স্বয়ং ঈশ্বর, অনন্য ৯

সকল বস্তুর প্রাণের উৎস হলেন ঈশ্বর (৩)

এই সময়কালের মধ্যে ঈশ্বরজ্ঞান সংক্রান্ত অনেক বিষয়ে আমরা কথা বলেছি এবং সম্প্রতি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছিলাম। প্রসঙ্গটি কী? (সকল বস্তুর প্রাণের উৎস হলেন ঈশ্বর।) যে বিষয়বস্তুটি নিয়ে আমি আলোচনা করেছিলাম মনে হয় তা সকলের মনে স্পষ্ট দাগ কেটেছিল। আগেরবার আমরা মানবজাতির জন্য ঈশ্বর-সৃজিত জীবনধারণের পরিবেশের কয়েকটি দিক এবং মানুষের জীবনযাপনের নিমিত্ত আবশ্যক ঈশ্বরের দ্বারা প্রস্তুত বিবিধ প্রকারের পরিপোষক উপাদান নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। বস্তুত, ঈশ্বর যা করেন তা কেবলমাত্র মানুষের জীবনধারণের জন্য একটি পরিবেশ রচনা বা তাদের প্রাত্যহিক জীবননির্বাহের উপাদান প্রস্তুতিকরণের মধ্যে সীমিত নয়। বরং, মানুষের জীবনধারণ ও মানবজাতির জীবনের বিভিন্ন দিক ও অভিমুখের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ রহস্যময় ও আবশ্যক কর্মসমাপন তাঁর কার্যের অন্তর্ভুক্ত। এসকলই ঈশ্বরের কর্মকাণ্ড। ঈশ্বরের এই কার্যকলাপগুলি শুধুমাত্র তাঁর মানুষের জীবনধারণ ও তাদের নৈমিত্তিক ভরণপোষণের জন্য পরিবেশ নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—তাঁর কার্যের এর চেয়ে অনেক বিস্তৃততর একটা পরিসর রয়েছে। এই দুই প্রকারের কার্য ব্যতীত, মানুষের উদ্বর্তনের উদ্দেশ্যে আবশ্যক জীবনধারণের নানান পরিবেশ ও পরিস্থিতিও তিনি প্রস্তুত করেন। এই বিষয়টিই আজ আমরা আলোচনা করতে চলেছি। এ-ও ঈশ্বরের কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত; তা না হলে, এখানে এ বিষয়ে আলোচনা করা অর্থহীন হতো। মানুষ যদি ঈশ্বরকে জানতে চায়, কিন্তু যদি তাদের কেবল “ঈশ্বর” শব্দটির বিষয়ে, বা ঈশ্বরের যা আছে এবং তিনি যা তার বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে একটা আক্ষরিক উপলব্ধি থাকে, তবে তা কোনো যথার্থ উপলব্ধি নয়। তাহলে ঈশ্বরজ্ঞানের পথটি কী? সেই পথটি হল তাঁর কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে ও তাঁর বিভিন্ন অভিমুখের সবগুলির মধ্য দিয়ে তাঁকে জানতে পারা। তাই, ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃজন করেন সেই সময়কালীন, তাঁর কার্যাবলীর বিষয়ে আমাদের আরো আলাপ-আলোচনা করতে হবে।

ঈশ্বর সকলকিছু সৃষ্টি করার পর থেকে সেগুলি একটা সুশৃঙ্খল রীতিতে এবং তাঁর নির্ধারিত বিধান অনুসারে কাজ করে চলেছে ও অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে। তাঁর নিবদ্ধ দৃষ্টির নীচে, তাঁর নিয়মের অধীনে, মানবজাতি জীবনধারণ করেছে, এবং এই সমস্ত সময়টা ধরে সকলকিছু একটা সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে বিকশিত হয়ে চলেছে। কোনোকিছুই এই বিধানসমূহের পরিবর্তন অথবা ধ্বংসসাধন করতে পারে না। ঈশ্বরের নিয়মের কারণেই সকল সত্তা বংশবৃদ্ধি করতে পারে, এবং তাঁর নিয়ম ও ব্যবস্থাপনার জন্যই সকল সত্তা টিকে থাকতে পারে। অর্থাৎ, ঈশ্বরের নিয়মের অধীনে সকল সত্তা একটা সুশৃঙ্খল রীতিতে জন্মলাভ করে, বিকশিত হয়, অন্তর্হিত হয়, ও পুনর্জন্মপ্রাপ্ত হয়। বসন্ত উপনীত হলে, ঝিরঝিরে বৃষ্টি এক আনকোরা ঋতুর অনুভূতি আনে ও মেদিনী সিক্ত করে। তুষার বিগলিত হয়ে ভূতল কোমল হতে শুরু করে, এবং তৃণাদি মৃত্তিকা ঠেলে নির্গত হয় ও অঙ্কুরিত হতে শুরু করে, ইতোমধ্যে বৃক্ষরাজি ক্রমশ শ্যামল বর্ণ ধারণ করে। এই সকল প্রাণময় সত্তা ধরাতলে তাজা প্রাণশক্তি বয়ে আনে। সকল সত্তা যখন অস্তিত্ব লাভ করে বিকশিত হচ্ছে তখন তা দেখে এমনই মনে হয়। বসন্তের উত্তাপ অনুভবের উদ্দেশ্যে যাবতীয় প্রকারের জীবজন্তু স্ব-স্ব বিবর থেকে নির্গত হয়। গ্রীষ্মে, সকল সত্তা উত্তাপ পোহায় এবং সেই ঋতুর বয়ে আনা উষ্ণতাকে উপভোগ করে। দ্রুতগতিতে তারা বেড়ে ওঠে। বৃক্ষাদি, তৃণলতাদি, তথা সকল প্রকার উদ্ভিদের প্রবল বেগে বৃদ্ধি ঘটে চলে, যতক্ষণ না অবশেষে তারা মুকুলিত ও ফলবন্ত হয়। গ্রীষ্মের সময় মানব সহ সকল প্রাণী ভারি ব্যস্ত। শরৎকালে বৃষ্টি শারদীয় শীতলতা নিয়ে আসে, আর সকল প্রকার জীবিত প্রাণী ফসল কাটার মরশুমের আগমন আঁচ করতে শুরু করে। সকল সত্তা ফলবান হয়, এবং শীতের প্রস্তুতি হিসাবে খাদ্য যোগানের উদ্দেশ্যে মানুষ ওইসব নানান রকমের ফল আহরণ করে ঘরে তুলতে শুরু করে। শীতকালে, হিমেল আবহাওয়া যখন জাঁকিয়ে বসে, সকল প্রাণী তখন ক্রমশ নিস্তব্ধতা ও বিশ্রামের মধ্যে থিতু হতে শুরু করে, আর এই মরশুমে মানুষও কাজকর্মে সাময়িক ক্ষান্তি দেয়। এক ঋতু থেকে অপর ঋতুতে, বসন্ত থেকে গ্রীষ্ম ও শরৎ হয়ে শীতে উত্তরণ—এই সমস্ত পরিবর্তন ঈশ্বরের প্রবর্তিত বিধান অনুসারেই সংঘটিত হয়। এই বিধানসমূহ প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি সকলকিছুর, তথা মানবজাতিরও, নেতৃত্বদান করেন এবং তিনি মানবজাতির উদ্দেশ্যে এক প্রাচুর্যময় ও বর্ণাঢ্য জীবনপ্রণালী উদ্ভাবন করেছেন, জীবনধারণের জন্য পরিবর্তনশীল উষ্ণতা ও ঋতু-বিশিষ্ট এক পরিবেশ নির্মাণ করেছেন। অতএব, জীবনধারণের এমন এক সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে মানুষ সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকতে ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। মানুষ এই বিধানগুলির রদবদল ঘটাতে পারে না, এবং কোনো মানুষ অথবা অন্য কোনো সত্তা এগুলির লঙ্ঘন করতে পারে না। যদিও অগণন পরিবর্তন সাধিত হয়েছে—সমুদ্র পরিণত হয়েছে প্রান্তরে, প্রান্তর সমুদ্রে—এই বিধানসমূহের অস্তিত্ব তবু অব্যাহত আছে। ঈশ্বর রয়েছেন বলে, এবং তাঁর নিয়ম ও ব্যবস্থাপনার কারণেই, বিধানসমূহও বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রকার সুশৃঙ্খল, বৃহদায়তন পরিবেশে, মানবজীবন এই বিধানসমূহের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই বিধানসমূহের অধীনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ জন্ম নিয়েছিল, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এর অধীনে জীবনধারণ করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মব্যাপী জীবনধারণের এই সুশৃঙ্খল পরিবেশ এবং ঈশ্বর-সৃষ্ট বিবিধ বস্তুর সকলকিছুই মানুষ উপভোগ করেছে। মানুষ যদিও এধরনের বিধানসমূহকে স্বাভাবিক প্রকৃতিদত্ত বলেই গণ্য করে, এবং সেগুলিকে অনায়াসলভ্য হিসাবে তুচ্ছজ্ঞান করে, এবং যদিও তারা অনুভব করতে পারে না যে এই বিধানসমূহের সমন্বয়সাধন করছেন ঈশ্বর, এই বিধানসমূহের উপর আধিপত্য করছেন ঈশ্বর, তবু, যাই ঘটুক না কেন, ঈশ্বর নিয়ত এই অপরিবর্তনশীল কার্যে ব্যাপৃত রয়েছেন। তাঁর এই পরিবর্তনরহিত কার্যের উদ্দেশ্য হল মানবজাতির উদ্বর্তন, যাতে মানুষ জীবনধারণ অব্যহত রাখতে পারে।

সমগ্র মানবজাতিকে প্রতিপালন করার উদ্দেশ্যে সকলকিছুর সীমানা নির্ধারণ করেন ঈশ্বর

আজ আমি যে বিষয়ে আলোচনা করতে চলেছি তা হল, ঈশ্বর যে বিধানসমূহ সকলকিছুর মধ্যে প্রবর্তন করেছেন, তা কীভাবে সমগ্র মানবজাতির প্রতিপালন করে। এটি বেশ বিস্তৃত এক বিষয়, তাই এটিকে আমরা কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে একাদিক্রমে আলোচনা করতে পারি, যাতে সেগুলিকে তোমাদের কাছে প্রাঞ্জল ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা যায়। এই পদ্ধতিতে, তোমাদের পক্ষে অনুধাবন করা আরো সহজসাধ্য হয়ে উঠবে, এবং তোমরা ক্রমশ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে।

তাহলে প্রথম অংশটি থেকে শুরু করা যাক। ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃষ্টি করেন, তিনি পর্বত, সমতল, মরুভূমি, পাহাড়, নদী ও হ্রদের সীমানা অঙ্কন করে দিয়েছিলেন। ভূপৃষ্ঠের উপর পর্বতমালা, সমতল, মরুভূমি ও পাহাড় যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন জলাধারসমূহও। এগুলি বিভিন্ন রকমের ভূমিরূপ গড়ে তোলে, তাই নয় কি? এগুলির মধ্যে ঈশ্বর সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সীমানির্দেশ বলতে বোঝায়, পর্বতরাজির রয়েছে নির্দিষ্ট সীমারেখা, সমতলভূমিগুলির নিজস্ব সীমানা আছে, মরুভূমিগুলির রয়েছে এক নির্দিষ্ট একটা চৌহদ্দি, আবার পাহাড়গুলিরও এক স্থির পরিসর রয়েছে। নদী ও হ্রদের মতো জলাধারসমূহেরও একটা সুনির্দিষ্ট পরিমাপ আছে। অর্থাৎ, ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃষ্টি করেন, তখন তিনি সকলকিছুকেই সুস্পষ্টরূপে বণ্টন করে দিয়েছিলেন। ঈশ্বর ইতিপূর্বেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন কোনো নির্দিষ্ট পর্বতের ব্যাসার্ধ কত কিলোমিটার হওয়া উচিৎ এবং সেটির পরিসরই বা কতখানি। তিনি এ-ও নিরূপণ করে দিয়েছিলেন যে একটা বিশেষ সমতলভূমির ব্যাসার্ধ কত কিলোমিটার হবে এবং তার পরিসরই বা কী হবে। সকলকিছু সৃষ্টি করার সময়, মরুভূমিগুলির সীমানা এবং পাহাড়গুলির বিস্তার ও তাদের অনুপাত, এবং সেগুলির চতুঃসীমানায় কী কী থাকবে তা-ও তিনি স্থির করে দিয়েছিলেন—এই সবকিছুই তাঁর দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল। নদী ও হ্রদ সৃজনের সময়েই তিনি সেগুলির বিস্তার নিরূপণ করে দিয়েছিলেন—এগুলির সকলেরই নিজস্ব সীমানা রয়েছে। তাহলে, “সীমানা” বলতে আমরা কী বোঝাতে চাই? কিছু পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি ঈশ্বর কীভাবে সকলকিছুর জন্য বিধান প্রবর্তনের মাধ্যমে সমস্তকিছুর উপর আধিপত্য করেন, সেই বিষয়ে। অর্থাৎ, পর্বতের বিস্তার বা সীমানা পৃথিবীর আবর্তনের কারণে বা সময়ের অগ্রগতির সাথে প্রসারিত বা সঙ্কুচিত হবে না। এগুলি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়, এবং ঈশ্বরই সেগুলির অপরিবর্তনীয়তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। সমতলভূমিগুলির পরিসর, সেগুলির বিস্তার কতখানি, সেগুলির চতুঃসীমানায় কী কী রয়েছে—এসকল ঈশ্বরের দ্বারা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এগুলির নিজস্ব সীমারেখা রয়েছে, আর সেই অর্থে, সমভূমির পৃষ্ঠদেশ থেকে যথেচ্ছভাবে মৃত্তিকাস্তূপ উঁচু হয়ে উঠতে পারে না। সমভূমি হঠাৎ করে পর্বতে পরিণত হতে পারে না—তা হবে অসম্ভব। যে বিধান ও সীমানার বিষয়ে কিছুপূর্বে বলা হয়েছিল, এ-ই হল তার অর্থ। মুরুভূমির কথা যদি ধরি, আমরা এখানে মরুভূমির সুনির্দিষ্ট কার্যাবলী বা অন্য কোনো ধরনের ভূমিরূপ বা ভৌগোলিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করবো না, শুধু সেগুলির সীমানার উল্লেখ করবো। ঈশ্বরের নিয়মের অধীনে, মরুভূমির সীমারেখাও প্রসারিত হবে না। কারণ ঈশ্বর মরুপ্রান্তরকে সেটির নিজস্ব বিধি ও সীমারেখা প্রদান করেছেন। সেটির আয়তন কত বিস্তৃত এবং সেটির কার্যকারিতা কী, কীসের দ্বারা তা পরিবেষ্টিত, এবং সেটির অবস্থান কোথায়—এসকল ঈশ্বর ইতিমধ্যেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মরুভূমি সেটির সীমানা অতিক্রম করবে না অথবা সেটির অবস্থান পরিবর্তন করবে না, এবং সেটির ক্ষেত্রফল যদৃচ্ছ সম্প্রসারিত হবে না। যদিও নদী ও হ্রদের মতো সকল জলপ্রবাহ নিয়মানুগ ও অবিশ্রান্ত, তবু সেগুলি কখনো স্বীয় বিস্তৃতির বাইরে বা সীমানা ছাড়িয়ে সঞ্চালিত হবে না। যে অভিমুখে সেগুলির প্রবাহিত হওয়ার কথা, সকলে সেই এক অভিমুখেই সুশৃঙ্খলভাবে প্রবাহিত হয়। তাই ঈশ্বরের বিধি-বিধানের আওতায়, কোনো নদী অথবা হ্রদ পৃথিবীর আবর্তনের কারণে অথবা চলমান সময়ের সাথে যদৃচ্ছ বিশুষ্ক হবে না, অথবা নির্বিচারে প্রবাহের গতিমুখ বা জলরাশির পরিমাণ পরিবর্তন করবে না। এসবকিছুই ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণাধীন। অর্থাৎ, এই মানবজাতির মাঝে ঈশ্বরের দ্বারা সৃজিত সকলকিছুর সুনির্দিষ্ট অবস্থান, এলাকা ও সীমানা আছে। সুস্পষ্টতরভাবে বললে, ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃজন করেছিলেন, তখনই সেগুলির সীমারেখা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, এবং তা খেয়ালমাফিক রদবদল, নবায়ন, বা পরিবর্তনসাধন করা যাবে না। “যদৃচ্ছ” শব্দটির অর্থ কী? এর অর্থ, আবহাওয়া, তাপমাত্রা, বা পৃথিবীর আবর্তন-বেগের কারণে সেগুলি ইচ্ছা মতো স্থানপরিবর্তন করবে না, সম্প্রসারিত হবে না, বা সেগুলির আদি আকৃতির রূপান্তর ঘটাবে না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি পর্বত এক নির্দিষ্ট উচ্চতাবিশিষ্ট হয়, সেটির তলদেশ হয় এক নির্দিষ্ট ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট, সেটির এক নির্দিষ্ট উচ্চতা থাকে, এবং সেটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গাছপালা ধারণ করে। এই সকলকিছুই ঈশ্বরের দ্বারা পরিকল্পিত ও পূর্বনির্ধারিত, এবং তা যথেচ্ছভাবে পরিবর্তিত হবে না। সমতলভূমির কথা ধরলে, অধিকাংশ মানুষ সমভূমিতে বসবাস করে, এবং জলবায়ুর কোনো পরিবর্তন তাদের বসবাসের এলাকা বা তাদের অস্তিত্বের মূল্যকে প্রভাবিত করবে না। এমনকি ঈশ্বর-সৃষ্ট এইসব নানাবিধ ভূমিরূপ ও ভৌগোলিক পরিবেশের অন্তর্ধৃত বস্তুসমূহও ইচ্ছে মতো পরিবর্তিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ, মরুভূমির উপাদানসমূহ, ভূগর্ভস্থ খনিজভাণ্ডারের প্রকৃতি, মরুভূমিতে ধৃত বালুরাশির পরিমাণ ও তার বর্ণ, মরুভূমির গভীরতা—এইসব খেয়ালমাফিক পরিবর্তিত হবে না। কেন এই সব ইচ্ছা মতো পরিবর্তিত হবে না? ঈশ্বরের নিয়ম ও তাঁর ব্যবস্থাপনার কারণে। ঈশ্বর-সৃষ্ট এইসমস্ত বিচিত্র ভূমিরূপ ও ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের মধ্যে সকলকিছুকে তিনি এক পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে পরিচালনা করছেন। সেই কারণেই, ঈশ্বরের দ্বারা সৃজিত হওয়ার শতসহস্র, এমনকি অযুত-লক্ষ বছর পরেও এসকল ভৌগোলিক পরিমণ্ডলগুলি অদ্যবধি বিদ্যমান রয়েছে, এবং আজও সেগুলি স্ব-স্ব নির্ধারিত কার্যকারিতায় বহাল রয়েছে। যদিও বিশেষ বিশেষ সময়কালে আগ্নেয়গিরি লাভা উদ্গিরণ করে, এবং বিশেষ বিশেষ সময়কালে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, এবং ভূপৃষ্ঠ জুড়ে ব্যাপক স্থানচ্যুতি ঘটে, কিন্তু তবু ঈশ্বর কোনোক্রমেই কোনো প্রকার ভূমিরূপকে সেটির মৌলিক কার্যকারিতা খোয়াতে দেবেন না। একমাত্র ঈশ্বরের এই ব্যবস্থাপনা, তাঁর বিধি, এবং এই বিধানসমূহের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের কারণেই, এই সমস্তকিছু—মানবজাতি যা দর্শন ও উপভোগ করে সেই সবকিছু—পৃথিবীপৃষ্ঠে এক সুশৃঙ্খল রীতিতে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু ঈশ্বর কেন পৃথিবীপৃষ্ঠে বিদ্যমান এই সকল বিচিত্র ভূমিরূপকে এইভাবে পরিচালনা করেন? তাঁর উদ্দেশ্য হল, বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে জীবনধারণকারী সজীব বস্তুগুলি সকলেই যেন একটা সুস্থিত পরিবেশ পায়, এবং সেই সুস্থিত পরিবেশের মধ্যে তারা যেন তাদের জীবনধারা অব্যাহত রাখতে ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এই সকলকিছু—যাকিছু জঙ্গম ও যাকিছু স্থাবর, যারা নাসারন্ধ্র দিয়ে শ্বাস নেয় ও যারা নেয় না—তারা সকলে মিলে মানবজাতির জীবনধারণের উপযোগী এক অদ্বিতীয় পরিমণ্ডল গড়ে তোলে। কেবল এই ধরনের প্রতিবেশই মানুষকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিপালন করতে পারে, এবং কেবল এই ধরনের প্রতিবেশই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে পারে।

এইমাত্র আমি যা আলোচনা করেছি তা একটি বিস্তৃত প্রসঙ্গ, সম্ভবত তোমাদের জীবন থেকে এটি খানিকটা সম্পর্কচ্যুত, কিন্তু আমি আস্থা রাখি তোমরা সকলেই এটা উপলব্ধি করতে পারবে, তাই নয় কি? অর্থাৎ, সমস্তকিছুর উপর তাঁর আধিপত্যের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বাস্তুতই অতীব গুরুত্ববাহী! এই বিধানের অধীনে সকল সত্তার বিকশিত হওয়ার পূর্বশর্ত কী? এই বিকাশ ঘটে ঈশ্বরের নিয়মের কারণে। তাঁর নিয়মের কারণেই সকলকিছু তাঁর নিয়মের অভ্যন্তরে তাদের নিজ নিজ কার্যাবলী সম্পন্ন করে। উদাহরণস্বরূপ, পর্বত অরণ্যকে প্রতিপালন করে এবং অরণ্য, প্রতিদানে, তার মধ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন পশু-পাখিকে প্রতিপালন করে ও সুরক্ষা দেয়। সমতলভূমি হল মানুষের নিমিত্ত প্রস্তুত ফসল বপনের একটা মঞ্চ, একই সঙ্গে বিভিন্ন পশুপাখির বাসস্থানও বটে। এগুলি মানবজাতির অধিকাংশ সদস্যকে সমতল ভূভাগে বসবাস করার সুযোগ দেয়, এবং মানুষের জীবনে সাচ্ছন্দ্য প্রদান করে। এবং সমভূমির মধ্যে তৃণভূমিও পড়ে—বিপুল, বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। এই তৃণভূমিগুলি ভূপৃষ্ঠের উপর উদ্ভিজ্জের আচ্ছাদন প্রদান করে। সেগুলি মৃত্তিকাকে সুরক্ষিত রাখে এবং তৃণভূমিবাসী গবাদি পশু, মেষ ও অশ্বাদি প্রতিপালন করে। মরুভূমিও তার নিজস্ব কার্য নির্বাহ করে। তা মনুষ্য-বসবাসের স্থান নয়; মরুভূমির কাজ হল আর্দ্র জলবায়ুকে শুষ্কতর করা। নদী ও হ্রদের প্রবাহ মানুষের কাছে স্বচ্ছন্দে পাণীয় জল বহন করে আনে। এগুলি প্রবাহিত হলে মানুষ পান করার জল পাবে এবং সকল বস্তু ও সত্তার জলের প্রয়োজন সহজেই মিটবে। এগুলিই হল বিভিন্ন ভূমিরূপের ঈশ্বর-চিহ্নিত সীমারেখা।

ঈশ্বরের দ্বারা চিহ্নিত এই সীমানাগুলির কারণে, বিভিন্ন ভূমিরূপ জীবনধারণের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ সৃজন করেছে, এবং জীবনধারণের এই পরিবেশগুলি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও জীবজন্তুর পক্ষে উপযুক্ত হয়ে উঠেছে এবং তাদের উদ্বর্তনের পরিসরও দিয়েছে। এখান থেকেই বিভিন্ন জীবন্ত সত্তার জীবনধারণের পরিবেশের সীমারেখা গড়ে উঠেছে। এ-ই হল দ্বিতীয় অংশ, এর পরে যার বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে চলেছি। প্রথমত, পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ কোথায় বাস করে? তারা কি জঙ্গল ও ঝোপেঝাড়ে বাস করে? এগুলিই তাদের বাসগৃহ। তাই, বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের সীমানা নির্ধারণ করা ছাড়াও, ঈশ্বর বিবিধ পাখি ও জীবজন্তু, মাছ, পতঙ্গ ও যাবতীয় উদ্ভিদের জন্য সীমানা চিহ্নিত ও বিধান প্রবর্তন করেছিলেন। বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্যের কারণে, এবং বিবিধ ভৌগোলিক পরিবেশ বিদ্যমান থাকার কারণে, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও জীবজন্তু, মাছ, পতঙ্গ ও উদ্ভিদের জীবনধারণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেশ রয়েছে। পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ নানাবিধ গাছপালার মাঝে বসবাস করে, মাছ বাস করে জলে, আর উদ্ভিদ স্থলভূমিতে বর্ধিত হয়। স্থলভূমির মধ্যে পর্বত, সমতল, পাহাড় ইত্যাদি বিবিধ অঞ্চল রয়েছে। পশুপাখিরা একবার তাদের নিজস্ব সুনির্দিষ্ট বাসভূমি পেয়ে গেলে তারা আর উদ্দেশ্যহীনভাবে ইতঃস্তত বিচরণশীল হয় না। অরণ্য ও পর্বত হল তাদের বাসভূমি। কোনোদিন তাদের বাসভূমি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেলে, এই শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে যেতো। শৃঙ্খলা লণ্ডভণ্ড হওয়ামাত্র, তার পরিণাম কী হয়? প্রথম কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়? প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানবজাতি। ঈশ্বর-প্রবর্তিত এইসকল বিধান ও সীমারেখার মধ্যে তোমরা কি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা লক্ষ্য করেছো? যেমন ধরো, মরুভূমির মধ্যে হাতির বিচরণ। এমনতর কিছু কি তোমরা দেখেছো? এমনটি যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তবে তা হবে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা, কারণ হাতি বাসস্থান হল অরণ্য, এবং অরণ্যই হল তাদের জন্য ঈশ্বর-প্রনীত জীবনধারণের পরিবেশ। তাদের জীবনধারণের জন্য নিজস্ব পরিমণ্ডল এবং নিজস্ব সুনির্দিষ্ট বাসভূমি আছে, তাহলে কেন তারা ইতস্তত ছুটে বেড়াতে যাবে? কেউ কি বাঘ-সিংহকে সমুদ্রসৈকতে বিচরণ করতে দেখেছ? না, তোমরা তা দেখনি। বাঘ-সিংহের বাসগৃহ হল অরণ্য ও পর্বত। সমুদ্রবাসী তিমি বা হাঙ্গরকে কি কেউ মরুভূমির মধ্য দিয়ে সন্তরণরত হতে দেখেছ? না, তোমরা তেমন কখনো দেখনি। তিমি ও হাঙ্গর সমুদ্রের মধ্যে তাদের আবাস নির্মান করে। মানুষের যাপন-পরিবেশে, বাদামি ভালুকের সঙ্গে সহাবস্থান করে এমন মানুষ কি রয়েছে? এমন মানুষ কি রয়েছে যারা তাদের ঘরে ও বাইরে সর্বদা ময়ূর বা অন্য পাখিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে? কেউ কি ঈগল বা বুনো হাঁসকে বানরের সাথে খেলতে দেখেছে? (দেখেনি।) এই সমস্তকিছুই অস্বাভাবিক সংঘটন হতো। আমি যে এমন সব বিষয়ের অবতারণা করছি যা তোমাদের কানে এত অদ্ভুত ঠেকছে এর উদ্দেশ্য হল তোমাদের এই মর্মে উপলব্ধি করানো যে, ঈশ্বর-সৃষ্ট সকলকিছুর—তা স্থাবর হোক অথবা জঙ্গম, বা তারা নাসারন্ধ্র দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করতে পারুক কি না পারুক—তাদের উদ্বর্তনের নিজস্ব বিধি আছে। এই সজীব সত্তাগুলি সৃষ্টি করার বহু পূর্বেই ঈশ্বর তাদের জন্য নিজস্ব বাসভূমি ও জীবনধারণের উদ্দেশ্যে তাদের নিজস্ব পরিবেশ নির্মাণ করেছিলেন। তাদের জীবনধারণের উদ্দেশ্যে এই জীবিত সত্তাগুলির নিজস্ব পরিমণ্ডল, তাদের নিজস্ব খাদ্য ও তাদের নিজস্ব সুনির্দিষ্ট বাসভূমি ছিল, এবং তাদের বেঁচে থাকার উপযোগী নিজস্ব সুনির্দিষ্ট স্থান, তাদের জীবনধারণের পক্ষে উপযুক্ত উষ্ণতাবিশিষ্ট স্থান ছিল। তাই তারা যেদিকে ইচ্ছা ইতস্তত ঘুরে বেড়াতো না, বা মানবজাতির উদ্বর্তনকে বিপদগ্রস্ত করতো না, বা মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতো না। এইভাবেই, ঈশ্বর সকলকিছু পরিচালনা করেন, মানবজাতির জীবনধারণের নিমিত্ত সর্বোৎকৃষ্ট পরিবেশের সংস্থান করেন। তার জীবনধারণের নিজস্ব পরিবেশের মধ্যেই প্রত্যেক জীবন্ত সত্তা তার নিজস্ব জীবন-পরিপোষক খাদ্য আহরণ করে। এই খাদ্যের মাধ্যমে তারা তাদের জীবনধারণের মূলীভূত পরিবেশের সঙ্গে সংসক্ত থাকে। সেই ধরনের প্রতিবেশের মধ্যে তাদের জন্য ঈশ্বর-প্রবর্তিত বিধান অনুযায়ী তারা তাদের উদ্বর্তন, বংশবৃদ্ধি, এবং অগ্রগমন অব্যাহত রাখে। এইরূপ বিধানসমূহের কারণে, ঈশ্বরকৃত পূর্বনির্ধারণের কারণে, মানবজাতির সঙ্গে সকলকিছু সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বসবাস করে, এবং মানবজাতি সকলকিছুর সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে একত্রে সহাবস্থান করে।

ঈশ্বর সকলকিছু সৃষ্টি করেছিলেন এবং সেগুলির সীমারেখা স্থাপন করেছিলেন; এই সকলকিছুর মধ্যে তিনি সকল প্রকার জীবিত বস্তুর প্রতিপালন করেছিলেন। একই সঙ্গে, মানবজাতির উদ্দেশ্যে জীবনধারণের বিভিন্ন উপায়ও তিনি প্রস্তুত করেছিলেন, অতএব তুমি দেখতে পাও যে, মানবজাতির জীবনধারণের কেবল যে একটিমাত্রই উপায় রয়েছে, এমন নয়, তাদের জীবনধারণের উপযোগী কেবল যে এক ধরনেরই পরিবেশ বিদ্যমান, তা-ও নয়। পূর্বে আমরা ঈশ্বর কর্তৃক মানুষের জন্য নানাবিধ খাদ্য ও জলের উৎসের প্রস্তুতিকরণের বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম, যে খাদ্য ও জল মানবজাতির জীবনকে দৈহিকভাবে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই মানবজাতির ভিতর সকল মানুষই যে খাদ্যশস্য খেয়ে প্রাণধারণ করে তা নয়। ভৌগোলিক পরিবেশ ও ভূমিরূপের পার্থক্যের কারণে মানুষের জীবনধারণের বিভিন্ন উপায় থাকে। জীবনধারণের এইসকল উপায়গুলি ঈশ্বরের দ্বারা প্রস্তুতকৃত। তাই সকল মানুষই প্রাথমিকভাবে কৃষিকাজে নিযুক্ত নয়। অর্থাৎ, সকল মানুষই যে ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের খাদ্য আহরণ করে, তা নয়। এবার আমরা তৃতীয় অংশটির বিষয়ে আলোচনা করতে চলেছি: মানবজাতির নানাবিধ বৈচিত্রময় জীবনশৈলীর কারণে, সীমারেখার উদ্ভব ঘটেছে। তাহলে মানুষের অন্যান্য কী কী প্রকারের জীবনশৈলী বিদ্যমান? খাদ্যের উৎসের প্রকারভেদ অনুযায়ী অন্য কী কী ধরনের মানুষ রয়েছে? বেশ কিছু মৌলিক প্রকারের মানুষ রয়েছে।

প্রথম প্রকারটি হল শিকারজীবী জীবনশৈলী। সেটা কী তা সকলেই জানে। শিকার অবলম্বন করে যারা জীবনধারণ করে তারা কী খায়? (শিকার করা পশুপাখি।) তারা অরণ্যের পশুপাখি আহার করে। “শিকার করা পশুপাখি” একটি আধুনিক শব্দবন্ধ। শিকারীরা বিষয়টিকে ক্রীড়া হিসাবে দেখে না; তারা তা গণ্য করে খাদ্য হিসাবে, তাদের দৈনন্দিন পরিপোষণ আকারে। ধরা যাক, কেউ একজন একটি হরিণ শিকার করেছে। তাদের এই হরিণ শিকার করাটা একজন কৃষকের মাটি থেকে খাদ্য আহরণ করার অনুরূপ। একজন কৃষক জমি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে, এবং এই খাদ্য যখন সে দেখে, তখন সে খুশি ও স্বচ্ছন্দ বোধ করে। ভোজনের পক্ষে পর্যাপ্ত ফসল থাকলে, পরিবার আর ক্ষুধার্ত থাকবে না। কৃষকের হৃদয় হয় উদ্বেগমুক্ত, এবং সে পরিতৃপ্ত বোধ করে। একজন শিকারীও তার শিকার-লব্ধ বস্তুকে দেখে স্বচ্ছন্দ ও পরিতৃপ্ত বোধ করে কারণ তাকে আর খাদ্যের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে না। পরবর্তী ভোজনকালে আহারের উপযোগী কিছু একটা রয়েছে, এবং ক্ষুধার্ত থাকার আর প্রয়োজন নেই। এ হল এমন এক ব্যক্তি যে জীবনধারণের জন্য শিকার করে। শিকারের দ্বারা যারা ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, তাদের অধিকাংশই পার্বত্য অরণ্যে বসবাস করে। এরা কৃষিকাজ করে না। সেইসকল অঞ্চলে কর্ষণযোগ্য জমি পাওয়া দুষ্কর, তাই তারা বিভিন্ন জীবন্ত প্রাণীর উপর, শিকার-লব্ধ পশুর উপর, নির্ভর করে জীবনধারণ করে। এই হল সাধারণ মানুষের থেকে স্বতন্ত্র প্রথম প্রকারের জীবনশৈলী।

দ্বিতীয় প্রকারটি হল পশুপালকের জীবনপ্রণালী। জীবিকার জন্যে যারা পশুপালন করে তারা কি জমিতে কৃষিকাজও করে? (না।) কীভাবে তারা জীবনধারণ করে? (বছরের অধিকাংশ সময় জীবিকার জন্য তারা গবাদি পশু ও মেষ পালন করে, এবং শীতের সময় তাদের সেই পশুসম্পদকে বধ করে তারা ভক্ষণ করে। তাদের প্রধান খাদ্য হল গোমাংস ও মেষমাংস, এবং তারা দুধ সহযোগে চা পান করে। পশুপালকরা বছরের চারটি ঋতুতেই কর্মব্যস্ত থাকে বটে, কিন্তু তাদের খাওয়াদাওয়ার মান বেশ ভালো। দুধ, দুগ্ধজাত সামগ্রী ও মাংস তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে।) জীবিকার জন্য যারা পশুপালন করে মুখ্যত তারা গোমাংস ও মেষমাংস আহার করে, মেষ ও গরুর দুধ পান করে, এবং গবাদি পশু ও ঘোড়ার পিঠে চড়ে তাদের পালিত পশুদের তারা চারণভূমিতে চরাতে নিয়ে যায়। তাদের চুলের মধ্যে দিয়ে বাতাস খেলে যায়, রোদ্দুর এসে পড়ে তাদের মুখে। আধুনিক জীবনের মানসিক চাপের সম্মুখীন তাদের হতে হয় না। সারাদিন তারা সুনীল আকাশ ও তৃণাচ্ছন্ন প্রান্তরের উন্মুক্ত বিস্তারের দিকে চেয়ে থাকে। পশুপালনজীবী মানুষদের অধিকাংশ তৃণভূমি অঞ্চলে বাস করে, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা তাদের যাযাবরসুলভ জীবনধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিছুটা একাকিত্বময় হলেও তৃণভূমির জীবন অত্যন্ত সুখের জীবনও বটে। এই জীবনরীতি মন্দ নয়!

জীবনরীতির তৃতীয় প্রকারটি হল মৎস্যশিকারীর জীবন। মনুষ্যজাতির একটি ক্ষুদ্রাংশ সমুদ্রের তীরে বা ক্ষুদ্র দ্বীপে বাস করে। তাদের বাসভূমি জল দ্বারা পরিবেষ্টিত, সমুদ্র অভিমুখী। জীবিকার জন্য এই মানুষগুলি মৎস্যশিকার করে। মৎস্যজীবী মানুষদের খাদ্যের উৎস কী? তাদের খাদ্যের উৎসগুলির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সকল প্রকার মৎস্য, সামুদ্রিক আহার্য, এবং অন্যান্য সমুদ্রজাত পদার্থ। মৎস্যজীবীগণ জমিতে কৃষিকাজ করে না, পরিবর্তে তাদের প্রত্যেকটা দিন অতিবাহিত হয় মৎস্যশিকার করে। তাদের প্রধান খাদ্যের মধ্যে পড়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ ও সমুদ্রজাত দ্রব্য। সময় বিশেষে সেগুলির বিনিময়ে তারা চাল, আটা-ময়দা ও অত্যাবশ্যক প্রাত্যহিক সামগ্রী ক্রয় করে। এ হল জলের নিকটে বসবাসকারী মানুষদের দ্বারা নির্বাহিত এক ভিন্নপ্রকার জীবনশৈলী। জলের কাছাকাছি বসবাস করার ফলে তাদের খাদ্যের জন্য তারা জলের উপর নির্ভর করে, এবং মাছ ধরার মাধ্যমে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। মৎস্যশিকার শুধু যে তাদের খাদ্যের একটা উৎসের সন্ধান দেয় তা-ই নয়, এই কাজ তাদের জীবিকানির্বাহের উপায়ও বটে।

জমিতে কৃষিকাজ করা ছাড়াও মানুষ প্রধানত উল্লিখিত জীবনযাত্রার তিনটি পদ্ধতি অনুযায়ী জীবন নির্বাহ করে। কিন্তু, মানুষদের গরিষ্ঠ অংশ জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকাজই করে, মানুষের স্বল্প কয়েকটি গোষ্ঠী কেবল পশুপালন, মৎস্যশিকার, এবং পশুপাখি শিকারের মাধ্যমে জীবননির্বাহ করে। কৃষিজীবী মানুষদের কীসের প্রয়োজন রয়েছে? তাদের প্রয়োজন হয় জমির। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাটিতে ফসল বপন করে তারা জীবনধারণ করে, এবং শাকসবজি, ফলমূল অথবা খাদ্যশস্য, যা-ই তারা বপন করুক না কেন, মৃত্তিকা থেকেই তারা তাদের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী লাভ করে।

এই বিভিন্ন জীবনশৈলীগুলি যে প্রাথমিক শর্তগুলির উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলি কী? যে পরিবেশে তারা জীবনধারণ করতে সক্ষম তাকে এক বুনিয়াদি স্তর থেকে সংরক্ষণ করা কি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নয়? অর্থাৎ, যারা শিকারের মাধ্যমে জীবনধারণ করে তারা যদি পার্বত্য অরণ্য বা পশুপাখি খুইয়ে ফেলতো, তাহলে তাদের জীবিকানির্বাহের উৎস নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো। এই মানবগোষ্ঠী ও এই ধরনের মানুষগুলির কোন অভিমুখে যাওয়া উচিৎ তা অনিশ্চিত হয়ে পড়তো এবং এমনকি হয়তো তাদের অস্তিত্বই লোপ পেতো। আর যারা জীবিকার জন্য পশুপালন করে তাদের বিষয়টা কীরকম? তারা কীসের উপর নির্ভর করে? তারা প্রকৃতপক্ষে যার উপর নির্ভর করে তা তাদের পালিত পশু নয়, বরং তা হল সেই পরিবেশ যেখানে তাদের পালিত পশুগুলি বেঁচে থাকতে পারে—অর্থাৎ, তৃণভূমি। যদি কোনো তৃণভূমি না থাকতো তাহলে পশুপালকরা কোথায় গিয়ে পশুচারণ করত? গবাদি পশু ও মেষগুলি তাহলে কী ভক্ষণ করতো? পালিত পশু না থাকলে এই যাযাবর মানুষগুলির কোনো জীবিকা থাকতো না। জীবিকা নির্বাহের উৎসের অবর্তমানে এই মানুষগুলি কোথায় যেতো? জীবনযাপন অব্যাহত রাখা তাদের পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়তো; তাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকতো না। যদি জলের কোনো উৎস না থাকতো, এবং নদী ও হ্রদগুলি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতো, তাহলে তখনো কি বেঁচে থাকার জন্য জলের উপর নির্ভরশীল ওই সমস্ত মাছের অস্তিত্ব থাকতো? থাকতো না। জীবিকার জন্য জল ও মাছের উপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলির জীবন কি অব্যাহত থাকতো? এই মানুষগুলি যখন খাদ্য বা জীবিকার সকল উৎস হারিয়ে ফেলতো, তখন তারা তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে অসমর্থ হতো। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠী যদি কখনো তাদের জীবিকা বা জীবনধারণের বিষয়ে সমস্যায় সম্মুখীন হতো, তাহলে সেই জনগোষ্ঠী টিকতো না, পৃথিবীর বুক থেকে তারা নিশ্চিহ্ন ও অবলুপ্ত হয়ে যেতো। এবং জীবিকার উদ্দেশ্যে যারা কৃষিকাজ করে তারা যদি তাদের জমি হারিয়ে ফেলতো, যদি তারা যাবতীয় উদ্ভিদের চাষ করে সেগুলির থেকে খাদ্য আহরণ করতে অসমর্থ হতো, তাহলে পরিণতি কী হতো? খাদ্যের অভাবে এই মানুষগুলি কি অনাহারে মারা পড়তো না? আর মানুষ যদি অনাহারে প্রাণত্যাগ করে, তাহলে সেই মানবসম্প্রদায় কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো না? তাহলে, এই হল ঈশ্বরের নানান রকমের পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষণ করার উদ্দেশ্য। বিভিন্ন পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র এবং তাদের মধ্যে থাকা বিভিন্ন জীবন্ত প্রাণীকে বজায় রাখার জন্য ঈশ্বরের শুধু একটিমাত্র উদ্দেশ্যই রয়েছে—এবং তা হলো সমস্ত ধরনের মানুষকে লালনপালন করা, তাদের লালনপালন করা যারা বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে বসবাস করে।

যদি সৃষ্টির সমস্ত জিনিস তাদের নিজস্ব নিয়ম-নীতি হারিয়ে ফেলে, তাহলে তাদের আর অস্তিত্ব থাকবে না; যদি সমস্ত জিনিসের নিয়ম-নীতি হারিয়ে যায়, তাহলে সমস্ত কিছুর মধ্যে জীবন্ত প্রাণীগুলি জীবগুলি আর টিকে থাকতে পারবে না। মনুষ্যজাতিও তাদের সেই পরিবেশ হারিয়ে ফেলবে যার উপর তারা বেঁচে থাকার জন্য নির্ভর করে। মানবজাতি যদি সেগুলি সব হারিয়ে ফেলে, তাহলে তারা আর এগোতে পারবে না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম উন্নতি ও সংখ্যাবৃদ্ধি করার জন্য তারা যেমনটা করে আসছে। মানবজাতি যে এখনো পর্যন্ত স্বীয় অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, তার কারণ হল তাদের প্রতিপালনের উদ্দেশ্যে, বিবিধ উপায়ে মানবজাতির লালনপালন করার জন্য, ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টির সকলকিছুর যোগান দিয়েছেন। মানবজাতিকে ঈশ্বর বিভিন্ন উপায়ে লালন করে বলেই কেবল মানবজাতি এখনো এই বর্তমান সময় পর্যন্ত টিকে রয়েছে। জীবনধারণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, অনুকূল ও সুশৃঙ্খল প্রাকৃতিক বিধানসম্পন্ন পরিমণ্ডল থাকার ফলেই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ, বিবিধ জনগোষ্ঠী সমুদয় তাদের স্ব-স্ব নির্ধারিত এলাকার ভিতর জীবন নির্বাহ করতে পারে। কেউই সেই সকল এলাকা বা সেগুলির মধ্যবর্তী সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে যেতে পারে না, কারণ সেগুলি নির্ধারিত হয়েছে ঈশ্বরের দ্বারা। ঈশ্বর কেন এইভাবে সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়েছিলেন? সমগ্র মানবজাতির জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রকৃতপক্ষেই অত্যন্ত গুরুত্ববাহী! প্রত্যেক প্রকার জীবিত সত্তার জন্য ঈশ্বর একটি নির্দিষ্ট পরিসর চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন এবং প্রতিটি প্রকারের মানুষের উদ্বর্তনের কোনো না কোনো পন্থা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে, পৃথিবীর বুকে বিবিধ প্রকারের মানুষ ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে তিনি বিভাজিত করেছিলেন, এবং তাদের জন্য একটা পরিসর স্থাপন করেছিলেন। এবার এই বিষয়েই আমরা আলোচনা করবো।

চতুর্থত, ঈশ্বর বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সীমারেখা চিহ্নিত করেছিলেন। পৃথিবীর বুকে শ্বেতাঙ্গ মানুষ, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ, পিঙ্গলবর্ণ মানুষ, ও পীতাভ বর্ণের মানুষ রয়েছে। এগুলি হল মানুষের বিভিন্ন প্রকার। ঈশ্বর এই বিভিন্ন প্রকারের মানুষের জীবনের পরিসরও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, এবং ঈশ্বরের ব্যবস্থাপনার অধীনে মানুষ, নিজেদের অজান্তেই, তাদের বেঁচে থাকার পক্ষে উপযুক্ত পরিবেশে বসবাস করে। কেউ এর বাইরে পা রাখতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, শ্বেতাঙ্গ মানুষদের কথা ধরা যাক। কোন ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে তাদের অধিকাংশ বসবাস করে? অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ মানুষ বসবাস করে ইউরোপ ও আমেরিকায়। মুখ্যত যে ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা বসবাস করে, তা হল আফ্রিকা। পিঙ্গলাভ মানুষরা মূলত বাস করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার থাইল্যাণ্ড, ভারত, মায়ানমার, ভিয়েৎনাম, ও লাওস প্রভৃতি দেশে। পীতবর্ণের মানুষরা বাস করে প্রধানত এশিয়ার চিন, জাপান, ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে। ঈশ্বর এইসকল বিভিন্ন জনজাতিগুলিকে যথাযথভাবে বণ্টিত করেছেন, যাতে এই বিভিন্ন জনজাতির মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিন্যস্ত হতে পারে। পৃথিবীর এই বিভিন্ন অংশগুলিতে বহুপূর্বেই ঈশ্বর প্রত্যেক ভিন্ন ভিন্ন মনুষ্যজাতির জীবনধারণের উপযুক্ত পরিবেশ প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। জীবনধারণের সেই পরিবেশগুলিতে ঈশ্বর তাদের জন্য ভিন্ন বর্ণ ও ভিন্ন উপাদান-সমন্বিত মৃত্তিকা সৃজন করেছেন। বাক্যান্তরে, যে উপাদানগুলি শ্বেতাঙ্গ মানুষদের শরীর গঠন করে তা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের দেহগঠনকারী উপাদানসমুদয়ের সাথে অভিন্ন নয়, এবং এই উপাদানসমূহ আবার অন্যান্য জনজাতির মানুষদের দেহগঠনকারী উপাদানগুলির থেকে পৃথক। ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃষ্টি করেন, তখনই তিনি সেই জনজাতির উদ্বর্তন-উপযোগী এক পরিবেশ রচনা করেছিলেন। তিনি এমন করেছিলেন যাতে, সেই জনজাতির মানুষগুলি যখন বংশবিস্তার শুরু করে সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়, তখন তাদের একটা নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়। মনুষ্য সৃজনের পূর্বেই ঈশ্বর এই সকলকিছু ভেবে রেখেছিলেন—ইউরোপ ও আমেরিকা তিনি শ্বেতাঙ্গ মানুষদের জন্য সংরক্ষিত করে রাখবেন যাতে তারা উন্নতিসাধন ও জীবনধারণ করতে পারে। তাহলে, ঈশ্বর যখন পৃথিবী সৃষ্টি করছিলেন, তাঁর তখনই একটি পরিকল্পনা ছিল, স্থলভূমির যেখানে তিনি যা স্থাপন করেছিলেন, এবং সেই স্থানে তিনি যা প্রতিপালন করেছিলেন, তার পিছনে তাঁর একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। উদাহরণস্বরূপ, সেই ভূখণ্ডটিতে কোন কোন পর্বত, কতসংখ্যক সমতলভূমি, জলের কতসংখ্যক উৎস, কী কী ধরনের পশুপাখি ও মাছ, এবং কী কী উদ্ভিদ থাকবে ঈশ্বর অনেক আগেই তা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। কোনো এক বিশেষ প্রকারের মানুষের, কোনো বিশেষ জনজাতির জন্য জীবনধারণের পরিবেশ প্রস্তুত করার সময়, ঈশ্বরের নানান বিষয়বস্তুকে নানান দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার প্রয়োজন হয়েছিল: যেমন, ভৌগোলিক পরিবেশ, মৃত্তিকার গঠনতন্ত্র, বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি, বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্যসমূহের আয়তন, মাছগুলির শরীর-গঠনের উপাদান, জলের গুণগত মানের পার্থক্য, এবং সকল বিবিধ প্রকার উদ্ভিদ…। ঈশ্বর বহুপূর্বেই এই সকলকিছু প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এহেন পরিবেশ হল জীবনধারণের এক পরিমণ্ডল, শ্বেতাঙ্গ মানুষদের উদ্বর্তনের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর যা সৃজন ও প্রস্তুত করেছিলেন, এবং সহজাতভাবেই, যা তাদের অধিকারভুক্ত ছিল। তোমরা কি উপলব্ধি করেছো যে সকলকিছু সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বর সেই বিষয়ে প্রভূত চিন্তাভাবনা প্রয়োগ করেছিলেন, এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্য করেছিলেন। (হ্যাঁ, বিভিন্ন প্রকারের মানুষের জন্য ঈশ্বরের বিবেচনা যে অত্যন্ত সুচিন্তিত ছিল তা আমরা উপলব্ধি করেছি। কারণ বিভিন্ন মনুষ্যগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য যে পরিবেশ তিনি সৃজন করেছিলেন, সেখানে কী কী প্রকারের পশুপাখি ও মাছ থাকবে, কতগুলি পর্বত ও কতগুলি সমভূমি তিনি প্রস্তুত করবেন, এই সবকিছুই তিনি অত্যন্ত সুচিন্তিত ও নির্ভুলভাবে বিবেচনা করেছিলেন।) শ্বেতাঙ্গ মানুষদের দৃষ্টান্ত ধরা যাক। শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিগণ প্রধানত কী আহার্যসমূহ ভক্ষণ করে? শ্বেতাঙ্গ মানুষজন যে খাদ্য গ্রহণ করে তা এশিয়াবাসী মানুষদের খাদ্যদ্রব্যের থেকে প্রভূতভাবে ভিন্নতর। মাংস, ডিম, দুধ, ও হাঁসমুরগি শ্বেতাঙ্গ মানুষদের প্রত্যহিক খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত। রুটি ও ভাতের মতো খাদ্যশস্যকে সাধারণত সম্পূরক খাদ্য হিসাবে তাদের থালার একপাশে রাখা হয়। এমনকি শাকসবজির স্যালাড খাওয়ার সময়েও তার মধ্যে তারা দু-এক টুকরো গরু বা মুরগির ঝলসানো মাংস যোগ করার প্রবণতা দেখায়, এবং এমনকি গম থেকে প্রস্তুত খাদ্য গ্রহণের সময়েও তাদের প্রবণতা থাকে তার সাথে চীজ, ডিম বা মাংস যোগ করার দিকে। অর্থাৎ, গম থেকে প্রস্তুত খাদ্য বা অন্ন মুখ্যত তাদের প্রধান খাদ্যদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়; তারা প্রচুর পরিমাণে মাংস ও চীজ খায়। যে খাবার তারা খায় তাতে ক্যালোরির পরিমাণ খুব বেশি বলে প্রায়শই তারা হিমশীতল জল পান করে। এই কারণেই শ্বেতাঙ্গ মানুষজন ব্যতিক্রমী রকমের স্বাস্থ্যবান। তাদের জন্য ঈশ্বরের দ্বারা প্রস্তুত জীবিকার উৎস ও জীবনধারণের পরিবেশ এমনই, যা তাদের এহেন জীবনযাপনের সুযোগ করে দেয়, যা অন্যান্য জনজাতির মানুষদের জীবনশৈলীর থেকে স্বতন্ত্র। জীবনযাপনের এমনতর পদ্ধতির মধ্যে ভালো-মন্দের কোনো বিষয় নেই—তা সহজাত, ঈশ্বরের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত, এবং ঈশ্বরের নির্দেশনা ও বন্দোবস্ত থেকে উদ্ভূত। এই জনজাতির জীবনযাপনের প্রণালী যে এই প্রকার, এবং তাদের জীবিকানির্বাহের উৎস যে এবম্বিধ, তা তাদের জাতিগোষ্ঠীগত কারণেই, এবং তা তাদের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর কর্তৃক নির্মিত জীবনধারণের পরিবেশের কারণেও বটে। এমন বলা চলে যে, শ্বেতাঙ্গ মানুষদের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর উদ্বর্তনের যে প্রতিবেশ রচনা করেছিলেন, এবং সেই প্রতিবেশ থেকে তারা যে প্রত্যহিক পুষ্টিউপাদান আহরণ করে, তা সমৃদ্ধ মানের ও প্রাচুর্যপূর্ণ।

অন্যান্য জনজাতির জীবনধারণের উদ্দেশ্যেও ঈশ্বর প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃজন করেছিলেন। যেমন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরদের ক্ষেত্রে আছে—কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা কোথায় অবস্থান করে? মূলত তারা মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় অধিষ্ঠিত। জীবননির্বাহের সেই প্রকার পরিবেশে, ঈশ্বর তাদের জন্য কী প্রস্তুত করেছিলেন? ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য, বিবিধ প্রজাতির পশুপাখি, আবার মরুভূমিও রয়েছে, এবং রয়েছে মানুষের পাশাপাশি বসবাসকারী বিবিধ উদ্ভিদসকল। তাদের জলের উৎস আছে, রয়েছে জীবিকা, ও খাদ্যের সংস্থান। তাদের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের কোনো পক্ষপাত ছিল না। তারা যা-ই করে থাকুক না কেন, তাদের জীবনধারণ কখনো প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হয়নি। তারাও একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং পৃথিবীর একাংশে একটি নির্দিষ্ট পরিসর নিজেদের অধিকারে রাখে।

এবার পীতবর্ণের মানুষদের সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক। পীতাভ মানুষরা মূলত পৃথিবীর পূর্বদিকে অধিষ্ঠান করে। পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য কী? পূর্বদিকের অধিকাংশ জমি উর্বর, এবং নানান উপাদান ও খনিজভাণ্ডারে সমৃদ্ধ। অর্থাৎ, ভূমির উপরস্থ ও ভূগর্ভস্থ যাবতীয় সম্পদ অঢেল পরিমাণে রয়েছে। এবং এই গোষ্ঠীর মানুষদের উদ্দেশ্যেও, এই জনজাতির জন্যও ঈশ্বর তাদের উপযোগী অনুরূপ মৃত্তিকা, জলবায়ু, ও বিবিধ ভৌগোলিক পরিবেশ প্রস্তুত করেছিলেন। যদিও এই ভৌগোলিক পরিবেশ ও পাশ্চাত্যের ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য বিদ্যমান, তবু ঈশ্বর মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য, জীবিকা ও জীবনধারণের উৎসসমূহও প্রস্তুত করেছিলেন। কেবল, তা প্রতীচ্যের শ্বেতাঙ্গ মানুষদের থেকে স্বতন্ত্র এক জীবনধারণের পরিবেশ। কিন্ত কোন একটি বিষয় নিয়ে তোমাদেরকে আমার বলার প্রয়োজন রয়েছে? প্রাচ্য জনজাতির মানুষের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত অধিক, সেহেতু ঈশ্বর পৃথিবীর এই অংশে অধিকতর পরিমাণে উপাদান সংযোজন করেছিলেন, যেগুলি প্রতীচ্যের তুলনায় ভিন্নতর। এখানে তিনি প্রভূত ও বিচিত্র ভূপ্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী এবং নানান প্রকার সামগ্রী সুপ্রতুল পরিমাণে সংযুক্ত করেছিলেন। প্রাকৃতিক সম্পদ এখানে সুপ্রচুর; ভূপ্রকৃতিও নানাবিধ ও বৈচিত্র্যময়, প্রাচ্য জনজাতির বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রতিপালন করার পক্ষে পর্যাপ্ত। প্রাচ্যকে যে বিষয়টি প্রতীচ্য থেকে পৃথক করে, তা হল প্রাচ্যের সর্বত্র—দক্ষিণ থেকে উত্তরে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে—জলবায়ু প্রতীচ্য অপেক্ষা উত্তমতর। চারটি ঋতু সুস্পষ্টরূপে স্বতন্ত্র, তাপমাত্রা যথাযথ, প্রকৃতিক সম্পদ প্রাচুর্যপূর্ণ, এবং প্রকৃতিক দৃশ্যাবলী ও ভূমিরূপের প্রকারভেদ প্রতীচ্যের তুলনায় অনেক ভালো। ঈশ্বর এমন কেন করলেন? শ্বেতাঙ্গ মানুষ ও পীতবর্ণের মানুষের মধ্যে ঈশ্বর খুব যুক্তিযুক্ত একটা ভারসাম্য সৃজন করেছিলেন। এই বাক্যের অর্থ কী? এর অর্থ হল, শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিগণের আহারাদি, তাদের ব্যবহার্য উপদানসামগ্রী, এবং তাদের উপভোগের জন্য সরবরাহকৃত দ্রব্যাদি সকল দিক থেকেই পীতবর্ণের মানুষদের উপভোগ্য সামগ্রীগুলির তুলনায় প্রভূত পরিমাণে ভালো। কিন্তু, ঈশ্বর কোনো জনজাতির বিরুদ্ধেই পক্ষপাতদুষ্ট নন। ঈশ্বর পীতবর্ণ মানুষদের জীবনধারণের উদ্দেশ্যে এক সুন্দরতর ও উত্তমতর পরিমণ্ডল প্রদান করেছিলেন। এ-ই হল সেই ভারসাম্য।

কোন ধরনের মানুষের পৃথিবীর কোন অংশে বসবাস করা উচিৎ, তা ঈশ্বরের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত; মানুষ কি সেই সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে? (না, তারা তা পারে না।) কী বিস্ময়কর ব্যাপার! বিভিন্ন যুগে বা বিশিষ্ট সময়কালে, এমনকি যদি যুদ্ধবিগ্রহ বা বলপূর্বক সীমানালঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটে থাকে, সেসকল ঘটনা ঈশ্বর প্রত্যেক মানবগোষ্ঠীর জন্য জীবনধারণের যে পরিবেশ পূর্বনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তা কোনোভাবেই বিনষ্ট করতে পারে না। অর্থাৎ, ঈশ্বর এক নির্দিষ্ট প্রকারের মানুষের জন্য পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারিত করে দিয়েছেন এবং তারা ওই সীমানাগুলি অতিক্রম করে যেতে পারে না। এমনকি মানুষের যদি তাদের জন্য নির্ধারিত ভূখণ্ড পরিবর্তন বা প্রসারিত করার কোনো প্রকার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেও থাকে, ঈশ্বরের অনুমতি ছাড়া তা অর্জন করা অত্যন্ত দুষ্কর হবে। তাদের পক্ষে সফল হওয়া খুবই কষ্টকর হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা তাদের অধিকৃত অঞ্চলের পরিসর প্রসারিত করতে চেয়ে অন্য কিছু রাষ্ট্রকে উপনিবেশে পরিণত করেছিলো। জার্মানরা কিছু দেশে হানা দিয়েছিল, এবং ব্রিটেন একসময় ভারত দখল করেছিল। ফল কী হয়েছিল? অন্তিমে তারা ব্যর্থই হয়েছিল। তাদের এই ব্যর্থতা থেকে আমরা কী বুঝি? ঈশ্বর যা পূর্বনির্ধারিত করেছেন তা ধ্বংসাতীত। তাই, ব্রিটেন যত প্রবল গতিবেগই বিস্তারলাভ করে থাকুক না কেন, পরিশেষে, তা সত্ত্বেও, তাদের ভারতের দ্বারা যে ভূখণ্ড অদ্যবধি অধিকৃত, তা ত্যাগ করে সরে আসতে হয়েছিল। ওই ভূখণ্ডে যারা বসবাস করে তারা এখনো ভারতীয়ই, ব্রিটিশ নয়, কারণ ঈশ্বর তা হতে দিতেন না। ইতিহাস বা রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষকবৃন্দ এই বিষয়ে তত্ত্ব পেশ করেছে। ব্রিটেনের ব্যর্থতার কারণ প্রদান করে তারা বলে, একটি বিশেষ নৃতাত্বিক গোষ্ঠীকে পরাভূত করা যায়নি বলে এমন হতে পারে, বা অন্য কোনো মনুষ্যোচিত কারণেও হয়ে থাকতে পারে…। এসকল প্রকৃত হেতু নয়। প্রকৃত হেতুটি হল ঈশ্বরের কারণে—তিনি এমন হতে দিতেন না! একটি বিশেষ নৃতাত্বিক গোষ্ঠীকে ঈশ্বর একটি বিশেষ ভূখণ্ডে বসবাস করতে দেন এবং তাদের সেখানে প্রতিষ্ঠিত করেন, এবং ঈশ্বর যদি তাদের সেই ভূখণ্ড থেকে অন্যত্র গমনের অনুমোদন না করেন, তাহলে তারা কখনোই অন্যত্র যেতে পারবে না। ঈশ্বর যদি তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এলাকা বরাদ্দ করে থাকেন, তাহলে তারা সেই অঞ্চলের ভিতরেই বসবাস করবে। এই নির্ধারিত এলাকাগুলি ছেড়ে মানুষ অন্যত্র পলায়ন করতে বা নিজেদের মুক্ত করতে পারে না। এমনটি নিশ্চিত। সীমানালঙ্ঘনকারীদের শক্তি যতই প্রবল হোক, বা যাদের সীমানা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তারা যতই দুর্বল হোক, হানাদারদের সাফল্য পরিশেষে সেই ঈশ্বরই সাব্যস্ত করবেন। তাঁর দ্বারা তা ইতিমধ্যেই পূর্বনির্ধারিত হয়ে রয়েছে, এবং কেউই তা পরিবর্তিত করতে পারে না।

ঈশ্বর বিভিন্ন জনজাতিকে কেমন ভাবে বণ্টিত করেছেন, উপরে তার বিবরণ দেওয়া হল। এই জনজাতিগুলিকে বণ্টিত করার উদ্দেশ্যে ঈশ্বর কী কার্য সম্পাদন করেছেন? প্রথমত, তিনি বৃহদায়তন ভৌগোলিক পরিবেশ নির্মাণ করেছেন, বিভিন্ন অঞ্চলকে মানুষের জন্য আবণ্টিন করেছেন, পরবর্তীকালে যে অঞ্চলসমূহে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনধারণ করেছে। এমন অবধারিত—তাদের জীবনধারণের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট অঞ্চল স্থিরীকৃত। এবং তাদের জীবন, তাদের খাদ্য ও পাণীয়, তাদের জীবিকা—এসমস্তই ঈশ্বর বহুকাল আগে স্থির করে দিয়েছিলেন। আর ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃষ্টি করছিলেন, বিভিন্ন প্রকারের মানুষের জন্য তিনি বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন: রয়েছে মৃত্তিকার বিভিন্ন গঠন, বিভিন্ন জলবায়ু, বিবিধ উদ্ভিদ ও বিবিধ ভৌগোলিক পরিমণ্ডল। বিভিন্ন স্থানে এমনকি ভিন্ন ভিন্ন পশুপাখিও রয়েছে, বিভিন্ন প্রকারের জলরাশিতে রয়েছে সেগুলির নিজস্ব বিশেষ প্রজাতির মৎস্য ও জলজ সামগ্রী। এমনকি পতঙ্গদের প্রকারভেদও ঈশ্বরের দ্বারা নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকা মহাদেশে যে বস্তুগুলি জন্মায় সেগুলি সকলই সুবিশাল, সুউচ্চ এবং অত্যন্ত সুপুষ্ট। পার্বত্য অরণ্যে সকল বনস্পতির শিকড় অতীব অগভীর হওয়া সত্ত্বেও, সেসকল স্থানে বৃক্ষরাজি সুউচ্চ হয়ে মাথা তোলে। একশো মিটার অথবা তার বেশি উচ্চতা অবধিও বেড়ে উঠতে পারে, এশিয়ার জঙ্গলের অধিকাংশ গাছপালা তত লম্বা নয়। উদাহরণস্বরূপ ঘৃতকুমারী গাছটির কথা ধরা যাক। জাপানে এই গাছটি খুব সরু আর খুব পাতলা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেই ঘৃতকুমারী গাছই আকারে খুব বড়ো। এখানে একটি পার্থক্য রয়েছে। এটি একই নামের একই প্রজাতির গাছ, কিন্তু আমেরিকা মহাদেশে তা সবিশেষরূপে সুবৃহৎ আকৃতি ধারণ করে বেড়ে ওঠে। এই সব বিভিন্ন বিষয়ে পার্থক্যসমূহ মানুষ লক্ষ্য বা উপলব্ধি নাও করে থাকতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর যখন সকলকিছু সৃষ্টি করছিলেন, এই বিষয়গুলিকে তিনি অনুপুঙ্খভাবে চিত্রিত করেছিলেন এবং বিভিন্ন জনজাতির জন্য বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিমণ্ডল, বিভিন্ন ভূমিরূপ, ও বিভিন্ন সজীব বস্তু প্রস্তুত করেছিলেন। এর কারণ হল ঈশ্বর নানান ধরনের মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, এবং তাদের প্রত্যেকের কী প্রয়োজন ও তাদের জীবনশৈলী কেমন, তা তিনি জানেন।

এই বিষয়গুলির মধ্যে কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করার পর, তোমাদের কি বোধ হচ্ছে যে আমাদের সদ্য-আলোচিত মুখ্য প্রসঙ্গটির বিষয়ে তোমরা কিছু জ্ঞানলাভ করেছো? তোমাদের কি মনে হচ্ছে, যে তোমরা এটিকে উপলব্ধি করতে শুরু করেছো? আমার মনে হয়, আমি কেন বিস্তৃততর প্রসঙ্গটির অভ্যন্তরে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতে মনস্থ করলাম, সেই বিষয়ে এতক্ষণে তোমাদের মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করা উচিৎ। বিষয়টা এমনই তো? এর কতটা তোমরা উপলব্ধি করেছিলে সে বিষয়ে হয়তো অল্প কিছু তোমরা বলতে পারো। (সকলকিছুর জন্য ঈশ্বর-নির্ধারিত বিধান দ্বারা সমগ্র মানবজাতি প্রতিপালিত হয়েছে। ঈশ্বর যখন এই নিয়মগুলি নির্ধারণ করছিলেন, বিভিন্ন জনজাতিকে তিনি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন জীবনশৈলী, ভিন্ন আহার্য বস্তু, এবং ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু ও তাপমাত্রা প্রদান করেছিলেন। এমন করা হয়েছিল যাতে সমগ্র মানবজাতি পৃথিবীর বুকে স্থায়ী বসতি নির্মাণ করে জীবনধারণ করতে পারে। এর থেকে আমি দেখতে পাই, মানবজাতির উদ্বর্তনের উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের পরিকল্পনাগুলি খুবই যথাযথ, এবং তাঁর প্রজ্ঞা ও ত্রুটিহীনতা, এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসাও পরিলক্ষিত হয়।) (ঈশ্বরের দ্বারা নির্ধারিত বিধান ও পরিসরসমূহ কোনো মানুষ, ঘটনাবলী বা বস্তুসমূহ দ্বারা পরিবর্তিত হতে পারে না। এই সকলকিছুই তাঁর নিয়মের অধীন।) সকলকিছুর বিকাশের জন্য ঈশ্বর-নির্ধারিত বিধানের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে, তার সমস্ত বৈচিত্র সমেত সমগ্র মানবজাতি কি ঈশ্বরের দ্বারা রসদপ্রাপ্ত ও প্রতিপালিত নয়? এই বিধানসমূহ যদি বিনষ্ট হতো, বা ঈশ্বর যদি মানবজাতির জন্য এই বিধানসমূহ প্রবর্তন না করতেন, তাহলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কী দাঁড়াতো? তাদের জীবনধারণের প্রাথমিক পরিবেশকে হারিয়ে ফেললে, মানুষের খাদ্যের কোনো উৎস থাকতো কি? খাদ্যের উৎস এক সমস্যা হয়ে দেখা দিতেই পারে। মানুষ যদি তাদের খাদ্যের উৎস খুইয়ে ফেলে, অর্থাৎ তারা যদি আহার্য না পায়, তাহলে তারা কতো দিন চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে? সম্ভবত তারা এমনকি এক মাসও টিকবে না, এবং তাদের বেঁচে থাকাটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তাই, মানুষের উদ্বর্তন, তাদের অস্তিত্ব, বংশবিস্তার ও জীবিকার অনুবর্তনের জন্য ঈশ্বরের সম্পাদিত প্রতিটি কার্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সৃজিত বস্তুসকলের মধ্যে ঈশ্বরের সম্পাদিত প্রতিটি কার্য মানবজাতির জীবনধারণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং তা থেকে অবিচ্ছেদ্য। মানুষের জীবনধারণ যদি সমস্যার সম্মুখীন হয়, তাহলে কি ঈশ্বরের ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকতে পারে? তখনো কি ঈশ্বরের ব্যবস্থাপনার কোনো অস্তিত্ব থাকবে? ঈশ্বরের ব্যবস্থাপনা তাঁর দ্বারা প্রতিপালিত মানবজাতির উদ্বর্তনের সাথে সহাবস্থান করে, তাই তাঁর সৃষ্ট সকলকিছুর জন্য ঈশ্বর যে প্রস্তুতিই গ্রহণ করুন না কেন এবং মানুষের জন্য তিনি যা-ই করুন না কেন, এই সকলকিছুই তাঁর কাছে প্রয়োজনীয়, এবং মানবজাতির জীবনধারণের জন্য তা অত্যাবশ্যক। সকল বস্তুর জন্য ঈশ্বর-নির্ধারিত এই বিধানসমূহ থেকে যদি বিচ্যুতি ঘটতো, এই বিধানসমূহ যদি লঙ্ঘিত বা ব্যাহত হতো, সকলকিছু আর অস্তিত্ব অব্যাহত রাখতে পারতো না, মানবজাতির জীবনধারণের পরিবেশ, বা তাদের দৈনন্দিন জীবিকা, বা মানবজাতি স্বীয় উদ্বর্তনও আর বজায় রাখতে পারতো না। এই কারণেই, মানবজাতির পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের ব্যবস্থাপনাও তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতো।

যাকিছু আমরা আলোচনা করেছি, তার প্রত্যেকটি বিষয়বস্তু, প্রতিটি আধেয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনধারণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তোমরা বলতে পারো, “আপনি যা বলছেন তা খুব বড়ো বিষয়, আমরা দেখতে পাই এমন কোনো বিষয় নয়,” এবং হয়তো এমন কথা বলার মতো মানুষও আছে যে “আপনি যে বিষয়ে কথা বলছেন তার সাথে আমার কোনো যোগ নেই”। কিন্তু, এ কথা ভুলো না যে তুমি কেবল সকলকিছুর একটা অংশ হিসাবেই জীবনধারণ করছো; ঈশ্বরের নিয়মের অধীন সৃষ্টির সকল বস্তুর মধ্যে তুমি অন্যতম মাত্র। ঈশ্বর-সৃষ্ট বস্তুগুলিকে তাঁর নিয়ম থেকে বিযুক্ত করা যায় না, এবং কোনো মানুষই তাঁর নিয়ম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। তাঁর নিয়ম ও তাঁর সংস্থানকে খুইয়ে ফেলার অর্থ হল মানুষের জীবন, মানুষের দেহজ প্রাণসত্তা, অন্তর্হিত হয়ে যাবে। এ-ই হল ঈশ্বর দ্বারা মানবজাতির জন্য উদ্বর্তনের উপযোগী পরিবেশ স্থাপনের গুরুত্ব। তুমি যে জনজাতিরই অন্তর্ভুক্ত হও বা যে ভূখণ্ডেই তুমি বাস করো না কেন, তা প্রাচ্যেই হোক কি প্রতীচ্যে—মানবজাতির উদ্দেশ্যে ঈশ্বর যে জীবনধারণের পরিবেশ স্থাপন করেছেন তুমি তার থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে পারো না, এবং সেই পরিবেশের প্রতিপালন ও সংস্থান থেকেও তুমি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারো না। তোমার জীবিকা যা-ই হোক, বেঁচে থাকার জন্য যার উপরেই তুমি নির্ভর করো, এবং তোমার লৌকিক জীবনকে অব্যাহত রাখার জন্য যার উপরেই তুমি ভরসা করো না কেন, নিজেকে তুমি ঈশ্বরের নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা থেকে পৃথক করতে পারবে না। কিছু লোক বলে: “আমি কৃষক নই; জীবিকার জন্য আমি ফসল বপন করি না। আমার খাদ্যের জন্য আমি স্বর্গের উপর নির্ভর করি না, তাই আমার উব্দর্তন ঈশ্বরের দ্বারা স্থাপিত জীবনধারণের পরিবেশের মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে না। ঐ ধরনের পরিবেশ থেকে আমাকে কিছুই প্রদান করা হয়নি”। কথাটি কি সঠিক? তুমি বলছো, তোমার জীবিকার জন্য তুমি ফসল রোপন করো না, কিন্তু তুমি কি খাদ্যশস্য আহার করো না? তুমি কি মাংস আর ডিম খাও না? আর তুমি কি শাকসবজি ও ফল ভক্ষণ করো না? তুমি যা ভোজন করো, যা তোমার প্রয়োজন—সেই সকলকিছুই মানবজাতির জীবনধারণের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর-স্থাপিত পরিবেশের থেকে অবিচ্ছেদ্য। এবং মানুষের প্রয়োজনীয় সকলকিছুর উৎসকেও ঈশ্বর-সৃষ্ট যাবতীয় কিছু, যেগুলি সামগ্রিকভাবে তোমাদের জীবনধারণের পরিবেশসমূহ গঠন করে, সেগুলির থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। যে জল তুমি পান করো, যে পোশাক তুমি পরিধান করো, এবং যে সকল সামগ্রী তুমি ব্যবহার করো—এই সকলকিছুর মধ্যে কোনটিই বা ঈশ্বর-সৃষ্ট বস্তুসকলের মধ্য থেকে প্রাপ্ত নয়? কিছু মানুষ বলে: “কিছু জিনিস আছে যেগুলো ঈশ্বর-সৃষ্ট বস্তুসকল থেকে পাওয়া যায় না। প্লাস্টিক এই ধরনের একটা সামগ্রী। এটি এক রাসায়নিক পদার্থ, মনুষ্য-নির্মিত বস্তু”। কথাটা কি ঠিক? প্লাস্টিক সত্যিই মনুষ্য-নির্মিত, এবং রাসায়নিক বস্তুও বটে, কিন্তু প্লাস্টিকের আদি উপাদানগুলি কোথা থেকে এসেছিল? আদি উপাদানগুলি পাওয়া গিয়েছিল ঈশ্বর-সৃষ্ট পদার্থ থেকে। যে বস্তুসকল তোমরা দেখো ও উপভোগ করো, তোমাদের ব্যবহৃত প্রতিটি সামগ্রী, এই সকলই ঈশ্বর-সৃষ্ট দ্রবাদি থেকে লভ্য। অর্থাৎ, একজন মানুষ যে জনজাতিরই অন্তর্ভুক্ত হোক, তার জীবিকা যা-ই হোক, অথবা জীবনধারণের যে ধরনের পরিবেশেই সে বসবাস করুক না কেন, ঈশ্বর যা সংস্থান করেছেন তার থেকে সে নিজেকে বিযুক্ত করতে পারে না। তাহলে আমাদের আজকের আলোচিত বিষয়গুলি কি “সকল বস্তুর প্রাণের উৎস হলেন ঈশ্বর” প্রসঙ্গটির সঙ্গে সম্পর্কিত? আমাদের আজকের আলোচিত বিষয়গুলি কি এই বৃহত্তর প্রসঙ্গটির মধ্যে পড়ে? (হ্যাঁ, পড়ে।) আমি আজ যে সকল বিষয়ে বাক্যালাপ করেছি, তার মধ্যে কিছু কিছু প্রসঙ্গ হয়তো কিছুটা বিমূর্ত এবং আলোচনার পক্ষে দুরূহ। যাই হোক, আমার মনে হয়, এখন সম্ভবত তোমাদের এই বিষয়ে স্পষ্টতর উপলব্ধি হয়েছে।

শেষ কয়েকবারের সহকারিতায় আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তুর পরিসর বেশ বিস্তৃত ছিল, তাই সমগ্র আলোচনাটা অন্তরঙ্গম করতে তোমাদের কিছু প্রচেষ্টা প্রয়োগ করতে হয়েছে। এর কারণ হল, মানুষের ঈশ্বর-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এই প্রসঙ্গগুলি আগে কখনো আলোচনা করা হয়নি। কিছু মানুষ এই বিষয়গুলিকে একটা রহস্য হিসাবে শ্রবণ করে, এবং কিছু মানুষ তা শ্রবণ করে এক আখ্যান-কাহিনী হিসাবে—কোন পরিপ্রেক্ষিতটি যথার্থ? কোন দৃষ্টিকোণ থেকে তোমরা এইসব বিষয়কে শ্রবণ করো? (তাঁর সৃষ্টির সকলকিছুকে ঈশ্বর কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করেছেন তা আমরা দেখেছি, দেখেছি সকলকিছুর সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, এবং এই বাক্যগুলির মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের ক্রিয়াকর্ম ও মানবজাতির পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে তাঁর সুনিপুণ বন্দোবস্ত আরো বেশি করে উপলব্ধি করতে পারি।) ঈশ্বর কর্তৃক সকলকিছুর ব্যবস্থাপনার পরিসর যে কতদূর প্রসারিত এইসকল আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে তা কি তোমরা লক্ষ্য করেছো? (সমগ্র মানবজাতির উপর, সকল বস্তুর উপর প্রসারিত।) ঈশ্বর কি কেবল একটি জনজাতির ঈশ্বর? তিনি কি কোনো এক প্রকারের মানুষের ঈশ্বর? তিনি কি কেবল মানবজাতির একটি ক্ষুদ্র অংশের ঈশ্বর? (না, তিনি তা নন।) যেহেতু বিষয়টি বাস্তবে তা নয়, তাই তোমার ঈশ্বর-জ্ঞান অনুসারে তিনি যদি মানবজাতির কেবল একটা ক্ষুদ্র অংশের ঈশ্বর হন, বা তিনি যদি শুধু তোমাদের একার ঈশ্বর হন, তাহলে কি সেই দৃষ্টিকোণকে যথাযথ বলা যায়? ঈশ্বর যেহেতু সকলকিছু পরিচালিত করেন এবং সকলকিছুর উপর কর্তৃত্ব করেন, তাই সকলকিছুর উপর তাঁর এই আধিপত্যের মধ্য দিয়ে তাঁর যে কার্যকলাপ, প্রজ্ঞা ও সর্বশক্তিমানতা প্রকাশিত হয়, মানুষের তা প্রত্যক্ষ করা উচিৎ। এটি হল এমন এক বিষয়, যা মানুষকে জানতেই হবে। তুমি যদি বলো যে ঈশ্বর সকলকিছু পরিচালনা করেন, সকলকিছুর উপর কর্তৃত্ব করেন, এবং সমগ্র মানবজাতির উপর আধিপত্য করেন, কিন্তু তোমার যদি মানবজাতির উপর তাঁর এই আধিপত্যের বিষয়ে কোনো উপলব্ধি বা কোনো অন্তর্দৃষ্টিই না থাকে, তাহলে তুমি কি সত্যিই মেনে নিতে পারো যে সকলকিছুর উপর তিনি কর্তৃত্ব করেন? মনে মনে তুমি হয়তো ভাবতে পারো, “আমি মেনে নিতে পারি, কারণ আমি প্রত্যক্ষ করি যে আমার জীবন সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত”। কিন্তু ঈশ্বর কি সত্যি এতটাই ক্ষুদ্র? না, তিনি তা নন! ঈশ্বরের পরিত্রাণকে তুমি শুধু তোমার নিজের জন্যে আর তাঁর কার্যকে কেবল তোমার নিজেরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করো, এবং কেবলমাত্র এই বিষয়গুলি থেকেই তুমি তাঁর শাসন উপলব্ধি করো। এ হল অতীব ক্ষুদ্র এক পরিসর, এবং তোমার যথার্থ ঈশ্বর-জ্ঞানের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এর এক ক্ষতিকর প্রভাব আছে। এছাড়াও তা সকলকিছুর উপর ঈশ্বরের আধিপত্যের বিষয়ে তোমার প্রকৃত জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করে তোলে। তোমার জন্য ঈশ্বর যা সংস্থান করেন, এবং তোমার জন্য তাঁর পরিত্রাণের ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যেই তুমি যদি তোমার ঈশ্বর-জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করে ফেলো, তাহলে তুমি কখনোই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে না যে তিনি সকলকিছুর উপর কর্তৃত্ব করেন, সকল বস্তুর উপর আধিপত্য বিস্তার করেন, এবং সমগ্র মানবজাতির উপর প্রভুত্ব করেন। এবং এই সমস্তকিছুই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে, তুমি কি প্রকৃতই এই সত্য অনুধাবন করতে পারো, যে, তোমার নিয়তির অধিপতি হলেন ঈশ্বর? না, পারো না। তোমার অন্তরে তুমি কখনো এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে না—তুমি কখনোই উপলব্ধির এই উচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। আমি যা বলছি তোমরা তা বুঝতে পারছো তো? বস্তুত, আমার আলোচিত এই প্রসঙ্গগুলি ঠিক কতটা উপলব্ধি করতে তোমরা সক্ষম, তা আমি জানি, তাহলে আমি এই বিষয়ে বক্তব্য রেখে চলেছি কেন? এর কারণ হল, এগুলি এমনই প্রসঙ্গ যে, প্রত্যেক ঈশ্বর-অনুসরণকারীর, ঈশ্বরের দ্বারা উদ্ধার হতে চায় এমন প্রতিটি ব্যক্তির, এগুলির মর্মগ্রহণ করা আবশ্যক—এই প্রসঙ্গগুলি অনুধাবন করা অবশ্যকর্তব্য। এই মুহূর্তে তুমি এই বিষয়গুলি না বুঝলেও, একদিন, যখন তোমার জীবন ও তোমার সত্যানুভব নির্দিষ্ট এক স্তরে উপনীত হবে, যখন তোমার জীবন-চরিত্রের পরিবর্তন একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছাবে এবং তুমি একটা নির্দিষ্ট মানের আত্মিক উচ্চতা অর্জন করবে, একমাত্র তখনই সহকারিতার-সূত্রে এই যে প্রসঙ্গগুলি আমি তোমাদের জ্ঞাপন করছি সেগুলি প্রকৃতই তোমাকে রসদ যোগাবে এবং ঈশ্বর-জ্ঞানের জন্য তোমার অন্বেষণকে চরিতার্থ করবে। তাই, এই বাক্যগুলির উদ্দেশ্য হল সকলকিছুর উপর ঈশ্বরের আধিপত্য বিষয়ক তোমাদের ভবিষ্যৎ উপলব্ধির উদ্দেশ্যে একটি ভিত্তি পত্তন করা, এবং স্বয়ং ঈশ্বর সম্বন্ধে উপলব্ধির জন্য তোমাদের প্রস্তুত করা।

মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বর বিষয়ক উপলব্ধি যত বেশি হয়, তাদের হৃদয়ের তত অধিক অংশ জুড়ে তিনি অধিষ্ঠান করেন। তাদের হৃদয়ে ঈশ্বর-জ্ঞানের মাত্রা যত বেশি হয়, তাদের অন্তরে ঈশ্বরকে তারা তত অধিকমাত্রায় মহান বলে অনুভব করে। যে ঈশ্বরকে তুমি জানো সে যদি শূন্যগর্ভ ও অনিশ্চিত হয়, তাহলে যে ঈশ্বরে তুমি বিশ্বাস করো সে-ও শূন্যগর্ভ ও অনিশ্চিত। তোমার পরিচিত সেই ঈশ্বর তোমার নিজের ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরের দ্বারা সীমাবদ্ধ, এবং তার সাথে স্বয়ং প্রকৃত ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই, ঈশ্বরের বাস্তববাদী কার্যকলাপকে জানা, ঈশ্বরের বাস্তবতা ও তাঁর সর্বশক্তিমানতাকে জানা, স্বয়ং ঈশ্বরের প্রকৃত পরিচয়কে জানা, তাঁর যা আছে ও তিনি যা তা জানা, তাঁর সৃষ্টির সকলকিছুর মধ্যে যে ক্রিয়াকলাপ তিনি প্রকাশিত করেছেন তা জানা—ঈশ্বর-জ্ঞানের অন্বেষণকারী প্রতিটি মানুষের কাছে এই বিষয়গুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সত্যের বাস্তবতার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে কিনা তার সাথে এগুলির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তোমার ঈশ্বর-উপলব্ধিকে তুমি যদি কেবল বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলো, তুমি যদি তা তোমার নিজের যৎসামান্য অভিজ্ঞতার মধ্যে, যাকে তুমি ঈশ্বরের অনুগ্রহ বলে অনুমান করো তার মধ্যে, বা ঈশ্বরের প্রতি তোমার ছোটোখাটো সাক্ষ্যের মধ্যে সীমায়িত করে ফেলো, তাহলে আমি বলছি, যে ঈশ্বরে তুমি বিশ্বাস করো কোনোক্রমেই তা স্বয়ং প্রকৃত ঈশ্বর নন। শুধু তাই-ই নয়, উপরন্তু একথাও বলা যায় যে, তুমি যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করো তা এক কাল্পনিক ঈশ্বর, প্রকৃত ঈশ্বর নন। এর কারণ, প্রকৃত ঈশ্বর হলেন তিনি যিনি সকলকিছুর উপর কর্তৃত্ব করেন, যিনি সকলকিছুর মধ্যে সঞ্চারিত হন, যিনি সকলকিছু পরিচালনা করেন। তিনিই সমগ্র মানবজাতির ও সকলকিছুর নিয়তিকে তাঁর করপুটে ধারণ করেন। যে ঈশ্বরের বিষয়ে আমি বলছি তাঁর কার্যকলাপ কেবল মনুষ্যজাতির এক ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে সীমায়িত নয়। অর্থাৎ, তা শুধুমাত্র সেই মানুষগুলির মধ্যেই সীমিত নয় যারা বর্তমানে তাঁর অনুসরণ করছে। তাঁর কাজকর্ম সকল বস্তুর মধ্যে, সকল বস্তুর উদ্বর্তনের মধ্যে, এবং সকল বস্তুর পরিবর্তনের বিধানসমূহের মধ্যে প্রতিভাত হয়।

তাঁর সৃষ্টির সকলকিছুর মধ্যে যদি তুমি ঈশ্বরের কোনো কর্ম প্রত্যক্ষ বা শনাক্ত করতে না পারো, তাহলে তুমি তাঁর কোনো কর্মের সাক্ষ্য দিতে পারবে না। তুমি যদি ঈশ্বরের সাক্ষ্য দিতে না পারো, তুমি যদি তোমার জানা সেই ক্ষুদ্র তথাকথিত “ঈশ্বর”-এর কথা বলে চলো, যে ঈশ্বর তোমার নিজের ধারণার দ্বারা সীমায়িত এবং কেবল তোমার মনের সংকীর্ণ পরিসরের মধ্যেই বিদ্যমান, তুমি যদি সেই প্রকার ঈশ্বরের কথাই বলতে থাকো, তাহলে ঈশ্বর কখনোই তোমার বিশ্বাসের প্রশংসা করবেন না। যখন তুমি ঈশ্বরের সাক্ষ্য দাও, তখন যদি তোমার সেই সাক্ষ্য কেবলমাত্র যেভাবে তুমি ঈশ্বরের অনুগ্রহ উপভোগ করো, যেভাবে তুমি ঈশ্বরের অনুশাসন ও তাঁর শোধন স্বীকার করো, এবং তাঁর প্রতি তোমার সাক্ষ্যে যেভাবে তুমি তাঁর আশীর্বাদ উপভোগ করো—এই সকলের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রদত্ত হয়, তাহলে তা মোটেই যথেষ্ট হবে না, এবং তাঁর সামান্যতমও সন্তুষ্টিবিধান করতে পারবে না। ঈশ্বরের ইচ্ছার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এক উপায়ে তুমি যদি তাঁর সাক্ষ্য দিতে চাও, স্বয়ং প্রকৃত ঈশ্বরের সাক্ষ্য দিতে চাও, তাহলে তাঁর কার্যাবলী থেকেই অতিঅবশ্যই তোমাকে জানতে হবে ঈশ্বরের যা আছে এবং ঈশ্বর যা। সকলকিছুর উপর ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণ থেকে তাঁর কর্তৃত্বকে তোমায় অনুধাবন করতে হবে, এবং কীভাবে তিনি সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যে সংস্থান করেন, সেই সত্য উপলব্ধি করতে হবে। তুমি যদি কেবল এটুকুই স্বীকার করো যে তোমার প্রাত্যহিক বেঁচে থাকার উপাদান ও তোমার জীবনে প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে, কিন্তু এই সত্যকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হও যে সমগ্র মানবজাতির সংস্থানের জন্যই ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টির সকল বস্তুকে গ্রহণ করেছেন, এবং সকলকিছুর উপর প্রভুত্ব স্থাপনের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে তিনি পরিচালিত করছেন, তাহলে কখনোই তুমি ঈশ্বরের সাক্ষ্য দিতে সক্ষম হবে না। আমার এইসব বলার উদ্দেশ্যটি কী? আমি এইসব বলছি যাতে তোমরা বিষয়টি লঘুভাবে না নাও, যাতে তোমরা ভ্রান্তিবশত ভেবে না বসো যে আমার আলোচিত বিষয়গুলি তোমাদের ব্যক্তিগত জীবন-প্রবেশের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক, এবং যাতে এই বিষয়গুলিকে তোমরা নিছক এক ধরনের জ্ঞান বা মতবাদ হিসাবে গ্রহণ না করো। যদি এহেন মানসিকতা নিয়ে তোমরা আমার বাক্য শ্রবণ করো, তাহলে তোমাদের কোনোই লাভ হবে না। ঈশ্বরকে জানার এই মোক্ষম সুযোগ তোমরা হারাবে।

এসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করার পিছনে আমার লক্ষ্যটি কী? আমার লক্ষ্য হল মানুষকে ঈশ্বর বিষয়ে অবগত করা, ঈশ্বরের ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপ মানুষের উপলব্ধিতে আনা। একমাত্র ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা ও তাঁর ক্রিয়াকলাপের বিষয়ে জ্ঞান আহরণের পরেই তুমি তাঁকে জানার সুযোগ বা সম্ভাবনা লাভ করো। উদাহরণস্বরূপ, যদি তুমি একজন মানুষকে উপলব্ধি করতে চাও, কীভাবে তা করে উঠবে? তার বাহ্যিক অবয়ব দেখার মাধ্যমে তা করা যাবে কি? সে কী পোশাক পরে এবং কীভাবে সাজসজ্জা করে তা লক্ষ্য করে তা করা যাবে কি? তার হাঁটার ধরন লক্ষ্য করার মাধ্যমে তা করা যাবে কি? তার জ্ঞানের পরিধি পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে কি তা করা যাবে? (না।) তাহলে একজন মানুষকে তুমি কীভাবে উপলব্ধি করো? একজন মানুষের কথাবার্তা ও আচার-আচরণ, তার চিন্তাভাবনা, এবং সে যা অভিব্যক্ত করে ও নিজের সম্পর্কে যা প্রকাশ করে—এই সকলকিছুর উপর ভিত্তি করেই তুমি সিদ্ধান্তে উপনীত হও। এভাবেই তুমি একজন মানুষকে জানতে পারো, তাকে উপলব্ধি করো। একইভাবে, যদি তুমি ঈশ্বরকে জানতে চাও, যদি তুমি তাঁর বাস্তববাদী দিকটি, তাঁর যথার্থ দিকটি উপলব্ধি করতে চাও, তাহলে অবশ্যই তুমি তাঁকে তাঁর কার্যাবলীর মধ্য দিয়ে এবং তাঁর প্রতিটি ব্যবহারিক কর্মের মাধ্যমেই জানবে। এ-ই হল সর্বোত্তম তথা একমাত্র পথ।

মানবজাতিকে জীবনধারণের একটা স্থিতিশীল পরিবেশ প্রদান করার উদ্দেশ্যে ঈশ্বর সকলকিছুর পারস্পরিক সম্পর্ককে ভারসাম্য-সমন্বিত করেন

সকল বস্তুর মধ্যে ঈশ্বর তাঁর কার্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটান, এবং সকলকিছুর মধ্যে তিনি সকল বস্তুর বিধানসমূহ পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত করেন। ঈশ্বর কীভাবে সকলকিছুর বিধানসমূহ পরিচালিত করেন, এবং এই বিধানসমূহের অধীনে কীভাবে তিনি সমগ্র মানবজাতির সংস্থান ও প্রতিপালন করেন, সেই বিষয়ে কিছুপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছিলাম। তা হল আলোচনার একটি অভিমুখ। এবার আমরা অপর এক অভিমুখ বিষয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি, যা সকল বস্তুর উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার উদ্দেশ্যে ঈশ্বর দ্বারা ব্যবহৃত একটি পন্থা। সকল বস্তু সৃজন করার পর, ঈশ্বর সেগুলির পারস্পরিক সম্পর্ককে কীভাবে ভারসাম্য-সমন্বিত করলেন, আমি সেই বিষয়ে আলোচনা করতে চলেছি। এটিও তোমাদের পক্ষে বিলক্ষণ বিস্তৃত এক প্রসঙ্গ। সবকিছুর পারস্পরিক সম্পর্কে ভারসাম্যবিধানের কার্যটি কি মানুষের দ্বারা সম্পন্ন হতে পারে? না, মানুষ এহেন দুরূহ কার্য সম্পন্ন করতে অক্ষম। মানুষ কেবলই ধ্বংসসাধনে পারঙ্গম। সকলকিছুর পারস্পরিক সম্পর্ককে তারা ভারসাম্য-সমন্বিত করতে পারে না; তারা তা পরিচালনা করতে অসমর্থ, এবং এই ধরনের বিপুল কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা মানবজাতির অনায়ত্ত। একমাত্র স্বয়ং ঈশ্বরেরই এমন কার্য সম্পাদন করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরের এহেন কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যটি কী—কী জন্য তা করা হয়? এটাও মানবজাতির উদ্বর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ঈশ্বর যা কিছু করতে চান তার সকলই আবশ্যক—করলেও চলে, আবার না-করলেও চলে, এমন কিছুই তাতে নেই। মানবজাতির উদ্বর্তনকে সুরক্ষিত রাখতে এবং মানুষকে জীবনধারণের পক্ষে এক অনুকূল প্রতিবেশ প্রদান করতে, এমন কিছু অত্যাবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে যা ঈশ্বরকে অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।

“ঈশ্বর সকলকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন” বাক্যাংশটির আক্ষরিক অর্থ থেকে তা অতি সুদূরপ্রসারী এক প্রসঙ্গ বলে বোধ হয়। প্রথমত, তা মানুষকে এই ধারণাটি দেয় যে “সকলকিছুর ভারসাম্য রক্ষা” একই সাথে সকলকিছুর উপর ঈশ্বরের কর্তৃত্বকেও নির্দেশ করে। এই “ভারসাম্য” শব্দটির অর্থ কী? প্রথমত, “ভারসাম্য” বলতে বোঝায় কোনোকিছুকে টাল হারিয়ে পড়ে যেতে না দেওয়া। বিষয়টা হল কোনো সামগ্রী ওজন করতে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করার মতো। দাঁড়িপাল্লাকে সাম্যাবস্থায় রাখতে গেলে দুইদিকের ওজনকে সমান হতে হবে। ঈশ্বর বিবিধ প্রকারের বস্তু সৃজন করেছিলেন: স্বস্থানে সংবদ্ধ বস্তু, চলমান বস্তু, সজীব বস্তু, শ্বাস গ্রহণ করে এমন বস্তু, এবং শ্বাসগ্রহণ করে না এমন বস্তু। এই সকল বস্তুগুলির মধ্যে উভয়েই উভয়কে শক্তি যোগায় এবং পরস্পরকে সংযত রাখে এমন এক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার, পারস্পরিক সংযুক্তির সম্পর্ক অর্জন করা কি সহজসাধ্য? এই সকলকিছুর মধ্যে অবশ্যই নীতিসমূহ রয়েছে, কিন্তু সেগুলি অত্যন্ত জটিল, তাই নয় কি? ঈশ্বরের কাছে দুরূহ না হলেও, মানুষের পক্ষে তা নিরীক্ষা করা অত্যন্ত জটিল ব্যাপার। “ভারসাম্য”—এই শব্দটি খুব সহজ-সরল। কিন্তু, মানুষ যদি বিষয়টিকে খুঁটিয়ে বিবেচনা করতো, এবং মানুষকে যদি নিজেদের প্রচেষ্টায় ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হতো, এমনকি সকল প্রকারের বিদ্বজ্জনরাও যদি এই বিষয়ে কাজ করতো—মানব জীববিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, রসায়নবিদ মায় ঐতিহাসিক অবধি—তাহলে সেই গবেষণার চূড়ান্ত পরিণাম কী হতো? পরিণাম কিছুই হতো না। তার কারণ, ঈশ্বর কর্তৃক সকলকিছুর সৃজন অতি আশ্চর্যজনক, এবং মানবজাতি কোনোদিনই এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে না। ঈশ্বর যখন সকল বস্তু সৃষ্টি করেছিলেন, তখনই তিনি সেগুলির পারস্পরিক নীতিসমূহ প্রণয়ন করেছিলেন, পারস্পরিক সংযতকরণ, পরিপূরকতা ও ভরণপোষণের নিমিত্ত জীবনধারণের বিভিন্ন পদ্ধতি স্থাপন করেছিলেন। এই বিবিধ পদ্ধতিগুলি অত্যন্ত জটিল, সেগুলি বিন্দুমাত্রও সরল অথবা একরৈখিক নয়। সকলকিছুর উপর ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণের পিছনের নিহিত নীতিসমূহ প্রতিপন্ন অথবা অধ্যয়ন করার উদ্দেশ্যে মানুষ যখন তাদের মন, তাদের অর্জিত জ্ঞান ও তাদের নিরীক্ষিত ঘটনাবলীকে ব্যবহার করে, দেখা যায় যে এই বিষয়গুলি আবিষ্কার করার পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ, এবং কোনো পরিণাম অর্জন করাও খুবই কঠিন। মানুষের পক্ষে কোনো ফলাফল লাভ করা শক্ত; মানবীয় চিন্তাভাবনা ও জ্ঞানের উপর নির্ভর করে ঈশ্বরসৃষ্ট সকল বস্তুকে পরিচালনা করতে গেলে মানুষের পক্ষে সেগুলির ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত দুঃসাধ্য। এর কারণ, মানুষ যদি বস্তুসকলের উদ্বর্তনের নীতিগুলি না জানে, তাহলে এই জাতীয় ভারসাম্যকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয়, তা-ও তারা জানবে না। তাই, মানুষকে যদি সকলকিছুর পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হতো, তাহলে খুব সম্ভবত এই ভারসাম্যকে তারা ধ্বংস করে ফেলতো। এই ভারসাম্য ধ্বংস হওয়ামাত্র, মানবজাতির জীবনধারণের পরিবেশও বিনষ্ট হয়ে যেতো, এবং তা যদি ঘটতো, তাহলে এর পর মানবজাতির উদ্বর্তনের ক্ষেত্রে এক সঙ্কটকাল উপস্থিত হতো। এর ফলে এক বিপর্যয় ঘনিয়ে আসতো। মানুষ যদি বিপর্যয়ের মধ্যে বাস করতো, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হতো? ফলাফল নিরূপণ করা খুবই কঠিন হতো, এবং নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হতো না।

তাহলে, সকল বস্তুর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঈশ্বর কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন? প্রথমত, পৃথিবীর কিছু স্থান সারা বছর বরফ ও তুষারে আবৃত থাকে, সেখানে অন্য কিছু স্থানে, চারটি ঋতুই বসন্তের মতো, আর শীতকাল কখনো আসে না, এবং এই ধরনের জায়গায় এক ফালি বরফ-ঢাকা জমি বা একটি তুষারকণাও তুমি কখনো দেখতে পাবে না। এখানে আমরা বৃহত্তর জলবায়ুর বিষয়ে কথা বলছি, এবং এই উদাহরণটি ঈশ্বরের সকলকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার অন্যতম এক পদ্ধতি। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হল এইরকম: একটি পর্বতমালা সতেজ উদ্ভিজ্জে আচ্ছাদিত, বিবিধ প্রকারের উদ্ভিদ মাটির উপর গালিচার আস্তরণ আকীর্ণ করেছে, এবং বিস্তির্ণ বনভূমি এত নিবিড় যে তার ভিতর দিয়ে হেঁটে গেলে এমনকি তুমি মাথার উপর সূর্যকেও দেখতে পাবে না। কিন্তু অন্য আরেকটি পর্বতমালার দিকে তাকালে ঘাসের একটি ফলাও সেখানে গজাতে দেখবে না, শুধু স্তরের পর স্তর জুড়ে ঊষর, অবিন্যস্ত পর্বতের বিস্তার। আপাতদৃষ্টিতে, উভয় ক্ষেত্রেই, মূলত শিথিল মৃত্তিকার বিপুল রাশি স্তূপীকৃত হয়ে পর্বতের আকার নিয়েছে, কিন্তু সেগুলির মধ্যে একটি ঘন অরণ্যে আবৃত, সেখানে অপরটি উদ্ভিদ-বিবর্জিত, এমনকি ঘাসের একটি ফলাও দেখা যায় না। এটি হল ঈশ্বরের সকলকিছুর সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের দ্বিতীয় পদ্ধতি। তৃতীয় পদ্ধতিটি হল: এক দিকে তাকালে হয়তো তুমি অন্তহীন তৃণভূমি, এক তরঙ্গায়িত হরিৎক্ষেত্র দেখতে পাচ্ছো। অন্যদিকে তাকালে দেখছো, দিগন্তপ্রসারিত মরুভূমি, ঊষর, শোঁ শোঁ শব্দে প্রবাহিত বায়ু-তাড়িত বালুরাশির মধ্যে কোনো জনপ্রাণী নেই, জলের কোনো উৎস তো নেই-ই। চতুর্থ উপায়টি এবম্বিধ: এক দিকে তাকালে দেখা যায়, সবকিছু সমুদ্রের তলায়, সেই বিপুল জলরাশির তলদেশে নিমজ্জিত, অন্য দিকে তাকালে, এমনকি এক বিন্দু সুমিষ্ট নির্ঝরিণীর জল খুঁজে মেলা ভার। পঞ্চম পদ্ধতিটি এইরকম: এখানকার এই ভূখণ্ডে প্রায়শই ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ে এবং আবহাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন ও স্যাঁতসেঁতে, সেখানে অপর এক ভূখণ্ডে, আকাশে প্রায়শই এক চণ্ড সূর্য বিরাজ করে, এমনকি এক বিন্দু বৃষ্টিপাতও সেখানে বিরল ঘটনা। ষষ্ঠ উপায়টি এবম্প্রকার: এক স্থানে এক মালভূমিতে বাতাস এত লঘু যে মানুষের পক্ষে শ্বাস নেওয়া কঠিন, সেখানে অপর এক স্থানে রয়েছে কেবলই জলা ও নিম্নভূমি, যা বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখিদের বাসস্থান হিসাবে কাজ করে। এগুলি হল বিবিধ প্রকার জলবায়ু, অথবা বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জলবায়ু বা আবহমণ্ডল। অর্থাৎ, ঈশ্বর মানবজাতির জীবনধারণের মৌলিক পরিবেশগুলিকে বৃহদায়তন আবহমণ্ডলের সাপেক্ষে ভারসাম্যে বিন্যস্ত করেন, জলবায়ু থেকে ভৌগোলিক পরিবেশ, এবং মাটির বিভিন্ন উপাদান থেকে জলের উৎসের সংখ্যা, এই সকলকিছুই নির্ণিত হয় মানুষের জীবনযাপনের পরিবেশের বায়ু, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য অর্জন করার উদ্দেশ্যে। এই সকল বিপরীতধর্মী ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের কারণে মানুষের এক স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল রয়েছে, এবং বিভিন্ন ঋতুর উষ্ণতা ও আর্দ্রতা সুস্থিত থেকেছে। এর ফলে মানুষ জীবনধারণের ঐরূপ পরিবেশে চিরকালের মতো করেই জীবনধারণ করে যেতে পারে। প্রথমে, এই বৃহদায়তন পরিবেশটিকে অবশ্যই ভারসাম্যান্বিত হতে হবে। এই শর্তটি অর্জিত হয় বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান ও সংগঠন এবং বিবিধ প্রকারের জলবায়ুর মধ্যে পরিবর্তনকে কার্যকর করে, ঈশ্বরের কাঙ্ক্ষিত তথা মানবজাতির জন্য প্রয়োজনীয় ভারসাম্যকে অর্জন করার লক্ষ্যে যা পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ ও সংবরণ করার সুযোগ প্রদান করে। বৃহদায়তন পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতেই এমন বলা হচ্ছে।

এখন আমরা সূক্ষ্ণতর অনুপুঙ্খসমূহের বিষয়ে আলোচনা করবো, যেমন ধরা যাক উদ্ভিজ্জ। তাদের ভারসাম্য কীভাবে অর্জিত হয়? অর্থাৎ, জীবনধারণের একটি সুষম পরিবেশের মধ্যে কীভাবে উদ্ভিজ্জদের টিকে থাকতে সমর্থ করে তোলা যায়? উত্তরটা হল, তাদের উদ্বর্তনের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের আয়ুষ্কাল, বৃদ্ধির মাত্রা এবং বংশবৃদ্ধির হার পরিচালনা করার মাধ্যমে। উদাহরণ হিসাবে অতি ক্ষুদ্র তৃণের বিষয়ে ধরা যাক—বসন্তে তাদের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে, গ্রীষ্মে ফুল ধরে, এবং শরতে ফল ধরে। সেই ফল মাটিতে পড়ে। পরের বছর, সেই ফলের বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং একই বিধানসমূহ অনুসারে সেই ঘটনার অনুবৃত্তি ঘটে। ঘাসের আয়ুষ্কাল খুবই হ্রস্ব; প্রতিটি বীজ মাটিতে পতিত হয়, শিকড় গজায় ও অঙ্কুরিত হয়, পুষ্পধারণ ও ফল উৎপাদন করে, এবং বসন্ত, গ্রীষ্ম ও হেমন্ত—মাত্র তিনটি ঋতুর মধ্যেই সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়ে যায়। সব ধরনের গাছেরই তাদের নিজস্ব আয়ুষ্কাল এবং অঙ্কুরোদ্গম ও ফলধারণের বিভিন্ন সময়কাল থাকে। কিছু গাছ কেবল ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যেই মারা যায়—সেটাই তাদের আয়ুষ্কাল। কিন্তু তাদের ফল মাটিতে পড়ে, তারপর তাতে শিকড় গজায় ও অঙ্কুরিত হয়, পুষ্পিত হয় ও ফল ধারণ করে, এবং আরো ৩০ থেকে ৫০ বছর বাঁচে। এটাই হল গাছটির পুনরাবর্তনের হার। পুরানো গাছ মারা যায় আর নবীন গাছ বেড়ে ওঠে; এই কারণেই অরণ্যে তুমি সততই তুমি বৃক্ষরাজির বৃদ্ধি ঘটতে দেখতে পাও। কিন্তু তাদেরও স্বাভাবিক জীবনচক্র এবং জন্ম ও মৃত্যুর প্রক্রিয়া রয়েছে। কিছু গাছ এক হাজার বছরেরও বেশি বেঁচে থাকতে পারে, এবং কিছু গাছ এমনকি তিন হাজার বছরও জীবিত থাকতে পারে। কোনো উদ্ভিদ যে প্রজাতিরই হোক বা তার আয়ুষ্কাল যাই-ই হোক না কেন, সাধারণভাবে, তা কত দিন বাঁচে, তার বংশবিস্তারের ক্ষমতা, বংশবিস্তারের দ্রুততা ও পর্যাবৃত্তির হার এবং উৎপাদিত অপত্যজনের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ঈশ্বর সেই উদ্ভিদটির ভারসাম্য পরিচালনা করেন। এর ফলে তৃণ থেকে বৃক্ষ অবধি সকল উদ্ভিদ একটি সুষম বাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে তেজীয়ানভাবে বিকশিত ও বর্ধিত হওয়া অব্যাহত রাখতে পারে। সেহেতু, পৃথিবীর যেকোনো অরণ্যের দিকে তাকালে দেখবে, যাকিছু সেখানে জন্মায়, তৃণ ও বৃক্ষ উভয়ই, তাদের নিজের নিয়ম অনুযায়ী ক্রমাগত বংশবৃদ্ধি করছে ও বেড়ে চলেছে। মনুষ্যজাতির কাছ থেকে তাদের উদ্বৃত্ত কোনো শ্রম অথবা সহায়তার প্রয়োজন ঘটে না। শুধুমাত্র এহেন ভারসাম্য তাদের রয়েছে বলেই তারা তাদের নিজস্ব বেঁচে থাকার পরিবেশ বহাল রাখতে সমর্থ হয়। কেবলমাত্র তাদের উদ্বর্তনের এক উপযুক্ত পরিমণ্ডল রয়েছে বলেই বিশ্বের অরণ্য ও তৃণভূমিগুলি পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে সমর্থ হয়। তাদের অস্তিত্ব মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এবং অরণ্য ও তৃণভূমিতে বসবাসকারী পশু-পাখি, পতঙ্গ ও সকল প্রকার অণুজীব সহ সমস্ত ধরনের প্রাণসত্তার প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রতিপালিত করে।

ঈশ্বর সকল প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে ভারসাম্যকেও নিয়ন্ত্রণ করেন। কীভাবে তিনি এই ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করেন? এটা উদ্ভিদদের অনুরূপই—তিনি তাদের ভারসাম্যকে পরিচালিত করেন এবং তাদের প্রজনন ক্ষমতা, তাদের বংশবৃদ্ধির পরিমাণ ও হার এবং প্রাণিজগতে তারা যে ভূমিকা পালন করে তার উপর ভিত্তি করে তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, সিংহ জেব্রা ভক্ষণ করে, সেহেতু, যদি সিংহের সংখ্যা জেব্রার থেকে বেশি হতো, তাহলে জেব্রাদের নিয়তি কী হতো? তারা বিলুপ্ত হয়ে যেতো। আর জেব্রারা যদি সিংহের তুলনায় অনেক কম শাবকের জন্ম দিতো, তাহলে তাদের পরিণতি কী হতো? তাহলেও তারা বিলুপ্ত হয়ে যেতো। তাই, জেব্রার সংখ্যা অবশ্যই সিংহের সংখ্যা অপেক্ষা অনেক বেশি হবে। তার কারণ, জেব্রাদের অস্তিত্ব শুধু তাদের নিজেদের জন্য নয়, উপরন্তু সিংহদের জন্যও বটে। ব্যাপারটা এইভাবেও বলা যায়: প্রতিটি জেব্রা হল সামগ্রিক জেব্রা প্রজাতির একটি অংশ, কিন্তু একই সাথে তা সিংহদের মুখের খাবারও বটে। সিংহদের প্রজননের হার কখনও জেব্রাদের প্রজননের হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না, তাই সিংহের সংখ্যা কখনো জেব্রার সংখ্যার চেয়ে অধিক হতে পারে না। একমাত্র এই ভাবেই সিংহের খাদ্যের উৎসকে সুনিশ্চিত করা যায়। এবং সেহেতু, সিংহেরা জেব্রাদের স্বাভাবিক শত্রু হলেও, মানুষ প্রায়ই এই দুই প্রজাতিকে একই অঞ্চলে অবসর সময়ে বিশ্রামরত অবস্থায় দেখতে পায়। সিংহ তাদের শিকার করে ভক্ষণ করে বলে জেব্রাদের সংখ্যা কখনো কমে যাবে না বা তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে না, এবং তাদের “রাজা” মর্যাদার অধিকারবলেই সিংহদের সংখ্যা যে বৃদ্ধি পাবে, তা-ও নয়। বহু পূর্বেই ঈশ্বর এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অর্থাৎ, ঈশ্বর সকল প্রাণীদের মধ্যে সুষমতার বিধানসমূহ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যাতে তারা এহেন ভারসাম্য অর্জন করতে পারে, এবং এই বিষয়টি মানুষ প্রায়শই দেখতে পায়। সিংহই কি জেব্রার একমাত্র প্রাকৃতিক শত্রু? না, কুমিরেও জেব্রা খায়। জেব্রাদের খুব অসহায় ধরনের প্রাণী বলে মনে হয়। সিংহের হিংস্রতা তাদের নেই, এবং যখন তাদের দুর্ধর্ষ শত্রু সিংহের সম্মুখীন হতে হয়, তখন দৌড়ে পালানো ছাড়া আর কিছুই তারা করতে পারে না। এমনকি প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রেও তারা শক্তিহীন। যখন তারা দৌড়ে সিংহকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না, তখন সিংহের খাদ্য হওয়া ছাড়া তাদের গত্যন্তর থাকে না। প্রাণীজগতে প্রায়শই এমন দেখা যায়। এহেন কিছু দেখলে তোমাদের কীধরনের অনুভূতি ও চিন্তা হয়? জেব্রাটির জন্য তোমাদের কি দুঃখবোধ হয়? সিংহটিকে তোমরা কি ঘৃণা করো? জেব্রারা দেখতে কত সুন্দর! কিন্তু সিংহ, তারা সবসময় লোভীর মতো তাদের লক্ষ্য করছে। আর জেব্রাগুলোও বোকার মতো ছুটে অনেকটা দূরে চলে যায় না। তারা দেখে সিংহ সেখানে গাছের তলায় ঠাণ্ডা ছায়ায় বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যেকোনো মুহূর্তে সে এসে তাদেরকে খেতে পারে। মনে মনে তারা এটা জানে, কিন্তু তবু সেই ভূখণ্ড ছেড়ে নড়বে না। এটা একটা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার, এমন অত্যাশ্চর্য এক বিষয় যা ঈশ্বরের পূর্বনির্ধারণ ও তাঁর নিয়মকে প্রতিভাত করে। জেব্রাটির জন্য তুমি দুঃখবোধ করো কিন্তু তুমি একে রক্ষা করতে অক্ষম, আর সিংহটিকে তুমি ঘৃণা করো কিন্তু একে তুমি ধ্বংস করতে পারো না। জেব্রা হল সিংহের জন্য ঈশ্বরের প্রস্তুতকৃত খাদ্য, কিন্তু সিংহেরা যতই ভক্ষণ করুক না কেন, জেব্রারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। সিংহেরা খুব স্বল্প সংখ্যক অপত্য উৎপাদন করে, এবং তারা অত্যন্ত শ্লথ গতিতে বংশবিস্তার করে, তাই যত সংখ্যক জেব্রাই তারা ভক্ষণ করুক না কেন, তাদের সংখ্যা কখনো জেব্রার সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে না। এখানেই, রয়েছে ভারসাম্য।

এহেন ভারসাম্য বিধানের পিছনে ঈশ্বরের লক্ষ্য কী? মানুষের উদ্বর্তনের উপযোগী পরিবেশ এবং মানবজাতির জীবনধারণ উভয়ই এর সাথে সংশ্লিষ্ট। সিংহের জেব্রা অথবা অনুরূপ কোনো শিকার—হরিণ অথবা অপর কোনো পশু—যদি খুব বেশি মন্থরগতিতে বংশবিস্তার করতো এবং সিংহের সংখ্যা হঠাৎ খুব বেড়ে যেতো, মানুষরা তখন কী ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতো? সিংহের তাদের শিকার আহার করাটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু একটা সিংহ কোনো মানুষকে আহার করলে তা একটা দুঃখজনক ঘটনা। এই শোকাবহ ঘটনাটি ঈশ্বরের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত কিছু নয়, তা তাঁর নিয়মের অধীনে সংঘটিত কোনো ঘটনা নয়, মানবজাতির উপর তাঁর ডেকে আনা কোনো দুর্দৈব তো নয়ই। বরং, তা এমনকিছু যা মানুষ নিজেরাই নিজেদের উপর ডেকে আনে। তাই ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, সকল বস্তুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকাটা মানবজাতির উদ্বর্তনের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তা উদ্ভিদই হোক কি প্রাণী, কোনোকিছুই তার যথাযথ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে না। উদ্ভিদ, প্রাণী, পর্বত ও হ্রদ—মানবজাতির উদ্দেশ্যে ঈশ্বর একটি সুষম বাস্তুতান্ত্রিক প্রতিবেশ প্রস্তুত করেছেন। কেবলমাত্র এমন এক সুষম বাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে তবেই মানুষের উদ্বর্তন সুরক্ষিত থাকতে পারে। যদি বৃক্ষ বা তৃণাদির বংশবিস্তারের ক্ষমতা নগণ্য হতো, কিংবা তাদের বংশবিস্তারের গতি অতীব মন্থর হতো, তাহলে কি মৃত্তিকা তার আর্দ্রতা হারিয়ে ফেলতো না? মৃত্তিকা যদি তার আর্দ্রতা হারিয়ে ফেলে তাহলে তখনো কি তা স্বাস্থ্যবান থাকবে? মৃত্তিকা যদি তার উদ্ভিজ্জ ও আর্দ্রতা হারিয়ে ফেলে, তখন তা খুব দ্রুত হারে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, এবং তার স্থলে বালুরাশি সঞ্চিত হবে। মৃত্তিকার ক্রমাবনতি ঘটলে মানুষের জীবনধারণের পরিবেশও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাবে। অনেক বিপর্যয় এই বিনাশের সঙ্গী হবে। এই প্রকার বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য ও এহেন বাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে, সকলকিছুর মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে মানুষকে প্রায়শই বিপর্যয়ের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণে ব্যাঙদের বাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়, তারা সকলে তখন এক জায়গায় জড়ো হয়, তাদের সংখ্যা আচমকা বেড়ে যায়, এবং মানুষ এমনকি নগরীর মধ্যেও বিপুল সংখ্যক ব্যাঙকে রাস্তা পার হতে দেখে। বিপুল সংখ্যক ব্যাঙ যদি মানুষের জীবনধারণের পরিবেশ দখল করে বসতো, তাহলে ঘটনাটিকে কী বলা যেতো? এক বিপর্যয়। একে বিপর্যয় কেন বলা হতো? মানবজাতির পক্ষে হিতকর এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলি তখনই মানুষের কাজে লাগে যখন তারা তাদের জন্য উপযুক্ত একটা জায়গায় অবস্থান করে; তখন তারা মানুষের জীবনধারণের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। কিন্তু তারা যদি হয়ে ওঠে বিপর্যয়স্বরূপ, তখন তারা মানুষের জীবনের সুশৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করবে। ব্যাঙগুলি যে সকল পদার্থ ও উপাদান তাদের দেহের দ্বারা বহন করে আনে তা মানবজীবনের গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি তা মানুষের শারীরিক অঙ্গগুলির আক্রান্ত হবার কারণ হতে পারে—এ হল এক ধরনের বিপর্যয়। আরেক প্রকার বিপর্যয়, মানুষ মাঝেমাঝেই যার সম্মুখীন হয়েছে, তা হল বিপুল সংখ্যায় পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাব। তা কি এক বিপর্যয় নয়? হ্যাঁ, তা বস্তুতই এক ভীতিপ্রদ বিপর্যয়। মানুষ কতটা সমর্থ তাতে কিছু যায় আসে না—মানুষ বিমানপোত, কামান, ও পারমাণবিক বোমা বানিয়ে থাকতে পারে—কিন্তু, পঙ্গপাল যখন আক্রমণ করে, মানবজাতির কাছে তার কী সমাধান রয়েছে? পঙ্গপালের উপর তারা কি কামান দাগতে পারে? যন্ত্রচালিত বন্দুক থেকে তাদের দিকে গুলি ছুঁড়তে পারে? না, পারে না। তাহলে তারা কি পঙ্গপাল বিতাড়নের উদ্দেশ্যে কীটনাশক প্রয়োগ করতে পারে? তা-ও মোটেই সহজ কাজ নয়। এই খুদে পঙ্গপালগুলি কী করতে আসে? তারা নির্দিষ্টভাবে ফসল ও খাদ্যশস্য খেয়ে ফেলে। পঙ্গপাল যেখানেই যায়, সমস্ত ফসল সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পঙ্গপালের আক্রমণের সময়, যাবতীয় খাদ্য, যার উপর চাষীরা সারা বছরের জন্য নির্ভর করে, পঙ্গপালরা চোখের নিমেষে তা সম্পূর্ণ খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। মানুষের কাছে, পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাব নিছকই এক উপদ্রবমাত্র নয়—তা হল এক বিপর্যয়। তাহলে আমরা জানলাম যে বিশাল সংখ্যায় পঙ্গপালের আবির্ভাব হল এক ধরনের বিপর্যয়, কিন্তু ইঁদুরের ক্ষেত্রে বিষয়টা কী? ইঁদুর খাওয়ার মতো কোনো শিকারী পাখি যদি না থাকে, তাহলে ইঁদুরের সংখ্যা খুব দ্রুত হারে বেড়ে যাবে, তোমরা যতটা কল্পনা করতে পারো তার থেকেও দ্রুত হারে। আর ইঁদুর যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ কি তাহলে সন্তোষজনক জীবন যাপন করতে পারে? মানুষকে কী ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো? (মহামারীর সম্মুখীন হতো।) কিন্তু মহামারীই কি একমাত্র ফলশ্রুতি হতো বলে তোমাদের মনে হয়? ইঁদুর সবকিছুতে দাঁত বসাবে, এমনকি কাঠের উপরেও তারা একনাগাড়ে কামড়ে যাবে। একটা বাড়িতে যদি কেবল দুটি ইঁদুরও থাকে, তবু বাড়ির সকল বাসিন্দাদের কাছে তারা একটা উপদ্রব হয়ে উঠবে। কখনো তারা তেল চুরি করে খায়, আবার কখনো তারা রুটি বা খাদ্যশস্য খায়। আর যে দ্রব্য তারা খায় না, সেগুলিকে চিবিয়ে সম্পূর্ণ অব্যবহারযোগ্য করে ছাড়ে। জামাকাপড়, জুতো, আসবাবপত্র—সবকিছুকে তারা দাঁতে কাটে। কখনো সখনো তারা দেরাজের উপরেও চড়ে বসে—ইঁদুর বাসনকোসনের উপর দিয়ে চলে বেড়ানোর পরেও কি সেগুলি ব্যবহার করা যায়? এমনকি জীবাণুমুক্ত করার পরেও তখনো তুমি স্বস্তিবোধ করবে না, তাই সেগুলো তুমি বাইরে ফেলেই দেবে। ইঁদুর মানুষের জন্য এইসব উৎপাত নিয়ে আসে। ইঁদুর ছোটোখাটো জীব হলেও, মানুষের কাছে তাদের মোকাবিলা করার কোনো উপায় জানা নেই, পরিবর্তে তাদের লুঠতরাজ কেবলই সহ্য করে যেতে হয়। কেবল এক জোড়া ইঁদুরই ব্যাঘাত সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট, এক দঙ্গলের কথা না-হয় ছেড়েই দাও। তাদের সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পেতো এবং তারা বিপর্যয় হয়ে উঠতো, তাহলে পরিণাম হতো অকল্পনীয়। এমনকি, পিঁপড়ের মতো অতি ক্ষুদ্র জীবও বিপর্যয় হয়ে উঠতে পারে। তা যদি ঘটতো, তাহলে মানবজাতির যে ক্ষতি তারা করতো, তা-ও উপেক্ষণীয় হতো না। পিঁপড়েরা ঘরবাড়ির এতটাই ক্ষতিসাধন করতে পারে যে সেগুলি ধ্বসে পড়ে। পিঁপড়েদের শক্তিকে তাচ্ছিল্য করা যাবে না। নানা ধরনের পাখিও যদি এক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতো তাহলে কি তা ভীতিপ্রদ হয়ে উঠতো না? (হ্যাঁ।) অন্যভাবে বললে, যখনই প্রাণী ও জীবিত বস্তু, সে তারা যে প্রজাতিরই হোক, তাদের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে, তারা তখন সংখ্যায় বৃদ্ধি পাবে, বংশবিস্তার করবে, এবং এক অস্বাভাবিক পরিসরের মধ্যে, অনিয়মিত পরিসরের ভিতর বাস করবে। এবং তা মানবজাতির জন্য অকল্পনীয় পরিণাম বয়ে আনতো। তা শুধু মানুষের উদ্বর্তন ও জীবনধারণকেই প্রভাবিত করতো না, উপরন্তু মানবজাতির জন্য তা বিপর্যয়ও বয়ে আনতো, যা এমনকি মানুষের নিয়তি সম্পূর্ণ বিলয় ও বিলুপ্তি সংঘটনের পর্যায়েও উপনীতে হতে পারতো।

ঈশ্বর যখন সকল বস্তু সৃষ্টি করেছিলেন, তখন সেগুলিকে ভারসাম্যে স্থিত করতে, পর্বত ও হ্রদের, উদ্ভিদ ও সকল প্রকার পশু, পাখি ও পতঙ্গের জীবনধারণের পরিস্থিতির ভারসাম্যে নিশ্চিত করতে তিনি যাবতীয় প্রকারের পদ্ধতি ও উপায়সমূহ অবলম্বন করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সকল জীবিত সত্তাকে তাঁর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিধানসমূহের অধীনে জীবনধারণ ও বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ দান করা। সৃষ্টির কোনোকিছুই এই নিয়মগুলির বাইরে যেতে পারে না, এবং এই বিধানসমূহ অলঙ্ঘনীয়। কেবলমাত্র এহেন প্রাথমিক পরিবেশের মধ্যেই মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সুরক্ষিতভাবে জীবনধারণ ও বংশবিস্তার করতে পারে। কোনো জীবিত সত্তা যদি ঈশ্বর-নির্ধারিত পরিমাণ বা পরিসরকে অতিক্রম করে যায়, বা যদি তা ঈশ্বর-নির্দেশিত বৃদ্ধির হার, প্রজনন পুনরাবৃত্তির হার, বা সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে মানবজাতির জীবনধারণের পরিবেশকে বিভিন্ন মাত্রায় ধ্বংসের সম্মুখীন হতে হবে। এবং একই সাথে, মানবজাতির উদ্বর্তন বিপন্ন হয়ে উঠবে। যদি কোনো এক প্রকারের জীবিত সত্তা সংখ্যায় খুব বেশি হয়, তাহলে তা মানুষের খাদ্য ছিনিয়ে নেবে, মানুষের জলের উৎসকে ধ্বংস করবে, ও তাদের বাস্তুভূমির সর্বনাশ করবে। এই ভাবে, মানবজাতির বংশবিস্তার বা জীবনধারণের পরিস্থিতি তৎক্ষণাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উদাহরণস্বরূপ, সকল বস্তুর কাছেই জল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইঁদুর, পিঁপড়ে, পঙ্গপাল, ব্যাঙ বা যেকোনো প্রকারের অন্য পশু অত্যধিক সংখ্যায় বিদ্যমান হলে, তারা বেশি পরিমাণে জল পান করবে। তাদের পান করা জলের পরিমাণ বাড়লে, পানীয় জলের উৎস ও জলময় এলাকার সুনির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে মানুষের পানীয় জল ও জলের উৎস হ্রাস পাবে এবং তারা জলের ঘাটতির সম্মুখীন হবে। বিবিধ প্রকারের জীবজন্তু সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মানুষের পানীয় জল যদি বিনষ্ট, সংক্রমিত, বা ব্যাহত হয়, তাহলে জীবনধারণের ওই রকম প্রতিকূল পরিবেশে মানবজাতির উদ্বর্তন গুরুতররূপে বিপন্ন হয়ে পড়বে। যদি কেবল এক প্রকারের বা বেশ কিছু প্রকারের জীবিত সত্তা তাদের যথাযথ সংখ্যাকে অতিক্রম করে যায়, তাহলে মানবজাতির জীবনধারণের পরিসরের মধ্যে বায়ু, উষ্ণতা, আর্দ্রতা, এমনকি বাতাসের উপাদানগত গঠনও বিভিন্ন মাত্রায় বিষাক্ত ও বিনষ্ট হবে। এহেন পরিস্থিতিতে, মানুষের উদ্বর্তন ও নিয়তিও এই বাস্তুতন্ত্রগত কারণসমূহের ফলস্বরূপ বিপন্নতার শিকার হবে। অতএব, এই ভারসাম্যগুলি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাসের বায়ু বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাদের পানীয় জল দুষিত হয়ে যাবে, এবং যে তাপমাত্রা তাদের দরকার তা-ও বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তিত ও প্রভাবিত হবে। যদি তা-ই ঘটে, তাহলে মানবজাতি সহজাতভাবে জীবনধারণের যে পরিবেশের অধিকারী তা অপরিমেয় অভিঘাত ও পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এমনতর এক পরিস্থিতিতে, মানুষের জীবনধারণের প্রাথমিক পরিবেশ যেখানে ধ্বংস করা হয়েছে, সেখানে মানবজাতির নিয়তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কী দাঁড়াবে? এ অত্যন্ত গুরুতর এক সমস্যা! যেহেতু ঈশ্বর জানেন ঠিক কী কারণে সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু মানবজাতির স্বার্থে অস্তিমান, তাঁর দ্বারা সৃজিত প্রতিটি প্রকারের বস্তুর ভূমিকা কী, মানবজাতির উপর প্রতিটি বস্তুর প্রভাব কী ধরনের, এবং সেগুলি কতো মাত্রায় মানবজাতির উপকার সাধন করে, যেহেতু এই সকল বিষয়ে ঈশ্বরের অন্তরে একটা পরিকল্পনা রয়েছে, এবং যেহেতু তাঁর সৃষ্ট সকল বস্তুকে প্রত্যেকটি বিষয়েই তিনি পরিচালনা করেন, সেহেতু তাঁর সম্পাদিত প্রতিটি কার্য মানবজাতির পক্ষে এত গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যক। অতএব, এখন থেকে, ঈশ্বরের সৃষ্টির বস্তুসমূহের মধ্যে যখনই তুমি কোনো বাস্তুতান্ত্রিক সংঘটন পর্যবেক্ষণ করবে, বা কোনো প্রাকৃতিক নিয়মকে ক্রিয়ারত দেখবে, তখন তুমি আর ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রতিটি জিনিসের আবশ্যকতা বিষয়ে সন্দিহান হবে না। তুমি আর ঈশ্বরের দ্বারা সকল বস্তুর সুবিন্যস্তকরণ এবং মানবজাতির সংস্থান সরবরাহের উদ্দেশ্যে তাঁর দ্বারা গৃহীত বিভিন্ন পদ্ধতির বিষয়ে অজ্ঞতাপ্রসূত শব্দাবলী প্রয়োগের মাধ্যমে যদৃচ্ছ বিচার জাহির করবে না। তাঁর সৃষ্টির সকল বস্তুর জন্য ঈশ্বরের নির্ধারিত যে বিধানসমূহ রয়েছে, সেগুলির বিষয়েও তুমি কোনো অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবে না। বিষয়টি এমনই নয় কি?

এক্ষুনি আমরা যে বিষয়সকল নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলি কী? একবার তা ভেবে দেখো। ঈশ্বরের দ্বারা সম্পাদিত প্রতিটি কাজের পিছনে তাঁর নিজস্ব অভিপ্রায় রয়েছে। যদিও মানুষের কাছে তাঁর অভিপ্রায় দুর্জ্ঞেয়, তবু মানবজাতির জীবনধারণের সঙ্গে সর্বদা তা ওতপ্রোত ও দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত। এটি সম্পূর্ণরূপে অপরিহার্য। তার কারণ, ঈশ্বর কখনো নিরর্থক কিছু করেননি। তাঁর প্রতিটি কার্যের নিহিত নীতিগুলি তাঁর পরিকল্পনা ও প্রজ্ঞা দ্বারা সম্পৃক্ত। সেই পরিকল্পনার লক্ষ্য ও অভিপ্রায় হল মানবজাতিকে সুরক্ষিত রাখা; বিপর্যয়, অন্যান্য জীবিত সত্তার আক্রমণ, এবং ঈশ্বর-সৃষ্ট যেকোনো বস্তুর কারণে সংঘটিত যেকোনো রকম অনিষ্টকে এড়াতে মানবজাতিকে সহায়তা করা। তাহলে, এমন কি বলা যায়, যে, ঈশ্বরের যে সকল কার্যাবলী আমরা এই প্রসঙ্গের আলোচনাক্রমে লক্ষ্য করেছি সেগুলি ঈশ্বরের মানবজাতির জন্য রসদ সংস্থানের আরেকটি উপায় নির্দেশ করে? আমরা কি বলতে পারতাম, এই কাজগুলির মাধ্যমে ঈশ্বর মানবজাতিকে খাদ্য সরবরাহ ও পরিচালিত করেন? (হ্যাঁ।) বর্তমান প্রসঙ্গ ও আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু: “সকল বস্তুর প্রাণের উৎস হলেন ঈশ্বর”—উভয়ের মধ্যে ওতপ্রোত কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি? (হ্যাঁ।) খুব মজবুত একটা সম্পর্ক রয়েছে, এবং বর্তমান প্রসঙ্গটি হল মূল বিষয়বস্তুর একটি দিক মাত্র। এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে ঈশ্বরের বিষয়ে, স্বয়ং ঈশ্বর ও তাঁর কার্যাবলীর বিষয়ে মানুষের কেবল একটি অস্পষ্ট কল্পনা ছিল—তাদের প্রকৃত কোনো উপলব্ধি ছিল না। কিন্তু, মানুষকে যখন তাঁর কার্যকলাপ এবং যাকিছু তিনি করেছেন সেবিষয়ে বলা হয়, তখন তারা ঈশ্বর যা করেন সেগুলির নীতিসমূহ উপলব্ধি ও হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, এবং এই বিষয়গুলি সম্বন্ধে তারা উপলব্ধি অর্জন করতে পারে, আর সেগুলি তাদের বোধগম্যতার আয়ত্তাধীন হয়—বিষয়টি এমনই নয় কি? যদিও ঈশ্বর যখনই সকল বস্তুর সৃজন বা শাসনের মতো কোনো কার্য সাধন করেন, তখন তাঁর হৃদয়ে বিবিধ প্রকারের অত্যন্ত জটিল সব তত্ত্ব, নীতি ও নিয়মকানুন থাকে, তবু, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তোমাদের এগুলির বিষয়ে কেবল একটা অংশও শেখার সুযোগ করে দিলে, তোমাদের অন্তরে এটুকু উপলব্ধি লাভ করা কি তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, যে, এগুলি ঈশ্বরের কার্যকলাপ এবং এগুলি যথাসম্ভব বাস্তব? (হ্যাঁ, সম্ভব।) তাহলে ঈশ্বরের বিষয়ে তোমাদের সাম্প্রতিক উপলব্ধি কীভাবে পূর্বের উপলব্ধির থেকে স্বতন্ত্র? এটি উপাদানগতভাবে পৃথক। পূর্বে, তোমাদের উপলব্ধি ছিল অতি অন্তঃসারশূন্য, অতি অস্পষ্ট; কিন্তু এখন তোমাদের উপলব্ধির মধ্যে ঈশ্বরের ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে মানানসই, ঈশ্বরের যা আছে ও তিনি যা তার সাথে মানানসই, প্রভূত সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে। সেই কারণেই, আমি যাকিছু আলোচনা করেছি, তা তোমাদের ঈশ্বর-উপলব্ধির ক্ষেত্রে চমকপ্রদ শিক্ষাবিষয়ক উপকরণ।

ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৪

পূর্ববর্তী: স্বয়ং অনন্য ঈশ্বর ৬

পরবর্তী: স্বয়ং অনন্য ঈশ্বর ১০

প্রতিদিন আমাদের কাছে 24 ঘণ্টা বা 1440 মিনিট সময় থাকে। আপনি কি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর বাক্য শিখতে 10 মিনিট সময় দিতে ইচ্ছুক? শিখতে আমাদের ফেলোশিপে যোগ দিন। কোন ফি লাগবে না।👇

সম্পর্কিত তথ্য

পরিশিষ্ট ২ ঈশ্বর সমগ্র মানবজাতির ভাগ্য নির্ধারক

মানব প্রজাতির সদস্য এবং ধর্মপ্রাণ খ্রীষ্টান হিসাবে আমাদের সকলের দায়িত্ব এবং কর্তব্য হলো নিজেদের দেহ ও মনকে ঈশ্বরের অর্পিত দায়িত্বে নিযুক্ত...

পরিশিষ্ট ১ ঈশ্বরের আবির্ভাব এক নতুন যুগের সূচনা করেছে

ঈশ্বরের ছয় হাজার বছরের পরিচালনামূলক পরিকল্পনা শেষ হতে চলেছে, এবং যারা তাঁর আবির্ভাবের পথ চেয়ে আছে তাদের সকলের জন্য স্বর্গের দ্বার ইতিমধ্যেই...

রাজ্যের যুগই হল বাক্যের যুগ

রাজ্যের যুগে, যে পদ্ধতিতে তিনি কাজ করেন তা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে, এবং সমগ্র যুগের কাজ সম্পাদন করার জন্য, ঈশ্বর নতুন যুগের সূচনা করতে বাক্যের...

সেটিংস

  • লেখা
  • থিমগুলি

ঘন রং

থিমগুলি

ফন্টগুলি

ফন্ট সাইজ

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

লাইনের মধ্যে ব্যবধান

পৃষ্ঠার প্রস্থ

বিষয়বস্তু

অনুসন্ধান করুন

  • এই লেখাটি অনুসন্ধান করুন
  • এই বইটি অনুসন্ধান করুন

Messenger-এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন