুব্ধ করা হয় কঠোর অধ্যয়ন করতে এবং দিনের পর দিন নিজেদের উন্নত করতে, জ্ঞানকে অস্ত্রে পরিণত করে সেই অস্ত্র দ্বারা নিজেদের সজ্জিত করতে, এবং তারপর জ্ঞানের ব্যবহার করে বিজ্ঞানের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করতে; প্রকারান্তরে বললে, তুমি যত বেশি জ্ঞান অর্জন করবে, তত বেশি উপলব্ধি করতে পারবে। শয়তান মানুষকে এইসব বলে; শয়তান মানুষকে বলে জ্ঞান অর্জনকালে উচ্চ আদর্শকে লালন করতে, নির্দেশ দেয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাষ গড়ে তোলার। মানুষের অজ্ঞাতসারে, শয়তান এই ধরনের বহু বার্তা পৌঁছে দেয়, যার ফলে মানুষ অবচেতনভাবে অনুভব করে যে এই বিষয়গুলি সঠিক অথবা উপকারী। অজ্ঞাতসারে, মানুষ সেই পথে পা বাড়ায়, নিজেদের অজান্তেই তাদের নিজস্ব আদর্শ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয়ে এগিয়ে চলে। ধাপে ধাপে, অজ্ঞাতসারেই তারা শয়তান প্রদত্ত জ্ঞান থেকে শেখে যে কোন কোন উপায়ে মহান অথবা বিখ্যাত ব্যক্তিরা চিন্তা করে। কিছু কিছু বিষয় তারা শেখে বীর হিসাবে গণ্য ব্যক্তিদের কীর্তি থেকেও। সেই বীরদের কীর্তির মাধ্যমে শয়তান মানুষকে কী পরামর্শ দিচ্ছে? সে মানুষের মধ্যে কী প্রবিষ্ট করাতে চাইছে? যে, মানুষকে অবশ্যই দেশপ্রেমিক হতে হবে, তার রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাবোধ থাকতে হবে, এবং তাকে আত্মিক বীরত্বের অধিকারী হতে হবে। মানুষ ঐতিহাসিক কাহিনী বা বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের জীবনী থেকে কি শেখে? শেখে ব্যক্তিগত আনুগত্যবোধের ধারণার অধিকারী হওয়া, নিজের বন্ধু ও ভ্রাতাদের জন্য যে কোনো কিছু করতে তৈরি থাকা। শয়তান প্রদত্ত এই জ্ঞানের মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজের অজ্ঞাতসারেই এমন অনেক কিছুই শিখে ফেলে যা মোটেই ইতিবাচক নয়। মানুষের অজান্তেই শয়তান-সৃষ্ট বীজ মানুষের অপরিণত মনে বপন করা হয়। এই বীজগুলির কারণেই তারা অনুভব করে যে তাদের মহান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে হবে, খ্যাতিমান হতে হবে, নায়ক হয়ে উঠতে হবে, দেশপ্রেমিক হতে হবে, হয়ে উঠতে হবে এমন মানুষ যারা নিজেদের পরিবারকে ভালোবাসে, এবং হতে হবে এমন মানুষ যে তার কোনো বন্ধুর জন্য যে কোনও কিছু করতে পারে, ও যার ব্যক্তিগত আনুগত্যবোধ আছে। শয়তানের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে, অজ্ঞাতসারে তারা সেই পথেই চলতে থাকে যা তাদের উদ্দেশ্যে শয়তান প্রস্তুত করেছে। যখন তারা সেই পথে চলতে থাকে, তারা জীবনযাপনের জন্য শয়তানের নিয়মগুলি মেনে নিতে বাধ্য হয়। সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞাতসারেই তারা তাদের জীবনযাপনের নিজস্ব নিয়ম তৈরি করে ফেলে, কিন্তু সেগুলি শয়তানের নিয়ম ছাড়া আর কিছুই নয়, যা সে বলপূর্বক তাদের ভিতর সঞ্চার করেছে। শেখার প্রক্রিয়া চলাকালীন, শয়তান মানুষকে দিয়ে তাদের নিজেদের অভীষ্টগুলিকে সযত্নে লালন করায়, এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য, জীবনযাপনের নিয়ম, জীবনের দিকনির্দেশ স্থির করায়, এবং এই সমস্ত সময় জুড়ে তাদের মধ্যে শয়তানের জিনিসগুলি প্রবিষ্ট করে গল্প, জীবনী, ও মানুষকে প্রলুব্ধ করার অন্যান্য সকল উপায়ের মাধ্যমে, অল্প অল্প করে, যতক্ষণ না তারা টোপ গ্রহণ করে। এইভাবে, তাদের শেখার সময়ে, কেউ পছন্দ করে সাহিত্য, কেউ অর্থনীতি, কেউ জ্যোতির্বিদ্যা বা ভূগোল। আবার কেউ কেউ আছে যারা রাজনীতি পছন্দ করে, কেউ কেউ পছন্দ করে পদার্থবিদ্যা, কেউ রসায়ন, এমনকি এমনও আছে এখনও যাদের ধর্মতত্ত্ব পছন্দ। এগুলি সবই সামগ্রিক জ্ঞানের এক একটা অংশ। তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ-নিজ অন্তরে জানো যে এই বিষয়বস্তুগুলি আসলে কী; তোমাদের প্রত্যেকেরই আগে সেগুলোর সাথে যোগাযোগ ঘটেছে। তোমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই জ্ঞানের এই শাখাগুলির মধ্যে কোনও না কোনও একটি বিষয়ে অবিরাম কথা বলে যেতে সক্ষম। এবং তাই এই জ্ঞান মানুষের মনে কতটা গভীরভাবে প্রবেশ করেছে তা খুবই স্পষ্ট; মানুষের মনে এই জ্ঞান কী অবস্থান দখল করেছে এবং তাদের উপর এর প্রভাব কত গভীর তা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান। একবার যখন কোনও ব্যক্তির মধ্যে জ্ঞানের কোনও একটি দিকের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়, যখন কেউ গভীরভাবে প্রেমে পড়ে যায় সেই বিষয়ের সাথে, তখন তাদের অজ্ঞাতসারেই তাদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠে: কেউ কেউ হতে চায় লেখক, কেউ সাহিত্যিক হতে চায়, কেউ রাজনীতিতে সফল হতে চায়, এবং কেউ কেউ অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়ে ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে চায়। আবার মানুষের মধ্যে এমন একটি অংশ রয়েছে যারা নায়কোচিত হয়ে উঠতে চায়, মহান অথবা প্রসিদ্ধ হতে চায়। কেউ কোন ধরনের ব্যক্তি হয়ে উঠতে চায় তা নির্বিশেষে, তাদের লক্ষ্য হল জ্ঞান অর্জনের এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করা এবং তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনের জন্য তা ব্যবহার করা, তাদের নিজস্ব ইচ্ছা, তাদের নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করা। শুনতে যতই ভালো লাগুক না কেন—তারা তাদের স্বপ্নগুলো সফল করতে চায়, তাদের জীবন নষ্ট করতে চায় না, অথবা চায় যে একটি নির্দিষ্ট পেশাগত জীবিকা থাকুক—তারা এইসব উচ্চ আদর্শ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, কিন্তু আসলে এসবের প্রয়োজনীয়তা কী? তোমরা কি আগে কখনও এই প্রশ্নটা বিবেচনা করে দেখেছ? শয়তান কেন এইভাবে কাজ করে? মানুষের মধ্যে এই বিষয়গুলি প্রবিষ্ট করার পিছনে শয়তানের উদ্দেশ্য কী? তোমাদের হৃদয়কে এই প্রশ্নের বিষয়ে স্বচ্ছ হতে হবে।

এবার আলোচনা করা যাক শয়তান কীভাবে জ্ঞানের ব্যবহার করে মানুষকে ভ্রষ্ট করে, সেই নিয়ে। প্রথমত, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে: জ্ঞানের মাধ্যমে শয়তান কী দিতে চায় মানুষকে? কোন প্রকার পথে সে মানুষকে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যেতে চায়? (ঈশ্বরকে প্রতিরোধ করার পথ।) হ্যাঁ, সেটা নিশ্চিতভাবেই তাই—ঈশ্বরকে প্রতিরোধ। তাহলে তুমি দেখতে পাচ্ছ, এটা মানুষের জ্ঞান অর্জনেরই পরিণতি—তারা ঈশ্বরকে প্রতিরোধ করতে শুরু করে। তাহলে, শয়তানের অশুভ উদ্দেশ্যগুলো কী কী? তোমার কাছে এই ব্যপারটা স্পষ্ট নয়, তাই নয় কি? মানুষের জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া চলাকালীন, শয়তান সমস্ত রকমের পদ্ধতি প্রয়োগ করে, তা সেটা গল্প বলাই হোক, তাদের কোনো একটা নির্দিষ্ট জ্ঞান দেওয়াই হোক, অথবা তাদের আকাঙ্ক্ষা বা উচ্চাভিলাষ পূর্ণ করতে দেওয়াই হোক না কেন। শয়তান তোমাকে পতনের কোন রাস্তায় নিয়ে যেতে চায়? মানুষ মনে করে যে, জ্ঞান অর্জন করার মধ্যে ভুল কিছু নেই, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মানুষের কাছে বিষয়টা এমনভাবে উপস্থাপিত যাতে তা আকর্ষণীয় মনে হয়, উচ্চ আদর্শ পোষণ করা বা উচ্চাশা থাকাই চালিকাশক্তি থাকার সমান, এবং এটাই জীবনের সঠিক পথ হওয়া উচিত। মানুষ যদি তাদের নিজস্ব আদর্শ উপলব্ধি করতে পারে, বা একটি পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তবে তা কি তাদের পক্ষে অধিকতর গৌরবান্বিত পন্থা নয়? এই কাজগুলি করে, কেউ যে শুধু তার পূর্বপুরুষদের সম্মানজ্ঞাপন করতে পারে তা-ই নয়, বরং সে একই সাথে ইতিহাসে নিজের চিহ্ন রেখে যাওয়ার সুযোগও পায়—তা কি একটা ভালো বিষয় নয়? জাগতিক মানুষের দৃষ্টিতে তা একটা ভালো বিষয়, এবং তাদের কাছে সেটি সঠিক এবং ইতিবাচক হওয়া উচিত। তবে বিষয়টা কি শুধু এইটুকুই যে শয়তান তার অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষকে এই প্রকার পথে নিয়ে চলে, আর সেই পথে শুধু এটুকুই রয়েছে? অবশ্যই তা নয়। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের আদর্শ যতই উচ্চ হোক না কেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা যতই বাস্তববাদী হোক বা যতই যথাযথ হোক না কেন, মানুষ কেবলমাত্র যা অর্জন করতে চায়, মানুষ একমাত্র যা অন্বেষণ করে, তা দুটিমাত্র শব্দের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই দুটি শব্দ প্রতিটি ব্যক্তির জীবনের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এগুলিই সেই বস্তু যা শয়তান মানুষের মধ্যে প্রবিষ্ট করতে চায়। এই দুটি শব্দ কী? সেগুলি হল “খ্যাতি” এবং “লাভ”। শয়তান একটি অতীব সূক্ষ্ম পদ্ধতির প্রয়োগ করে, তা এমন এক পদ্ধতি যা মানুষের পূর্বধারণাগুলির সাথে মিলে যায়, যা বিন্দুমাত্র উগ্র নয়, যার মাধ্যমে মানুষকে দিয়ে তাদের অজ্ঞাতসারেই শয়তান নিজের জীবনযাপনের পদ্ধতি ও নিয়মগুলি গ্রহণ করায়, এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য ও জীবনের পথনির্দেশ স্থাপন করে, এবং তা করতে গিয়ে তাদের অজান্তেই মানুষের জীবনে চলে আসে উচ্চাকাঙ্ক্ষা। জীবনের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি যতই মহৎ বলে মনে হোক না কেন, তারা “খ্যাতি” এবং “লাভ” এর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যে কোনও মহান অথবা যশস্বী ব্যক্তিত্ব—বস্তুত, সকল মানুষই—জীবনে যা অনুসরণ করে, তা শুধুমাত্র এই দুটি শব্দের সাথে সম্পর্কিত: “খ্যাতি” এবং “লাভ”। মানুষ মনে করে যে একবার খ্যাতি ও লাভ অর্জন করলে তারপর তারা উচ্চ মর্যাদা ও বিপুল সম্পদ উপভোগ করার জন্য এবং জীবনকে উপভোগ করার জন্য সেগুলিকে মূলধন হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে। তারা মনে করে যে খ্যাতি এবং লাভ হল এক প্রকার মূলধন যা ভোগসুখের অন্বেষণ এবং উদ্দাম দৈহিক ভোগবিলাসময় জীবন অর্জন করার জন্য তারা ব্যবহার করতে পারবে। এই যে খ্যাতি এবং লাভ, যার জন্য মানবজাতি এত লুব্ধ, তা অর্জন করার উদ্দেশ্যে মানুষ স্বেচ্ছায়, যদিও অজ্ঞাতসারেই, তাদের দেহ, মন, তাদের যা কিছু আছে সব, তাদের ভবিষ্যত, এবং তাদের নিয়তি, শয়তানের হাতে তুলে দেয়। তারা এক মুহুর্তের দ্বিধা ছাড়াই তা করে, তারা যা যা হস্তান্তর করেছে সেসকল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে তারা চির অজ্ঞ। এইভাবে একবার শয়তানের শরণ নিয়ে তার অনুগত হয়ে যাওয়ার পর, মানুষ কি নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে? একেবারেই না। তারা আদ্যোপান্তভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে শয়তানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তারা সম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণভাবে একটা চোরাবালিতে ডুবে গেছে, এবং তারা নিজেদের মুক্ত করতে অক্ষম। কেউ একবার খ্যাতি ও লাভে নিমজ্জিত হলে, তারা আর সন্ধান করে না সেসবের যা কিছু উজ্জ্বল, যা কিছু ন্যায়পরায়ণ, বা যা কিছু সুন্দর ও মঙ্গলময়। এর কারণ হল, মানুষের উপর খ্যাতি ও লাভের যে প্রলোভনকারী ক্ষমতা রয়েছে তা সুবিশাল; সেগুলি তাদের সারা জীবন এবং এমনকি অনন্তকাল পর্যন্ত নিরন্তর অনুসরণীয় বিষয় হয়ে ওঠে। একথা সত্যি নয় কি? কিছু লোক বলবে যে জ্ঞান অর্জন করার অর্থ হল, যাতে তারা সময়ের সাথে পিছিয়ে না পড়ে বা দুনিয়া থেকে পিছিয়ে না থাকে সেই উদ্দেশ্যে বই পড়া, বা যা তারা ইতিমধ্যে জানে না তেমন কিছু জিনিস শেখা, এর চেয়ে বেশি আর কিছুই নয়। জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল যাতে তারা অন্নসংস্থান করতে পারে, যাতে তাদের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগে, অথবা মৌলিক প্রয়োজনগুলির সংস্থান হয়। এমন কোনো ব্যক্তি কি আছে যে এক দশক যাবৎ কঠোর অধ্যয়ন সহ্য করবে শুধুই মৌলিক প্রয়োজনগুলি মেটানোর জন্য, শুধুমাত্র খাদ্যের সংস্থানের জন্য? না, এরকম কেউ নেই। তাহলে কেন কোনো ব্যক্তি এতগুলো বছর ধরে এই কষ্ট সহ্য করে? তা শুধু খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে। যেন খ্যাতি ও লাভ তাদের জন্য সুদূরে প্রতীক্ষারত, তাদের হাতছানি দিচ্ছে, এবং তারা বিশ্বাস করে যে কেবলমাত্র তাদের নিজস্ব অধ্যাবসায়, ক্লেশসাধন, ও সংগ্রামের মাধ্যমে তারা সেই পথ অনুসরণ করতে পারবে যা তাদের খ্যাতি ও লাভ অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে। এরকম একজন ব্যক্তিকে তাদের ভবিষ্যতের পথের উদ্দেশ্যে, তাদের ভবিষ্যত সুখভোগের উদ্দেশ্যে, এবং এক উন্নত জীবন লাভের উদ্দেশ্যে এই কষ্টগুলি ভোগ করতে হবে। এই জ্ঞান আদতে কী—তোমরা কি আমায় তা বলতে পার? তা কি মানুষের মধ্যে শয়তানের ঢুকিয়ে দেওয়া জীবনযাপনের নিয়ম ও দর্শন নয়, যেমন, “দলকে ভালবাসো, দেশকে ভালবাসো, আর তোমার ধর্মকে ভালবাসো” এবং “কোনও জ্ঞানী ব্যক্তি পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করে”? তা কি মানুষের মধ্যে শয়তানের দ্বারা সঞ্চারিত জীবনের “মহৎ আদর্শ” নয়? উদাহরণস্বরূপ, মহান ব্যক্তিদের ধ্যানধারণা, বিখ্যাত ব্যক্তিদের সততা অথবা বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের দুঃসাহসী তেজ, অথবা মল্লবিদ্যা বিষয়ক উপন্যাসে নায়ক এবং তলোয়ারধারীদের বীরত্ব ও দয়াশীলতার কথাই ধরা যাক—এই সবই কি শয়তানের এই আদর্শগুলিকে প্রবিষ্ট করানোর পদ্ধতি নয়? এই ধারণাগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্মের উপর প্রভাব বিস্তার করে, এবং প্রতিটি প্রজন্মের মানুষ এই ধারণাগুলি গ্রহণ করে। তারা ক্রমাগত সেই “মহৎ আদর্শ” গুলির অন্বেষণে সংগ্রাম করে, যার জন্য তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ পর্যন্ত করতে পারে। এটাই সেই উপায় ও পন্থা যার মাধ্যমে শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট করতে জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটায়। সুতরাং, শয়তান মানুষকে এই পথে নিয়ে যাওয়ার পর, তারা কি আর ঈশ্বরের আনুগত্য ও উপাসনায় সক্ষম থাকে? এবং তারা কি আর ঈশ্বরের বাক্য গ্রহণে এবং সত্যের অন্বেষণে সক্ষম? বিন্দুমাত্র নয়—কারণ তারা শয়তানের দ্বারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। শয়তানের দ্বারা মানুষের মধ্যে প্রবিষ্ট জ্ঞান, চিন্তাভাবনা এবং মতামতগুলিকে আবার দেখে নেওয়া যাক: এই বিষয়গুলির মধ্যে কি ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের এবং ঈশ্বরের উপাসনার সত্য রয়েছে? এগুলির মধ্যে ঈশ্বরে ভীতি ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করার সত্য আছে কি? সেখানে ঈশ্বরের বাক্যের মধ্যে কোনো একটিও রয়েছে কি? এমন কিছু কি রয়েছে যা সত্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত? বিন্দুমাত্রও নেই—এই বিষয়গুলি সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। তোমরা কি এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারো যে শয়তান মানুষের মধ্যে যে বিষয়গুলো প্রবিষ্ট করেছে সেখানে কোনও সত্য নেই? সে সাহস নেই তোমাদের—কিন্তু তাতে কিছু আসে-যায় না। যদি তুমি বুঝতে পারো যে “খ্যাতি” এবং “লাভ”, এই দুটিই হল মূল শব্দ যা প্রয়োগ করে শয়তান মানুষকে মন্দের পথে প্রলুব্ধ করে, তবে সেইটুকুই যথেষ্ট।

আমরা এতক্ষণ যে বিষয়ে আলোচনা করলাম, সেটার একটা সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা যাক: শয়তান মানুষকে দৃঢ়ভাবে তার নিয়ন্ত্রণের অধীন করে রাখার উদ্দেশ্যে কী ব্যবহার করে? (খ্যাতি এবং লাভ।) সুতরাং, শয়তান মানুষের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে খ্যাতি ও লাভের প্রয়োগ করে, যতক্ষণ না সকল মানুষ শুধু খ্যাতি এবং লাভের বিষয়ে ছাড়া অন্যকিছু চিন্তা করতে না পারে। খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে তারা সংগ্রাম করে, খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য করে, খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে অপমান সহ্য করে, খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে তাদের সর্বস্ব ত্যাগ করে এবং খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে তারা যে কোনও রায় দান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এইভাবে, শয়তান মানুষকে অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে, এবং তা থেকে নিজেকে মুক্ত করার শক্তি বা সাহস তাদের নেই। তারা অজ্ঞাতসারেই সেই শৃঙ্খলভার বহন করে, এবং বহু কষ্টে অগ্রসর হতে থাকে। এই খ্যাতি ও লাভের উদ্দেশ্যে, মানবজাতি ঈশ্বরকে পরিত্যাগ করে, তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, এবং ক্রমশ খল হয়ে ওঠে। এই ভাবেই, শয়তানের খ্যাতি ও লাভের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ধ্বংস হয়ে চলেছে। শয়তানের ক্রিয়াকলাপগুলির প্রতি এখন দৃষ্টিপাত করলে, তার অশুভ অভীষ্টগুলি কি আদ্যোপান্তই ঘৃণার্হ নয়? তোমরা হয়তো আজও শয়তানের অশুভ উদ্দেশ্যগুলি দেখতে পাচ্ছ না, কারণ তোমরা মনে করো যে খ্যাতি ও লাভ ছাড়া কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। তোমরা মনে করো যে মানুষ যদি খ্যাতি ও লাভ পরিহার করে, তাহলে তারা আর সামনের পথটিকে দেখতে পাবে না, তারা আর তাদের লক্ষ্যগুলিকে দেখতে পাবে না, তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার, ম্লান এবং তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু ধীরে ধীরে একদিন তোমরা সকলেই বুঝবে, খ্যাতি এবং লাভ হল সেই ভয়ঙ্কর শৃঙ্খল যা শয়তান মানুষকে আবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। যখন সেই দিনটি আসবে, তুমি শয়তানের নিয়ন্ত্রণকে, এবং শয়তান যে শৃঙ্খলগুলি ব্যবহার করে তোমাদের আবদ্ধ করে রাখে সেগুলিকে, পুরোপুরিভাবে প্রতিহত করবে। যখন এমন সময় আসবে যে শয়তান তোমার মধ্যে যা যা প্রবিষ্ট করেছে সেগুলি সকলই তুমি ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইবে, তখনই তুমি শয়তানের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিযুক্ত করবে, এবং শয়তান তোমায় যা যা এনে দিয়েছে সেই সকল কিছুকে প্রকৃতরূপে ঘৃণা করবে। কেবলমাত্র তখনই মানবজাতি ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা লাভ করবে।

আমরা এইমাত্র আলোচনা করলাম কীভাবে মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তান জ্ঞানের প্রয়োগ করে, তাহলে মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তান কীভাবে বিজ্ঞানের প্রয়োগ করে, এবার সেই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রথমত, মানুষের কৌতূহল, মানুষের বিজ্ঞান অন্বেষণ এবং রহস্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তান বিজ্ঞানের নাম ব্যবহার করে। বিজ্ঞানের নাম করে, শয়তান মানুষের বস্তুগত চাহিদা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত উন্নত করার আকাঙ্ক্ষাকে পরিতৃপ্ত করে। সুতরাং, এই অজুহাতেই শয়তান বিজ্ঞান ব্যবহার করে মানুষকে কলুষিত করে। শয়তান কি কেবলমাত্র মানুষের চিন্তাভাবনা বা মানুষের মনকেই বিজ্ঞানের মাধ্যমে এইভাবে কলুষিত করে? আমাদের আশেপাশের যে সকল মানুষ, ঘটনাবলী এবং বস্তুসমূহ আমরা দেখতে পাই এবং যেগুলির সংস্পর্শে আসি, সেগুলির মধ্যে শয়তান বিজ্ঞানের দ্বারা আর কোন বিষয়টিকে ভ্রষ্ট করে? (প্রাকৃতিক পরিবেশকে।) সঠিক। মনে হচ্ছে যে, তোমরা এর দ্বারা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রভাবিত হয়েছ। মানুষকে প্রবঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানের সকল বিভিন্নরকম আবিষ্কার ও সিদ্ধান্তকে ব্যবহার করার পাশাপাশি, ঈশ্বরের দ্বারা মানুষকে প্রদত্ত জীবনধারণের পরিবেশকে নির্বিচারে ধ্বংস এবং শোষণ করার উপায় হিসাবেও শয়তান বিজ্ঞানের ব্যবহার করে। এমনটা সে এই অজুহাতে করে, যে মানুষ যদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যায়, তাহলে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবেশ ও গুণমান ক্রমাগত উন্নত হবে, এবং উপরন্তু, বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যই হল মানুষের দৈনন্দিন ক্রমবর্ধমান বস্তুগত চাহিদা পূর্ণ করা এবং ক্রমাগত তাদের জীবনযাত্রায় গুণমানের উন্নতিসাধন করে যাওয়া। এ-ই হল শয়তানের দ্বারা বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর তাত্ত্বিক ভিত্তি। অথচ, বিজ্ঞান মানবজাতির জন্য কী বহন করে এনেছে? আমাদের জীবনযাপনের পরিবেশ—এবং সমগ্র মানবজাতির জীবনযাপনের পরিবেশ—কলুষিত হয়ে যায়নি কি? মানুষ যে বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়, সেই বাতাস কি দূষিত হয়ে যায়নি? আমরা যে জল পান করি, তা কি দূষিত হয়ে যায়নি? আমরা যে সকল খাদ্য গ্রহণ করি তা কি এখনও জৈব এবং প্রাকৃতিক? অধিকাংশ শস্য ও শাকসব্জি জিনগতভাবে পরিবর্তিত, সার দিয়ে সেগুলিকে উৎপাদন করা হয়েছে, এবং বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রজাতি তৈরি করা হয়েছে। যে সকল শাকসব্জি ও ফলমূল আমরা খাই সেগুলোও আর প্রাকৃতিক নয়। এমনকি, প্রাকৃতিক ডিম খুঁজে পাওয়াও আজকের দিনে আর সহজ নয়, এবং তার স্বাদও আর আগের মতো নেই, কারণ শয়তানের তথাকথিত “বিজ্ঞান”-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যেই তার প্রক্রিয়াকরণ হয়ে গেছে। বৃহত্তর পটভূমিকায় দেখলে, সমগ্র বায়ুমণ্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত ও দূষিত হয়ে গেছে; পাহাড়পর্বত, হ্রদ, অরণ্য, নদী, মহাসাগর, এবং ভূমির উপরে বা নীচে যা কিছু রয়েছে, তার সমস্তটাই তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সাফল্যের প্রকোপে ধ্বংস হয়ে গেছে। সংক্ষেপে বললে, সমগ্র প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঈশ্বর মানবজাতিকে যে বসবাসের পরিবেশ দিয়েছেন, তা তথাকথিত বিজ্ঞানের দ্বারা বিনষ্ট এবং ধ্বংস হয়ে গেছে। যদিও এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছে যারা জীবনের যে গুনমান সর্বদা আশা করেছিল তা অর্জন করেছে, এতে তাদের কামনাবাসনা ও ইন্দ্রিয়সুখ চরিতার্থ হয়েছে, কিন্তু মানুষ যে পরিবেশে বাস করে তা মূলত বিজ্ঞানের বিভিন্ন “সাফল্যের” দ্বারা বিনষ্ট এবং ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে, আমাদের আর বিশুদ্ধ বাতাসে একটিবারের জন্যও নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার নেই। এটাই কি মানবজাতির দুঃখ নয়? মানুষকে যখন এরকম অবস্থায় বসবাস করতেই হবে, তখন কি আর তার জন্য বলার মতো কোনো সুখ অবশিষ্ট রয়েছে? একেবারে প্রথম থেকেই, এই পরিমণ্ডল এবং জীবনধারণের যে পরিবেশে মানুষ বসবাস করে, ঈশ্বর তা মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন। মানুষ যে জল পান করে, যে বাতাসে সে শ্বাস গ্রহণ করে, যে বিভিন্ন খাদ্যবস্তু সে আহার করে, সেইসাথে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও জীবিত সত্তা, এবং এমনকি পর্বতরাশি, হ্রদ ও মহাসাগর—এই সজীব পরিবেশের প্রতিটি অংশই ঈশ্বর মানুষকে দান করেছিলেন; তা প্রাকৃতিক, ঈশ্বরের নির্ধারিত প্রাকৃতিক বিধান অনুসারেই তা পরিচালিত হয়। বিজ্ঞান না থাকলে মানুষ এখনও ঈশ্বরের দ্বারা তাদের উপর অর্পিত পন্থাগুলি অবলম্বন করেই চলবে, যা কিছু আদিম ও প্রাকৃতিক তা তারা উপভোগ করতে পারবে, এবং তারা সুখী হবে। যদিও এখন এই সবকিছুই শয়তানের দ্বারা ধ্বংস ও বিনষ্ট হয়েছে; মানুষের জীবনধারণের মৌলিক পরিসর আর তার আদি অকৃত্রিম রূপে নেই। কিন্তু কীসের ফলে এমন হয়েছিল বা কীভাবে এমন হল, তা কেউই বুঝে উঠতে পারে না, এবং আরো বেশি সংখ্যায় মানুষ তাদের মধ্যে শয়তানের প্রবিষ্ট ধারণাগুলি অনুসারেই বিজ্ঞানমুখী হয় এবং বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করে। তা কি চূড়ান্ত রকমের ঘৃণার্হ ও শোচনীয় নয়? এখন যখন শয়তান মানুষের অস্তিত্বের পরিসর ও সেইসাথে তাদের জীবনধারণের পরিবেশ অধিকার করে নিয়েছে, এবং মানুষকে এতদূর পর্যন্ত ভ্রষ্ট করে ফেলেছে, এবং যখন মানবজাতি এরকমভাবে এগিয়ে চলেছে, তখন ঈশ্বরের কি ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের ব্যক্তিদের ধ্বংস করার কোনও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? মানুষ যদি এইভাবে অগ্রসর হয়ে চলে, তাহলে কোন দিশায় তারা উপনীত হবে? (তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।) কীভাবে তাদের নিশ্চিহ্ন করা হবে? খ্যাতি ও লাভের জন্য লোলুপ সন্ধানের পাশাপাশি মানুষ নিরন্তর বৈজ্ঞানিক অন্বেষণ চালিয়ে যায় এবং গবেষণার গভীরে ডুব দেয়, এবং তারপর তারা অবিরাম এমনভাবে কাজ করে যায় যাতে তাদের জাগতিক চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাগুলি পূর্ণ হয়; তারপর মানুষের পরিণাম কী? প্রথমতঃ, বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে, এবং, যখন এমনটা ঘটে, তখন মানুষের দেহ, তাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, এই ভারসাম্যহীন পরিবেশের ফলে কলুষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ও মহামারি পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এটা কি সত্য নয় যে এখন এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যার উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই? এখন যেহেতু তোমরা এটা বুঝেছ, তাহলে মানবজাতি যদি ঈশ্বরের অনুসরণ না করে, বরং যদি সর্বদা এভাবেই শয়তানের অনুগামী হয়ে চলে—ক্রমাগত নিজেদের সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য তারা জ্ঞানের ব্যবহার করে চলে, বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে অবিরাম মানবজীবনের ভবিষ্যতের সন্ধান করে চলে, জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য এই ধরনের পদ্ধতির ব্যবহার করে চলে—তাহলে এর পরিণাম মানবজাতির জন্য কেমন হবে তা কি তুমি বুঝতে পারছ? স্বাভাবিকভাবেই মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে: ধাপে-ধাপে মানুষ অগ্রসর হয়ে চলেছে ধ্বংসের দিকে, তাদের নিজেদের ধ্বংসের দিকে! এ কি নিজেই নিজের বিনাশ ডেকে আনা নয়? এবং এ কি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলস্বরূপই নয়? এখন মনে হচ্ছে যেন বিজ্ঞান হল এক রকমের জাদুকরি ঔষধ যা শয়তান মানুষের জন্য প্রস্তুত করেছে, যাতে যখন তোমরা বিষয়গুলি উপলব্ধি করায় সচেষ্ট হও, তখন তোমরা যেন অস্পষ্টতায় আছন্ন থাকো; যতই কঠিনভাবে দেখো না কেন, তোমরা বিষয়গুলিকে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাও না, এবং যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমরা সেগুলি বুঝে উঠতে পারো না। এদিকে শয়তান বিজ্ঞানের নাম ব্যবহার করে তোমার বাসনাকে উত্তেজিত করে তুলে তোমাকে তার নিয়ন্ত্রণের অধীন করে তোলে এবং এক পা এক পা করে অতল গহ্বরের দিকে ও মৃত্যুর দিকে তোমাকে চালিত করে। এবং তার ফলে মানুষ স্পষ্টতই দেখতে পাবে যে প্রকৃতপক্ষে মানুষের ধ্বংসসাধন ঘটে শয়তানের হাতেই—শয়তানই হল তার মূল হোতা। তাই নয় কি? (হ্যাঁ, ঠিক তাই।) এটাই শয়তানের মানবজাতিকে ভ্রষ্ট করার দ্বিতীয় উপায়।

মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তানের দ্বারা অবলম্বন করা তৃতীয় পন্থাটি হল প্রথাগত সংস্কৃতি। প্রথাগত সংস্কৃতি এবং কুসংস্কারের মধ্যে নানান সাদৃশ্য রয়েছে, তবে পার্থক্য হল এই, যে, প্রথাগত সংস্কৃতিতে কিছু কাহিনী, টিপ্পনী এবং সূত্র উল্লেখ করা থাকে। শয়তান নিজের মনগড়া বিভিন্ন লোককথা বা ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লিখিত নানান কাহিনির অবতারণা করেছে বা সেগুলিকে উদ্ভাবন করেছে, যা মানুষের মনে প্রথাগতভাবে সাংস্কৃতিক অথবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন চরিত্রদের বিষয়ে গভীর প্রভাব ফেলে গিয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, চীনে রয়েছে “অমরত্ব-প্রাপ্ত আটজনের সাগর পার হওয়া”, “পশ্চিমে যাত্রা”, জেড সম্রাটের কাহিনি, “নেঝা-র ড্রাগন-রাজার উপর জয়লাভ” এবং “দেবতাদের অভিষেক”। এই সকল বিষয় কি মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়নি? এমনকি তোমাদের মধ্যে যদি কেউ খুঁটিনাটিগুলো নাও-বা জানো, তবু তোমরা গল্পগুলো মোটামুটি জানো, এবং এই সাধরণ বিষয়বস্তুগুলোই তোমার হৃদয় এবং মননের সাথে এমনভাবে সংলগ্ন হয়ে রয়েছে, যে, তোমরা সেগুলো ভুলে যেতে পারো না। এই ধরনের ধারণা ও কিংবদন্তীগুলিকে শয়তান বহুকাল আগেই মানুষের জন্য তৈরি করে রেখেছিল, যা বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত হয়েছে। এই বিষয়গুলো সরাসরি মানুষের আত্মার ক্ষতি ও ক্ষয় করে এবং মানুষকে একের পর এক সম্মোহনের আওতায় নিয়ে আসে। অর্থাৎ, বলা যেতে পারে যে, যেইমাত্র তুমি এই ধরনের প্রথগত সংস্কৃতি, কাহিনি অথবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিষয়কে মেনে নাও, যেইমাত্র সেগুলি তোমার মনে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং যেইমাত্র সেগুলি তোমার হৃদয়ের সাথে জড়িয়ে যায়, তখনই তুমি যেন সম্মোহিত হয়ে যাও—তুমি এই সকল সংস্কৃতির ফাঁদ, এই ধারণাসমূহ এবং প্রথগত কাহিনিগুলির দ্বারা প্রভাবিত হও ও সেগুলির জালে জড়িয়ে পড়ো। সেগুলি প্রভাবিত করে তোমার জীবনকে, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে কে, এবং তোমার বিচারবুদ্ধিকে। অধিকন্তু, সেগুলি তোমার জীবনের প্রকৃত পথের অন্বেষণকেও প্রভাবিত করে: এ এক দুষ্ট সম্মোহন। যতই চেষ্টা করো না কেন তুমি একে ঝেড়ে ফেলতে পারবে না; তুমি যতই তাদের খণ্ডন করার চেষ্টা করো, তারা খণ্ডিত হবে না; তুমি যতোই তাদের প্রহার করার প্রয়াস করো, তারা প্রহৃত হবে না। উপরন্তু, অজ্ঞাতসারে এই ধরনের সম্মোহনের মধ্যে পতিত হওয়ার পর, মানুষ অজান্তেই নিজ-নিজ হৃদয়ে শয়তানের প্রতিমূর্তির প্রতিপালন করে এবং শয়তানের উপাসনা শুরু করে। প্রকারান্তরে বললে, তারা শয়তানকে নিজেদের আদর্শ হিসাবে এবং উপাসনা করার এবং মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার লক্ষ্যবস্তু হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে, এমনকি তারা তাকে ঈশ্বর হিসেবে গণ্য অবধি করে। অজ্ঞাতসারেই, এই বিষয়গুলি মানুষের হৃদয়ে রয়ে যায়, তাদের কথা ও কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে। তদুপরি, যদিও-বা তুমি প্রাথমিক ভাবে এই কাহিনি ও কিংবদন্তীগুলিকে মিথ্যা হিসেবে গণ্য করো, তবুও তারপর, তুমি অজান্তেই সেগুলির অস্তিত্ব স্বীকার করে নাও, সেগুলির চরিত্রগুলিকে বাস্তব হিসাবে এবং সেগুলিতে বর্ণিত বস্তুগুলিকে বাস্তব, বিদ্যমান বস্তু হিসেবে গণ্য করতে শুরু করো। স্বীয় অজ্ঞানতায়, তুমি অবচেতনভাবে এই সমস্ত ধারণা এবং এই বিষয়বস্তুসমূহের অস্তিত্ব স্বীকার করে নাও। তুমি অবচেতনভাবেই সেই দানবদের, শয়তানকে, এবং বিগ্রহসমূহকে স্বগৃহে এবং নিজের হৃদয়ের অভ্যন্তরে গ্রহণ করে নাও—যথার্থই এ এক সম্মোহন। এই বাক্যসমূহ কি তোমাদের মধ্যে অনুরণিত হচ্ছে? (হ্যাঁ।) তোমাদের মধ্যে কি কেউ ধূপ জ্বালিয়ে বুদ্ধের উপাসনা করেছ? (হ্যাঁ।) তাহলে, ধূপ জ্বালিয়ে বুদ্ধের উপাসনা করার উদ্দেশ্যে কী ছিল? (শান্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা।) এখন বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখলে, শয়তানের কাছে শান্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা কি হাস্যকর রকমের অযৌক্তিক নয়? শয়তান কি শান্তি নিয়ে আসে? (না।) তুমি কি দেখতে পাও না যে তুমি তখন কত অজ্ঞ ছিলে? সেই ধরনের আচরণ ছিল অযৌক্তিক, অজ্ঞানতাপ্রসূত এবং হাস্যকরভাবে অতিসরল, তাই নয় কি? শয়তানের একমাত্র চিন্তা তোমাকে কী উপায়ে ভ্রষ্ট করা যায়। শয়তানের পক্ষে তোমাকে শান্তি দেওয়া সম্ভব নয়, সে কেবল সাময়িক স্বস্তিই দিতে পারে। কিন্তু সেই স্বস্তি লাভ করতে হলে, তোমাকে একটি প্রতিজ্ঞা করতে হয়, এবং তুমি যদি শয়তানকে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি অথবা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করো, তাহলেই তুমি দেখতে পাবে সে কীভাবে তোমায় নির্যাতন করে। তোমাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করার মাধ্যমে, সে আদতে চায় তোমায় নিয়ন্ত্রণ করতে। তোমরা যখন শান্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেছিলে, তখন কি তোমরা শান্তিলাভ করেছিলে? (না।) শান্তি তো তোমরা পাওই নি, বরং, তার পরিবর্তে, তোমার প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ এসেছিল দুর্ভাগ্য এবং অন্তহীন বিপর্যয়—যথার্থরূপেই তিক্ততার এক অনন্ত সাগর। শয়তানের আধিপত্যের অধীনে শান্তি নেই, এই হল সত্য। এই হল মানবজাতির কাছে সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কার ও প্রথাগত সংস্কৃতির পরিণাম।

শেষ যে পন্থাটি অবলম্বন করে শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত করে, সেটি হল সামাজিক প্রবণতা। সামাজিক প্রবণতার মধ্যে অনেক কিছুই পড়ে, এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পরিসর, যেমন খ্যাতনামা ও মহান ব্যক্তিত্বের, সেইসাথে চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের দুনিয়ার তারকদেরও উপাসনা করা, সেলিব্রেটিদের পুজো করা, অনলাইন গেমস, ইত্যাদি—এগুলি সকলই সামাজিক প্রবণতার অংশ, এবং এসবের মধ্যে বিস্তারিত ভাবে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই এখানে। মানুষের মধ্যে যে সকল ধারণা সামাজিক প্রবণতাগুলির দ্বারা প্রবিষ্ট হয়, সেগুলির ফলে মানুষ যেভাবে জগতে নিজেদেরকে পরিচালিত করে, এবং জীবনের যে সকল লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি সেগুলি মানুষের মধ্যে নিয়ে আসে, আমরা কেবলমাত্র সেই বিষয়গুলি নিয়েই আলাপ-আলোচনা করব। এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এগুলি মানুষের চিন্তাভাবনা ও মতামতকে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রবণতাগুলি একের পর এক উদ্ভূত হতে থাকে, এবং এরা সকলেই বহন করে এক মন্দ প্রভাব, যা ক্রমান্বয়ে মানবজাতির অবমূল্যায়ন ঘটায়, যার ফলে মানুষ হারিয়ে ফেলে বিবেক, মনুষ্যত্ব ও যুক্তিবোধ, দুর্বলতর হয়ে পড়ে তাদের নৈতিকতা ও তাদের চারিত্রিক গুণমান, এতদূর পর্যন্ত, যে এমনকি আমরা এমনও বলতে পারি, অধিকাংশ মানুষের এখন কোনও সততা, মানবতা অথবা বিবেক নেই, যুক্তিবোধ তো আরোই নেই। তাহলে, এই সামাজিক প্রবণতাগুলি কী কী? এগুলি এমনসব প্রবণতা যা তুমি খালি চোখে দেখতে পাবে না। যখন কোনও নতুন প্রবণতা বিশ্বময় পরিব্যাপ্ত হয়, তখন খুব সম্ভবত স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিই সেখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, প্রবণতা-প্রবর্তক হিসেবে কাজ করে। তারা নতুন কিছু করার মাধ্যমে আরম্ভ করে, ও তারপর কোনো একটা চিন্তা বা কোনো একটা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। তবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষজন অজ্ঞাতসারেই এই প্রবণতা দ্বারা ক্রমাগত সংক্রমিত হবে, আকৃষ্ট হবে, এবং আত্তীকৃত হবে, যতক্ষণ না তারা সকলেই অজান্তে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে সেটিকে গ্রহণ করে ও সেটিতে নিমজ্জিত হয় এবং সেটির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। একের পর এক এই প্রবণতাগুলির ফলে, যারা সুস্থ শরীর ও মনের অধিকারী নয়, সত্য কী তা জানে না, এবং ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়গুলির মধ্যে পার্থক্য করতে অপারগ, তারা সেই সব প্রবণতাকে সানন্দে গ্রহণ করে, এবং সেইসাথে গ্রহণ করে জীবনের প্রতি সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধগুলি যেগুলি শয়তানের থেকে এসেছে। জীবনকে কীভাবে দেখতে হবে সে বিষয়ে শয়তান যা বলে, এবং জীবনযাপন করার যে পদ্ধতি শয়তান তাদের “প্রদান” করে, তারা সেগুলিকেই গ্রহণ করে, এবং তা প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা বা সামর্থ্য কোনোটাই তাদের নেই, সচেতনতাও একেবারেই নেই। তাহলে, এই ধরনের প্রবণতাগুলিকে কীভাবে চেনা যায়? আমি একটি সহজ উদাহরণ বেছে নিয়েছি যা তোমরা ক্রমশঃ বুঝতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে মানুষ এমনভাবে তাদের ব্যবসা চালাত যাতে কেউ প্রতারিত না হয়; কোন ব্যক্তি ক্রয় করছে তা নির্বিশেষে তারা এক ধরনের সামগ্রী একই মূল্যে বিক্রয় করত। সুন্দর বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধের কিছু উপাদান কি এখানে প্রকাশিত হয় না? মানুষ যখন এইভাবে সততা ও আন্তরিকতার সাথে তাদের ব্যবসা পরিচালিত করত, তা থেকে দেখতে পাওয়া যায় যে সেই সময় তাদের মধ্যে কিছু বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ ছিল। কিন্তু মানুষের ক্রমবর্ধমান অর্থের চাহিদার সাথে সাথে সে নিজের অজান্তেই অর্থ, লাভ, ও সুখভোগকে আরো বেশি করে ভালোবাসতে শুরু করেছিল। মানুষ কি অর্থকে আগে যতটা প্রাধান্য দিত এখন তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য দেয় না? মানুষ যখন অর্থকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দেখে, তখন তারা অজ্ঞাতসারেই নিজেদের খ্যাতি, প্রতিপত্তি, সুনাম, ও সততাকে কম গুরুত্ব দিতে থাকে, তাই নয় কি? যখন তুমি ব্যবসায় নিযুক্ত হও, তুমি দেখো যে অন্যরা মানুষের সাথে প্রতারণা করে বিত্তবান হয়ে উঠছে। যদিও সেই অর্থ অসৎ পথে উপার্জিত, তবুও তারা আরও বেশি করে ধনী হয়ে উঠতে থাকে। তাদের পরিবার যা কিছু উপভোগ করে, তা দেখে তুমি বিরক্ত হয়ে ওঠো: “আমরা দুজনেই ব্যবসায় যুক্ত রয়েছি, কিন্তু ওরা ধনী হয়ে গেল। আমি কেন প্রচুর টাকা উপার্জন করতে পারছি না? আমি এটা সহ্য করতে পারছি না—আমায় আরও বেশি টাকা রোজগারের উপায় খুঁজে বের করতে হবে”। এর পরে, কীভাবে সম্পদশালী হয়ে ওঠা যায় কেবলমাত্র সেই বিষয়েই তুমি চিন্তা করতে থাকো। একবার যখন এই বিশ্বাস তুমি ত্যাগ করো যে “অর্থ উপার্জন করা উচিত বিবাকবান ভাবে, কাউকেই প্রতারিত না করে” তখন নিজের স্বার্থের দ্বারা চালিত হয়ে তোমার চিন্তাভাবনা করার পদ্ধতি ক্রমশ পরিবর্তিত হয়, যেমন হয় তোমার কাজের পিছনে নিহিত নীতিগুলি। তুমি যখন প্রথমবার কাউকে প্রতারিত করো, তখন তুমি বিবেকের দংশন অনুভব করো, এবং তোমার হৃদয় তোমায় বলে, “একবার এটা হয়ে গেলে, এই শেষবারের মতো আমি কাউকে ঠকাচ্ছি। সব সময় মানুষের সাথে প্রতারণা করে গেলে আমাকে তার প্রতিফল পেতে হবে!” এটাই মানুষের বিবেকের কাজ—তোমায় দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করানো এবং তোমায় ভর্ৎসনা করা, যাতে যখন কাউকে প্রতারিত করছ, তখন তোমার মনে হয় যে তা অস্বাভাবিক। কিন্তু কাউকে সফলভাবে প্রতারিত করার পর তুমি দেখতে পাও যে তোমার কাছে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে অর্থ রয়েছে, আর তখন তোমার মনে হয় এই পদ্ধতিটি তোমার পক্ষে অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। অন্তরে একটা স্তিমিত বেদনা উপলব্ধি করা সত্ত্বেও, তোমার নিজের সাফল্যের জন্য নিজেকে সাধুবাদ দিতে ইচ্ছা হবে, তুমি নিজের প্রতি কিছুটা হলেও সন্তুষ্ট বোধ করবে। তখনই প্রথমবারের মতো তুমি নিজের আচরণ, নিজের প্রতারণামূলক পদ্ধতি, অনুমোদন করে ফেলো। মানুষ একবার এই প্রতারণা দ্বারা সংক্রামিত হয়ে গেলে, তখন বিষয়টা হয় কারও জুয়াখেলার সাথে জড়িয়ে পড়ার, ও তারপর জুয়াড়িতে পরিণত হওয়ার সমগোত্রীয়। নিজের অজ্ঞাতসারেই তুমি নিজের প্রতারণামূলক আচরণ অনুমোদন করো, এবং তা গ্রহণ করো। অজ্ঞাতসারেই, তুমি প্রতারণাকে একটি বৈধ বাণিজ্যিক আচরণ হিসাবে এবং নিজের অস্তিত্ত্বরক্ষা ও জীবিকা নির্বাহের জন্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পন্থা হিসাবে গ্রহণ করো; তোমার মনে হয় যে এমন করে তুমি সত্ত্বর সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। এটা একটা প্রক্রিয়া: প্রথম দিকে মানুষ এমন আচরণকে গ্রহণ করতে পারে না এবং তারা এই প্রকার আচরণ ও অনুশীলনকে অবজ্ঞা করে। তারপর তারা নিজেরাই এই আচরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরম্ভ করে, তাদের নিজস্ব উপায়ে পরীক্ষা করে দেখে, এবং ক্রমান্বয়ে তাদের হৃদয় রূপান্তরিত হতে শুরু করে। কী রকম রূপান্তর? তা হল সেই প্রবণতাটিকে, সেই সামাজিক প্রবণতা তোমার মধ্যে যে ধারণার সঞ্চার ঘটিয়েছে সেই ধারণাটিকে, অনুমোদন করা ও স্বীকার করে নেওয়া। নিজের অজ্ঞাতসারেই, ব্যবসা করার সময় মানুষকে প্রতারিত না করলে তোমার মনে হতে থাকে যে তোমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ল; তুমি যদি মানুষকে না ঠকাও, তাহলে তোমার মনে হয় যেন তোমার কোনো ক্ষতি হয়ে গেল। তোমার অজ্ঞাতে এই প্রতারণাই হয়ে ওঠে তোমার আত্মা, তোমার মেরুদন্ড, এবং এমন এক প্রকার অত্যাবশ্যক আচরণ, যা তোমার জীবনের নীতি। মানুষ নিজেদের এই আচরণ ও এই চিন্তাভাবনাকে মেনে নেওয়ার পর কি তা তাদের হৃদয়ে কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি? তোমার হৃদয় পরিবর্তিত হয়েছে, তাহলে সেইসাথে কি তোমার সততাও পরিবর্তিত হয়েছে? তোমার মনুষ্যত্বও কি পরিবর্তিত হয়েছে? তোমার বিবেকবোধও কি পরিবর্তিত হয়েছে? তোমার সমগ্র সত্তা, তোমার হৃদয় থেকে চিন্তাভাবনা পর্যন্ত, অন্তর থেকে বাইরে পর্যন্ত, পরিবর্তিত হয়েছে, এবং তা এক গুণগত পরিবর্তন। এই পরিবর্তন তোমাকে ঈশ্বরের নিকট থেকে আরও বেশি করে দূরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে, এবং তুমি শয়তানের সাথে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ো; তুমি আরও বেশি করে শয়তানের মতো হয়ে ওঠো, যার ফলে শয়তানের দুর্নীতি তোমায় একজন দানবে পরিণত করে।

এই সামাজিক প্রবণতাগুলি দেখে তুমি কি বলবে যে মানুষের উপর সেগুলির বিশাল প্রভাব আছে? মানুষের উপর কি সেগুলির গভীরভাবে ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে? যথার্থই মানুষের উপর সেগুলির গভীরভাবে ক্ষতিকর প্রভাব আছে। এই প্রবণতাগুলির প্রত্যেকটিকে ব্যবহার করে শয়তান মানুষের কোন কোন দিকগুলিকে ভ্রষ্ট করে? শয়তান মূলত ভ্রষ্ট করে মানুষের বিবেক, অনুভূতি, মনুষ্যত্ব, নীতিবোধ, এবং জীবনের দৃষ্টিভঙ্গী। এবং এই সামাজিক প্রবণতাগুলি কি মানুষকে ক্রমশ অবনমিত ও ভ্রষ্ট করে না? শয়তান এই সামাজিক প্রবণতাগুলিকে ব্যবহার করে মানুষকে এক ধাপ এক ধাপ করে শয়তানদের ডেরার মধ্যে চালিত হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধ করছে, যাতে সামাজিক প্রবণতায় আবদ্ধ মানুষ অজ্ঞাতসারে অর্থলিপ্সা, জাগতিক ভোগসুখ, পাপাচারকেই সমর্থন করে। এই সকল বস্তু মানবহৃদয় প্রবেশ করলে মানুষের কী হয়? মানুষ সাক্ষাৎ শয়তানে পরিণত হয়—স্বয়ং শয়তানে! কেন? কারণ, মানবহৃদয়ে কোন প্রকার মনস্তাত্বিক প্রবৃত্তি রয়েছে? মানুষ কোন বিষয়গুলিকে শ্রদ্ধা করে? মানুষ শঠতা এবং হিংসায় আনন্দ পেতে শুরু করে, শুভ ও সুন্দরের প্রতি তার কোনো প্রীতি দেখা যায় না, শান্তির প্রতি তো দূরের কথা। মানুষ স্বাভাবিক মনুষ্যত্ব নিয়ে সরল জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক নয়, বরং তারা উচ্চ মর্যাদা এবং প্রভূত পরিমাণ সম্পদ ভোগ করতে চায়, ইন্দ্রিয়সুখ চরিতার্থ করে প্রমোদে ডুবে যেতে চায়, নিজেদের দৈহিক কামনা-বাসনা পরিতৃপ্ত করার জন্য চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখে না, কোনোরকম বিধিনিষেধ, কোনোরকম বন্ধনের তারা পরোয়া করে না, অন্যভাবে বলতে গেলে প্রাণে যা চায়, তারা তাই করে। তাহলে, মানুষ যখন এই সকল প্রবণতায় নিমজ্জিত হয়ে গেছে, তখন কি তোমার অর্জিত জ্ঞান নিজেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে তোমার সহায় হতে পারে? তোমার প্রথাগত সংস্কৃতি এবং কুসংস্কারবিষয়ক উপলব্ধি কি তোমাকে এই ভয়ঙ্কর দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করতে পারে? মানুষের পরিচিত প্রথাগত নৈতিকতা এবং আনুষ্ঠানিকতা কি সংযম অনুশীলনের ক্ষেত্রে তাদের সহায় হতে পারে? ঐতিহাসিক “অ্যানালেক্ট” অথবা “তাও তে চিং”-এর উদাহরণ ধরুন। সেগুলি কি মানুষকে এই পাপাচারের প্রবণতার চোরাবালি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে? কখনোই নয়। এইভাবে, আরো বেশি করে পাপী, উদ্ধত, উন্নাসিক, স্বার্থপর ও বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে আর কোনো স্নেহ নেই, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর কোনো প্রীতি নেই, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে আর কোনো বোঝাপড়া নেই; মানুষে-মানুষে সম্পর্ক এখন হিংসার দ্বারা চিহ্নিত। প্রতিটি মানুষ হিংস্র উপায়েই অন্যান্য মানুষের মধ্যে বসবাস করতে চায়; হিংসা প্রয়োগ করে তারা রুজিরুটি আয় করতে চায়; হিংসার মাধ্যমেই তারা পদমর্যাদা লাভ এবং মুনাফা উপার্জন করতে চায়, এবং তারা হিংসা ও পাপের পথেই নিজেদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে চায়। এমন মানবতা কি ভীতিপ্রদ নয়? অবশ্যই, ভীষণভাবেই তাই: তারা যে কেবলমাত্র ঈশ্বরকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল তা-ই নয়, বরং তাঁর সকল অনুগামীকেও হত্যা করে—কারণ মানুষ বড়ই খল। এইমাত্র আমি যা যা বললাম সেই সব শোনার পর, তোমার কি মনে হয় না যে এই পরিবেশে, এই পৃথিবীতে, এবং এই ধরনের মানুষের মধ্যে, যেখানে শয়তান মানবজাতিকে ভ্রষ্ট করে, সেখানে জীবনধারণ করা ভয়াবহ? (হ্যাঁ।) তাহলে, তোমাদের কি কখনো নিজেদেরকে অনুকম্পার যোগ্য বলে মনে হয়েছে? এই মুহুর্তে তুমি নিশ্চয়ই ব্যাপারটা কিছুটা হলেও অনুভব করেছ, তাই নয় কি? (হ্যাঁ, ঠিকই।) তোমাদের কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে তোমরা ভাবছ, “মানুষকে ভ্রষ্ট করার জন্য শয়তানের কাছে অনেক রকমের উপায় রয়েছে। সে প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগায়, এবং আমরা যেখানেই যাই, সে সেখানেই থাকে। তারপরেও কি মানুষ কি উদ্ধার পেতে পারে?” তারপরেও কি মানুষকে উদ্ধার করা যেতে পারে? মানুষ কি নিজেদের উদ্ধার করতে পারে? (না।) জেড সম্রাট কি মানুষকে উদ্ধার করতে পারে? কনফুশিয়াস কি মানুষকে উদ্ধার করতে পারে? গুয়ানয়িন বোধিসত্ত্ব কি মানুষকে উদ্ধার করতে পারে? (না।) তাহলে কে মানুষকে উদ্ধার করতে পারে? (ঈশ্বর।) তবে, কারও হৃদয়ে এই ধরনের প্রশ্ন জাগবে: “শয়তান আমাদের এত প্রবল ক্ষতিসাধন করে, এত বিকৃত উন্মত্ততার সাথে, যে আমাদের জীবনধারণ করার কোনও আশা নেই, আমাদের বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাসও নেই। আমরা সকলেই দুর্নীতির মধ্যে বসবাস করি, এবং প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ঈশ্বরের প্রতিরোধ করে চলে, এবং এখন আমাদের হৃদয়ের পক্ষে যতটা অবনমিত হওয়া সম্ভব, ততটাই অবনমিত হয়ে পড়েছে। তাহলে, কোথায় রয়েছেন ঈশ্বর যখন শয়তান আমাদের ভ্রষ্ট করছে? ঈশ্বর কী করছেন? ঈশ্বর আমাদের জন্য যা-ই করুন না কেন, আমরা কখনোই তা অনুভব করি না!” কিছু মানুষ অনিবার্যভাবে আশাহত এবং কিছুটা ভগ্নমনোরথ বোধ করে, তা-ই নয় কি? এই অনুভূতি তোমাদের কাছে অত্যন্ত গভীর, কারণ আমি যা কিছু বলে চলেছি তার উদ্দেশ্যে হল মানুষ যাতে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, যাতে আরও বেশি করে অনুভব করে যে তাদের আশা নেই, আরও বেশি করে উপলব্ধি করে যে তারা ঈশ্বরের দ্বারা পরিত্যক্ত। তবে দুশ্চিন্তা কোরো না। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়, “শয়তানের মন্দত্ব”, আসলে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য নয়। তবে, ঈশ্বরের পবিত্রতার সারসত্য সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা করতে গেলে প্রথমে শয়তান কীভাবে মানুষকে ভ্রষ্ট করে সেই বিষয়ে এবং শয়তানের মন্দত্বের বিষয়ে আলোচনা করে নিতে হবে, যাতে মানুষ বর্তমানে কী ধরণের পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে তা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়। এই বিষয়ে আলোচনা করার একটি উদ্দেশ্য হল মানুষকে শয়তানের মন্দত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেওয়া, অন্য উদ্দেশ্যেটি হল মানুষকে গভীরতরভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেওয়া যে প্রকৃত পবিত্রতা কী।

এইমাত্র আমরা যে বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলি সম্পর্কে কি আগেরবারের তুলনায় আমি অনেক বেশি বিস্তারিতভাবে বললাম না? এখন কি তোমাদের উপলব্ধি কিছুটা গভীরতর হল? (হ্যাঁ।) আমি জানি যে এখন বহু ব্যক্তি আশা করছে ঈশ্বরের পবিত্রতা ঠিক কী সেই বিষয়ে আমি বলবো, তবে ঈশ্বরের পবিত্রতা সম্পর্কে বলার সময়ে আমি সর্বাগ্রে ঈশ্বরের কার্যগুলির বিষয়ে বলব। তোমাদের সবার মন দিয়ে তা শোনা উচিত। তার পরে, আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করব, যে ঈশ্বরের পবিত্রতা বস্তুত কী। আমি তোমাদের সরাসরি বলব না, বরং তার পরিবর্তে তোমদের তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে দেব; তার জন্য যথাযথ পরিসরও আমি তোমাদের দেব। এই পদ্ধতি তোমাদের কেমন লাগছে? (শুনে তো ভালোই লাগছে।) তাহলে আমি যা বলছি তা যত্ন সহকারে শোনো।

শয়তান মানুষকে যখনই ভ্রষ্ট করে অথবা লাগামছাড়া ভাবে মানুষের ক্ষতিসাধন করে, তখন ঈশ্বর নিষ্ক্রিয় থাকেন না, এবং তিনি তাঁর নির্বাচিত ব্যক্তিদের অগ্রাহ্য করেন না, বা দেখেও না দেখার ভান করেন না। শয়তান যা কিছু করে তা সবই ঈশ্বর সম্পূর্ণ স্পষ্টভাবে বোঝেন। শয়তান যা-ই করুক না কেন, সে যে প্রবণতাই সৃষ্টি করুক না কেন, শয়তান যা কিছু করার চেষ্টা করছে তা সবই ঈশ্বর জানেন, এবং ঈশ্বর তাঁর মনোনীত ব্যক্তিদের ব্যাপারে কখনোই হাল ছেড়ে দেন না। পরিবর্তে, কোনো মনোযোগ আকর্ষণ না করেই—গোপনে, নিঃসাড়ে—ঈশ্বর সেই সবকিছুই করেন, যা যা প্রয়োজন। ঈশ্বর যখন কারও উপর কাজ করা শুরু করেন, তিনি যখন কাউকে মনোনীত করেছেন, তখন তিনি এই সংবাদ কারও কাছে ঘোষণা করেন না, বা তিনি শয়তানের কাছেও তা ঘোষণা করেন না, এবং কখনোই তা নিয়ে কোনো আড়ম্বর করেন না। তিনি শুধু অত্যন্ত শান্তভাবে, খুব স্বাভাবিকভাবে, যা প্রয়োজন তা করেন। প্রথমে, তিনি তোমার জন্য একটি পরিবার নির্বাচন করেন; তোমার পারিবারিক প্রেক্ষাপট, তোমার পিতামাতা ও পূর্বপুরুষ—এই সমস্ত কিছু ঈশ্বর আগে থেকেই নির্ণয় করে রাখেন। প্রকারান্তরে বললে, ঈশ্বর খামখেয়ালির মতো এই সিদ্ধান্তগুলি নেন না; বরং তিনি এই কাজ অনেক আগেই আরম্ভ করেছেন। তোমার জন্য একটি পরিবার নির্বাচন করার পর, তিনি তোমার জন্মের তারিখটি নির্ধারিত করেন। তারপর ঈশ্বর তোমার জন্মগ্রহণ করা ও ক্রন্দনরত অবস্থায় পৃথিবীতে আসা নিরীক্ষণ করেন। তিনি দেখেন তোমার জন্ম নেওয়া, প্রথম কথাগুলি উচ্চারণ করা, হাঁটতে শেখার পথে তোমার টলোমলো পায়ে প্রথম নেওয়া পদক্ষেপ। এক পা এক পা করে তুমি এগিয়ে চলো … আর এখন, তুমি দৌড়তে পারো, লাফাতে পারো, কথা বলতে পারো, নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারো। মানুষ যখন বড় হতে থাকে, শয়তানের স্থির দৃষ্টি তাদের প্রত্যেকের উপর নিবদ্ধ থাকে, একটা বাঘ যেভাবে শিকারের দিকে তাকিয়ে থাকে ঠিক সেরকম। কিন্তু তাঁর কাজ করার সময়ে, ঈশ্বর কখনোই মানুষ, ঘটনাবলী বা বস্তসমূহ থেকে, অথবা স্থান বা কাল থেকে উদ্ভূত কোনো সীমাবদ্ধতার অধীন হননি; তাঁর যা করা উচিত এবং তাঁকে যা করতেই হবে তিনি তাই করেন। বড় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায়, তুমি এমন অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে পারো যা তোমার অপছন্দ, যেমন অসুস্থতা এবং হতাশা। কিন্তু যখন তুমি এই পথে চলো, তোমার জীবন ও তোমার ভবিষ্যত কঠোরভাবে ঈশ্বরের তত্ত্বাবধানে থাকে। ঈশ্বর তোমায় সারাজীবন তোমার অস্তিত্ত্ব বজায় রাখার প্রকৃত নিশ্চয়তা দেন, কারণ তিনি তোমার পাশেই রয়েছেন, তোমাকে রক্ষা করছেন, এবং তোমার দেখাশোনা করছেন। তুমি এই বিষয়ে সচেতন না থেকেই বড় হয়ে ওঠো। তুমি নতুন বস্তুগুলির সংস্পর্শে আসতে শুরু করো, এবং এই বিশ্ব ও এই মানবজাতিকে জানতে শুরু করো। তোমার কাছে সবই সতেজ ও নবীন। কিছু কাজ করতে তুমি আনন্দ অনুভব করো। তুমি তোমার নিজস্ব মনুষ্যত্বের ভিতর জীবনধারণ করো, তুমি তোমার নিজস্ব পরিসরের ভিতর বসবাস করো, এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিষয়ে তোমার ন্যূনতম উপলব্ধিও থাকে না। কিন্তু তুমি যত বড় হতে থাকো, ঈশ্বর তোমার চলার পথের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখেন, এবং লক্ষ্য করেন সামনের দিকে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ। এমনকি যখন তুমি জ্ঞান অর্জন অথবা বিজ্ঞান অধ্যয়ন করছ, ঈশ্বর কখনো একটিমাত্র ধাপেও তোমার পার্শ্বত্যাগ করে যাননি। সে বিষয়ে তুমিও অন্যান্য লোকেদের মতোই, বিশ্বকে জানার এবং বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত হওয়াকালীন, তুমি তোমার নিজস্ব আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছ, তোমার রয়েছে নিজস্ব শখ, নিজস্ব আগ্রহ, এবং তুমি অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষও পোষণ করো। তুমি প্রায়শই নিজের ভবিষ্যতের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করো, প্রায়শই নিজের ভবিষ্যত কেমন হওয়া উচিত তার রূপরেখা অঙ্কন করো। কিন্তু পথিমধ্যে যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, ঈশ্বর তা সকলই সুস্পষ্টরূপে সংঘটিত হতে দেখেন। তুমি হয়তো নিজের অতীত বিস্মৃত হয়েছো, কিন্তু ঈশ্বরের কাছে, তোমায় তাঁর চেয়ে বেশি ভালো করে কেউ বুঝতে পারে না। ঈশ্বরের দৃষ্টির অধীনেই তুমি জীবনধারণ করো, বড় হয়ে ওঠো, পরিণত হয়ে ওঠো। এই সময়কালে, ঈশ্বরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে কী, তা কেউ কখনও উপলব্ধি করে না, এমন কিছু যা কেউ জানে না। ঈশ্বর অবশ্যই সেটির বিষয়ে কাউকে বলেন না। তাহলে এই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কী? এমন বলা যেতে পারে যে, তা হল সেই নিশ্চয়তা যে ঈশ্বর কোনও ব্যক্তিকে উদ্ধার করবেন। অর্থাৎ, ঈশ্বর যদি সেই ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে চান, তাহলে তাহলে তাঁকে এ কাজ করতেই হবে। এই কাজটি মানুষ এবং ঈশ্বর উভয়ের পক্ষেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা কি জানো কী সেই কাজ? মনে হচ্ছে যেন তোমাদের এই বিষয়ে কোনও বোধ নেই, বা তা নিয়ে কোন ধারণাও নেই, তাই আমিই তোমাদের বলবো। তোমার জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত তোমার উপরে ঈশ্বর প্রভূত কর্ম সম্পাদন করেছেন, কিন্তু তিনি যা করেছেন তোমাকে সেই সমস্ত কর্মের বিস্তারিত হিসাব তিনি দেন না। ঈশ্বর তোমাকে এগুলি জানার অনুমতিও দেননি, এবং তিনি তোমাকে বলেনওনি। কিন্তু তিনি যা কিছুই করেন সবই মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরের দিক থেকে দেখতে গেলে, তাঁকে এটা করতেই হবে। তাঁর হৃদয়ে এসবের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা তাঁর সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সেটি হল, একটি মানুষের জন্মলগ্ন থেকে আজকের দিন পর্যন্ত, ঈশ্বরকে তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। এই বাক্যগুলি শুনলে তোমাদের এমন মনে হতে পারে যে এগুলি তোমাদের সম্পূর্ণভাবে বোধগম্য হচ্ছে না। তোমরা প্রশ্ন করতে পারো, “এই নিরাপত্তা কি এতই জরুরি?” আচ্ছা, “নিরাপত্তা”-র আক্ষরিক অর্থ কী? হয়তো তোমাদের কাছে এই শব্দের অর্থ শান্তি, অথবা হয়তো তোমাদের কাছে এর অর্থ কখনোই কোনও দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের সম্মুখীন না হওয়া, ভালো ভাবে বেঁচে থাকা, স্বাভাবিক জীবন যাপন করা। কিন্তু অন্তর থেকে তোমাদের অনুধাবন করতে হবে যে বিষয়টি অত সহজ নয়। তাহলে সেই বিষয়টি ঠিক কী যা আমি বলছিলাম, যা ঈশ্বরকে করতে হবে? ঈশ্বরের কাছে নিরাপত্তার অর্থ কী? তা কি সেই নিশ্চয়তা যা “নিরাপত্তা” বলতে সাধারণভাবে বোঝায়? না। তাহলে ঈশ্বর যা করেন তা আসলে কী? এই “নিরাপত্তা”-র অর্থ হল, শয়তান তোমাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করতে পারবে না। সেটা কি গুরুত্বপূর্ণ? শয়তানের গ্রাসের কবলিত না হওয়া—তা কি তোমার নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত নয়? হ্যাঁ, তা তোমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, এবং তার থেকে বেশি গুরত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। একবার যদি তুমি শয়তানের গ্রাসের শিকার হও, তাহলে তোমার আত্মা এবং তোমার দেহ আর ঈশ্বরের থাকে না। তখন ঈশ্বর তোমাদের আর উদ্ধার করবেন না। যে সকল আত্মাকে ও মানুষকে শয়তান গ্রাস করেছে তাদের ঈশ্বর পরিত্যাগ করেন। তাই আমি বলি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ ঈশ্বরকে করতে হয় তা হচ্ছে তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এটা নিশ্চিত করা যে তুমি শয়তানের গ্রাসের শিকার হবে না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই নয় কি? তাহলে তোমরা কেন উত্তর দিতে পারছ না? মনে হচ্ছে তোমরা ঈশ্বরের অসীম দয়া অনুভব করতে অক্ষম!

মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি ঈশ্বর আরও অনেক কিছুই করেন, সুনিশ্চিত করেন যে তারা শয়তানের গ্রাসের শিকার হবে না। কাউকে নির্বাচিত ও উদ্ধার করার আগে তিনি প্রভুত পরিমাণে প্রস্তুতিমূলক কার্যও করেন। প্রথমত, ঈশ্বর এই সমস্ত বিষয়ে সূক্ষাতিসূক্ষ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন যে তুমি কেমন চরিত্রের অধিকারী হবে, তুমি কীরকম পরিবারে জন্মগ্রহণ করবে, তোমার পিতামাতা কারা হবে, তোমার কতজন ভাই-বোন থাকবে, এবং তুমি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করবে তার পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবেশ কেমন হবে। তুমি কি জানো ঈশ্বরের মনোনীত লোকেদের অধিকাংশই কী ধরনের পরিবারে জন্মগ্রহণ করে? সেগুলি কি বিশিষ্ট পরিবার? আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যারা বিশিষ্ট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে। তেমন কেউ থাকতেই পারে, কিন্তু সংখ্যায় তারা অতীব নগণ্য। তারা কি অমিত সম্পদের অধিকারী পরিবার, ধনকুবের, বা কোটিপতিদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করে? না, তারা প্রায় কখনোই এই ধরনের পরিবারে জন্মগ্রহণ করে না। তাহলে এই ব্যক্তিদের অধিকাংশের জন্য ঈশ্বর কোন ধরনের পরিবারের আয়োজন করেন? (সাধারণ পরিবার।) তাহলে কোন পরিবারগুলিকে “সাধারণ পরিবার” হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে? এর মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী পরিবারগুলি—অর্থাৎ, যারা বেঁচে থাকার জন্য মজুরির উপর নির্ভর করে, কেবলমাত্র মৌলিক চাহিদাগুলিই মেটাতে পারে, এবং অত্যধিক সচ্ছল নয়; এর মধ্যে রয়েছে কৃষিজীবি পরিবারগুলিও। কৃষকরা তাদের অন্নসংস্থানের উদ্দেশ্যে শস্য রোপণের উপর নির্ভর করে, তাদের আহারের উদ্দেশ্যে শস্য এবং পরিধানের উদ্দেশ্যে পোশাকআশাক রয়েছে, এবং ক্ষুধার্ত অথবা শীতার্ত হয়ে তাদের দিন কাটাতে হয় না। এছাড়াও, কিছু পরিবার রয়েছে যারা ক্ষুদ্র ব্যবসা চালায়, আবার কিছু পরিবার আছে যেখানে অভিভাবকগণ বুদ্ধিজীবী, এবং সেগুলিকেও সাধারণ পরিবার হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এমন কিছু পরিবার রয়েছে যেগুলির অভিভাবকগণ অফিসের কর্মী অথবা ছোটোখাটো সরকারি কর্মকর্তা, সেগুলিকেও বিশিষ্ট পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা যায় না। বেশিরভাগই সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, এবং এই সকলই ঈশ্বরের দ্বারা আয়োজিত। অর্থাৎ বলা যায়, প্রথমত, তুমি যে পরিবেশে বসবাস করো তা মানুষ যেমন কল্পনা করে তেমন সচ্ছল পরিবার নয়, এবং তা ঈশ্বর কর্তৃক তোমার জন্য নির্ধারিত পরিবার, এবং অধিকাংশ মানুষ এই ধরনের পরিবারের সীমার মধ্যেই বসবাস করবে। তাহলে সামাজিক অবস্থানের বিষয়টা কী রকম? অধিকাংশ অভিভাবকদের অর্থনৈতিক অবস্থান গড়পরতা, এবং তাদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদা নেই—তাদের কাছে নিছক একটা চাকরি থাকাই যথেষ্ট। তাদের মধ্যে কী রাজ্যপালেরা রয়েছে? রয়েছে কি রাষ্ট্রপতিরা? নেই, তাই নয় কি? বড়জোর তারা ক্ষুদ্র ব্যবসার পরিচালক অথবা মালিকদের মতো ব্যক্তি। তাদের সামাজিক অবস্থা মাঝারিমানের, এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা গড়পরতা। আরেকটি বিষয় হল পারিবারিক জীবনধারণের পরিবেশ। প্রথমত, এই পরিবারগুলির মধ্যে এমন কোনও পিতামাতা নেই যারা তাদের সন্তানদের দৈবচর্চা এবং ভবিষ্যদ্বক্তা হওয়ার পথে চালিত করার উদ্দেশ্যে স্পষ্টভাবে প্রভাবিত করবে; খুব অল্প লোকই রয়েছে যারা এই ধরনের বিষয়ের সাথে জড়িত। অধিকাংশ পিতামাতাই যথেষ্ট স্বাভাবিক। ঈশ্বর যখন মানুষকে নির্বাচিত করেন, সেই একই সময়ে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে তেমনই পরিবেশ প্রস্তুত করেন, যা মানুষকে উদ্ধার করার জন্য তাঁর কাজের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী। বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে ঈশ্বর মানুষের জন্য বিশাল কিছুই করেননি; তিনি কেবল শান্তভাবে ও গোপনে তাঁর সকল কাজ করে চলেন, সবিনয়ে এবং নীরবে। কিন্তু বস্তুত, ঈশ্বর যা কিছু করেন, তা সকলই তিনি করেন তোমার পরিত্রাণের ভিত্তি স্থাপন করার উদ্দেশ্যে, করেন তোমার সম্মুখবর্তী পথ এবং পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পরিস্থিতি প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে। অতঃপর, ঈশ্বর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁর সামনে ফিরিয়ে আনেন, প্রত্যেককে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে: ঠিক তখনই তুমি ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শুনতে পাও; ঠিক তখনই তুমি তাঁর সামনে উপস্থিত হও। এমন যখন হয়, তারমধ্যে কেউ কেউ নিজেরাই পিতামাতা হয়ে উঠেছে, আবার অন্যরা তখনও কারও সন্তান হয়েই রয়েছে। প্রকারান্তরে বললে, কেউ কেউ বিবাহ করেছে এবং তাদের সন্তান হয়েছে, এদিকে কিছু লোক এখনও অবিবাহিত রয়ে গিয়েছে, তারা এখনও তাদের নিজেদের পরিবার শুরু করেনি। কিন্তু পরিস্থিতি নির্বিশেষে ঈশ্বর ইতিমধ্যেই সেই সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন যখন তুমি মনোনীত হবে এবং যখন তাঁর সুসমাচার ও বাক্য তোমার কাছে পৌঁছবে। ঈশ্বর সেই পরিস্থিতি নির্ধারণ করেছেন, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কোনও নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট নিরূপণ করে রেখেছেন, যার মাধ্যমে তোমার কাছে সুসমাচার পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে তুমি ঈশ্বরের বাক্য শ্রবণ করতে পারো। ঈশ্বর তোমার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পরিস্থিতি আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছেন। এইভাবে, যদিও মানুষ জানতে পারে না যে এটা ঘটছে, কিন্তু সে ঈশ্বরের সম্মুখে আসে এবং ঈশ্বরের পরিবারে প্রত্যাবর্তিত হয়। এছাড়াও মানুষ নিজের অজান্তেই ঈশ্বরকে অনুসরণ করে এবং তাঁর কাজের প্রতিটি ধাপে প্রবেশ করে, প্রবেশ করে ঈশ্বর মানুষের জন্য যে কর্মপদ্ধতি প্রস্তুত করেছেন তার প্রতিটি পর্যায়ে। এই সময়ে ঈশ্বর যখন মানুষের জন্য কিছু করেন, তখন তিনি কোন উপায় ব্যবহার করেন? প্রথমত, ন্যূনতম হল তাঁর সেই যত্ন ও নিরাপত্তা যা মানুষ উপভোগ করে। এছাড়াও, ঈশ্বর বিভিন্ন মানুষ, ঘটনাবলী ও বস্তুসমুহের আয়োজন করেন, যার মাধ্যমে মানুষ তাঁর অস্তিত্ব ও তাঁর কার্য দেখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু মানুষ আছে যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে কারণ তাদের পরিবারের কেউ অসুস্থ। যখন অন্যরা তাদের কাছে সুসমাচার প্রচার করে, তখন তারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করা আরম্ভ করে, এবং তাদের এই ঈশ্বরবিশ্বাস উৎপন্ন হয়েছে পরিস্থিতির ফলে। তাহলে, কে এই পরিস্থিতির আয়োজন করেছেন? (ঈশ্বর।) এই অসুখের মাধ্যমে, কিছু কিছু পরিবারের সকল সদস্যই বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, আবার কিছু পরিবার রয়েছে, যার শুধু অল্পসংখ্যক সদস্যই বিশ্বাসী। বাহ্যিকভাবে এমন মনে হতে পারে যে তোমার পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়েছে, কিন্তু আসলে এটা একটা পরিস্থিতি যা তোমায় প্রদান করা হয়েছে, যাতে তুমি ঈশ্বরের সম্মুখে আসতে পারো—এটা ঈশ্বরের দয়া। যেহেতু কারও কারও কাছে পারিবারিক জীবন কঠিন এবং তারা শান্তির সন্ধান পায় না, তাই একটি সুযোগ উপস্থিত হতে পারে—কেউ সুসমাচার জ্ঞাপন করল এবং বলল, “প্রভু যীশুতে বিশ্বাস করো, তুমি শান্তি পাবে”। এইভাবে, অজ্ঞাতসারেই, তারা খুব স্বাভাবিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে, তাহলে এটা কি এক ধরনের পরিস্থিতি নয়? এবং তাদের পরিবার যে শান্তিতে নেই, তা কি তাদের প্রতি ঈশ্বরের প্রদত্ত এক অনুগ্রহ নয়? এমনও কেউ কেউ আছে যারা অন্য কোনও কারণবশতঃ ঈশ্বরে বিশ্বাস করা আরম্ভ করে। বিশ্বাসের জন্য বিভিন্ন কারণ রয়েছে এবং বিভিন্ন উপায় রয়েছে, কিন্তু যে কারণই তোমাকে তাঁর প্রতি বিশ্বাসে উপনীত করুক না কেন, তা সবই আসলে ঈশ্বরেরই আয়োজিত ও নির্দেশিত। প্রথমে, ঈশ্বর তোমায় মনোনীত করার এবং তোমায় তাঁর পরিবারভুক্ত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করেন। প্রতিটি ব্যক্তিকে ঈশ্বর এই অনুগ্রহ প্রদান করেন।

ঈশ্বরের কাজের এই বর্তমান পর্যায়ে, অর্থাৎ অন্তিম সময়ে, তিনি আর আগের মতো মানুষের উপর শুধু অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ বর্ষণ করেন না, বা মানুষকে অগ্রসর হতে প্ররোচিত করেন না। কাজের এই পর্যায় চলাকালীন, ঈশ্বরের কাজের যেসব দিকের অভিজ্ঞতা মানুষ লাভ করেছে, তা থেকে তারা কী দেখতে পেয়েছে? মানুষ দেখেছে ঈশ্বরের ভালোবাসা, এবং দেখেছে ঈশ্বরের বিচার ও শাস্তি। এই সময়কালের ভিতর, ঈশ্বর মানুষকে সংস্থান প্রদান, সমর্থন, আলোকিত এবং পথনির্দেশিত করেন, যাতে মানুষ ধীরে ধীরে তাঁর অভিপ্রায় জানতে পারে, অবগত হতে পারে তিনি যে বাক্যগুলি বলেন এবং যে সত্যগুলি মানুষকে অর্পণ করেন, সেগুলি সম্বন্ধে। মানুষ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তারা নিরাশ হয়ে পড়ে, যখন তাদের যাওয়ার কোন জায়গা থাকে না, তখন ঈশ্বর তাঁর বাক্যগুলি ব্যবহার করে মানুষকে সান্ত্বনা, উপদেশ এবং উৎসাহদান করবেন, যাতে মানুষের নগণ্য আত্মিক উচ্চতা ক্রমে ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে উঠতে পারে, ইতিবাচকতার সাথে উত্থিত হতে পারে এবং ঈশ্বরের সাথে সহযোগিতায় ইচ্ছুক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ ঈশ্বরকে অমান্য করে বা তাঁকে প্রতিরোধ করে, অথবা যখন মানুষ তার দুর্নীতি প্রকাশ করে, তখন ঈশ্বর মানুষকে শাস্তিপ্রদান ও অনুশাসন করার বিষয়ে কোনও করুণা প্রকাশ করবেন না। তবে, ঈশ্বর মানুষের মূর্খতা, অজ্ঞতা, দুর্বলতা এবং অপরিণত অবস্থার বিষয়ে সহনশীলতা এবং ধৈর্য প্রদর্শন করবেন। এইভাবে, ঈশ্বর মানুষের জন্য যেসকল কার্য করেন সেগুলির মাধ্যমে, মানুষ ক্রমে পরিণত হয়ে ওঠে, বড়ো হয়ে ওঠে, এবং ঈশ্বরের অভিপ্রায় সম্বন্ধে অবগত হয়, কিছু নির্দিষ্ট সত্য জানতে পারে, যাতে কোন বিষয়গুলি ইতিবাচক এবং কোনগুলি নেতিবাচক তা জানতে পারে, যাতে অশুভ ও অন্ধকার কী তা জানতে পারে। ঈশ্বর সর্বদা মানুষকে শাস্তিপ্রদান ও অনুশাসন করার জন্য একটিমাত্র পদ্ধতি প্রয়োগ করেন না, তবে তিনি সর্বদা সহনশীলতা এবং ধৈর্য্যও দেখান না। বরং তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির উদ্দেশ্যে তাদের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং তাদের বিভিন্ন আত্মিক উচ্চতা ও ক্ষমতা অনুসারে বিভিন্ন উপায়ে সংস্থান প্রদান করেন। তিনি মানুষের উদ্দেশ্যে বহু কিছু করেন এবং তা করেন অনেক মূল্য ব্যয় করে; মানুষ সেই কাজ বা সেগুলির মূল্য কিছুই বোঝে না, তবুও বাস্তবে তিনি যা কিছু করেন তা প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তির উপরেই সম্পন্ন হয়। ঈশ্বরের প্রেম ব্যবহারিক: ঈশ্বরের অনুগ্রহে, মানুষ একের পর এক বিপর্যয় এড়িয়ে যায়, এবং ঈশ্বর সর্বক্ষণ বারংবার মানুষের দূর্বলতার প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেন। ঈশ্বরের বিচার ও শাস্তিদানের ফলে মানুষ ধীরে ধীরে মানবজাতির কলুষ ও শয়তানোচিত সারমর্ম জানতে পারে। ঈশ্বর যা প্রদান করেন, মানুষের প্রতি তাঁর আলোকপ্রাপ্তি ও তাঁর পথনির্দেশনা, তার ফলে মানবজাতি সত্যের সারমর্ম সম্বন্ধে অধিকতর অবগত হয়ে ওঠে, এবং ক্রমান্বয়ে জানতে পারে মানুষের কী প্রয়োজন, কোন পথ তাদের গ্রহণীয়, কীসের জন্য তারা বেঁচে থাকে, তাদের জীবনের মূল্য ও অর্থ, এবং সম্মুখবর্তী পথে কীভাবে চলতে হবে। এই সকল কার্য যা ঈশ্বর করেন তা তাঁর একমাত্র মূল উদ্দেশ্যের সাথে অবিচ্ছেদ্য। তাহলে কী সেই উদ্দেশ্যে? মানুষের উপর তাঁর কার্য নির্বাহ করতে ঈশ্বর কেন এই পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করেন? কী ফলাফল তিনি অর্জন করতে চান? অন্যভাবে বললে, তিনি মানুষের মধ্যে কী দেখতে চান? মানুষের কাছ থেকে তিনি কি প্রাপ্ত করতে চান? ঈশ্বর যা দেখতে চান তা হল, মানবহৃদয়ের পুনরূজ্জীবন সম্ভবপর। মানুষের উপর কাজ করার জন্য ঈশ্বর যে সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করেন তা এক নিরন্তর প্রচেষ্টা মানুষের হৃদয়কে জাগরিত করার, মানুষের আত্মাকে জাগরিত করার, মানুষকে বোঝানোর যে তাদের উৎপত্তিস্থল কোথায়, কে তাদের পথনির্দেশনা, সমর্থন, ও সংস্থান প্রদান করে চলেছে, এবং কে মানুষকে অদ্যবধি জীবিত থাকার অনুমতি দিয়েছে; এগুলির মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে সৃষ্টিকর্তা কে, তাদের কার উপাসনা করা উচিত, কী ধরনের পথে তাদের চলা উচিত, এবং কোন পথে মানুষের ঈশ্বর-সমীপে উপনীত হওয়া উচিত; এগুলিই হল মনবহৃদয়ের ক্রমশ পুনরূজ্জীবনের উপায়, যাতে মানুষ ঈশ্বরের হৃদয়কে জানতে পারে, ঈশ্বরের হৃদয়কে উপলব্ধি করতে পারে, এবং মানুষের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে তাঁর কার্যের নেপথ্যে নিহিত পরম যত্ন ও সুবিবেচনার বিষয়ে অবগত হতে পারে। মানব হৃদয়ের পুনরূজ্জীবন ঘটলে মানুষ আর অধঃপতিত, ভ্রষ্ট স্বভাব নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় না, বরং পরিবর্তে সে চায় ঈশ্বরের সন্তুষ্টিবিধানের উদ্দেশ্যে সত্যের অন্বেষণ করতে। মানবহৃদয়ের যখন জাগরণ ঘটে, তখন মানুষ নিজেদের শয়তানের থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে তুলতে সক্ষম হয়। পুনরায় কখনও তারা শয়তানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, আর কখনো সে তাদের নিয়ন্ত্রিত করতে বা মূর্খ প্রতিপন্ন করতে পারবে না। পরিবর্তে, ঈশ্বরের হৃদয়কে পরিতৃপ্ত করার জন্য মানুষ ঈশ্বরের কার্যে এবং তাঁর বাক্যে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতে পারবে, ফলত সে অর্জন করবে ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগ। এ-ই হল ঈশ্বরের কর্মের আদি উদ্দেশ্য।

শয়তানের মন্দত্বের বিষয়ে আমরা এইমাত্র যে আলোচনাটা করলাম, তা থেকে প্রত্যেকেরই মনে হয় যেন মানুষ প্রবল নিরানন্দের মাঝে জীবনযাপন করে এবং মানুষের জীবন দুর্ভাগ্যের দ্বারা বেষ্টিত। কিন্তু এখন, যখন আমি ঈশ্বরের পবিত্রতার বিষয়ে এবং তিনি মানুষের উপর যে কাজ করেন সেই বিষয়ে বলছি, তখন তোমাদের কেমন লাগছে? (খুব ভালো লাগছে।) আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে ঈশ্বর যা কিছু করেন, মানুষের জন্য শ্রমসাধ্যভাবে তিনি যা কিছুর আয়োজন করেন, সকলই নিষ্কলঙ্ক। ঈশ্বর যা কিছু করেন তা ত্রুটিবিহীন, অর্থাৎ নিখুঁত, কারও কোনও সংশোধন, পরামর্শ, বা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ঈশ্বর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যা করেন তা সংশয়াতীত; তিনি প্রত্যেককে হাত ধরে নেতৃত্ব দেন, প্রতিটি মুহুর্তে তোমার তত্ত্বাবধান করে চলেন, এবং কখনও একবারের জন্যও তোমার পাশ ছেড়ে কোথাও যান নি। মানুষ যখন এমন পরিবেশে ও এমন প্রেক্ষাপটে বড় হতে থাকে, আমরা কি বলতে পারি যে মানুষ আসলে ঈশ্বরের করতলেই বেড়ে ওঠে? (হ্যাঁ।) তাহলে তোমাদের কি এখনও অসহায় বোধ হচ্ছে? কেউ কি এখনও হতাশ বোধ করছ? কেউ কি এমন মনে করছ যে, ঈশ্বর মানবজাতিকে পরিত্যাগ করেছেন? (না।) তাহলে ঈশ্বর ঠিক কী করেছেন? (তিনি মানবজাতির উপর লক্ষ্য রেখে চলেছেন।) যে মহৎ ভাবনা ও যত্ন ঈশ্বরের সকল কার্যে নিহিত, তা প্রশ্নের অতীত। অধিকন্তু, তিনি সর্বদা তাঁর কাজ নিঃশর্তভাবে সম্পাদন করেছেন। তাঁর কখনোই এরকম চাহিদা ছিল না যে তিনি তোমার জন্য যে মূল্য প্রদান করেন, তা তোমাদের মধ্যে কেউ জানুক এবং তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞ বোধ করুক। ঈশ্বর কি কখনও তোমার কাছে এরকম দাবি জানিয়েছেন? (না।) মানবজীবনের দীর্ঘ পথে, প্রায় প্রত্যেক ব্যক্তিই অনেক বিপজ্জনক পরিস্থিতির এবং প্রলোভনের সম্মুখীন হয়েছে। কারণ শয়তান তোমার পাশে দণ্ডায়মান রয়েছে, তার স্থির দৃষ্টি নিয়ত তোমার দিকে নিবদ্ধ। যখন বিপর্যয় তোমাকে আঘাত করে, তখন শয়তান তাতে উল্লাস করে; যখন তুমি দুর্যোগের কবলে পড়ো, যখন তোমার জন্য কিছুই ঠিকভাবে হয় না, যখন তুমি শয়তানের জালে জড়িয়ে পড়ো, তখন শয়তান তাতে প্রবল আনন্দ লাভ করে। ঈশ্বর যা করছেন তা হল, প্রতি মুহূর্তে তিনি তোমাকে রক্ষা করছেন, একের পর এক দুর্ভাগ্য এবং একের পর এক বিপর্যয় থেকে তোমায় দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই কারণেই আমি বলি যে মানুষের যা কিছু রয়েছে—শান্তি ও আনন্দ, আশীর্বাদ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—তা সবই আসলে রয়েছে ঈশ্বরেরই নিয়ন্ত্রণের অধীনে; তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির ভাগ্য পরিচালনা ও নির্ধারণ করেন। কিন্তু ঈশ্বরের কি তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা রয়েছে, যেমন কেউ কেউ বলে থাকে? ঈশ্বর কি তোমার কাছে ঘোষণা করেন, “আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমাদের দায়িত্ব যে গ্রহণ করে সে আমিই। তোমাদের আমার কাছে করুণা ভিক্ষা করতে হবে, আর আনুগত্যহীনতার শাস্তি হবে মৃত্যু”? ঈশ্বর কি কখনও মানবজাতিকে এই মর্মে ভীতিপ্রদর্শন করেছেন? (না।) তিনি কি কখনও বলেছেন, “মানবজাতি ভ্রষ্ট, অতএব এটা বিবেচ্য নয় যে আমি তাদের সাথে কেমন আচরণ করি, এবং তাদের সাথে যে কোনও রকম আচরণই করা যেতে পারে; তাদের উদ্দেশ্যে সুবন্দোবস্ত করার কোনও প্রয়োজন আমার নেই”? ঈশ্বর কি এইভাবে চিন্তা করেন? ঈশ্বর কি এরকম আচরণ করেছেন? (না।) তার বিপরীতে, প্রতিটি ব্যক্তির প্রতি ঈশ্বরের আচরণ আন্তরিক ও দায়িত্বশীল। এমনকি নিজের প্রতি তুমি যতটা দায়িত্বশীল আচরণ করো, তোমার প্রতি তাঁর আচরণ তার চেয়েও বেশি দায়িত্বশীল। তাই নয় কি? ঈশ্বর নিরর্থক কথা বলেন না, এবং তিনি তাঁর নিজের সুউচ্চ অবস্থান জাহিরও করেন না, বা মানুষকে লঘুভাবে প্রতারিতও করেন না। পরিবর্তে, যা তাঁর নিজের সম্পাদন করা প্রয়োজন, তিনি সততার সাথে ও নীরবে সেগুলি করে চলেন। তা মানুষের জন্য আশীর্বাদ, শান্তি ও আনন্দ নিয়ে আসে। সেগুলি মানুষকে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময়ভাবে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ও তাঁর পরিবারে নিয়ে আসে; তারপর তারা ঈশ্বরের সম্মুখে বসবাস করে, এবং স্বাভাবিক যুক্তিবোধ ও চিন্তাভাবনার সাথে ঈশ্বরের পরিত্রাণ গ্রহণ করে। তাহলে ঈশ্বর কি কখনও তাঁর কাজে মানুষের সাথে ছলনা করেছেন? তিনি কি কখনও নকল উদারতা প্রদর্শন করেছেন, প্রথমে কিছু আনন্দদানের মাধ্যমে মানুষকে বোকা বানিয়ে তারপর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন? (না।) ঈশ্বর কি কখনও এক কথা বলে তারপর অন্য কাজ করেছেন? ঈশ্বর কি কখনও এমন কোনো শূন্যগর্ভ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ও দাম্ভিক মন্তব্য করেছেন যে মানুষের জন্য তিনি এই কাজ করতে পারেন, ওই কাজে মানুষকে তিনি সাহায্য করতে পারেন, কিন্তু তারপর অদৃশ্য হয়ে গেছেন? (না।) ঈশ্বরের মধ্যে কোনও ছলনা নেই, কোনও মিথ্যা নেই। ঈশ্বর বিশ্বাসযোগ্য, এবং তিনি যা কিছু করেন সেই সবেতেই তিনি সত্য। তিনিই সেই অদ্বিতীয়, যাঁর উপর মানুষ নির্ভর করতে পারে; তিনিই সেই ঈশ্বর যাঁর কাছে মানুষ তাদের জীবন এবং তাদের যা কিছু আছে সবই অর্পণ করতে পারে। যেহেতু ঈশ্বরের মধ্যে কোন ছলনা নেই, তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে ঈশ্বরই সর্বাপেক্ষা আন্তরিক? (হ্যাঁ।) অবশ্যই বলতে পারি! যদিও “আন্তরিক” শব্দটি ঈশ্বরের প্রতি প্রয়োগ করার পক্ষে অতীব নিষ্প্রভ, অত্যন্ত মনুষ্যসুলভ, তবে, আমাদের ব্যবহারযোগ্য অন্য কোনও কোন শব্দ রয়েছে কি? এটাই মানুষের ভাষার সীমাবদ্ধতা। যদিও ঈশ্বরকে “আন্তরিক” শব্দটির দ্বারা অভিহিত করা কিঞ্চিত অনুপযুক্ত, তবুও আপাতত আমরা এই শব্দটিই ব্যবহার করব। ঈশ্বর বিশ্বাসযোগ্য এবং আন্তরিক। সুতরাং, যখন আমরা এই দিকগুলির বিষয়ে আলোচনা করি, তখন আমরা কীসের প্রতি নির্দেশ করছি? আমরা কি ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এবং ঈশ্বর ও শয়তানের মধ্যে পার্থক্যের প্রতি নির্দেশ করছি? হ্যাঁ, তা বলা যেতে পারে। এর কারণ হল, শয়তানের ভ্রষ্ট স্বভাবের একটিমাত্র চিহ্নও মানুষ ঈশ্বরের মধ্যে দেখতে পায় না। ঠিক বলেছি তো? আমেন? (আমেন!) শয়তানের দুষ্ট স্বভাবের কোনোকিছুই ঈশ্বরের মধ্যে প্রকাশিত হয় না। ঈশ্বর যা করেন এবং যা প্রকাশ করেন তা সম্পূর্ণরূপে মানুষের জন্য উপকারী ও তাদের সহায়ক, তা সম্পূর্ণরূপে মানুষকে সংস্থান যোগানের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত, তা প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ, এবং তা মানুষকে অনুসরণীয় একটি পথ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ঈশ্বর ভ্রষ্ট নন, এবং উপরন্তু, ঈশ্বর যা কিছু করেন তার দিকে এখন দৃষ্টিপাত করে আমরা কি বলতে পারি যে ঈশ্বর পবিত্র? মানবজাতির ভ্রষ্ট স্বভাবের কোনোটিই যেহেতু ঈশ্বরের মধ্যে নেই, নেই ভ্রষ্ট মানবজাতির শয়তানোচিত নির্যাসের অনুরূপ কোনোকিছুও, সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে আমরা পূর্ণতই বলতে পারি যে ঈশ্বর পবিত্র। ঈশ্বর কোনও দুর্নীতি প্রদর্শন করেন না, এবং ঈশ্বর যখন কাজ করেন সেই একই সময়ে তিনি তাঁর নিজস্ব সারসত্য প্রকাশ করেন, যা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করে যে স্বয়ং ঈশ্বরই পবিত্র। তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ? ঈশ্বরের পবিত্র সারমর্ম সম্বন্ধে অবহিত হতে, আপাতত দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাক এই দুইটি বিষয়ে: ১) ঈশ্বরের মধ্যে ভ্রষ্ট স্বভাবের চিহ্নমাত্র নেই; ২) মানুষের উপর ঈশ্বরের সম্পাদিত কাজের সারমর্ম মানুষকে ঈশ্বরের নিজস্ব সারসত্য দেখতে দেয়, এবং সেই সারসত্য সম্পূর্ণরূপে ইতিবাচক। কারণ, ঈশ্বরের কাজের প্রতিটি অংশই মানুষের কাছে যে বিষয়গুলিকে উপস্থিত করে, তা পূর্ণতই ইতিবাচক। প্রথমত, ঈশ্বর চান যে মানুষ সৎ হোক—এটা কি ইতিবাচক বিষয় নয়? ঈশ্বর মানুষকে প্রজ্ঞা প্রদান করেন—এটা কি ইতিবাচক নয়? ঈশ্বর মানুষকে শুভ ও অশুভের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম করে তোলেন—তা কি ইতিবাচক নয়? তিনি মানুষকে মানবজীবনের অর্থ ও মূল্য উপলব্ধি করতে সক্ষম করে তোলেন—তা কি ইতিবাচক নয়? তিনি মানবজাতিকে অনুমতি দেন সত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে মানুষ, ঘটনাবলী ও বিষয়সমূহের সারমর্ম প্রত্যক্ষ করতে—তা কি ইতিবাচক নয়? অবশ্যই তা ইতিবাচক। এবং এই সমস্ত কিছুর ফলে মানুষ শয়তানের দ্বারা আর প্রতারিত হবে না, শয়তানের দ্বারা আর ক্ষতিগ্রস্থ অথবা নিয়ন্ত্রিত হবে না। প্রকারান্তরে বললে, এই বিষয়গুলি মানুষকে শয়তানের কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হতে দেয়, ও তার ফলে ধীরে ধীরে ঈশ্বরে ভীতি এবং মন্দ কর্ম পরিত্যাগের পথে চলতে দেয়। তোমরা এখন এই পথ ধরে কতদূর অবধি অগ্রসর হয়েছ? তা বলা মুশকিল, তাই নয় কি? কিন্তু অন্ততপক্ষে শয়তান মানুষকে কীভাবে ভ্রষ্ট করে, কোন বিষয়গুলি মন্দ এবং কোনগুলি নেতিবাচক, তোমাদের কি সেই সম্পর্কে এখন একটা প্রাথমিক উপলব্ধি হয়েছে? অন্ততপক্ষে, তোমরা এখন জীবনের সঠিক পথে চলেছ। এটা কি নিশ্চিন্তে বলা যেতে পারে? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

ঈশ্বরের পবিত্রতা সম্বন্ধিত এমন একটি বিষয় আছে যা আলোচনা করা আবশ্যক। তোমরা যা যা শুনেছ ও গ্রহণ করেছ, তার ভিত্তিতে তোমাদের মধ্যে কে বলতে পারো যে ঈশ্বরের পবিত্রতা কী? ঈশ্বরের যে পবিত্রতার বিষয়ে আমি বলছি তা কীসের প্রতি নির্দেশ করে? এক মুহুর্তের জন্য এই বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তা করো। ঈশ্বরের সত্যপরায়ণতাই কি তাঁর পবিত্রতা? ঈশ্বরের বিশ্বাসযোগ্যতাই কি তাঁর পবিত্রতা? ঈশ্বরের স্বার্থহীনতাই কি তাঁর পবিত্রতা? নাকি তাঁর পবিত্রতা হল তাঁর বিনয়? নাকি তা তাঁর মানবপ্রেম? ঈশ্বর নির্দ্বিধায় মানুষকে সত্য ও জীবন প্রদান করেন—এ-ই কি তাঁর পবিত্রতা? ঠিক তাই, এগুলি সবকটিই। এই সবকিছু যা ঈশ্বর প্রকাশ করেন তা অনন্য, এবং ভ্রষ্ট মনুষ্যত্বের মাঝে তার কোনো অস্তিত্ত্ব নেই, এবং তা মানুষের মধ্যে দেখাও যায় না। শয়তানের দ্বারা মানুষের ভ্রষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়া চলাকালীন এর চিহ্নমাত্রও দেখতে পাওয়া যায় না, শয়তানের ভ্রষ্ট স্বভাবে অথবা শয়তানের সারমর্মে কিংবা প্রকৃতিতেও নয়। ঈশ্বরের যা আছে এবং তিনি যা, তা সকলই অনন্য; শুধুমাত্র স্বয়ং ঈশ্বরেরই এই প্রকার সারসত্য রয়েছে, এবং তিনিই তার অধিকারী। আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে, আমি এক্ষনি যেমন বর্ণনা করলাম মানবজাতির মধ্যে তেমন পবিত্র কাউকে কি তোমরা কেউ দেখেছ? (না।) তাহলে, এই যে সকল আদর্শ ব্যক্তিরা, খ্যাতনামা অথবা মহান ব্যক্তিরা যারা মানবজাতির দ্বারা উপাস্য, তাদের মধ্যে কি কেউ আছে যে এমন পবিত্র? (না।) তাহলে আমরা যখন বলি যে ঈশ্বরের পবিত্রতা অনন্য, তা কি অতিকথন? একেবারেই নয়। অধিকন্তু, ঈশ্বরের পবিত্র অনন্যতার একটি ব্যবহারিক দিকও রয়েছে। আমি এখন যে পবিত্রতার বিষয়ে বলছি, এবং তোমরা আগে যে পবিত্রতার কথা ভেবেছিলে এবং কল্পনা করেছিলে, সেদুটির মধ্যে কি কোনও অসঙ্গতি রয়েছে? (হ্যাঁ।) খুব বড় একটা অমিল আছে। মানুষ যখন পবিত্রতার কথা বলে, তখন প্রায়শই তারা পবিত্রতা বলতে কী বোঝায়? (কিছু বাহ্যিক আচরণ।) কোনও আচরণকে বা অন্য কিছুকে লোকে যখন পবিত্র বলে, তখন তাদের এমন বলার একমাত্র কারণ হল যে তারা সেই বিষয়টিকে ইন্দ্রিয়ের সাপেক্ষে বিশুদ্ধ অথবা আনন্দদায়ক হিসাবে দেখে। যদিও, ব্যতিক্রমহীনভাবে সেইসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে পবিত্রতার প্রকৃত উপাদানের অভাব—এটি মতবাদের একটি দিক। এছাড়া, মানুষের মনে পবিত্রতার ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে যে ধারণা থাকে তা আসলে কী নির্দেশ করে? তা কি অধিকাংশই ক্ষেত্রেই তারা যা কল্পনা করে বা বিচার করে, তা-ই? উদাহরণস্বরূপ, কিছু বৌদ্ধ অনুশীলন করার সময় মারা যায়, তারা ঘুমন্ত অবস্থায় বসে থেকেই প্রাণত্যাগ করে। কিছু মানুষ বলে যে তারা পবিত্র হয়ে স্বর্গে উড়ে গিয়েছে। এটাও কল্পনারই ফসল। তারপর আবার কেউ কেউ আছে যারা মনে করে স্বর্গ থেকে ভেসে নেমে আসা পরীই পবিত্র। আসলে, “পবিত্র” শব্দটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা সর্বদাই এক প্রকার অন্তঃসারশূন্য স্বপ্নবিলাসিতা এবং তত্ত্ব ছিল, যার মধ্যে মূলতঃ কোনো বাস্তব উপাদান নেই, এবং যার সাথে পবিত্রতার সারসত্যেরও কোনো সম্পর্ক নেই। পবিত্রতার সারসত্য হল প্রকৃত প্রেম, তবে তার চেয়েও বেশি করে, তা হল সত্য, ন্যায়পরায়ণতা ও আলোকের সারসত্য। “পবিত্র” শব্দটি তখনই উপযুক্ত যখন তা ঈশ্বরের সম্পর্কে প্রয়োগ করা হয়; সৃষ্টির কোনও কিছুই “পবিত্র” হিসাবে অভিহিত হওয়ার যোগ্য নয়। মানুষকে তা বুঝতে হবে। এখন থেকে, আমরা শুধুমাত্র ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই “পবিত্র” শব্দটি প্রয়োগ করব। সেটাই উচিত, তাই তো? (হ্যাঁ, একেবারেই।)

শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে কী কী উপায় ব্যবহার করে, এবার সেই আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক। ঈশ্বর যেসকল বিভিন্ন উপায়ে মানুষের উপর কাজ করেন, যেগুলি তোমরা প্রত্যেকে নিজেরাই অনুভব করতে পারো, সেই বিষয়ে আমরা এইমাত্র আলোচনা করলাম, তাই আমি অত্যধিক বিশদে কিছু বলব না। কিন্তু শয়তান মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে কী কী চাতুর্য ও কৌশল প্রয়োগ করে, সেই বিষয়ে সম্ভবত তোমাদের হৃদয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে, বা অন্ততপক্ষে সেগুলির বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট উপলব্ধি নেই। সে কথা আমি আবার বললে তা কি কোনো উপকারে আসবে? তোমরা কি এই বিষয়ে জানতে চাও? তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন করবে: “কেন আবার শয়তানের ব্যাপারে বলা? যে মুহুর্তে শয়তানের কথা উল্লেখ করা হয়, আমরা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠি, এবং তার নাম শুনলেই আমরা ভীষণ অস্বস্তি বোধ করি”। তা তোমায় যতোই অস্বস্তি বোধ করাক, বাস্তবের মুখোমুখি তোমায় হতেই হবে। মানুষের বোঝার সুবিধার জন্য এই বিষয়গুলি নিয়ে স্পষ্টভাবে বলা উচিত, এবং এগুলিকে স্পষ্ট করা উচিত; অন্যথায় মানুষ বস্তুতই শয়তানের প্রভাব ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে পারে না।

শয়তান যে পাঁচটি উপায় অবলম্বন করে মানুষকে ভ্রষ্ট করে সেগুলি নিয়ে আমরা আগে আলোচনা করেছি, যার মধ্যে রয়েছে শয়তানের কূটকৌশল। শয়তান যে পন্থাগুলিতে মানুষকে ভ্রষ্ট করে তা শুধু উপরের স্তর; যে কুটিলতর কৌশলের মাধ্যমে শয়তান তার লক্ষ্য অর্জন করে সেগুলি এই উপরের স্তরের তলায় প্রচ্ছন্ন থাকে। সেই কূটকৌশলগুলি কী কী? এসো, সেগুলি সংক্ষেপে বলো। (সে প্রতারণা করে, প্রলুব্ধ করে এবং বলপ্রয়োগ করে।) যত এই কৌশলগুলি তালিকাবদ্ধ করবে, ততই তুমি বিষয়টির কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে। মনে হচ্ছে তুমি শয়তানের দ্বারা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছ এবং এই প্রসঙ্গে তোমার জোরালো অনুভব রয়েছে। (সে আপাতদৃষ্টিতে সত্যি মনে হয় এমন অলংকারপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে। সে মানুষকে প্রভাবিত করে ও বলপূর্বক অধিকার করে।) বলপূর্বক অধিকার—এই শব্দ বিশেষভাবে গভীর ছাপ রেখে যায়। মানুষ শয়তানের দ্বারা বলপূর্বক অধিকৃত হতে ভয় পায়, তাই নয় কি? এছাড়া আর কোনও কৌশল রয়েছে কি? (সে হিংস্রভাবে মানুষের ক্ষতিসাধন করে, ভীতিপ্রদর্শন করে ও প্রলোভনকারী প্রস্তাব পেশ করে, এবং মিথ্যা বলে।) সে যা যা করে তার মধ্যে একটি হলো মিথ্যাচরণ। শয়তান মিথ্যাচরণ করে যাতে সে তোমাকে প্রতারিত করতে পারে। মিথ্যাচরণের বৈশিষ্ট্য কী? মিথ্যাচরণ কি প্রতারণার সমতুল্য নয়? মিথ্যা বলার আসল লক্ষ্য হল তোমায় ঠকানো। আর কোনো কৌশল রয়েছে? তোমরা শয়তানের যেসব কূটকৌশল সম্বন্ধে জানো, সেগুলি আমায় বলো। (সে প্রলুব্ধ করে, ক্ষতিসাধন করে, অন্ধ ও প্রতারিত করে।) এই প্রতারণার বিষয়ে তোমাদের অধিকাংশের অনুভূতিই একইরকম, তাই নয় কি? (সে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষকে অধিকার করে, মানুষকে আতঙ্কিত করে, এবং মানুষকে ঈশ্বরবিশ্বাস থেকে বিরত রাখে।) আমাকে তোমরা যা যা বলছ সেইসবের সামগ্রিক অর্থ আমার জানা, আর এটা বেশ ভালো ব্যাপার। তোমরা সকলেই এই বিষয়ে কিছু জানো, তাই এখন এই কৌশলগুলির একটি সারাংশ তৈরি করা যাক।

মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তান ছয়টি প্রাথমিক কৌশল ব্যবহার করে।

প্রথমটি হল নিয়ন্ত্রণ এবং বলপ্রয়োগ। অর্থাৎ, শয়তান সমস্তরকম সম্ভাব্য উপায়ে চেষ্টা করবে তোমার হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। “বলপ্রয়োগ” মানে কী? এর অর্থ হল ভীতিপ্রদর্শনকারী ও বলপ্রয়োগকারী কৌশলের ব্যবহার, যাতে তুমি তাকে মেনে চলো, এবং না মানার পরিণাম সম্পর্কে তুমি ভাবতে বাধ্য হও। তুমি ভীত হয়ে পড়ো এবং তাকে অমান্য করার সাহস তোমার থাকে না, তাই তুমি তখন তার কাছে সমর্পণ করো।

দ্বিতীয় কৌশলটি হল প্রতারণা ও চাতুরী। “প্রতারণা ও চাতুরী”-র মধ্যে কী কী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে? শয়তান কিছু কাহিনী এবং মিথ্যা বানিয়ে যেতে থাকে, কৌশলের মাধ্যমে তোমাকে সেগুলিতে বিশ্বাস করায়। সে তোমায় কখনোই বলে না যে মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্ট, আবার সে এমনটাও প্রত্যক্ষভাবে বলে না যে তুমি ঈশ্বরসৃষ্ট নও। সে “ঈশ্বর” শব্দটি একেবারেই ব্যবহার করে না, বরং তার পরিবর্তে বিকল্প হিসাবে অন্য কিছু ব্যবহার করে, তোমায় প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে, যাতে তুমি ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিষয়ে কোনও ধারণাই না করতে পারো। অবশ্যই, এই “চাতুরী”-র শুধু এই একটিই নয়, আরও অনেক দিক রয়েছে।

তৃতীয়টি হল বলপূর্বক মতবাদ আরোপ। কীসের মাধ্যমে জোর করে মানুষের উপর মতবাদ আরোপ করা হয়? বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মতবাদ আরোপ কি মানুষের নিজের পছন্দে করা হয়? তা কি মানুষের সম্মতিক্রমে ঘটে? অবশ্যই না। এমনকি তুমি সম্মতি না দিলেও এই বিষয়ে তোমার কিছুই করার নেই। তোমার অজ্ঞাতসারেই, শয়তান তোমার উপর মতবাদ আরোপ করে, তোমার ভিতর সঞ্চারিত করে তার চিন্তাভাবনা, তার জীবনের নিয়মাবলী, এবং তার সারমর্ম।

চতুর্থ কৌশলটি হল ভীতিপ্রদর্শন ও ছলনা। অর্থাৎ, শয়তান বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে যাতে তুমি তাকে গ্রহণ করো, তার অনুসরণ করো এবং তার সেবায় নিয়োজিত হও। সে তার অভীষ্ট সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যে কোনও কিছু করে ফেলবে। তোমাদের পাপে প্রলুব্ধ করার সময় কখনও কখনও সে তোমার ছোটোখাটো উপকার করে দেয়। তুমি যদি তার অনুসরণ না করো, তবে সে তোমায় কষ্টভোগ করাবে ও শাস্তি দেবে, আর তোমার বিরুদ্ধে আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করবে।

পঞ্চমটি হল প্রবঞ্চনা এবং অসাড়তা। “প্রবঞ্চনা ও অসাড়তা” হল যখন শয়তান মানুষের মধ্যে কিছু শ্রুতিমধুর শব্দ ও ধারণা প্রবিষ্ট করে যা মানুষের পূর্বধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আপাতভাবে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়, যাতে মানুষকে মনে করানো যায় যে সে মানুষের দেহগত পরিস্থিতি, তাদের জীবন ও ভবিষ্যত সম্পর্কে বিবেচনাশীল, যখন আসলে তার একমাত্র লক্ষ্য হল তোমায় বোকা বানানো। সে তখন তোমায় অসাড় করে দেয়, যাতে তুমি কোনটি সঠিক এবং কোনটি ভুল তা জানতে না পারো, যাতে তুমি অনিচ্ছাকৃতভাবে তার কৌশলের শিকার হও এবং ফলস্বরূপ তার নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়ো।

শয়তানের ষষ্ঠ কৌশলটি হল দেহ ও মনের ধ্বংসসাধন। মানুষের কোন অংশটিকে শয়তান ধ্বংস করে? শয়তান তোমার মনকে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে তোমার প্রতিরোধ করার ক্ষমতা চলে যায়, যার অর্থ, তোমার হৃদয় অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু একটু করে শয়তানের অভিমুখী হয়। এই বিষয়গুলি সে প্রতিদিন তোমার মধ্যে সঞ্চারিত করে, প্রত্যহ সে এই ধারণা ও সংস্কৃতির ব্যবহার করে তোমায় প্রভাবিত ও প্রস্তুত করে, তোমার ইচ্ছাশক্তিকে একটু একটু করে হ্রাস করে চলে, যাতে অবশেষে তুমি আর একজন সৎ ব্যক্তি হয়ে উঠতে না চাও, যাতে তুমি যাকে “ন্যায়পরায়ণতা” হিসাবে অভিহিত করো তার সপক্ষে আর দাঁড়াতে না চাও। অজ্ঞাতসারেই, তোমার স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার ইচ্ছাশক্তি আর থাকে না, বরং তুমি স্রোতে গা ভাসিয়েই প্রবাহিত হতে চাও। “ধ্বংস” মানে হল শয়তানের দ্বারা মানুষকে এতটাই বেদনার্ত করা যে তারা নিজেদের ছায়ার মতো হয়ে পড়ে, তারা আর মানুষ থাকে না। সেই সময়েই শয়তান আঘাত করে, তাদের ধরে ফেলে এবং গ্রাস করে।

মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তানের দ্বারা ব্যবহৃত এই কৌশলগুলির প্রতিটিই মানুষকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাহীন করে তোলে; সেগুলির মধ্যে যে কোনও একটিই মানুষের পক্ষে প্রাণান্তকর হয়ে উঠতে পারে। প্রকারান্তরে বললে, শয়তান যা কিছু করে এবং সে যে সকল কূটকৌশল প্রয়োগ করে, তার মধ্যে যে কোনও একটিই তোমার অধঃপতনের কারণ হয়ে উঠতে পারে, তোমায় শয়তানের নিয়ন্ত্রণের অধীন করতে পারে, এবং তোমায় মন্দত্ব ও পাপের চোরাবালিতে ডুবিয়ে ফেলতে পারে। মানুষকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে শয়তানের অবলম্বন করা কূটকৌশলগুলি এমনই।

আমরা বলতেই পারি শয়তান মন্দ, কিন্তু তা প্রতিপন্ন করার জন্য আমাদের দেখতে হবে শয়তানের মানুষকে ভ্রষ্ট করার পরিণাম কী এবং তা মানুষের মধ্যে কোন স্বভাব ও সারসত্য নিয়ে আসে। তোমরা সকলেই এই বিষয়ে কিছু জানো, সেগুলি বলো। শয়তানের মানুষকে ভ্রষ্ট করার পরিণাম কী হয়? তারা কোন কোন ভ্রষ্ট স্বভাবগুলিকে প্রকাশিত ও অনাবৃত করে? (ঔদ্ধত্য ও অহমিকা, স্বার্থপরতা ও ঘৃণ্যতা, কুটিলতা ও প্রতারণা, কাপট্য ও বিদ্বেষ, এবং মানুষ্যত্বের সম্পূর্ণ অভাব।) সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারি যে তাদের কোনও মনুষ্যত্ব নেই। এবারে অন্যান্য ভাই বোনেদের বলতে দাও। (মানুষ একবার শয়তানের দ্বারা ভ্রষ্ট হলে তারা সাধারণত হয় অহঙ্কারী এবং নিজের নৈতিকতার বিষয়ে উদ্ধত, স্ব-গুরুত্ব আরোপকারী এবং আত্ম-গর্বে গর্বিত, হয় লোভী এবং স্বার্থপর। আমি মনে করি যে এইগুলিই সবচেয়ে গুরুতর বিষয়।) (শয়তানের দ্বারা ভ্রষ্ট হওয়ার পর, কোনোকিছুই মানুষকে পার্থিব বিষয়বস্তু এবং সম্পদ লাভের উদ্দেশ্য থেকে বিরত করতে পারে না। এবং তারা এমনকি ঈশ্বরের শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে, ঈশ্বরের প্রতিরোধ করে, ঈশ্বরকে অমান্য করে, এবং তারা হারিয়ে ফেলে সেই বিবেক ও যুক্তিবোধ যা মানুষের থাকা উচিত।) তোমরা যা যা বলেছ তা মূলত একই, কিছু ছোটোখাটো পার্থক্য ছাড়া; তোমার মধ্যে কেউ কেউ আবার শুধু তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করেছ। সংক্ষেপে বললে ভ্রষ্ট মানবতা সম্পর্কিত যে বিষয়গুলি প্রকটতম হয়ে দাঁড়ায় তা হল ঔদ্ধত্ব, প্রতারণা, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা। তবে, তোমরা সকলেই একটা বিষয়কে উপেক্ষা করেছ। মানুষের কোনও বিবেক নেই, তারা তাদের যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলেছে এবং তাদের কোনও মনুষ্যত্ব নেই—কিন্তু আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা তোমরা উল্লেখ করোনি, তা হল “বিশ্বাসঘাতকতা”। শয়তানের দ্বারা একবার ভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে কোনও মানুষের মধ্যে বিদ্যমান এই স্বভাবগুলির চূড়ান্ত পরিণাম হল ঈশ্বরের প্রতি তাদের বিশ্বাসঘাতকতা। ঈশ্বর মানুষকে যা-ই বলুন বা তিনি তাদের উপর যে কাজই করুন না কেন, তারা যে বিষয়টিকে সত্য হিসাবে জানে, সেটির প্রতি তারা মনোযোগ দেয় না। অর্থাৎ, তারা আর ঈশ্বরকে স্বীকার করে না এবং তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে; শয়তানের মানুষকে ভ্রষ্ট করার পরিণাম এটাই। মানুষের সমস্ত কলুষিত স্বভাবের জন্যে তা একই। মানুষকে ভ্রষ্ট করার জন্য শয়তান যে উপায়গুলি ব্যবহার করে—মানুষ যে জ্ঞান অধ্যয়ন করে, যে বিজ্ঞান তারা জানে, কুসংস্কার ও প্রথাগত সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষের যা ধারণা, সেইসাথে সামাজিক প্রবণতা—এর মধ্যে একটিও এমন আছে কি যার মাধ্যমে মানুষ বলতে পারে কোনটি ধার্মিক এবং কোনটি অধার্মিক? এমন কিছু কি রয়েছে, যা মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে কোনটি পবিত্র এবং কোনটি মন্দ? এই বিষয়গুলি পরিমাপ করার জন্য কোনও মান আছে কি? (না।) এমন কোনও মান এবং কোন ভিত্তি নেই যা মানুষকে সাহায্য করতে পারে। যদিও মানুষ হয়তো “পবিত্র” শব্দটি জানে, কিন্তু এমন কেউ নেই যে প্রকৃতপক্ষে জানে পবিত্র কী। তাহলে শয়তান মানুষের কাছে যে বিষয়গুলি নিয়ে আসে, সেগুলি কি সত্যকে জানতে তাদের সাহায্য করতে পারে? সেগুলি কি মানুষকে আধিকতর মনুষ্যত্ব সহকারে জীবনধারণ করতে সাহায্য করতে পারে? সেগুলি কি মানুষকে এমনভাবে জীবনধারণ করতে সাহায্য করতে পারে, যাতে তারা ঈশ্বরের আরও বেশি উপাসনা করতে পারে? (না।) স্পষ্টতই সেগুলি মানুষকে ঈশ্বরের উপাসনায় বা সত্যের উপলব্ধিতে সাহায্য করতে পারে না, বা সেগুলি মানুষকে পবিত্রতা এবং মন্দ কী, তা জানতেও সাহায্য করতে পারে না। বিপরীতে, মানুষ অধিকতররূপে অধঃপতিত হয়, বিপথগামী হয়ে ঈশ্বরের কাছ থেকে দূর হতে দূরতর হয়ে যায়। এই কারণেই আমরা বলি শয়তান মন্দ। শয়তানের মন্দ উপাদান এতদূর ব্যবচ্ছেদ করার পর, তোমরা কি শয়তানের মূল উপাদানে অথবা তার সারমর্ম সম্বন্ধে তোমাদের উপলব্ধিতে, পবিত্রতার কোনও উপাদান দেখতে পেয়েছ? (না।) এইটুকু নিশ্চিত। তাহলে তোমরা কি শয়তানের সারমর্মের এমনও কোন দিক দেখতে পেয়েছ ঈশ্বরের সাথে যার কোনো সাদৃশ্য আছে? (না।) শয়তানের কোনও অভিব্যক্তির কি ঈশ্বরের সাথে কোনও সাদৃশ্য রয়েছে? (না।) তাহলে এখন আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করতে চাই: তোমাদের নিজের ভাষায় বলো ঈশ্বরের পবিত্রতা বিষয়টি ঠিক কী। প্রথমত, “ঈশ্বরের পবিত্রতা” কথাটি কীসের সম্পর্কে বলা হয়? তা কি ঈশ্বরের সারসত্যের প্রসঙ্গে বলা হয়? নাকি তাঁর স্বভাবের কোনো দিক সম্পর্কে বলা হয়? (ঈশ্বরের সারসত্যের প্রসঙ্গে বলা হয়।) আমাদের অবশ্যই স্পষ্টভাবে একটি অবস্থান চিহ্নিত করতে হবে যেখান থেকে আমাদের কাঙ্খিত বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করা যায়। এই কথাগুলি ঈশ্বরের সারসত্যের সম্পর্কেই ব্যবহৃত হয়। প্রথমত, আমরা শয়তানের মন্দত্বকে ঈশ্বরের সারসত্যের বিপরীতে ব্যবহার করেছি যাতে ঈশ্বরের সারসত্য উজ্জ্বলতর রূপে প্রতিভাত হয়, তাহলে তোমরা কি ঈশ্বরের মধ্যে শয়তানের কোনও সারমর্ম দেখেছ? অথবা মানবজাতির কোনও সারমর্ম? (না, আমরা তা দেখিনি। ঈশ্বর উদ্ধত নন, স্বার্থপর নন এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেন না, এবং এর থেকে আমরা ঈশ্বরের পবিত্র সারসত্য প্রকাশিত হতে দেখি।) আর কিছু আছে, যা যোগ করতে চাও? (ঈশ্বরের মধ্যে শয়তানের ভ্রষ্ট স্বভাবের লেশমাত্র নেই। শয়তানের যা রয়েছে তা সম্পূর্ণ নেতিবাচক, অথচ ঈশ্বরের যা আছে তা ইতিবাচক ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ঈশ্বর সর্বদা আমাদের পাশে রয়েছেন, আমাদের লক্ষ্য রাখছেন ও সুরক্ষিত রাখছেন, যখন আমরা একেবারেই ছোট ছিলাম তখন থেকে সারা জীবন এবং আজকের দিন পর্যন্ত, বিশেষ করে যখন আমরা বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছি। ঈশ্বরের কোনও প্রবঞ্চনা নেই, কোন প্রতারণা নেই। তিনি স্পষ্ট ও সরলভাবে কথা বলেন, এবং এটিও ঈশ্বরের প্রকৃত সারসত্য।) খুব ভালো! (শয়তানের কোনও ভ্রষ্ট স্বভাব, কোনও দ্বিচারিতা, কোনও আত্মম্ভরিতা, কোনও শূন্যগর্ভ প্রতিশ্রুতি এবং কোনও তঞ্চকতা আমরা ঈশ্বরের মধ্যে দেখতে পাই না। ঈশ্বরই একমাত্র, যাঁকে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে। ঈশ্বর বিশ্বাসযোগ্য এবং আন্তরিক। ঈশ্বরের কাজ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ঈশ্বর মানুষকে সৎ হতে বলেন, তাদের প্রজ্ঞা প্রদান করেন, মন্দ থেকে ভালোর পার্থক্য নিরূপণে, এবং বিভিন্ন মানুষ, ঘটনাবলী ও বস্তুসমূহের বিষয়ে বিচক্ষণতা অর্জনে সমর্থ করে তোলেন। এর মধ্যেই আমরা দেখতে পাই ঈশ্বরের পবিত্রতা।) তোমাদের বলা কি শেষ হয়েছে? তোমাদের বক্তব্য কি তোমাদের সন্তুষ্ট করেছে? ঈশ্বর সম্পর্কে কতটা উপলব্ধি সত্যিই রয়েছে তোমাদের হৃদয়ে? এবং ঈশ্বরের পবিত্রতাই বা তোমরা কতটা বুঝতে পারো? আমি জানি যে তোমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে কিছুদূর পর্যন্ত অনুভূতিলব্ধ ধারণা রয়েছে, কারণ প্রত্যেক ব্যক্তি তাদের উপর ঈশ্বরের কাজ অনুভব করতে পারে, এবং তারা ঈশ্বরের কাছ থেকে বিভিন্ন মাত্রায় অনেক কিছু পেয়ে থাকে: অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ, আলোকপ্রাপ্তি ও প্রদীপ্তি, ঈশ্বরের বিচার ও শাস্তি, এবং এগুলির ফলে ঈশ্বরের সারসত্য সম্বন্ধে মানুষ কিছু সরল উপলব্ধি অর্জন করে।

ঈশ্বরের পবিত্রতার বিষয়ে আজ আমরা যে আলোচনা করছি, তা যদিও অধিকাংশ মানুষের কাছে অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে, তবুও আমরা এখন এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করেছি, এবং এই পথে আরও এগিয়ে চলতে থাকলে তোমরা গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করবে। তার জন্য প্রয়োজন তোমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা লাভের সময় জুড়ে ক্রমশ অনুভব করতে ও বুঝতে পারা। আপাতত, ঈশ্বরের সারসত্যের বিষয়ে তোমাদের অনুভূতি-ভিত্তিক উপলব্ধির এখনও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন শেখার জন্য, নিশ্চিত হওয়ার জন্য, এবং অনুভব ও অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য, যতক্ষণ না একদিন তোমরা তোমাদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অবগত হবে, “ঈশ্বরের পবিত্রতা”-র অর্থ হল ঈশ্বরের সারসত্য ত্রুটিহীন, ঈশ্বরের প্রেম নিঃস্বার্থ, ঈশ্বর মানুষকে যাকিছু প্রদান করেন তা নিঃস্বার্থ, এবং তোমরা জানতে পারবে ঈশ্বরের পবিত্রতা নিষ্কলঙ্ক ও অনিন্দনীয়। ঈশ্বরের সারসত্যের এই দিকগুলি নিছকই কিছু বাক্য নয় যা ব্যবহার করে তিনি তাঁর মর্যাদা জাহির করেন, বরং প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে প্রশান্ত আন্তরিকতার সাথে আচরণের উদ্দেশ্যেই ঈশ্বর তাঁর সারসত্য ব্যবহার করেন। প্রকারান্তরে বললে, ঈশ্বরের সারসত্য শূন্যগর্ভ নয়, তা শুধুই তাত্ত্বিকতা অথবা মতবাদও নয়, এবং অবশ্যই কোনও প্রকার জ্ঞানও নয়। তা মানুষের জন্য কোনও প্রকার শিক্ষা নয়; বরং তা হল ঈশ্বরের নিজস্ব কর্মের প্রকৃত উদ্ঘাটন, এবং ঈশ্বরের যা আছে এবং তিনি যা, তার প্রকাশিত সারসত্য। মানুষের এই সারসত্য জানা উচিত এবং তা অনুধাবন করা উচিত, কারণ ঈশ্বরের প্রতিটি কার্য এবং তাঁর প্রতিটি বাক্যই প্রত্যেক মানুষের জন্য মহামূল্যবান ও পরম তাৎপর্যপূর্ণ। তুমি যখন ঈশ্বরের পবিত্রতা অনুধাবন করতে পারো, তখন তুমি প্রকৃতপক্ষেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারো; তুমি যখন ঈশ্বরের পবিত্রতা অনুধাবন করতে পারো, তখন তুমি যথার্থরূপেই “স্বয়ং অনন্য ঈশ্বর” কথাটির প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারো। এই পথ ব্যতীত তোমার চলার জন্য নির্বাচনের উপযুক্ত ভিন্নতর কোনও পথ রয়েছে, এই মর্মে তুমি আর কোনোপ্রকার অলীক কল্পনা করবে না, এবং ঈশ্বর তোমার উদ্দেশ্যে যেসকল আয়োজন করেছেন, সেগুলির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে আর ইচ্ছুক রইবে না। যেহেতু ঈশ্বরের সারসত্য পবিত্র, এর অর্থ হল যে কেবলমাত্র ঈশ্বরের মাধ্যমেই তুমি জীবনে আলোকময় ন্যায়পরায়ণতার পথে হাঁটতে পারবে; কেবলমাত্র ঈশ্বরের মাধ্যমেই তুমি জীবনের অর্থ অনুধাবন করতে পারবে; কেবলমাত্র ঈশ্বরের মাধ্যমেই তুমি বাস্তব মনুষ্যত্বমণ্ডিত জীবন যাপন করতে পারবে এবং সত্যের অধিকার লাভ করতে ও সত্যকে জানতে পারবে। কেবলমাত্র ঈশ্বরের মাধ্যমেই তুমি সত্য থেকে জীবন আহরণ করে নিতে পারবে। কেবলমাত্র স্বয়ং ঈশ্বরই মন্দকে পরিহার করার ক্ষেত্রে তোমাকে সাহায্য করতে পারেন এবং শয়তানের ক্ষতিসাধন ও নিয়ন্ত্রণ থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে পারেন। সেইসঙ্গে, ঈশ্বর ব্যতিরেকে অপর কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর সামর্থ্য নেই তোমাকে দুঃখের সাগর থেকে পরিত্রাণ করেন যাতে তোমাকে আর কোনোদিন যন্ত্রণা না পেতে হয়। ঈশ্বরের সারসত্য দ্বারাই এটি নির্ধারিত হয়। কেবলমাত্র স্বয়ং ঈশ্বরই এত নিঃস্বার্থভাবে তোমাকে রক্ষা করেন; শেষ পর্যন্ত, কেবলমাত্র ঈশ্বরই তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার অদৃষ্ট এবং তোমার জীবনের জন্য দায়বদ্ধ, এবং তিনি তোমার জন্য সমস্ত কিছু পরিচালনা করেন। সৃষ্ট অথবা অসৃষ্ট অপর কোনো কিছুই এই কার্য সাধন করতে পারে না। কারণ সৃষ্ট অথবা অসৃষ্ট অপর কোনও কিছুরই সেই সারসত্য নেই যা ঈশ্বরের রয়েছে, তোমাকে রক্ষা করার এবং তোমাকে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অপর কোনো ব্যক্তি অথবা বস্তুর নেই। এই হল মানুষের কাছে ঈশ্বরের সারসত্যের গুরুত্ব। সম্ভবত তোমরা মনে করছ যে আমার এই বাক্যগুলি নীতিগতভাবে সামান্য কিছুটা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি সত্যের অন্বেষণ করো, যদি তুমি সত্যকে ভালবাসো, তাহলে তুমি অনুভব করতে পারবে কীভাবে এই বাক্যগুলি শুধুমাত্র যে তোমার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবে তা-ই নয়, উপরন্তু সেগুলি তোমায় মানবজীবনের সঠিক পথে নিয়ে আসবে। তুমি তা উপলব্ধি করো, তাই নয় কি? তাহলে তোমাদের মধ্যে কি এখন ঈশ্বরের সারসত্য জানার জন্য কিছুটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে? (হ্যাঁ।) তোমরা যে আগ্রহী, তা জেনে ভালো লাগলো। ঈশ্বরের পবিত্রতাকে জানার বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা আজকের মতো আমরা এখানেই শেষ করব।

আজকে আমাদের সমাবেশের শুরুতে তোমরা এমন একটা কিছু করেছিলে যা আমায় অবাক করে দিয়েছিল, আমি এখন সেই বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো কৃতজ্ঞতার অনুভূতি পোষণ করছ, সম্ভবত তোমরা কৃতজ্ঞ বোধ করছিলে, এবং তাই আবেগের বশে হয়তো এরকম একটা কাজ করেছ। তোমরা যা করেছিলে, তা নিন্দনীয় কিছু নয়; তা ঠিক অথবা ভুল নয়। কিন্তু আমি চাই যে তোমরা একটি বিষয়ে উপলব্ধি করো। কী সেই বিষয় যা আমি চাই তোমরা উপলব্ধি করো? প্রথমত, তোমরা এখনই যা করলে আমি সেই বিষয়ে তোমাদের জিজ্ঞাসা করতে চাই। সেটা কি উপাসনার উদ্দেশ্যে সাষ্টাঙ্গে প্রণত অথবা নতজানু হওয়া? কেউ বলতে পারো? (আমাদের বিশ্বাস ওটা সাষ্টাঙ্গ প্রণামই ছিল।) তোমরা বিশ্বাস করো যে ওটা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম, তাহলে সাষ্টাঙ্গ প্রণামের অর্থ কী? (উপাসনা করা।) তাহলে উপাসনার জন্য নতজানু হওয়া কাকে বলে? ইতিপূর্বে আমি তোমাদের সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিনি, কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে সেটা করা দরকার। তোমরা কি তোমাদের সাধারণ সমাবেশগুলিতে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করো? (না।) প্রার্থনা করার সময়ে কি তোমরা সাষ্টাঙ্গে প্রণত হও? (হ্যাঁ।) পরিস্থিতি অনুকূল হলে প্রতিবারই প্রার্থনা করার সময়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করো? (হ্যাঁ।) ভালো। কিন্তু আমি চাই তোমরা আজ এটা বোঝো যে ঈশ্বর শুধুমাত্র দুই ধরনের মানুষের কাছ থেকেই নতজানু প্রার্থনা গ্রহণ করেন। আমাদের বাইবেল অথবা কোনও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের কাজ বা আচরণের সাথে বিষয়টা যাচাই করে দেখার প্রয়োজন নেই। পরিবর্তে, এখন আমি তোমাদের কিছু সত্য জানাবো। প্রথমত, উপাসনার জন্য সাষ্টাঙ্গ হওয়া এবং নতজানু হওয়া এক বিষয় নয়। ঈশ্বর কেন তাদের নতজানু উপাসনা স্বীকার করেন যারা সাষ্টাঙ্গে প্রণত হয়? তার কারণ, ঈশ্বর কোনো একজনকে তাঁর কাছে ডাকেন এবং সেই ব্যক্তিকে তাঁর অর্পিত দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে আহ্বান করেন, তাই ঈশ্বর তাকে ঈশ্বরের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত করার অনুমতি দেবেন। এ হল প্রথম ধরনের ব্যক্তি। দ্বিতীয় প্রকার হল, যারা ঈশ্বরে ভীত ও মন্দ কর্ম পরিত্যাগ করেছে, তারা যখন উপাসনার উদ্দেশ্যে নতজানু হয়। শুধু এই দুই ধরনেরই মানুষ রয়েছে যাদের নতজানু প্রার্থনা তিনি গ্রহণ করেন। তাহলে, তোমরা কোনটির অন্তর্ভুক্ত? তা কি তোমরা বলতে পারবে? এটাই সত্যি, যদিও তা তোমাদের অনুভূতিকে কিছুটা আহত করতে পারে। প্রার্থনার সময় মানুষের নতজানু হওয়া নিয়ে কিছু বলার নেই—তা যথাযথ এবং এমনটাই করা উচিত, কারণ মানুষ যখন প্রার্থনা করে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কোনোকিছুর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা, ঈশ্বরের কাছে আপন হৃদয় অবারিত করা এবং তাঁর মুখোমুখি হওয়া। তা ঈশ্বরের সঙ্গে হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগাযোগ ও বিনিময়। নতজানু হয়ে উপাসনা করা শুধুই একপ্রকার আনুষ্ঠানিকতা হওয়া উচিত নয়। তোমরা আজকে যা করেছ তার জন্য আমি তোমাদের ভর্ৎসনা করছি না। আমি শুধু তোমাদের কাছে এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করতে চাই, যাতে তোমরা এই নীতিটি উপলব্ধি করতে পারো—তোমরা তা জানো, তাই নয় কি? (হ্যাঁ, আমরা জানি।) আমি তোমাদের এ কথা বলছি যাতে এটা আর না ঘটে। তাহলে মানুষের কি ঈশ্বরের সম্মুখে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হওয়া অথবা নতজানু হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? এমন নয় যে সেই সুযোগ কখনোই আসবে না। আজ না হোক কাল, সেই দিন আসবেই, তবে এখন সেই সময় নয়। তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ? তা কি তোমাদের বিচলিত করছে? (না।) ভালো। হয়তো এই বাক্যগুলি তোমাদের নিজেদের অন্তঃকরণে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে বর্তমান অস্বস্তিকর অবস্থার কথা এবং ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে এখন কী ধরণের সম্পর্ক বিদ্যমান, সেই বিষয়ে অবগত হতে উৎসাহিত ও প্রণোদিত করবে। যদিও সাম্প্রতিককালে আমরা আরো কিছু আলাপচারিতা ও ভাববিনিময় করেছি, তবু ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের উপলব্ধি এখনও যথেষ্টর চেয়ে অনেক কম। ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার অন্বেষণে মানুষকে এখনও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। জরুরি বিষয় বলে তোমাদের এমন করতে বাধ্য করা, বা সেরকম আকাঙ্খা বা অনুভূতি প্রকাশের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠা, আমার অভিপ্রায় নয়। তোমরা আজকে যা করেছ তা হয়তো তোমাদের প্রকৃত অনুভূতিকে প্রকাশ ও উন্মোচন করে, এবং আমি তা অনুভব করতে পেরেছি। তাই যখন তোমরা এমন করছিলে, আমি কেবলমাত্র উঠে দাঁড়িয়ে তোমাদের উদ্দেশ্যে আমার শুভকামনা জ্ঞাপন করতে চেয়েছিলাম, কারণ আমি চাই যে তোমরা সবাই ভালো থাকো। তাই, আমার প্রতিটি বাক্যে এবং প্রতিটি কার্যে, আমি তোমাদের সাহায্য করার জন্য, তোমাদের পথপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে, সর্বতোভাবে সচেষ্ট হই, যাতে তোমরা সকল বিষয়ে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে এবং যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গি পেতে পারো। তোমরা নিশ্চয়ই তা বুঝতে পারো, তাই নয় কি? (হ্যাঁ।) ভালো। ঈশ্বরের বিভিন্ন স্বভাব, ঈশ্বরের যা আছে ও তিনি যা, এবং ঈশ্বর যে কাজ করেন, তার দিকগুলি সম্পর্কে যদিও মানুষের কিছু বোধগম্যতা আছে, কিন্তু এই উপলব্ধির অধিকাংশই সীমিত থাকে কোনও একটি বইয়ের পৃষ্ঠার বাক্যগুলি পাঠ করা, বা সেগুলিকে শুধু নীতিগতভাবেই উপলব্ধি করা, অথবা শুধুই সেগুলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার মধ্যে। মানুষের সর্বাধিক যে অভাব রয়েছে তা হল প্রকৃত অভিজ্ঞতা থেকে উৎপন্ন প্রকৃত উপলব্ধি ও অন্তর্দৃষ্টির। যদিও ঈশ্বর মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন, কিন্তু তা সম্পন্ন করতে পারার আগে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আমি চাই না যে কেউ মনে করুক ঈশ্বর তাদের নিদারুণভাবে বর্জন করেছেন, ঈশ্বর তাদের পরিত্যাগ করেছেন অথবা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আমি শুধু এটাই দেখতে চাই যে সকল প্রকারের আশঙ্কা ও ভার থেকে মুক্ত হয়ে তারা সকলে সংকল্পে অবিচল থেক সত্য অন্বেষণের পথে, বীরদর্পে ও দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে। তুমি যতই অন্যায় করে থাকো না কেন, তুমি যতই দূরে পথভ্রষ্ট হও না কেন, তোমার অধর্ম যতই গুরুতর হোক না কেন, ঈশ্বর-উপলব্ধির পথে এগুলি যেন তোমার গুরুভার অথবা অতিরিক্ত বোঝা না হয়ে ওঠে। দৃপ্ত পদক্ষেপে সম্মুখে এগিয়ে চলো। ঈশ্বর সর্বদা মানুষের পরিত্রাণকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করেন; এর কখনও পরিবর্তন হয় না। এটাই ঈশ্বরের সারসত্যের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ। তোমাদের কি এখন আগের চেয়ে একটু ভালো লাগছে? (হ্যাঁ।) আমি আশা রাখি যে সকল বিষয়ের প্রতি এবং আমার কথিত বাক্যগুলির প্রতি তোমরা সঠিক মনোভাব গ্রহণ করতে পারবে। এই আলোচনা তাহলে এইখানেই শেষ করা যাক। বিদায়!

জানুয়ারি ১১, ২০১৪

পূর্ববর্তী: স্বয়ং অনন্য ঈশ্বর ৫

পরবর্তী: স্বয়ং ঈশ্বর, অনন্য ৯

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।👇

সম্পর্কিত তথ্য

ঈশ্বরের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

যে পথে মানুষ ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে এবং ঈশ্বরের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে, সেই পথটি হল নিজের হৃদয়ে ঈশ্বরের পরম শক্তিকে স্থান দিয়ে তাঁর...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন